ঢাকা, বৃহস্পতিবার 19 July 2018, ৪ শ্রাবণ ১৪২৫, ৫ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ই-পাসপোর্ট যুগে বাংলাদেশ ॥ ডিসেম্বরেই মিলবে ॥ জার্মানির সাথে চুক্তি স্বাক্ষর আজ

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : ই-পাসপোর্ট বা ইলেকট্রনিক পাসপোর্টের যুগে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই গ্রাহকদের হাতে ই-পাসপোর্ট তুলে দেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করছে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্ট অধিদফতর। এ জন্য একটি প্রকল্পও হাতে নেয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের মেয়াদ হবে ১০ বছর। এর আওতায় শুরুর দিকে ২০ লাখ পাসপোর্ট জার্মানি থেকে প্রিন্ট করে এনে সরবরাহ করা হবে। এরপর আরও দুই কোটি ৮০ লাখ পাসপোর্ট বাংলাদেশে প্রিন্ট করা হবে। সে জন্য রাজধানীর উত্তরায় অত্যাধুনিক অ্যাসেমব্লিং কারখানা স্থাপন করার প্রক্রিয়া শুরু  হয়েছে। ওই কারখানা থেকে প্রতি আট ঘন্টার এক শিফটে ২৫ হাজার ই-পাসপোর্ট ছাপা হবে। খবর সংশ্লিষ্ট সুত্রের।
এদিকে দেশের ১০টি আঞ্চলিক অফিস থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র মুদ্রণ ও বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ জন্য আঞ্চলিক অফিসগুলোতে সার্ভার স্টেশন স্থাপন করেছে সংস্থাটি। হারিয়ে যাওয়া জাতীয় পরিচয়পত্র এসব আঞ্চলিক অফিস থেকেই তোলা যাবে আগামী ১ আগস্ট থেকে।
ডিসেম্বরের মধ্যেই পাওয়া যাবে ই-পাসপোর্ট : কয়েক পাতার ছোট বইয়ের মতো হাতে লেখা কাগুজে পাসপোর্টের দিন শেষ হয়েছে অনেক আগেই। মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) চালু থাকলেও সে যুগ শেষ হচ্ছে খুব শিগগির। চলতি বছরই বাংলাদেশ প্রবেশ করতে যাচ্ছে ইলেকট্রনিক বা ই-পাসপোর্ট যুগে। আজ বৃহস্পতিবার এ ব্যাপারে জার্মানির সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হবে। এরই মধ্যে এ প্রকল্পের জন্য গত ২১ জুন একনেক সভায় চার হাজার ৬৩৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় সুত্র জানায়,আজ বৃহস্পতিবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, জার্মানির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং জার্মানির সরকারি প্রতিষ্ঠান ভেরিডোস জেএমবিএইচের প্রধান নির্বাহী উপস্থিত থাকবেন। জার্মানির এই প্রতিষ্ঠানটিই জিটুজির আওতায় বাংলাদেশকে ই-পাসপোর্ট প্রকল্পে সহায়তা দিচ্ছে।
ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মাসুদ রেজওয়ান বলেন, আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর তারা আশা করছেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই গ্রাহকদের হাতে ই-পাসপোর্ট তুলে দেওয়া যাবে। ১০ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের অধীনে শুরুর দিকে ২০ লাখ পাসপোর্ট জার্মানি থেকে প্রিন্ট করে এনে সরবরাহ করা হবে। এরপর আরও দুই কোটি ৮০ লাখ পাসপোর্ট বাংলাদেশে প্রিন্ট করা হবে।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ই-পাসপোর্ট চালু হলেও এমআরপি এখনই পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। যেদিন থেকে ই-পাসপোর্ট চালু হবে, সেদিন থেকে এমআরপি রি-ইস্যু করতে গেলেও ই-পাসপোর্টই দেওয়া হবে। এর মেয়াদ হবে পাঁচ বছর ও ১০ বছর।
পাসপোর্ট অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ১১ জুলাই সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে জার্মানির সরকারি প্রতিষ্ঠান ভেরিডোস জিএমবিএইচের কাছ থেকে ই-পাসপোর্টের জন্য সরঞ্জাম ও সেবা কেনার প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে। 'বাংলাদেশ ই-পাসপোর্ট অটোমেটেড বর্ডার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা' প্রকল্পের আওতায় এসব পণ্য ও সেবা জিটুজি ভিত্তিতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে জার্মানি থেকে কেনা হবে। এতে ব্যয় হবে মোট তিন হাজার ৩৩৮ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। ওই টাকায় প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশকে ২০ লাখ পাসপোর্ট বুকলেট, দুই কোটি ৮০ লাখ পাসপোর্ট তৈরির সরঞ্জাম, আনুষঙ্গিক হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার এবং ১০ বছর রক্ষণাবেক্ষণ সেবা দেবে।
ই-পাসপোর্টে যা থাকবে : ই-পাসপোর্টে ৩৮ ধরনের নিরাপত্তা ফিচার থাকবে। বর্তমানে এমআরপি তথ্যভান্ডারে যেসব তথ্য আছে, তা ই-পাসপোর্টে স্থানান্তর করা হবে। বর্তমানে বই আকারে যে পাসপোর্ট আছে, ই-পাসপোর্টেও একই ধরনের বই থাকবে। তবে বিদ্যমান পাসপোর্টের বইয়ে ব্যক্তির তথ্যসংবলিত যে দুটি পাতা আছে, ই-পাসপোর্টে তার স্থলে পলিমারের তৈরি বিশেষ একটি কার্ড থাকবে। এই কার্ডের মধ্যে স্থাপিত থাকবে একটি চিপ। সেই চিপে পাসপোর্টের বাহকের সব ধরনের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। প্রচলিত এমআরপির পাতায় দেশের নানা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের যে ছবি রয়েছে, তাতেও পরিবর্তন আসবে। এসব ছবির স্থলে নতুন করে অন্যান্য ঐতিহাসিক, প্রাকৃতিক দৃশ্য ও নানা সফলতার দৃশ্য তুলে ধরা হতে পারে।
নিয়ম অনুযায়ী ই-পাসপোর্টের সব তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষিত থাকবে 'পাবলিক কি ডাইরেক্টরি' বা পিকেডিতে। ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন (আইসিএও) আন্তর্জাতিক এই তথ্যভান্ডার পরিচালনা করে থাকে। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলসহ বিশ্বের সব বিমান ও স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ এই তথ্যভান্ডারে ঢুকে তথ্য যাচাই করতে পারে।
অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, ই-পাসপোর্ট চালুর সঙ্গে সঙ্গে দেশের প্রতিটি বিমান, নৌ ও স্থলবন্দরে প্রয়োজনীয় ই-গেট স্থাপন করে স্বয়ংক্রিয় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে। ই-পাসপোর্ট বহনকারী ব্যক্তি এই গেট দিয়ে সীমান্ত পার হবেন। বর্তমানে বিশ্বের ১১৯টি দেশে ই-পাসপোর্ট ও ই-গেট ব্যবস্থাপনা চালু রয়েছে, যা এমআরপি থেকে বেশি নিরাপদ।
আঞ্চলিক অফিসেই মিলবে হারানো জাতীয় পরিচয়পত্র : দেশের ১০টি আঞ্চলিক অফিস থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র মুদ্রণ ও বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ জন্য আঞ্চলিক অফিসগুলোতে সার্ভার স্টেশন স্থাপন করেছে সংস্থাটি। হারিয়ে যাওয়া জাতীয় পরিচয়পত্র এসব আঞ্চলিক অফিস থেকেই তোলা যাবে আগামী ১ আগস্ট থেকে।
জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন (এনআইডি) উইংয়ের মহাপরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, আঞ্চলিক অফিসে হারানো আইডি কার্ড মুদ্রণ ও বিতরণের জন্য আমরা সকল প্রস্তুুতি সম্পন্ন করেছি। আগামী ১ আগস্ট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ কার্যক্রম শুরু হবে।
জানা যায়, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও ফরিদপুরে ইসির আঞ্চলিক কার্যালয়ে আগস্ট থেকে হারানো পরিচয়পত্র তোলা যাবে। এ জন্য মাঠ পর্যায়ের প্রত্যেকটি অফিসের জন্য এক লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দও দিয়েছে কমিশন। আর প্রত্যেকটি অফিসের জন্য কেনা হয়েছে ২টি প্রিন্টার, ২টি লেমিনেটিং মেশিন, ২টি কাটিং মেশিন এবং পাউচ।
সূত্র জনায়, ঢাকায় জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগের ওপর থেকে চাপ কমাতে হারানো জাতীয় পরিচয়পত্র আঞ্চলিক কার্যালয়ে ছাপানো হবে। সেক্ষেত্রে আঞ্চলিক সার্ভার স্টেশনগুলোর সঙ্গে ঢাকার হেড অফিসের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা হবে। বর্তমানে শুধু ঢাকায় হারানো বা নষ্ট হয়ে যাওয়া কার্ড প্রিন্ট দেয়া হয়। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র উত্তোলন করতে ঢাকায় আসতে হয় সাধারণ নাগরিকদের। নতুন উদ্যোগের ফলে আঞ্চলিক অফিসে এই সেবা পাওয়া যাবে।
কার্ড হারিয়ে গেলে বা নষ্ট হলে থানায় সাধারণ ডায়েরির (জিডি) অনুলিপির সঙ্গে নির্ধারিত ফি জমা দিলেই বর্তমানে কেন্দ্রীয় অফিস থেকে কার্ড ছাপিয়ে দেয়া হয়।
সূত্র জানায়, স্থানীয় পর্যায়ে ইসির সেবা পৌঁছে দিতে দেশের ৩৩ উপজেলা এবং ২টি জেলায় ইসির নতুন নিজস্ব ভবন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই ভবনগুলোতে ইসির কেন্দ্রীয় অফিসের সঙ্গে যুক্ত করা হবে সার্ভার স্টেশন। এরপর এসব ভবন থেকেও জাতীয় পরিচয়পত্র বা স্মার্ট কার্ড পাওয়া যাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ