ঢাকা, বুধবার 18 July 2018, ৩ শ্রাবণ ১৪২৫, ৪ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

‘এটা সিম্পলি গুন্ডাবাহিনী’

গতকাল মঙ্গলবার টিএসসির শিক্ষক লাউঞ্জে নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষকদের উদ্যোগে সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয় -সংগ্রাম

# জাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস পরীক্ষা বর্জন
# ঢাবি ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ, প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি
# ফোনে ঢাবি অধ্যাপককে হুমকি, থানায় জিডি
স্টাফ রিপোর্টার : প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠেছে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্পাসে প্রতিদিনই মিছিল সমাবেশ, মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার সমাবেশ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রব্বানীর পদত্যাগ দাবি করা হয়। এ দিকে শিক্ষক নাজেহাল হওয়ার ঘটনায় কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সংহতি সমাবেশে হামলার জন্য ছাত্রলীগকে দায়ী করে নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষকরা বলেছেন হল প্রশাসনও তাদের কাছে পনবন্দী।
গতকাল মঙ্গলবার টিএসসি ক্যাফেটোরিয়ার শিক্ষক লাউঞ্জে সাংবাদিক সম্মেলন করেন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষকরা। শিক্ষকরা এ সময় ২ দিনের কর্মসূচির ঘোষণা দেন। সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা বলেন, এটা কারও অজানা নয় যে, ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের অগুলি হেলন ছাড়া আবাসিক হলগুলোর একটি গাছের পাতাও নড়তে পারে না। হল প্রশাসনও তাদের কাছে পনবন্দি। এরই ধারাবাহিকতায় গত রোববার শহীদ মিনারে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কার আন্দোলনে গ্রেপ্তারকৃতদের মুুক্তি ও হামলাকারীদের বিচারের দাবিতে সমাবেশ করতে গেলে আমাদের কয়েকজন শিক্ষক তাতে সংহতি জানাতে যান। কিন্তু ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সেই সংহতি সমাবেশ প- করতে গিয়ে নানা অসভ্য উপায় অবলম্বন করে।
সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. ফাহমিদুল হক, সহযোগী অধ্যাপক রাজ্জাক খান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা, অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. রুশাদ ফরিদী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তানজিম উদ্দীন খান, সহযোগী অধ্যাপক আব্দুল মান্নান,  ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুনাসির কামালসহ আরও কয়েকজন।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের উপর গত কিছু দিনে কয়েকদফা হামলার জন্য ছাত্রলীগকেই দায়ী করে আসছিলেন আন্দোলনকারীরা। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মুক্তি দাবিতে গত রোববার শহীদ মিনারে মানববন্ধনে শিক্ষকদের উপর চড়াও হন ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মী; পরে তারা মারধর করে শিক্ষার্থীদের।
ড. রাজ্জাক ছাত্রলীগের সমালোচনা করে আরও বলেন, ছাত্রলীগ তাদের ইতিহাস জানে না, তাদের ঐতিহ্য জানে না। তোফায়েল সাহেব (বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ) আর রাজ্জাক সাহেবের (প্রয়াত মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক) ছাত্রলীগ আর এই ছাত্রলীগ আপনি মেলাবেন? তিনি বলেন, এটা সিম্পলি গু-াবাহিনী। যাদের শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নেই, তারা কোথায় পড়েছে, আমি জানি না। এই ধরনের আচরণ আমি আমার ২০ বছরের শিক্ষক জীবন ও সাংবাদিকতা জীবনে দেখি নাই।
শিক্ষার্থীদের উপর একের পর এক হামলার পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো পদক্ষেপ না দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই শিক্ষক। তিনি জানান, অপরিচিত ফোন নম্বর থেকে তাকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে, এজন্য তিনি থানায় জিডি করেছেন।
ড. সামিনা লুৎফা প্রশাসনের সমালোচনা করে বলেন, আন্দোলনে যুক্তদের 'বাম ঘরানার শিবির', 'জঙ্গির মতো', 'জামায়াত-শিবির' ইত্যাদি অভিধায় ভূষিত করা হচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার, যারা নিপীড়ক তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করা হচ্ছে না। কেবল যারা নিপীড়িত, তাদের বিরুদ্ধেই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে, বক্তব্য প্রদান করা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দিক থেকে।
শহীদ মিনারের ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেই সমাবেশস্থলে প্রক্টরিয়াল বডির কেউ উপস্থিত ছিলেন না, পুলিশ বাহিনীর কেউ ছিলেন না, এভাবে নিপীড়নের জন্য একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেওয়া হয়েছিল। অনেক পরে প্রক্টরিয়াল বড়ির সদস্যরা আসেন, তাও ঘটনাস্থলের শিক্ষকরা ডাকার পর। তিনি বলেন, প্রক্টর পুরো ঘটনার জন্য একরকম শিক্ষকদেরই দায়ী করেন। নিপীড়ক ছাত্রদের সাথে শিক্ষকদের একইভাবে জড়িয়ে প্রেসকে দেওয়া প্রক্টরের বক্তব্য একই সাথে স্পর্ধামূলক এবং তার বক্তব্যে আমরা বিক্ষুব্ধ।
সাংবাদিক সম্মেলন থেকে এই শিক্ষকরা চারটি কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তা হল- ১৯ জুলাই সকাল ১১টায় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে শিক্ষকদের সংহতি সমাবেশ, ২৩ জুলাই কলাভবনের সামনে বটতলায় নিপীড়নবিরোধী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিক্ষক লাঞ্ছনার পরিপ্রেক্ষিতে পদক্ষেপ নিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির কাছে পত্র প্রেরণ, নিপীড়নের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চ্যান্সেলরের কাছে স্মারকলিপি প্রদান।
প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি শিক্ষার্থীদের: গতকাল ক্যাম্পাসে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল করেছে শিক্ষার্থীরা। ক্লাস বর্জন কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে অনেক বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এদিকে বারবার ক্যাম্পাসে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার সুষ্ঠু সমাধন বা প্রতিহতে ব্যর্থ প্রক্টর অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রব্বানী পদত্যাগ দাবি করেছে শিক্ষার্থীরা।
দুপুরে বিজ্ঞান গ্রন্থাগারের প্রবেশমুখে কালো ব্যানার নিয়ে মানববন্ধন করে পর্দাথ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এসময় তারা যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসে তাদের নিরাপত্তা না দেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। এ সময় শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত আটক শিক্ষার্থীদের দ্রুত মুক্তির দাবি জানায়।
মানববন্ধনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা ‘এমন ক্যাম্পাসই কি আমরা চেয়েছিলাম?’, ‘ক্যাম্পাস অনিরাপদ কেন?’, ‘আমাদের ক্যাম্পাসে আমরা কেন আক্রান্ত?’ লেখা সম্বলিত বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড বহন করে। শিক্ষার্থীরা বলেন, আমাদের ক্যাম্পাসে আমরাই আজ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমাদের শিক্ষদের ওপর এভাবে হামলা করা হচ্ছে, আমাদের ওপর হামলা করা হচ্ছে, কিন্তু প্রশাসন চুপ করে বসে আছে। আমরা আমাদের ক্যাম্পাসে নিরাপদ থাকতে চাই। নির্ভয়ে ক্লাসে আসতে চাই।
তারা বলেন, আমাদের সঙ্গে যেসব অন্যায়-অত্যাচার হচ্ছে তার বিচার দাবির অধিকার আমাদের রয়েছে। কিন্তু সেই স্বাধীনতায় কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারে না।
এসময় এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, গত ২ জুন আমাদের বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মিঠুকে শাহবাগ ওভারব্রিজের ওপর থেকে ধরে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়েরই কিছু সন্ত্রাসী পাবলিক লাইব্রেরির মধ্যে নিয়ে মারে। সে এখনও অসুস্থ। তার চিকিৎসার দায়ভার বিশ্ববিদ্যালয় বহন করছে না।
অন্য এক শিক্ষার্থী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র হয়ে যারা অন্য ছাত্র ও শিক্ষকদের ওপর হামলা চালায় তারা যে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তা বলতে লজ্জা লাগে। তারা অন্তত শিক্ষার্থী নয়, তারা সন্ত্রাসী।
ফোনে ঢাবি অধ্যাপককে হুমকি, থানায় জিডি: কোটা সংস্কার আন্দোলনে সংহতি জানানো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুর রাজ্জাককে ফোনে হুমকি দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি জানিয়ে তিনি ০১ জুলাই শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক জিডিতে উল্লেখ করেন গত ২৮ জুন +৩৩১২৩৪৫৬৭৮ নম্বর থেকে ফোন করে তাকে প্রাণনাশর হুমকি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমাকে একাধিকবার কল দেওয়া হয়েছে।
অজ্ঞাত পরিচয় নম্বর থেকে ফোন আসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সেদিনের ঘটনার পর আমাকে দুইবার ফোন দিয়েছিল। অপরিচিত নম্বর তাই আমি রিসিভ করে জিজ্ঞাসা করলাম ‘কে আপনি?’ জবাবে আমাকে বলে, ‘আমি তোর বাপ, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে কেন গিয়েছিলি? আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা জীবনে ছাত্রলীগের এমন নজির কখনো দেখিনি।’ অধ্যাপক রাজ্জাকের ধারণা যারা হুমকি দিয়েছে তারা ছাত্রলীগের নেতা। তিনি বলেন, ‘গত ১৫ জুলাই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীদের সমাবেশে সংহতি জানিয়ে অংশগ্রহণ করেছি। এর কিছুক্ষণ পর দেশি-বিদেশি দুটো নম্বর থেকে আমাকে অশ্লীল ভাষায় হুমকি দেওয়া হয়।’
আব্দুর রাজ্জাক আরও বলেন, ‘যেভাবে আমাকে তুই-তুকারি করে কথা বলছিল আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, হয়ত আমার বন্ধু হবে। কিন্তু যখন জিজ্ঞেস করলাম ‘আপনি কে?’ তখন আমাকে বলে, ‘আমি তোর বাপ, হারামজাদা!’ এরপর বাজে মন্তব্য এবং অশ্লীল ভাষায় জানতে চায় আমি কেন শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছি? তারা এর আগে আমাকে গত আট তারিখেও ফোন করেছিল। বিভিন্ন সময় তারা আমাকে হুমকি দিয়েছে। আমি তাদের নাম্বারগুলো নিয়ে শাহবাগ থানায় অভিযোগ দায়ের করেছি।’
জাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন: কোটা সংস্কার আন্দোলনে গ্রেপ্তারকৃত ছাত্রদের নিঃশর্ত মুক্তি, আন্দোলনে হামলাকারীদের বিচার ও অবিলম্বে কোটা সংস্কারের দাবিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি পালন করছে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা। গতকাল মঙ্গলবার অন্তত ৬টি বিভাগের কয়েকটি ব্যাচে ক্লাস-পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি বলে জানা গেছে। এর আগে একই দাবিতে গত সোমবার ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি শুরু করে ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীরা।
জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, দর্শন, প্রাণীবিদ্যা (৪৪তম ব্যাচ), ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং (৪৫ ব্যাচ), অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস্ (৪৫ ও ৪৬ ব্যাচ) ও পদার্থবিজ্ঞান (৪৬তম ব্যাচ) বিভাগের শিক্ষার্থীরা এ কর্মসূচি পালন করে। ফলে এসব বিভাগ ও ব্যাচে পূর্বনির্ধারিত কোনো ক্লাস-পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি।
এ ব্যাপারে দর্শন বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন একটি ন্যায্য দাবি। এটা নিয়ে কোনো প্রহসন মেনে নেওয়া যায় না। সরকারের কাছে অবিলম্বে কোটা সংস্কারের যৌক্তিক দাবি মেনে নেয়ার দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে আটককৃতদের মুক্তির দাবি জানাচ্ছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ