ঢাকা, বুধবার 18 July 2018, ৩ শ্রাবণ ১৪২৫, ৪ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ফটিকছড়ি পৌর সদর ও কোটি টাকার ব্রিজ হুমকীতে

ধুরুং নদীর ভাঙ্গনে হুমকীর মুখে ফটিকছড়ি পৌর সদর, ছবিটি পৌর সদরের ইসমাইল মোয়াজ্জির বাড়ি

মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) : চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি পৌর এলাকা দিয়ে প্রবাহিত খরস্রোতা ধুরুং নদীর ব্যাপক ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে কয়েকটি গ্রামের শতাধিক ঘরবাড়ি ও একটি ফোরকানিয়া মাদ্রাসা। সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ধুরুং নদীর ভাঙ্গনে ইতিমধ্যে পৌর সদরের বিবিরহাট বাজারের পশ্চিমে আনু হাজির বাড়ির ফজল আহমদ, ভেলা ফকিরের ঘর, ইসমাইল মোয়াজ্জিন বাড়ির আবুল কালাম, সেলিম উদ্দিন, শাহাজাহান, নুরুল হক, ইয়াকুবের ঘর, দাশ পাড়ার মন্টু দাশ, অনিল দাশ, গৌরাঙ্গ দাশ, বাবুল দাশ, লেদু ও নুরুদের ঘরসহ প্রায় ২৫ ঘর ধুরুং নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভয়াবহ ভাঙ্গনে হুমকীর মধ্যে পড়ে ফটিকছড়ি পৌরসদরের গোয়াজ ফকির বাড়ি, হাড়িঁপাড়া, উত্তর ধুরুং এলাকার বিভিন্ন গ্রাম ও কয়েক কোটি টাকায় নির্মিত ধুরুং নদীর লামার ঘাট ব্রিজটি। এছাড়া ভাঙ্গন এলাকা দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হয়ে ফটিকছড়ি পৌর এলাকার দুই শতাধিক কাঁচা ঘর বাড়ি, রাস্তা ব্রিজ কালভার্ট ধবংস করে দিয়ে গেছে। পৌর এলাকার গ্রামের কানেকটিভিটি সড়কের মধ্যে একটি সড়কও বর্তমানে চলাচলের অবস্থা নেই।
ফটিকছড়ি পৌরসভা অফিসের ক্ষয় ক্ষতির তালিকা থেকে জানা গেছে, সম্প্রতি বন্যায় পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে দুই’শ ২৫টি কাঁচা ঘরবাড়ি, ৭০টি ছোট বড় রাস্তা বন্যার পানিতে ভেঙ্গে-চুরে একাকার হয়ে গেছে। সেই সাথে পৌর এলাকার কয়েকশ পুকুরের মাছ হাজার হাজার একর জমির আমন বীজতলা বন্যার পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে পৌরসভা এলাকার মানুষের ৩৫ কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়ে গেছে বলে ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। এখনো পর্যন্ত অনেক ঘর হারা পৌরবাসী তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই টুকু দাঁড় করাতে পারেনি। মাত্র ২৬ বর্গ কি.মি. আয়তনের পৌর এলাকায় ৩৫ কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হলে সেখানের মানুষের অবস্থা কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।
ধুরুং নদীর ভয়াবহ ভাঙ্গন নিয়ে ৯নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবুল কাসেম, স্থানীয় শাহাদাত হোসেন সেলিম, মাহাবুবুল আলম, এনামুল হক, রোকাইয়া তুলি সহ বিভিন্ন লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পৌর এলাকার মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত ধুরুং নদী গত বছর বর্ষায় একাধিক স্থানে ভেঙ্গে যায়। কিন্ত গত এক পেরিয়ে গেলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের অভাবে ভাঙ্গনগুলো মেরামত করেনি। এবারের বন্যায় সেই পুরনো ভাঙ্গনগুলোর পাশাপাশি আরো নতুন কয়েকটি পয়েন্টে ধুরুং নদী ভেঙ্গে গিয়ে পানি প্রবেশ করে সমগ্র পৌর এলাকা ভাসিয়ে দেয়। তদুপরি মরার উপর খাঁড়ার ঘা এর মত পৌর এলাকার মধ্যেই ধুরুং নদীর উপর সেই পাকিস্তানী আমলে নির্মিত একটি বাঁধই বর্তমান ভয়াবহ পরিস্থিতর জন্য বহুলাংশে দায়ী বলে সচেতন মহলের অভিমত।
সরেজমিনে উক্ত বাঁধ এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, ধুরুং নদীটি প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার’শ ফুট চওড়া হলেও বাঁধ এলাকায় নদীটিকে শাসন করে প্রায় ৮০ ফুটে এনে বাঁধটি নির্মাণ করা হয়েছে। তদুপরি নদীর তলদেশ থেকে একটি কংক্রিটের চওড়া দেওয়াল প্রায় ১৫ ফুট উচু করা আছে। ফলে সাড়ে তিন’শ চার’শ ফুট প্রশস্ততা বেয়ে আসা উজানের পানি বাঁধ এলাকায় এসে স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়ে ৮০ ফুট চওড়া দিয়ে প্রবাহিত হতে হয়। এতে করে উজানের পানি নদীর দুই তীর ভেঙ্গে চুড়ে পৌর এলাকা সহ কাঞ্চননগর ইউনিয়ন, পাইন্দং ইউনিয়ন সহ আশপাশের এলাকায় ব্যাপক বন্যার সৃষ্টি হয়।
ভাঙ্গনের ব্যাপারে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে সে ব্যাপারে জানতে চাইলে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী অলি আফাজ চৌধুরী বলেন ধূরুং নদীর উল্লেখিত ভাঙ্গনগুলি মেরামতের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে, বরাদ্দ পাওয়া গেলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভাঙ্গনগুলি মেরামত করা হবে, ৬০ বছর আগে নির্মিত বাধঁটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এসে দেখে গেছে আমরা রিপোর্ট দিয়েছি, যেভাবে উচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশ আসবে সেভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই বাধঁটির কারণে ভাঙ্গন হচ্ছে বলে সরেজমিনে দেখা যাচ্ছে, স্থানীয় জনগণও এই বাধেঁর ব্যাপারে অভিযোগ করে আসছে, তাই এই বাধঁটি উঠিয়ে দেওয়ায় সমীচীন হবে বলে মনে করি। তাতে ভাঙ্গন কমে আসবে বলে মনে হয়।
এ ব্যাপারে ফটিকছড়ি পৌরসভার মেয়র ও পৌর আ’লীগের সভাপতি আলহাজ মো.ইসমাইল হোসেনের নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত বছর হালদা প্রজেক্টের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আসা একটি টিম ধুরুং নদীর উক্ত বাঁধটি সরজমিন পরিদর্শন করে হালদায় পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে উক্ত বাঁধটি তুলে দেবার সুপারিশ করে। এছাড়া তিনি আরো বলেন, বাঁধটি তুলে দেওয়া, না হয় এটিকে নদীর চওড়া বরাবর প্রশস্ত করে এটিকে সময়োপযোগী করার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড সহ সরকারি বিভিন্ন মিটিং এবং বিভিন্ন ফোরামে বহু আগে থেকেই আবেদন নিবেদন করে আসছেন। কিন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ড রহস্যজনক কারণে এ ব্যাপারে আজতক কোন পদক্ষেপ নেয়নি বলে তিনি জানান। তিনি উক্ত বাঁধটি তুলে দেওয়া সহ সম্প্রতি বন্যায় ক্ষত বিক্ষত ফটিকছড়ি পৌর এলাকাকে পূর্নগঠনে সরকারের আশু পদক্ষেপ কামনা করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ