ঢাকা, বৃহস্পতিবার 19 July 2018, ৪ শ্রাবণ ১৪২৫, ৫ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নির্বাচনের নামে তামাশার খেলা বন্ধ করতে ঐক্য চাই

গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ আয়োজিত বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা ও নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার: বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশে নির্বাচন ব্যবস্থা বলতে কিছুই আর বাকি নেই। এটা এখন একটি খেলা, নির্বাচনের নামে তামাশা চলছে। তারপরও আমরা তামাশায় যাচ্ছি। জনগণ চায় যে আমরা যাই, জনগণ চায় যে তাদেরকে আমরা উন্মোচিত করি। তিনি বলেন, এটা মনে রাখতে হবে এই যাওয়াটাই স্থায়ী নয়। বাংলাদেশের জনগণ রুখে দাঁড়াচ্ছে, বাংলাদেশের জনগণ রুখে দাঁড়াবে। ঐক্য হচ্ছে, ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। একটি মাত্র ইস্যুতে আমরা ঐক্য চাই- বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে, আমরা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। যা দিয়ে জনগণ পরবর্তি সরকার গঠন করবে এবং সংকটের সমাধান হবে। একইসাথে সরকার দেশের অর্থনীতিকে ফোকলা করে দিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন মির্জা ফখরুল। গতকাল বুধবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের উদ্যোগে খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা ও মুক্তি দাবিতে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এতে শিক্ষক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, কৃষিবিদ, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংবাদিকসহ পেশাজীবীরা অংশ নেন।
সংগঠনের সভাপতি, আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমানের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেনের পরিচালনায় মানববন্ধনে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি রুহুল আমিন গাজী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের আহবায়ক প্রফেসর ড. আখতার হোসেন খান, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের অধ্যক্ষ সেলিম ভুঁইয়া, জাকির হোসেন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কাদের গনি চৌধুরী, সাখাওয়াত হোসেন, চিকিৎসক রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, নিলুফার ইয়াসমীন, কৃষিবিদ রিয়াজুল ইসলাম রিজু, শামীমুর রহমান, আমিরুজ্জামান খান শিমুল, সাংস্কৃতিক দলের নেতা রফিকুল ইসলাম প্রমূখ বক্তব্য রাখেন।
সরকার দেশের অর্থনীতি ফোকলা করে দিচ্ছে অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভোল্টে অনিয়ম প্রমাণ করেছে সরকার দেশের অথনীতিকে শেষ করে দিয়েছে। তিনি বলেন, আপনারা দেখুন- দুর্নীতির কোন পর্যায়ে এরা (সরকার) চলে গেছে। আজকে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে ঘটনা উঠে এসেছে যে ভোল্টের মধ্যে সোনার বদলে সেখানে ধাতব মুদ্রা রাখা হয়েছে, সেখানে অর্নামেন্টগুলো বদলিয়ে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে নকল জিনিসপত্র রাখা হয়েছে। এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বহু টাকা হ্যাকিং করে নিয়ে চলে গেলো তার প্রতিবেদনটা আজ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। কারণ অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদের হাত নাকি অনেক লম্বা। বাংলাদেশকে আপনারা অর্থনীতির দিক থেকে সম্পূর্ণ ফোকলা করে দিয়েছেন, মাইক্রো ইকোনোমি সিষ্টেমকে আপনারা শেষ করে দিয়েছেন।
 দেশের অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরে অর্থনীতির সাবেক শিক্ষক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দেশে এখন মানবাধিকার বলুন, মানুষের মৌলিক অধিকার বলুন, গণতান্ত্রিক অধিকার বলুন সব শেষ। মিথ্যা কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করে আন্তর্জাতিক বিশ্বকে বিভ্রান্ত করে তারা একটা ধোঁয়া তুলেছেন, এখন নাকী বাংলাদেশের অর্থনীতি অত্যন্ত সবল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার প্রমাণ হচ্ছে- প্রতিদিন এখানে রেমিটেন্স কমছে, প্রতিদিন বিনিয়োগের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। একটাও বেসরকারি বিদেশী বিনিয়োগ আপনারা আনতে পারেন নাই। আপনারা জনগনের পকেট থেকে পয়সা কেটে দুর্নীতির কারণে বিভিন্ন মেগা প্রকল্প চালাচ্ছেন। ওইসব প্রকল্পে লাভ হচ্ছে শুধু আপনাদের।
তিনি বলেন, মঙ্গলবার একটি রাজনৈতিক দলের নেতা একটা ক্যাম্পেইন শুরু করেছেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে। সেখানে তিনি বলেছেন প্রতিমাসে এখানে লাখ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। এই টাকা কোত্থেকে আসছে? এই টাকা জনগণের পকেট থেকে আসছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে জনগণের পকেট থেকে টাকা কেটে নিয়ে যাচ্ছেন। সেই পদ্মাসেতু প্রকল্প এখন ১০ গুণ বেড়েছে। প্রত্যেকটি প্রকল্প এভাবে ১০ থেকে ১৫ গুণ বৃদ্ধি কওে হরিলুট চালানো হচ্ছে। এই টাকা দিয়ে এখন আপনাদের বিদেশে সকলের বাড়ি তৈরি হচ্ছে। সুইস ব্যাংকের একাউন্ট বাড়ছে। কী রেখেছে এদেশের জন্যে?
গণমাধ্যমের ওপর সরকারের চাপের কথা তুলে ধরেন বিএনপি মহাসচিব বলেন, এখন কেউই সত্য লিখতে পারে না। যারাই লিখছে বা বলছে তাদের উপর নির্মমতা নেমে আসছে। সরকারের উদ্দেশ্য একটাই। তা হচ্ছে এক দলীয় শাসন। যা তারা অতীতেও করেছিল।
দেশের মানবাধিকার ও বিচারবর্হিভুত হত্যাকা- নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া সম্প্রতিক বক্তব্যকে হাস্যকর বলে অভিহিত করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, আপনারা (সরকার) আজকে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে হাস্যকর একটা জায়গায় নিয়ে গেছেন। আপনারা বলছেন যে, মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এখানে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় না, একটাও নাকী এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং হয় না। এটা শুনে তো মানুষ হাসবে। পুরনো ঢাকার ঘোড়ার গল্প আছে জানেন তো। দাম জিজ্ঞাসা করছিলো, দাম কম বলায় বলছিলো যে, আপনার কথা শুনলে ঘোড়াও হাসবে। এদেশের অবস্থা তাই হয়েছে।
বৃটিশ মানবাধিকার প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে ফখরুল বলেন, সম্প্রতি এই প্রতিবেদনটি বেরিয়েছে। সেখান পরিস্কারভাবে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশে বিচারবর্হিভুত হত্যা বেড়েছে, গুম বেড়েছে, হত্যা বেড়েছে এবং রাজনৈতিক নির্যাতন বেড়েছে। প্রতিবেদন বলা আছে, মিডিয়ার ওপরে চাপ আগের চেয়ে অনেক বেশি বেড়েছে। এসব কথা একটাও মিথ্যা নয়। প্রত্যেকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিদেশী সংস্থা থেকে পরিস্কার করে বলা হচ্ছে ,বাংলাদেশে ক্রমশই গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের স্পেস সংকোচিত হয়ে আসছে।
কোটা নিয়ে অথবা দেশনেত্রীর চিকিৎসা নিয়ে বিএনপি কোনো রাজনীতি করছে না বলে মন্তব্য করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, বেকার যুবকরা ন্যায়সঙ্গত কোটা সংস্কার আন্দোলন করেছিলো। সেটাকে সংসদে প্রধানমন্ত্রী রেগে-মেঘে বলে দিলেন যে, কোটা থাকবে না। আপনি (প্রধানমন্ত্রী) এখন ইউটার্ন করেছেন। ইউটার্নে বলেছেন হাইকোর্টের রায়ের বাইরে তিনি যেতে পারেন না। হাইকোর্টের রায়ে কী আছে। এটি পর্যবেক্ষন, ওইটা রায় নয়। আপনি হাইকোর্টের পর্যবেক্ষনকে এ্যাবোর্ট করলেন। এয়োদশ সংশোধনী যখন বাতিল করা হলো পঞ্চদশ সংশোধনীতে। সেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বাতিল করে দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনী ব্যবস্থা রাখালেন। যেটাতে আপনার সুবিধা সেটাতে আপনি আদালতকে ব্যবহার করছেন, যেটাতে সুবিধা নেই সেখানে করছেন না। খুব পরিস্কার করে আমরা বলতে চাই, আমরা কোটা নিয়ে বা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য নিয়ে রাজনীতি করছি না। আমরা যেটা সত্য তা জনগনের সামনে তুলে ধরছি। আমাদের নৈতিক দায়িত্ব বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে সত্যকে প্রকাশিত করা, জনগণের সামনে তুলে ধরা।
মির্জা ফখরুল বলেন, আপনারা(সরকার) এতো বড় হয়ে গেছেন, এতো দাম্ভিক হয়ে গেছেন যে, বাংলাদেশের জনপ্রিয় নেতা তিন বারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নির্জন কারাগারে আটকিয়ে রেখে তাকে কোনো চিকিৎসা সেবা পর্যন্ত দিচ্ছেন না। আমরা যখনই তার চিকিৎসার কথা বলছি তখনই বলছে, না সব ঠিক আছে, তার কোনো অসুখ নেই। এই চরম মিথ্যা কথা আপনারা বলছেন। চিকিৎসদের দেখা করতে দিচ্ছেন না, পরিবারের সদস্যদের দেখা করতে দিচ্ছেন না, আমাদের কথা বাদই দিলাম। সম্পূর্ণভাবে আমাদেরকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে, জাতিকে রাখা হয়েছে। অবিলম্বে খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার দাবি জানান তিনি।
নির্বাচনের নামে দেশে সরকার তামাশা করছে অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল বলেন, রাজশাহীতে বুলবুলে (ধানের শীষের প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল) মিটিংয়ে বোমা মারলো। তারপর সাথে সাথে সংবাদ সম্মেলন করে তারা(ক্ষমতাসীন দল) বলছে, এটা আমরা মারিনি। এটা প্রমাণ করে আপনারাই মেরেছেন। দেশে নির্বাচন ব্যবস্থা আর নেই। এটা এখন খেলা খেলা, তামাশা চলছে। তারপরও আমরা তামাশায় যাচ্ছি। জনগণ চায় যে আমরা যাই, জনগণ চায় যে তাদেরকে আমরা উন্মোচিত করি। এটা মনে রাখতে হবে এই যাওয়াটাই স্থায়ী নয়।বাংলাদেশের জনগণ রুখে দাঁড়াচ্ছে, বাংলাদেশের জনগণ রুখে দাঁড়াবে। ঐক্য হচ্ছে, ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। একটি মাত্র ইস্যুতে আমরা ঐক্য চাই- বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে, নির্বাচন কমিশনের অধীনে আমরা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। যা দিয়ে জনগণ পরবর্তী সরকার গঠন করবে এবং সংকটের সমাধান হবে।
রুহুল আমিন গাজী বলেন, বর্তমানে একটি ফ্যাসিস্ট সরকার জনগণের উপর চেপে বসেছে। তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আপনারা যদি মনে করেন খালেদা জিয়াকে মুক্তি না দিয়ে এবং তার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা না করে আজীবন ক্ষমতায় থাকবেন তাহলে ভুল করবেন। তিনি বলেন, সরকারের নির্দেশে প্রশাসন এবং আদালত কাজ করছে। সরকার প্রতিনিয়ত মিথ্যাচার করে চলছে। কোটা আন্দোলন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সংসদে যা বলেছেন পরবর্তীতে সেটি অস্বীকার করছেন। প্রধানমন্ত্রী বলছেন, সংসদে যেটি বলেছেন সেটি আন্দোলন থামানোর জন্যই বলেছেন। সাংবাদিক এ নেতা বলেন, এই সরকারকে সরাতে আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। তাই দেশের গণতন্ত্র এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন কখনোই থামবে না। এটি চলতেই থাকবে।
শওকত মাহমুদ বলেন, যতই দিন যাচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পায়ের নীচের মাটি সরে যাচ্ছে। একটি পর্যায়ে অবস্থা এমন হবে যে, এরা খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়ার সুযোগ টুকুও পাবেনা। জনরোষে তাদের পতন ঘটবে। তিনি বলেন, দেশের জনগনের এখন একটাই দাবি সেটি হচ্ছে এই সরকারের পতন। আন্দোলনের মাধ্যমেই সেই পতন ঘটানো হবে।
সভাপতির বক্তব্যে সংগঠনের সভাপতি আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, আজকে দেশের স্বাধীনতা চলে গেছে। এই স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে আমাদের দিল্লীর সাথে লড়াই করতে হবে। দেশনেত্রীর বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি, দেশের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার ও জনগণের মুক্তি আজকে একাকার হয়ে গেছে। আগেও বলেছি, এখনো বলছি, কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় বেগম জিয়ার মুক্তি ঘটবে না। কারণ দেশের বিচার বিভাগ একেবারে আওয়ামীকরণ হয়ে গেছে। শেখ হাসিনার নির্দেশে এই বিচার বিভাগ তার সিদ্ধান্ত জানিয়ে থাকে। কাজেই সকলকে আমি বলব, বৃহত্তর লড়াইয়ের দিকে আপনারা মনোযোগী হোন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ