ঢাকা, মঙ্গলবার 17 July 2018, ২ শ্রাবণ ১৪২৫, ৩ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ইভটিজিং প্রতিরোধে ইসলাম

মহান আল্লাহ এক মানব আদম আ. থেকে তার স্ত্রী, অতঃপর এতদুভয় হতে সমগ্র মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন। সৃৃষ্টজীব হিসেবে যেমন রয়েছে নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা; তেমনি আচার-আচরণ, মূল্যবোধ, অধিকার, দায়িত্ব-কর্তব্য ইত্যাদি দিক থেকেও রয়েছে নারী-পুরুষের সাম্য। মায়ের জাতি নারী সমাজ আজ সমাজের নানা প্রান্তে নানা প্রকার অত্যাচার-নির্যাতনে জর্জরিত। নারীজাতি তথাকথিত আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে ইসলামী বিধান বাদ দিয়ে অপসংস্কৃতি চর্চায় উদগ্রীব; যার ফলশ্রুতিতে আইয়ামে জাহেলিয়্যাতের ন্যায় এ দেশের নারী সমাজ আজও পদে পদে নির্যাতিত হচ্ছে। ইভটিজিং হলো নারী নির্যাতনের একটি আধুনিক সংস্করণ। ইভটিজিং কী? এর উৎপত্তি এবং এ বিষয়ে দেশীয় ও ইসলামী আইনের তুলনামূলক পর্যালোচনাপূর্বক ইসলামী আইনের উপযোগিতা তুলে ধরা এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে ইভটিজিং একটি মারাত্মক সামাজিক সমস্যা। যা অন্য সকল অপরাধকে হার মানিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমা সংস্কৃতি, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, সুন্দরী প্রতিযোগিতার নামে চরিত্র হনন, বিভিন্ন দিবস পালনের নামে তরুণ-তরুণীদের অবাধ উন্মাদনা, আধুনিক পোষাকের নামে উলঙ্গপনা, ফেইসবুকে তরুণ-তরুণীদের অবাধ হৃদয় বন্ধন ইত্যাদি নানাবিধ অনৈতিক কাজের ফলাফল স্বরূপই আজকের সমাজে নেমে এসেছে ভয়াল ইভটিজিং। ইভটিজিং আইন, সমাজ, রাষ্ট্র কারো দ্বারাই প্রতিরোধ সম্ভব হচ্ছে না। মুসলিম সমাজে নৈতিক মূল্যবোধকে পাশ কাটিয়ে ইভটিজিং ঠেকানোও সম্ভব নয়। তাই আজকের সমাজে ইভটিজিং থেকে বাঁচতে হলে ইসলামী অনুশাসন ও এর আইনি ব্যবস্থা মেনে চলা অপরিহার্য। কেননা একমাত্র ইসলামী অনুশাসনই হতে পারে ইভটিজিং প্রতিরোধের সর্বোত্তম পন্থা। ইভটিজিং এর পরিচিতি, এর সাথে সম্পৃক্ত প্রত্যয়সমূহ, ইভটিজিং প্রতিরোধে দেশীয় ও ইসলামী আইন সমূহ, সর্বোপরি ইভটিজিং প্রতিরোধে একটি সুপারিশমালা পেশ করাই এ প্রবন্ধের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
ইভটিজিং বলতে কী বুঝায়? ইভটিজিং শব্দটি যৌন হয়রানির একটি অমার্জিত (slang) ভাষা। ইভ (Eve) দ্বার বাইবেলে বর্ণিত প্রথম নারী হাওয়াকে বুঝানো হয়েছে। আর ইভটিজিং (Teasing) বলতে ঠাট্রা করা, বিরক্ত করা, বিব্রত করা ইত্যাদি বুঝায়। সুতরাং ইভটিজিং (Eveteasing) বলতে নারীর প্রতি বিব্রতকর, লজ্জাকর, নিপীড়নমূলক যে কোনো আচরণ বুঝায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ শব্দটি (Sexual Harassment) এর প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত। ১৯৯৯ সালে সাংবাদিক সুসান ব্রাউন মিলার সর্বপ্রথম (Sexual Harassment) শব্দটি ব্যবহার করেন।
ইভটিজিং একটি ব্যাপকার্থক পরিভাষা, যা নিম্নে বর্ণনা করা হলো- হাইকোর্ট বিভাগের রায় অনুসারে ইভটিজিং (যৌন হয়রানির ও নিপীড়ন) বলতে বুঝায়: শারীরিক স্পর্শের মত অপ্রত্যাশিত যৌনকাক্সক্ষামূলক ব্যবহার। প্রশাসনিক, কর্তৃত্বমূূলক অথবা পেশাগত ক্ষমতার অপব্যবহার করে যৌনসম্পর্ক স্থাপনের উদ্বেগ বা চেষ্টা, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষাগত আচরণ, যৌন সম্পর্কের দাবি বা অনুরোধ, পর্ণোগ্রাফি প্রদর্শন, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য বা অঙ্গভঙ্গি। অশালীন অঙ্গভঙ্গি, অশালীন ভাষায় প্রয়োগসহ যৌন কামনা থেকে হয়রানি। চিঠি, টেলিফোন, মোবাইল ফোন, এসএমএস, পোষ্টার, নোটিশ, কার্টুন, বেঞ্চ, চেয়ার, টেবিল, নোটিশ বোর্ড, দেয়ালে লিখনের মাধ্যমে উত্ত্যক্ত করা। ব্ল্যাকমেইলিং এবং চরিত্র হনন-এর উদ্দেশ্য স্থির বা ভিডিও চিত্র ধারণ। লিঙ্গীয় ধারণা থেকে বা যৌন হয়রানির উদ্দেশ্যে শিক্ষা, খেলাধূলা, সাংস্কৃতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতায় বাধা প্রদান। প্রেমের প্রস্তাব দেওয়া এবং প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কারণে চাপ সৃষ্টি ও হুমকি প্রদান। মিথ্যা আশ্বাস, প্রলোভন বা প্রতারণার মাধ্যমে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা। এ. এফ. সোলায়মান চৌধুরী বলেন, সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে আরেক ব্যক্তি সভ্যতা, ভদ্রতা ও নীতি নৈতিকতা জলাঞ্জলি দিয়ে অশালীন ও আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গি বা বাক্য প্রয়োগ করার একটি মারাত্মক রূপ ইভটিজিং।
সর্বোপরি ইভটিজিং হলো ব্যক্তি চরিত্রের নগ্ন রূপের এক চরম বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ আচরণ, যা শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নির্যাতন অর্থাৎ স্বাভাবিক চলাচল, যোগাযোগ বা ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা মতামত প্রকাশের উপর হস্তক্ষেপ, যৌন নির্যাতন নারী নির্যাতন মানহানি ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করে যা ফৌজদারী কার্যবিধি “ফৌজদারী কার্যাবলী” Code of criminal procedure, 1898 (Act 5 of 1898)”  অর্থ, মোতাবেক অপরাধ বলে গণ্য, যা শিশু, ইসলামী দৃষ্টিকোণে সাবালক, সকল শ্রেণীর নারীর প্রতি হতে পারে।
উত্ত্যক্ত করা ও মানহানি করা অর্থে পবিত্র কুরআনে ইভটিজিং শব্দের ব্যবহার হয়েছে। মহান আল্লাহর বাণী: হে নবী! আপনি আপনার পত্নীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দাংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে (পর্দানশীন হিসেবে) চিনতে পারা য়ায় ও এর ফলে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। এছাড়া কুরআনে একে অপবাদ নামের সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে- ঐরা সতী-সধ্বী, সরলমনা নারীদের প্রতি অপবাদ দেয়, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত। সুতরাং বুঝা যায় যে, ইভটিজিং মূলত মানুষের একটি বিকৃত আচরণ ও অনৈতিক কর্ম। যার সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য সমাধান দেয়া হয়েছে মহাগ্রন্থ আল কুরআন ও আল-হাদীসে।
ইভটিজিং-এর ধরণ ও এর অর্ন্তভুক্ত কাজ : ইভটিজিং একটি সামাজিক ব্যাধি, সমাজ নানাভাবে-নানারূপে ইভটিজিং লক্ষণীয়।
ক. বাচনিক কার্যাবলী : অশালীন মন্তব্য, শিস বাজানো, যৌন আবেদনময়ী গান, হুমকি প্রদান, যৌন সম্পর্কের আবেদন, প্রস্তাব, অনভিপ্রেত বিয়ের প্রস্তাব। খ. অবাচনিক কার্যাবলী : লোলুপ চাহনি, উস্কানিমূলক তালি, কুরুচিপূর্ণ ছবি প্রদর্শন, কমোদ্দীপক গানবাজনা, অশুভ ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টি, পিছু নেয়া, মোবাইলে কুরুচিপূর্ণ ম্যাসেজ দেয়া, মিসকল দেয়া, flying kiss (উড়ন্ত চুমু), চলার পথে বাধা দান, ই-মেইল কুরুচিপূর্ণ ম্যাসেজ দেয়া ইত্যাদি। গ. শারীরিক কার্যাবলী : ঘাড় ও কাঁধে হাত দেয়া, গা ঘেঁষে দাঁড়ানো, জড়িয়ে ধরা, চুমু খাওয়া, শরীরে ধাক্কা দেওয়া, ব্লাকমেইল করার অভিপ্রায়ে চিত্র ধারণ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইভটিজিং : ইভটিজিং বর্তমান সময়ে একটি মারাত্মক সমস্যা। যার ক্ষতিকর প্রভাব আমাদের পারিবারিক, সামাজিক সহ সকল ক্ষেত্রকে আক্রান্ত করছে। বাংলাদেশে সংঘটিত ‘ইভটিজিং’ এর একটি সমীক্ষা নিম্নে প্রদান করা হলো:
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, গত এক বছরে ইভটিজিং এর অপরাধে মামলা হয়েছে ১০৫টি, জিডি ৩৩৭টি, থানায় অভিযোগ ১২৯৬ জনের বিরুদ্ধে। গ্রেফতার হয়েছে মাত্র ৫২০ জন। জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির গবেষণা অনুযায়ী ২০১৬ সালে ৭ মেয়ে বখাটেদের উৎপাতে আত্মহত্যা করে। আর ২০১৭ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫তে এবং মোট ইভটিজিং এর প্রত্যক্ষ শিকার হয় ৫২ জন। বিভাগভিত্তিক কয়েক মাসের ইভটিজিং এর পরিসংখ্যানে দেখা যায়; রাজশাহীতে ১৩টি মামলা, সিলেটে ১৮টি মামলা, বরিশালে ২৭টি মামলা, ৪টি জিডি, রংপুরে ৫টি মামলা, চট্রগ্রামে ২৩৭টি ইভটিজিং এর ঘটনা ঘটে। ইভটিজিং এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে এখন আক্রমণের শিকার হচ্ছে অভিভাবক। যেমন: নাটোরের মিজনুর রহমান, ফরিদপুরের চাঁপা রাণী ভৌমিক। এমতাবস্থায় দেশব্যাপী ইভটিজিং এর প্রতিরোধ সভা, সেমিনার, প্রবন্ধ রচনা, আইন প্রণয়ন, মিছিল, মানববন্ধনসহ নানা আয়োজন চলছে।
ইভটিজিং এর কারণ : ইভটিজিং একটি অপরাধ, এ অপরাধের পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। অপরাধ সংগঠনের পেছনে স্থান-কাল, অবস্থান, ব্যক্তির মূল্যবোধ ইত্যাদি জড়িত। ইভটিজিং সংঘটনের কারণগুলোর অন্যতম কয়েকটি হলো- স্বভাবজাত ঝোঁক, ইসলামী শিক্ষার অভাব, ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি উদাসীনতা, অশালীন পোশাক, মুক্ত আকাশ সংস্কৃতি, পারিবারিক শিক্ষার অভাব, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, অপসংস্কৃতির প্রভাব, আইন ও বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা, নেশা ও মাদকতা, বেকারত্ব, সামাজিক দায়বদ্ধতা না থাকা, অর্থ-সামাজিক কর্মকা-, একে অপরের প্রতি মর্যাদা ও শ্রদ্ধাবোধের অভাব। মিডিয়ায় অশ্লীলতা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, মাতা-পিতার অবাধ্যতা, নৈতিক অবক্ষয়, যথাযত আইনের অভাব, আইনের প্রয়োগ না থাকা, নারীর প্রতি সমাজের (পুরুষদের) নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারী পুরুষের মধ্যে বৈষম্যমূলক সম্পর্ক, পর্ণোগ্রাফির ব্যাপক ছড়াছড়ি এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় ইত্যাদি।
ইভটিজিং সম্পর্কিত বাংলাদেশের আইন : বাংলাদেশে ইভটিজিং সম্পর্কিত অনেক আইন রয়েছে। “যৌন পীড়ন, ইত্যাদি দণ্ড। যদি কোন ব্যক্তি অবৈধভাবে তাহার যৌন কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে তাহার শরীরের যে কোন অঙ্গ বা কোন বস্তু দ্বারা কোন নারী বা শিশুর যৌন অঙ্গ বা অন্য কোন অঙ্গ স্পর্শ করেন বা কোন নারীর শ্লীলতাহানি করেন তাহা হইলে এই কাজ হইবে যৌন পীড়ন এবং তজ্জন্য উক্ত ব্যক্তি অনধিক দশ বৎসর কিন্তু অন্যূন তিন বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন।” “নারীর আত্মহত্যায় প্ররোচনা, ইত্যাদিও শাস্তি। কোন নারীর সম্মতি ছাড়া বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন ব্যক্তির ইচ্ছাকৃত (Wilrul)  কোন কার্য দ্বারা সম্ভ্রমহানি হইবার প্রত্যক্ষ কারণে কোন নারী আত্মহত্যা করিলে উক্ত ব্যক্তি উক্ত নারীকে অনুরূপ কার্য দ্বারা আত্মহত্যা করিতে প্ররোচিত করিবার অপরাধে অপরাধী হইবেন এবং উক্ত অপরাধের জন্য তিনি অনধিক দশ বৎসর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বৎসর সশ্রম কারদণ্ডে দ-নীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন।” “রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন। এদেশের অধিকাংশ মানুষ ইভটিজিং প্রতিরোধে এসব আইন সম্পর্কে জানেন না। সুতরাং তাদরকে এসব আইন সম্পর্কে জানাতে এবং আইনের সুফল ভোগ করতে সংশ্লিষ্ট মহলের উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরী।
ইভটিজিং প্রতিরোধে ইসলামী অনুশাসন : ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ও বাস্তবধর্মী যুগোপযোগী জীবন ব্যবস্থা। জীবনের প্রতিটি দিকের সমাধান এ ধর্মে ব্যবস্থা থেকে পাওয়া যায়। মহান আল্লাহ বলেন, আমি এ কুরআনকে সকল কিছুর সমাধান স্বরূপ নাযিল করেছি। এমতাবস্থায় ইসলামী অনুশাসন অনুযায়ী ইভটিজিং প্রতিরোধের কারণসমূহের সাথে ইসলামী আইনের কতটুকু সামঞ্জস্য রয়েছে তা আলোচনা করা যায়-
দৃষ্টিশক্তির হেফাজত : ইভটিজিং এর পেছনে সবচেয়ে ক্ষতিকর যে কারণ তা হল: অবাধ দৃষ্টি প্রয়োগ। ইভটিজিং প্রতিরোধে ইসলাম বর্ণিত দৃষ্টি সম্পর্কিত ফৌজদারী আইনের অনুশীলন জরুরী। মহান আল্লাহ বলেন, (হে রাসূল) ঈমানদার পুরুষদেরকে বলুন, তার যেন তাদেও দৃষ্টিকে নত রাখে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ স. বলেন, (অসংযত) দৃষ্টি হচ্ছে ইবলিসের বিষাক্ত তীরগুলো থেকে একটি তীর। যে ব্যক্তি আমাকে ভয় করে তা ত্যাগ করবে, আমি তার বদলে তাকে এমন ঈমান দান করবো, যার স্বাদ সে নিজের হৃদয়ে অনুভব করবে। পূর্বেই আমরা উল্লেখ করেছি, দৃষ্টিশক্তির অবাধ নিয়ন্ত্রণহীনতার ফলেই ইভটিজিং ঘটছে। সুতরাং ইভটিজিং বন্ধে ইসলাম প্রদর্শিত পন্থায় দৃৃষ্টিশক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
সতর ঢেকে রাস্তায় চলাচল : সতর না ঢেকে উগ্র, অর্ধ উলঙ্গ চলাচলের প্রভাবে সমাজের যুবকদেরও সুপ্ত যৌন আকাক্সক্ষা উস্কে দেয়া হয়। যার প্রভাবে ইভটিজিং এর মতো অনৈতিক কর্মকা-ের উদ্ভব হয়। সুতরাং ইভটিজিং প্রতিরোধে শালীন পোশাক পরিচ্ছদেও অনুশীলন জরুরী। মহান আল্লাহ বলেন, যে বনী আদম! আমি তোমাদের জন্য এমন পোশাক অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জস্থানকে আবৃত করে রাখবে এবং যা হবে ভূষণ। আর পরহেযগারীর, পোশাক এটি সর্বোত্তম। সতরের সীমারেখা সম্পর্কে হাদীসের বাণী, আমর বিন শুআইব রা . সূত্রে বর্ণিত, তিনি রাসূলূল্লাহ সা. থেকে বর্ণনা করেন , নিশ্চয় পুরুষের সতর হলো নাভি ও হাঁটুর মধ্যবর্তী স্থান। আল্লাহ তাআলার বাণী, “তারা যেন তাদেও সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তবে যা এমনিতেই প্রকাশিত হয়ে যায়। আয়াতে ‘যা এমনিতেই প্রকাশিত হয়ে যায়’ দ্বারা অধিকাংশ ইমামের মতে- মুখমন্ডল, হাতের তালু ও বহিরাবরণকে বোঝানো হয়েছে।
সর্বোপরি নারীর সতর সম্পর্কে কতিপয় আলিমের মতভেদ থাকা সত্ত্বেও পরপরুষের সামনে বিনা প্রয়োজনে চেহারা খোলা রাখা নিষিদ্ধ হবার ব্যাপারে সকলেই ঐকমত্য পোষণ করেছেন। সুতরাং প্রতিটি নারীর জন্য উচিত হবে, রাস্তায় চলাচল অথবা মাহরাম ব্যতীত অন্য কারো সামনে যেতে হলে অবশ্যই দেহ আবৃত রাখা। পর্দা সংক্রান্ত সূরা আহযাব ও সূরা নূরের সবগুলো আয়াত অধ্যয়ন করলে এবং সাহাবায়ে কিরামের আমল পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, পরপুরুষের ক্ষেত্রে মহিলাদের মুখমন্ডলও সতরের অন্তর্ভূক্ত হবে। মহিলাদের মূখম-লের গুরুত্ব সম্পর্কে মুহাম্মদ আলী আস সাবুনী বলেন, “মুখমন্ডল হচ্ছে সুন্দর্যের কেন্দ্রবিন্দু এবং বিপর্যয়ের উৎস ও বিপদের ঘাঁটি। উপযুক্ত আলোচনার সারমর্ম হিসেবে আল্লামা মুহাম্মদ আলী আস সাবুনী রাহ.-এর মতামত প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, “মহিলাদের দিকে তাকানো জায়িয নয় শুধু ফিতনার আশঙ্কায়। আর চেহারা খোলা তাকলে যে ফিতনার সৃষ্টি হয় তা পা, নলা এবং চুল খোলা রাখার চেয়েও মারাত্মক। যেখানে পায়ের নলা এবং চুলের দিকে তাকানো সর্বসম্মতভাবে হারাম, সেখানে চেহারার দিকে তাকানো আরো বেশি হারাম হওয়া উচিত। কারণ তা হচ্ছে সৌন্দর্যেও কেন্দ্রবিন্দু ও ফিতনার উৎস। সুতরাং বোঝা গেলো যে, ইভটিজিং বন্ধে মহিলাদেরকে সতর হিসেবে তাদের মুখম-লসহ সমস্ত শরীরই ঢেকে রাখতে হবে। সাধারণত কিশোরী, তরুণী ও যুবতীরাই ইভটিজিং এর শিকার হয়ে হয়ে থাকে। কারণ এ সময় তারা নিজেদেরকে আবেদনময়ী সাজসজ্জা করে পরপুরুষের কাছে উপস্থাপন করা।
রাস্তায় আড্ডা না দেয়া : আজকের সমাজে যে সব স্থানে ইভটিজিং হয় তা হল রাস্তা, ঘাট, বাজার, বিপনী বিতান, শিক্ষা-প্রতিষ্টান, অতচ এসব ব্যাপাওে ইসলামের বিধান যদি মানা হত তাহলে মনে হয় ইভটিজিং নামক শব্দটির উদ্ভব হত না। এ প্রসংঙ্গে আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবী বলেছেন, তোমরা রাস্তায় বসা থেকে বিরত থাকো। সাহাবীগণ বলেন, আমাদের তো রাস্তার উপরে বসা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। আমরা তো সেখানে বসেই আলাপ করে থাকি। রাসূলূল্লাহ সা. বললেন- যদি তোমরা একান্তই রাস্তায় বসতে চাও, তাহলে তোমরা রাস্তার হক আদায় করবে। তারা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল। রাস্তার হক কী? রাসূলূল্লাহ সা. বললেন, “রাস্তার হক হল- চক্ষু অবনত রাখা, কাউকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা, সালামের জবাব দেয়া, সৎকাজের আদেশ করা এবং অসৎ কাজে বাধাদান করা। আলোচ্য হাদীসের নির্দেশনা যদি সমাজে বাস্তবায়িত হতো, তাহলে রাস্তার মোড়ে মোড়ে এত আড্ডার আসর হত না এবং ইভটিজিংও হত না। সুতরাং ইভটিজিং বন্ধে রাস্তার হকসমূহের যথাযথ অনুশীলন জরুরী। বাংলাদেশে সংঘটিত ইভটিজিং এর অধিকাংশ ঘটে রাস্তা ঘাটে, স্কুল, কলেজ ও বিভিন্ন গার্মেন্টস-এর সামনে অবস্থানকারী বখাটে উগ্র যুবকদের দ্বারা।
নারীদের রাস্তায় নম্রভাবে চলাচল : ইসলামী অনুশাসন হল নারীরা সাবধানতার সাথে রাস্তার একপাশ দিয়ে চলাচল করবে নম্র ও শালীন ভাবে। কিন্তু তারা যদি অহংকারের সাথে রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলাচল কওে, তবে তাদেও ইভটিজিং এর সম্মুখিন হওয়া অতি সাধারণ। তাই ইসলামী অনুশাসন মান্য করা জরুরী। মহান আল্লাহ বলেন, তারা যেন তাদের গোপন সাজসজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদাচারণা না করে।
পোশাকের ব্যাপারে ইসলামী বিধানমালা অনুসরণ : নারীর পোশাকের ব্যাপারে ইসলামী বিধ-বিধানের কয়েকটি হলো-
সতর পরিমাণ ঢেকে থাকে এমন ঢিলেঢালা পোশাক পরিধান করা; প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক না পরা; পোশাক স্বচ্ছ পাতলা না হওয়া; পোশাক আঁটসাঁট না হওয়া; নারী-পুরুষের পোশাকে সাদৃশ্য না হওয়া; মুসলিমের পোশাক বিজাতীয় পোশাকের ন্যায় না হওয়া; যশ-খ্যাতির উদ্দেশ্যে পোশাক না পরা; মুসলিমের পোশাক বিজাতীয় পোশাকের ন্যায় না হওয়া; সর্বোপরি ইসলাম নির্দেশিত পোশাকের বিধান অনুসাওে হিজাব অনুশীলনের মাঝেই নারীর সঠিক মর্যাদা ও কল্যাণ নিহিত। বেপর্দার কারণেই নারী নির্যাতন, ইভটিজিং সমাজে আজ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, কুরআনের এ সুন্দও বিধানকে উপেক্ষা কওে আজকের সমাজে যে শিক্ষা প্রতিষ্টান, চাকুরীজীবীদের কর্মস্থল ইত্যাদিকে শালীনতা বিবর্জিত ও ইসলাম বিরোধী পোশাকের প্রচলন করা হয়েছে। যা ইভটিজিং এর মতো অনভিপ্রেত অপরাধ বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। সুতরাং ইভটিজিং বন্ধে ইসলামী পোশাক প্রচলন জরুরী। বাংলাদেশে সংঘটিত ইভটিজিং এর অধিকাংশই নারীদের সৌন্দর্য প্রদর্শন ও অশ্লীল পোশাক পরিধানে কারণেই হয়ে থাকে।
নারীদের সুগন্ধি ব্যবহার : যেহেতু সুগন্ধি ইন্দ্রিয়গুলোকে উত্তেজিত কওে, তাই মহানবী সা. মহিলাদেরকে খোশবু লাগিয়ে বাইরে বের না হবার হুকুম দিয়েছেন। আশআরী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, কোন মহিলা যদি সুগন্ধি ব্যবহার করে, অতঃপর মানুষের পাশ দিয়ে হাঁটে, যাতে তারা তার সুঘ্রাণ পায়, তবে সেই মহিলা ব্যভিচারিণী। সুতরাং ইভটিজিং বন্ধে ইসলামী অনুশাসন মেনে নারীর উচিত হবে সুগন্ধি ব্যবহার করে বাইরে বের না হওয়া।
পরপুরুষের সঙ্গে আবেদনময়ী স্বরে কথা না বলা : পরপুরুষের সঙ্গে নারীর কথা বলার ভঙ্গি ও ধরন এমন হতে হতে, যাতে আলাপকারী পর পুরুষের মনে অশুভ চিন্তার উদয় না হয়। পরপুরুষের ক্ষেত্রে সর্বদা ইসলামের এই অনুশাসনটির কথা স্মরণ রাখতে হবে, যাতে করে কেউ নারীর কথার দ্বারা তার প্রতি আকর্ষিত না হয়। যার কুপ্রভাব হতে পারে ইভটিজিং এর মত জঘন্য কাজ। মহান আল্লাহ বলেন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল ও আকর্শণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না, ফলে সেই ব্যক্তি কুবাসনা করে, যার অন্তরে ব্যধি রয়েছে। তোমরা সঙ্গত কথাবার্তা বলবে।
ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবায়ন : ইভটিজিং একটি সামাজিক সমস্যা। উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদেও মাঝে এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তারা বাস্তবতার তুলনায় আবেগ তাড়িত হয়েই মূলত এ সকল ঘৃণ্য কাজ করে। তাই তাদের সামনে যদি ইসলামী অনুশাসন শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে উপস্থাপিত করা যায়, তাহলে ইভটিজিং বন্ধে তা হবে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। উদাহরণ স্বরূপ NCTB অনুমোদিত ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে কার্যকর সিলেবাসে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ইসলামী শিক্ষা একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর প্রথম পত্র বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়ে  ‘ইভটিজিং প্রতিরোধের ধর্মীয় অনুশাসন’ অন্তর্ভুক্তি।
ইসলামী সংস্কৃতি চর্চা : বর্তমান সমাজে প্রচলিত অপসংস্কৃতি মূলত ইভটিজিং এর প্রত্যক্ষ প্রশিক্ষকের ভূমিকা পালন করে। সুতরাং ইভটিজিং বন্ধ করতে হলে পশ্চিমা ও ভারতীয় অপসংস্কৃতির বিপরীতে ইসলামী সংস্কৃতির উপর জো দেয়া জরুরী। বাংলাদেশ ইসলামী সংস্কৃতি চর্চা জোরদারকরণে ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’ যথার্থ প্রতিষ্ঠান। ইসলামী সংস্কৃতি বাস্তবায়নে এ প্রতিষ্ঠানের আরো বলিষ্ঠ পদক্ষেপ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আমাদের কয়েকটি প্রস্তাবনা হলো- সরকারি উদ্যোগে ইসলামী টেলিভিশিন ও বেতার চ্যানেল প্রতিষ্ঠা;  সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন ইসলামী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চালু করা; দেশের চলমান টেলিভিশন ও বেতারগুলোকে ইসলামাইজেশন করার উদ্যোগ গ্রহণ; এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন ইসলামী সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী গঠন।
পরিবার প্রথা ওপারিবারিক বন্ধন সদৃঢ়করণ : আধুনিক সমাজ যান্ত্রিক উন্নতিকে আত্মস্থ করতে গিয়ে নৈতিকতাকে সম্পুর্ণ উপেক্ষা করছে। পশ্চাত্যেও অধিকাংশ মানুষ ‘Living together’ পন্থাকে ‘Marriage’ এর বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করেছে। যা দেখে আমাদের কোমলমতী তরুণ-তরুণীরা ইভটিজিং-এ উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। অথচ ইসলাম অভিভাবকদের নির্দেশ দিয়েছে পরিণত বয়সে ছেলে মেয়েদেরকে বিয়ের ব্যবস্থা করতে। মহান আল্লাহ বলেন, তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিবাহ সম্পাদন করে দাও।
আলক্বামাহ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহ করতে সক্ষম, তারা যেন বিবাহ করে নেয়। আর যে ব্যক্তি বিবাহ করতে অক্ষম, সে যেন রোযা রাখে। কেননা, রোযা তার যৌন ক্ষুধাকে অবদমিত রাখে।
চারিত্রিক উন্নতি সাধন : মূলত চারিত্রিক অবক্ষয়ের করণেই সমাজে ইভটিজিং এর ন্যায় ভয়াল সামাজিক অপরাধ নেমে এসেছে। তাই ইভটিজিং প্রতিরোধে যে কাজটি সবার আগে করতে হবে তা হলো- ব্যক্তি চারিত্রের উন্নতি সাধন। ইসলামী জীবনাদর্শে চারিত্রিক উন্নতি সাধন একটি মহৎ গুণ। নবী মুহাম্মদ সা. চারিত্রিক উন্নতির পূর্ণতা সাধন করতেই এ পৃথিবীতে আগমন করেন। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, মহান নৈতিক গুণাবলী পবিপূর্ণ করার জন্যই আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে।
নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত জাতি গঠন : মানুষ নৈতিক জীব। নৈতিক জীবনবোধ মানুষকে ভালো-মন্দ, সৎ-অসৎ ন্যায়-অন্যায়, উচিত-অনুচিত, নীতি-দুর্নীতি, পাপ-পুণ্য সম্পর্কে সচেতন করে, প্রেরণা যোগায়, ভালো হতে সাহয্য করে। ধর্মই নৈতিকতার আসল ও প্রকৃত উৎস। ধর্মেও বাঁধন শিথিল হয়ে গেলে কিংবা ধর্মেও শিক্ষা ও নির্দেশনা ভুলে গেলেও মানুষ তার সামাজিক পরিম-লের উচিত-অনুচিত বোধ থেকে নৈতিক অবস্থান তৈরী করে নেয়; যা সর্বাত্মক ও পরিপূর্ণ নয়। কেননা, আল্লাহ প্রদত্ত তথা স্রষ্টার পক্ষ থেকে প্রেরিত নীতিমালা ও বিশ্বাসই মানব জীবনের সার্বিক কল্যাণের চালিকাশক্তি। ধর্মেও সঙ্গে সম্পর্কহীন মানব জীবনের সামগ্রিক কল্যাণ উন্নয়ন ও পরিত্রাণ সম্ভব নয়। এজন্যই সত্য ধর্মাশ্রিত নৈতিক শিক্ষা মানব জীবনের জন্য অপরিহায্য। ইসলাম ধর্মই নৈতিকতা শিক্ষার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। সুতরাং একজন মুসলিম হিসেবে আমাদেরকে নৈতিকতার শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, নৈতিকতার বিচারে যে ব্যক্তি উত্তম, মু’মিনদের মধ্যে সে ব্যক্তিই পূর্ণতম ঈমানের অধিকারী।
ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, নৈতিক অবক্ষয়ের কারণেই মূলত সমাজে ইভটিজিং-এর ন্যায় ভয়াল সামাজিক অপরাধ নেমে এসেছে। তাই জাতিকে এ নৈতিক অবক্ষয় থেকে বাঁচাতে হলে যে কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে করতে হবে, তা হলো- জাতিকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলতে হবে। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সা. জাতিকে নৈতিক শিক্ষায় সুন্দররূপে গড়ে তোলতেই এ পৃথিবীতে মহান শিক্ষকরূপে আগমন করেছিলেন।
মাদকাসক্তি দূরীকরণ : মাদকাসক্তি মানব বিবেক-বুদ্ধি ও মস্তিষ্কের ওপর মারাত্মক ও ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে। মস্তিষ্কেও করটেক্স বা উচ্চতর বুদ্ধিবৃত্তির স্তওে নিস্তেজ হয়ে যায় ফলে মদপানকারী মাতাল হয়ে পড়ে। লজ্জা-সংকোচ কমে যায়, কথাবার্তা বেশি বলে, এমনকি অনেক গোপন তথ্যও বের হয়ে পড়ে। কথাবার্তা জড়িয়ে যায়, এক পর্যায়ে চেতনা হারায়। মাদকাসক্তি মানুষকে শুধু মানবাত ও নৈতিকতাবিরোধী কার্যকলাপের দিকেই উদ্বুদ্ধ কওে না, এটা মানুষকে যাবতীয় মন্দ ও ঘৃণ্যতর পাপ কাজের দিকেও ধাবিত করে। এটা মানুষকে চিত্তবিভ্রাম, অস্থির ও উচ্ছৃঙ্খল করে তোলে। ব্যভিচার, নরহত্যা ছিনতাই, রাহাজানি, সড়ক দুর্ঘটনা ও নির্যাতনের মত জঘন্যতম অপরাধের অধিকাংশই মাদকাসক্তিরই পরিণাম। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, “মদ সকল অপকর্মের জননী।” সুতরাং ইভটিজিং প্রতিরোধ করতে হলে অবশ্যই সমাজ থেকে মাদকাসক্তি দূর করতে হবে।
ফলাফলমূলক পর্যালোচনা : ধর্ম বাংলাদেশের সমাজের চালিকাশক্তি, তাই ধর্মীয় অনুশাসনের মাধ্যমে এদেশ থেকে ইভটিজিং এর প্রতিরোধ সম্ভব। আমরা উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি, ইসলামী অনুশাসনের মাধ্যমেই ইভটিজিং প্রতিরোধ সম্ভব। এছাড়া ইদানীং কালে পত্রপতিকায়ও এ ব্যাপারে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে।
সুপারিশসমূহ : ইভটিজিং প্রতিরোধে আইনী ও ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে কয়েকটি সুপারিশ হলো- আইন মন্ত্রণালয় ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ ইভটিজিং প্রতিরোধ আইন’ প্রণয়ন; অথবা, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (২০০)’ এর সংশোধন করে ‘ইভটিজিং প্রতিরোধে ইসলামের অনুশাসন’ বিষয়ক ধারা সংযোজন; তথ্য মন্ত্রণালয় ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে ‘ইভটিজিং প্রতিরোধে ইসলামী অনুশাসন’ ধারণাটি ব্যাপকভাবে প্রচারকরণ; শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে শিক্ষার সর্বস্তওে ‘ইভটিজিং প্রতিরোধে ইসলামী অনুশাসন’ বিষয়টি অন্তর্ভুক্তকরণ; জনপ্রতিনিধি, মসজিদের ইমাম, পরিবারের প্রধান ব্যক্তিরা নিজ নিজ স্থান থেকে ‘ইভটিজিং প্রতিরোধে ইসলামী অনুশাসন’ বাস্তবায়নের প্রদক্ষেপ গ্রহণ; অবাধ নারী স্বাধীনতায় গা ভাসিয়ে না দিয়ে নারী স্বাধীনতার মূল প্রত্যয় উপলব্ধি করে ইসলামী অনুশাসন মেনে চলা; ইসলামী ভাবধারা অক্ষুণ্ণ রেখে শিক্ষাব্যবস্থা ও নারীর কর্মক্ষেত্র নির্ধারণ; ইসলামে প্রদর্শিত ‘মানহানি প্রতিরোধ’ আইন মেনে চলা; পারিবারিক শৃংখলা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, রাষ্ট্রীয় আইনের বাধ্যবাধকতা ও ইসলামী অনুশাসন গ্রহণে যত্নশীল হওয়া; নারীর প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর মানসিকতা সৃষ্টি; চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধনে তৎপরতা বৃদ্ধি ইত্যাদি।
উপসংহার : আল্লাহ তাআলা নারীকে মা, স্ত্রী ও কন্যা হিসেবে সম্মান দিয়েছেন। অথচ আজ তারা আল্লাহর পদত্ত গৌরব ও মর্যাদা ভুলে গিয়ে মেকি ভোগ বিলাস, কামনা-বাসনা, অনৈসলামিক উম্মাদনায় আক্রান্ত। তারা আজ আদর্শ মা ও স্ত্রী হবার পরিবর্তে উচ্ছৃঙ্খল প্রেমিকা, রক্ষিতা, নায়িকা, মডেল ও খ্যাতি আর্জনে উদ্গ্রীব। উচ্ছৃঙ্খল, আঁটসাঁট পোশাক আর বেপরোয়া চলন-বলন অব্যহত রেখে আইন প্রণয়ন অনর্থক। তাই আজকের সমাজ থেকে ইভটিজিং নামক কালো অধ্যায় দূর করতে হলে ইসলামী অনুশাসনের যথাযথ বাস্তবায়ন একান্ত প্রয়োজন।
-মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ