ঢাকা, বুধবার 18 July 2018, ৩ শ্রাবণ ১৪২৫, ৪ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মাদক বাণিজ্য ও অপব্যবহার ভয়ংকর মাত্রায়

জিবলু রহমান : [ছয়]
এসব আমাদের প্রচলিত আইনের দুর্বলতার লক্ষণ। এসব এখনই প্রতিরোধ করা না হলে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক চোরাকারবারিদের জন্য অভয়ারণ্য হয়ে উঠবে। একটি কথা না বললেই নয়-মাদক নিয়ন্ত্রণে দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা কখনই সন্তোষজনক পর্যায়ে ছিল না। কোন কোন পথ দিয়ে দেশে মাদক ঢুকছে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অজানা থাকার কথা নয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২৫ অক্টোবর ২০০৭ গুলশানের দুটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আমিন হুদা ও তার সহযোগী আহসানুল হক হাসানকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। ওই দিন তাদের হেফাজত থেকে ৪২ ধরনের ১৩৮ বোতল বিদেশি মদ, এক লাখ ৩০ হাজার আইস পিল (ইয়াবার বিকল্প), ভায়াগ্রা ট্যাবলেট, এসব তৈরির সরঞ্জাম, ফেনসিডিল, বিভিন্ন দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও ১২টি মোবাইল ফোনসেট উদ্ধার করা হয়। সরাসরি ইয়াবা তৈরি করা না হলেও ইয়াবার বিকল্প আইস পিল তৈরি হতো ওই যন্ত্রপাতি দিয়ে। এই মামলার রায়ে ২০১২ সালে আমিন হুদা ও তার সহযোগীর ১৪ বছর করে কারাদণ্ড হয়।
১৯ জানুয়ারি ২০১২ চট্টগ্রামে প্রথম ইয়াবা তৈরির কারখানার সন্ধান পাওয়া যায়। নগরীর কক্সবাজার এলাকায় প্যারেড ময়দানসংলগ্ন বাসা থেকে কারখানার মালিক রাখাল চন্দ্র ধর নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। সেখান থেকে ইয়াবা তৈরির কাঁচামাল, তিন প্যাকেট রং, ২০ বোতল ইয়াবার রাসায়নিক দ্রব্য, ইয়াবা তৈরির ডায়াস ও তৈরি করা দুই হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। কারখানা মালিক রাখাল চন্দ্র পুলিশের কাছে স্বীকার করে, তাদের উৎপাদিত ইয়াবার ক্রেতা মাদক কারবারিরা। এর আগে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায়ও মিনি কারখানার সন্ধান পায় চট্টগ্রাম পুলিশ।
১৮ জুলাই ২০১৪ রাজধানীর যাত্রাবাড়ী বাঁশপট্টির ১২০ নম্বর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ডিবি পুলিশ ইয়াবার কারখানার সন্ধান পায়। কারখানায় উৎপাদিত এক হাজার ৩০০ পিস ইয়াবা ও এর কাঁচামাল জব্দ করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় আলী আকবর, সোহেল ও রুবেল নামে তিনজনকে।
২৪ আগস্ট ২০১৪ রাজধানীর খিলগাঁওয়ের খিদমাহ হাসপাতালের সামনে থেকে একটি পাজেরো জিপ আটক করে ডিবি পুলিশ বিপুল পরিমাণ ইয়াবা তৈরির কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি উদ্ধার এবং ৫৫ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করে। আবদুল্লাহ জুবায়ের নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে চারজন মাদক কারবারি এসব যন্ত্রপাতি টেকনাফ থেকে ঢাকায় নিয়ে আসছিল। আবদুল্লাহ জুবায়ের পুলিশের কাছে স্বীকার করে, ঝুঁকি এড়াতে বিলাসবহুল গাড়িতে করে এই যন্ত্রপাতি ও ইয়াবার চালান ঢাকা আনা হচ্ছিল। যারা আটক হয়েছিল তারা হচ্ছে আইয়ুব আলী, শামসুল আলম ও মোস্তাকিন হোসেন। গ্রেপ্তারকৃতরা জানায়, গুলশান নিকেতন এলাকার ৫ নম্বর সড়কের ২০৫/৩ নম্বর বাসার সাত ও আট তলায় এই কারখানা গড়ার পরিকল্পনা ছিল।
১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪ যশোর বেনাপোল সড়ক থেকে কাভার্ড ভ্যান হতে ৪ সহ¯্রাধিক বোতল ফেনসিডিল আটক করে যশোর বিজিবি। দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের ওপারে বনগাঁ, রানাঘাট, কাঞ্চনগর, হরিদাসপুর, বারাসাত, বানপুর ও বহরমপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ফেনসিডিলের আড়ত রয়েছে বাংলাদেশে পাচারের জন্য। ১৯ জানুয়ারি ২০১৬ নগরীর চকবাজার প্যারেড কর্ণার থেকে ইয়াবা তৈরির সরঞ্জাম সহ রাখাল নামে এক ইয়াবা উৎপাদনকারীকে আটক করা হয়েছিল।
২৪ নভেম্বর ২০১৬ মিরপুর-২ নম্বর সেকশনের একটি বাসা থেকে ইয়াবা কারবারি জসিম উদ্দিন ওরফে শিমুল, সৈয়দ তরিকুল ইসলাম ওরফে সুমন, মো. আলী আকবর, জুবায়ের হোসেন জুয়েল ও কীর্তি আজাদ ওরফে টুটুলকে ইয়াবা তৈরির কাঁচামাল ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতিসহ আটক করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আটককৃতরা স্বীকার করে, তারা এসব যন্ত্রপাতি দিয়ে প্রতি ঘণ্টায় ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উৎপাদন চলত, যার ক্রেতা ছিল রাজধানীর বিভিন্ন ইয়াবা কারবারি।
১৯ ডিসেম্বর ২০১৬ রাজধানীর ডেমরার সারুলিয়া টেংরা এলাকার মা মেমোরিয়াল স্কুল গলির একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে ইয়াবা তৈরির সরঞ্জামসহ নাসির উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। এই মিনি কারখানায় প্রতিদিন ৫০০ পিস ইয়াবা তৈরি করে খুচরাভাবে বিক্রি করত বলে নাসির পুলিশের কাছে স্বীকার করে।
৩ জানুয়ারি ২০১৭ নারায়ণগঞ্জ শহরের বাবুইল এলাকায় ইয়াবা তৈরির কারখানার সন্ধান পায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয় যন্ত্রপাতিসহ আমজাদ হোসেন, সামিউল ইসলাম ও রাজেস চৌধুরী শ্যামকে। এই কারখানার ইয়াবার বড় বড় চালান দেশের বিভিন্ন স্থানে যেত। কারখানাটিতে ঘণ্টায় ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উৎপাদন করা যেত।
২৬ ডিসেম্বর ২০১৭ চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানার ব্যাপারীপাড়া কমিশনার গলির এক বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আড়াই লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এই বাড়িতে আড়াই লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট তৈরি করত আবুল হোসেন সওদাগর নামের এক ব্যক্তি। বাড়িটি থেকে চারটি স্টিলের ডাইস, দুটি প্রেশার মেশিন, ডিজিটাল স্কেল, জার ও বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য উদ্ধার করা হয়। আবুল হোসেন পুলিশকে বলেছে, তার কারখানায় উৎপাদিত ইয়াবার এজেন্ট ছিল আবদুল্লাহ আল নোমান ওরফে আবদুল্লাহ আল আমান নামের এক ব্যক্তি। নোমান এসব ইয়াবা দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহের দায়িত্বে ছিল। আমানকে পরে গ্রেপ্তার করা হয়। মামুন হোসেন ও আয়মা সিদ্দিকী নামে দুই ব্যক্তি ইয়াবা কারবারের সঙ্গে জড়িত ছিল বলে তাদের স্বীকারোক্তিতে জানা যায়।
১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানা এলাকার হরিপুর গ্রামের একটি টিনশেড বাড়ি ঘেরাও করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা। কক্ষে প্রবেশ করেই দেখা যায় একাধিক ইয়াবা তৈরির যন্ত্র সাজানো। সেখান থেকে তৈরি ইয়াবা, কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি উদ্ধার করা হয়। ওই বাড়ির মালিক হাবিবুরের স্ত্রী লাকীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে লাকী স্বীকারোক্তিতে জানায়, দীর্ঘদিন ধরে তারা এই বাড়িতে গোপনে ইয়াবা তৈরি করে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে ইয়াবা কারবারিদের কাছে সরবরাহ করে আসছিল। বাড়ির চারপাশে সিসি ক্যামেরা লাগানো থাকত। ভেতরে মনিটরেই দেখা যেত বাড়িতে কারা যাতায়াত করছে। এই বাড়িতে যখন অভিযান চালানো হয় তখন তার স্বামী হাবিবুর রহমান কেটে পড়েছে।
দেশব্যাপী মাদক নির্মুল অভিযানে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের অধিকাংশই ছোট বা মাঝারি শ্রেণির মাদক ব্যবসায়ী বা বাহক অথবা সেবক চুনোপুটি শ্রেণির। সরষের মধ্যে ভূত বিরাজ করছে। পুলিশের এক শ্রেণির কর্মকর্তা অভিযানের আগাম তথ্য মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। এ কারণে অভিযানে গডফাদাররা ধরা পড়ছে না। রাজধানীর ৪৯টি থানার প্রতিটিতে পুলিশের ১৫/২০ জন করে সোর্স আছে। এসব সোর্সের মাধ্যমে পুলিশকে অপরাধের তথ্য জানানোর কথা। কিন্তু তারা এখন উল্টো পথে চলছে। নিজেরাই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। খুচরা মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা উঠিয়ে পুলিশের এক শ্রেণির কর্মকর্তার কাছে তারা পৌঁছে দেয়। এসব মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষের টাকা পেয়ে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা বড়লোক হয়েছেন, তারা এখন অভিযানের আগাম তথ্য ফাঁস করে দিচ্ছেন।
‘অভিযানে আসছি, দ্রুত বাবা নিয়ে বসকে (মাদক ব্যবসায়ী) আত্মগোপনে যেতে বলো, স্যারেরা থাকবে, আমাদের কিছুই করার থাকবে না কিন্তু-’রাজধানীতে মাদকের একটি আখড়া এলাকায় মাদক নির্মুল অভিযানে যাওয়ার আগে পুলিশের একজন কর্মকর্তা তার সোর্সকে এভাবে নির্দেশনা দেয়ার তথ্য একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ পেয়েছে। (সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক ২৯ মে ২০১৮)
ইয়াবাসহ মাদকের ব্যবসা করতে হলে প্রশাসনকে উৎকোচ দিতেই হবে। এই উৎকোচের পরিমাণ মাসে কোটি কোটি টাকা। স্থানীয় প্রশাসন, রেঞ্জ, জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয় ও গোয়েন্দা বিভাগের এক শ্রেণির কর্মকর্তার নিয়মিত উৎকোচ গ্রহণের ফলেই দেশব্যাপী মাদকের দ্রুত বিস্তার ঘটেছে। মাসে কোটি কোটি টাকার উেকাচ তাদেরসহ এক শ্রেণির স্থানীয় রাজনীতিকদের পকেটে যায়। কোন কোন রাজনীতিকদের নির্বাচনী ব্যয়ভার ও মাস্তান নিয়োগের কাজটিও করেন মাদক ব্যবসায়ীরা।
সারাদেশে দ্রুত মাদকের বিস্তারের মূলে স্থানীয় প্রশাসন, রেঞ্জ, জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয় ও গোয়েন্দা বিভাগ এবং মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক শ্রেণির কর্মকর্তারা নিয়মিত উৎকোচ গ্রহণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব দুর্নীতিগ্রস্থ কর্মকর্তাদের পারিবারিক অনুষ্ঠান, বিদেশ ভ্রমণ ও স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সব ব্যয়ভার বহন করে থাকে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা, যারা মাদকের গডফাদার হিসেবে পরিচিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ