ঢাকা, বৃহস্পতিবার 19 July 2018, ৪ শ্রাবণ ১৪২৫, ৫ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ইসরাইলী গুলী নীতির ফলেই চিকিৎসক নাজ্জারের মৃত্যু

১৮ জুলাই, টাইমস অব ইসরাইল : ফিলিস্তিনী চিকিৎসাকর্মী রাজান আল নাজ্জারকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যার প্রমাণ পেয়েছে ইসরাইলের একটি মানবাধিকার গ্রুপ। ৩০ মার্চ শুরু হওয়া ফিলিস্তিনিদের গ্রেট মার্চ অব রিটার্ন কর্মসূচির দশম শুক্রবারে (১ জুন) ইসরাইলী সেনাদের গুলীতে এই ফিলিস্তিনীর মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত শেষে ইসরাইলের মানবাধিকার গ্রুপ বি’টেসেলেম এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। ইসরাইলের সেনা কর্তৃপক্ষ ওই মৃত্যুকে একটি দুর্ঘটনা বলে আখ্যা দিয়ে আসলেও তদন্ত শেষে মানবাধিকার গ্রুপটি বলছে ইসরাইল রাষ্ট্রের গুলী শুরুর নীতির সরাসরি ফল হলো নাজ্জারের মৃত্যু।

১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনী ভূমি দখল করে গঠিত হয় ইসরাইল নামের রাষ্ট্র। ১৯৭৬ সালের ৩০ মার্চ ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলে ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করে ইহুদি বসতি নির্মাণের প্রতিবাদ করায় ছয় ফিলিস্তিনীকে হত্যা করা হয়। পরের বছর থেকেই ৩০ মার্চ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত পরবর্তী ছয় সপ্তাহকে ভূমি দিবস হিসেবে পালন করে আসছে ফিলিস্তিনীরা। এই বছরের কর্মসূচিতে চালানো ইসরাইলী বাহিনীর গুলীতে নিহত হয়েছে অন্তত ১৩৭জন ফিলিস্তিনী। আহত হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার।

গ্রেট মার্চ অব রিটার্ন কর্মসূচির দশম শুক্রবার (০১ জুন) ছিল সেদিন।  ইসরাইলের সেনাবাহিনীর ¯œাইপারের (দূর থেকে নিশানায় নিখুঁত লক্ষ্যভেদে পারদর্শী বন্দুকধারী) গুলিতে আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা সহায়তা দিতে অন্য প্যারামেডিকদের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবীর কাজ করার সময়ে নিজেই নিহত হন ২১ বছর বয়সী রাজান আল নাজ্জার। তখন ইসরাইলি বাহিনীর তরফে এই মৃত্যুর ঘটনাকে দুর্ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।

নিজেদের প্রাথমিক তদন্তের বরাত দিয়ে ইসরাইলী বাহিনীর মুখপাত্র গত ৫ জুন  বলেন, আল নাজ্জারকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়নি। দেশটির সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইলের কাছে তার দাবি ছিল নাজ্জার হয়তো কোনও গুলীর ভগ্নাংশ বা লক্ষ্যভ্রস্ট হওয়া কোনও গুলীতে নিহত হয়েছেন। ঘটনাস্থলে থাকা সেনাদের সাক্ষাৎকারে ভিত্তিকে ওই তদন্ত হয়েছিল বলে তখন জানানো হয়েছিল। পরীক্ষার বরাত দিয়ে তারা জানিয়েছিল, ওই সেনা সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলী চালিয়েছিল, নাজ্জারকে নয়।

তবে বি’টেসেলেম’র তদন্তে দেখা গেছে, ইসরাইলী নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্য  সীমান্ত বেড়ার ২৫ মিটার দূরে নাজ্জারকে তাক করে সরাসরি গুলী করে। মানবাধিকার গ্রুপটি বলছে, ‘নাজার ওই নিরাপত্তা সদস্য বা অন্য কারোও প্রতি নিরাপত্তা হুমকি তৈরি না করলেও মেডিকেল ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় তাকে গুলি করা হয়।’

বি’টেসেলেম’র মুখপাত্র অমিত গিলাটজ বলেছেন, ‘ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর এই ঘটনার অনেকগুলো বর্ণনার সঙ্গে মিল না পেয়ে তারা এই একটি সিদ্ধান্তেই পৌঁছাতে পেরেছেন।’  

নাজ্জারের জানাযায় ফিলিস্তিনীদের ঢল

বি’টেসেলেমকে দেওয়া স্বাক্ষ্যে আল নাজারের সহকর্মী ও খান ইউনিস এলাকার চিকিৎসা স্বেচ্ছাসেবী রামি আবু জাজার (২৯) বলেছেন, সেদিন সন্ধ্যা ছয়টার দিকে সীমান্ত এলাকায় টিয়ার গ্যাসে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা দুই ব্যক্তিকে উদ্ধারে যায় প্যারামেডিকদের একটি গ্রুপ। মেডিকেল ইউনিফর্ম আর ভেস্ট পরিহিত এই গ্রুপটি তাদের মাথার ওপরে হাত উঁচু করে সেনা সদস্যদের জানিয়েছিল দেখো আমরা প্যারামেডিক।

তারা অজ্ঞান ওই দুই ব্যক্তিকে সরিয়ে আনা শুরু করলে ওই সেনা সদস্যটি তাদের দিকে প্রবল বেগে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। এতে আল নাজ্জারের শ্বাসরোধ হতে শুরু করে আর ওই গ্রুপটি বেড়ার কাছ থেকে সরে যেতে থাকে।

আবু জাজার বলেন, ‘আমরা সরে এসে কিছুটা ভালো অনুভব করতেই বিক্ষোভকারীদের কাছাকাছি চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই।’  ‘আমরা তাদের থেকে দশ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম যা সীমান্ত বেড়া থেকে ২৫ মিটার দূরত্বে। আমাদের আশেপাশে কোনও বিক্ষোভকারী ছিলো না। প্রায় ৫৪৫মিনিটের দিকে আমরা দেখলাম সামরিক বাহিনীর একটি জিপ থেকে দুই সৈন্য নামলো, হাঁটু গেড়ে বসলো আর আমাদের দিকে বন্দুক তাক করলো।’

 ‘রাজান আমার ডান দিকে দাঁড়িয়ে ছিল আর মেডিকেল দলের আরেক সদস্য রাশা আমার পিছনে ছিল। আমরা কথা বলছিলাম। হঠাৎ করে তারা আমাদের দিকে দুটি গুলি ছুঁড়লো। আমি নাজারের দিকে তাকালাম আর দেখলাম তার পিঠে গুলি লেগেছে আর পড়ে গেল,’ বলেন জাজার।

সেকেন্ডের ব্যবধানে আবু জাজার নিজের হাঁটুরে ওপরে গুলিবিদ্ধ হন। তাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক প্যারামেডিকে ডান হাত ও পেটে গুলির ধারালো অংশ আঘাত করে।

বি’টেসেলেম’র এর মুখপাত্র বলছেন, আল নাজ্জারের মৃত্যুর পর প্রথমে সামরিক বাহিনীর তরফে দাবি করা হয়েছিল ওই ঘটনাস্থলে নাজার দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় সেনাসদস্যরা কোনও গুলি করেনি। এর মাধ্যমে ইসরাইলি বাহিনী তার মৃত্যুর দায় থেকে সদস্যদের মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

বি’টেসেলেমের অনুসন্ধান মৃত্যুর আগে দেওয়া আল নাজ্জারের দেওয়া সাক্ষ্যের সঙ্গে মিলে যায়। গত এপ্রিলে আল জাজিরাকে দেওয়া স্বাক্ষাৎকারে নাজ্জার বলেছিলেন, তাকে লক্ষ্য করে একাধিকবার গুলি চালিয়েছে ইসরাইলি সেনাসদস্যরা। তিনি দাবি করেছিলেন, ‘আমি তথ্য পেয়েছি যে আমাকে মাঠ পর্যায়ে আমার সব কর্মকান্ড থেকে বিরত রাখতে ইসরাইলী সেনাসদস্যরা আমাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। তবে আমি সেসব অগ্রাহ্য করেছি।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে গ্রেট রিটার্ন অব মার্চ কর্মূসূচি চলাকালে ইসরাইলের সেনা সদস্যদের গুলিতে অন্তত ১৩৭জন ফিলিস্তিনী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় ১৫ হাজার ফিলিস্তিনী।

নাজ্জার নিহত হওয়ার দুই সপ্তাহ আগে ১৪ মে আরেক চিকিৎসাকর্মী মুসা আবু হাসানাইনকেও গুলী করে হত্যা করে ইসরাইলী সেনাসদস্যরা। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী গত ৩০ মার্চ থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত ৩৫৭জন স্বাস্থ্য কর্মীর ওপর আক্রমাণ চালানো হয়েছে। এর মধ্যে তাজা গুলির আঘাত পেয়েছেন ২৬ জন, সরাসরি টিয়ারগ্যাসের ক্যানিস্টারের আঘাত পেয়েছেন ৩৭জন আর ১২ জন গুলির ভগ্নাংশের আঘাত পেয়েছেন। একই সময়ে ৫৮টি অ্যাম্বুলেন্সও আক্রান্ত হয়েছে।

বি’টেসেলেম বলছে বিক্ষোভ শুরুর পর ইসরাইলের প্রণীত গুলী শুরুর নীতির (ওপেন ফায়ার পলিসি) সরাসরি ফল হলো নাজ্জারের মৃত্যু। গিলাটজ বলেন, আল নাজ্জারের মৃত্যুর দায় অস্বীকার হলো সেই প্রক্রিয়ার অংশ যার মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ আসল ঘটনা গোপন করে ইসরাইলের ভাবমূর্তি নষ্ট করে আসছে।

তিনি বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, ফিলিস্তিনিদের হত্যার বিষয়ে ইসরাইল উদাসীন। না হলে অনেক আগেই তারা গুলি শুরুর নীতি বদলাতো আর সীমান্ত বেড়ার ওপাশে থাকা নিরস্ত্র বিক্ষোভকারী যারা কোনও ধরণের হুমকি তৈরি করে না তাদের ওপর গুলি ছোঁড়া বন্ধ করতো।’

ইসরাইলের মানবাধিকার সংগঠন ইয়েশ দিন ও আরও কয়েকটি গ্রুপ মিলে দেশটির উচ্চ আদালতে এক পিটিশন দাখিল করে। তাতে ফিলিস্তিনিদের গ্রেট মার্চ অব রিটার্ন কর্মসূচীতে প্রণীত গুলি শুরুর নীতি অবৈধ। মে মাসে হাই কোর্ট বেঞ্চের বিচারকেরা সর্বসম্মতভাবে ওই পিটিশন খারিজ করে দেয়।  বিচারকদের যুক্তি ছিল, এই বিক্ষোভ হচ্ছে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গ্রুপ হামাসের সঙ্গে তাদের দেশের লড়াইয়ের অংশ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ