ঢাকা, বৃহস্পতিবার 19 July 2018, ৪ শ্রাবণ ১৪২৫, ৫ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রড-সিমেন্টের মূল্যবৃদ্ধি

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এক নিয়মিত ও স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে প্রধান দুই নির্মাণ সামগ্রী রড ও সিমেন্টের মূল্য বেড়ে গেছে অস্বাভাবিক পরিমাণে। গতকাল দৈনিক সংগ্রামের এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা না নেয়ার ফলে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রতি টন রডের মূল্য বেড়েছে এমনকি ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা টিসিবির পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গত বছর ২০১৭ সালের জুলাই মাসে ৬০ গ্রেডের যে এমএস রড ৫৩ হাজার পাঁচশ’ থেকে ৫৪ হাজার পাঁচশ’ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে, সে একই রড বর্তমান বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৬৬ হাজার থেকে ৬৮ হাজার টাকা দরে। পাশাপাশি ৪০ গ্রেডের রড প্রতি টনে ৪৩ থেকে ৪৫ হাজার টাকার স্থলে বিক্রি হচ্ছে ৫৭ হাজার থেকে ৫৮ হাজার টাকা দরে। অর্থাৎ টিসিবির হিসাবেই রডের  দাম বেড়েছে ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে ২৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত। টাকার অংকে প্রতি টন রডের দাম বেড়েছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা।
ওদিকে রডের পাশাপাশি আরেক প্রধান নির্মাণ সামগ্রী সিমেন্টের দামও বেড়ে চলেছে। গত এক বছরে বিভিন্ন কোম্পানির ৫০ কেজি ওজনের সিমেন্টের প্রতি বস্তায় দাম বেড়েছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত। কোনো কোনো কোম্পানির সিমেন্টের বস্তা প্রতি দাম বেড়েছে এমনকি ৯০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত। ৩৬০ টাকার এক বস্তা সিমেন্ট ৪৪০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত দামেও বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের অবশ্য অজুহাতের অন্ত নেই। সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে অনুসন্ধান চালানোর সময় জিজ্ঞাসার জবাবে ব্যবসায়ীরা যথারীতি আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের এবং মার্কিন ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার যুক্তি হাজির করেছেন। তারা সেই সাথে বন্দরে মাল খালাসে অত্যধিক বিলম্বজনিত আর্থিক ক্ষতি এবং পরিবহন ব্যয় ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ার মতো গৎবাঁধা বিভিন্ন যুক্তিও তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাঁচামাল ও ডলারের দাম বেড়েছে মাত্র তিন শতাংশ হারে। সে কারণে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধি কোনো বিচারেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সিমেন্টের ক্ষেত্রেও এতটা ঢালাওভাবে দাম বাড়িয়ে দেয়ার পক্ষে যুক্তি খুঁজে পাননি তথ্যাভিজ্ঞরা। তারা মনে করেন, বাস্তবে সরকারের জ্ঞাতসারেই অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট গঠন করে মূল্যবৃদ্ধির যথেচ্ছ কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।  
এদিকে রড ও সিমেন্টের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় দেশের নির্মাণ শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। নতুন কোনো ভবন বা অ্যাপার্টমেন্ট তো তৈরি হচ্ছেই না, নির্মাণাধীন হাজার হাজার ভবনের কাজও মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রি (বিএসিআই) জানিয়েছে, রড ও সিমেন্টের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো দেউলিয়া হয়ে পড়ার পর্যায়ে এসে গেছে। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিএসিআই-এর নেতারা বলেছেন, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির কারবার বন্ধ না করা হলে দেশে সব ধরনের নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে যাবে। এর ফলে উন্নয়নই কেবল বাধাগ্রস্ত হবে না, লাখ লাখ শ্রমিকও বেকার হয়ে পড়বে। অমন অবস্থায় দেশে অর্থনৈতিক সংকট মারাত্মক হয়ে উঠবে এবং সামাজিক বিশৃংখলা দেখা দেবে। বিএসিআই-এর পক্ষ থেকে তাই অনতিবিলম্বে রড ও সিমেন্টের মূল্য কমিয়ে আনার লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়েছে। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)-ও একই দাবি ও আহবান জানিয়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, রড ও সিমেন্টের মূল্য অস্বাভাবিক পরিমাণে বেড়ে গেছে এবং এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের নির্মাণ শিল্প। বেসরকারি পর্যায়ের তো বটেই, সরকারের অনেক উন্নয়ন প্রকল্পও মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে সড়ক-মহাসড়ক থেকে পদ্মাসেতু পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়েই পিছিয়ে পড়ছে সরকার। আমরা মনে করি, এমন অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। বড় কথা, সরকার অন্তত মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সিন্ডিকেটের কারসাজি সম্পর্কে সুনিদিষ্টভাবেই জানে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি এবং এখনো নিচ্ছে না আসলে একটি বিশেষ কারণে। সে কারণটি হলো, সবকিছুর সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলেরই রাঘব-বোয়ালরা জড়িত রয়েছেন। সেই সাথে রয়েছে চাঁদা ও কমিশনের মতো কিছু বিষয়, যেগুলো সম্পর্কে নিয়মিতভাবেই অভিযোগ ওঠে এবং অভিযোগ প্রমাণিতও হয়ে থাকে।
অতীতের তিক্ত কোনো উদাহরণ টেনে আনার পরিবর্তে আমরা মনে করি, বর্তমান পর্যায়ে সরকারের উচিত রড ও সিমেন্টের মূল্যবৃদ্ধির জন্য দায়ী ব্যবসায়ী নামধারী চিহ্নিত গোষ্ঠীর লাগাম টেনে ধরা। একথা বুঝতে হবে যে, মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের উন্নয়ন শুধু নয়, ব্যক্তিগত পর্যায়ের উন্নয়নও ভয়ংকরভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে নির্মাণ শ্রমিকদের আয়-রোজগারের বিষয়টিও। বিএসিআই ও রিহ্যাব-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এবং এটা সত্যও যে, নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে ৫০ লাখের বেশি শ্রমিক ও মজুর প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছে। তাদের আয়-রোজগার বন্ধ হলে বা কমে গেলে তারাই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, অভাবের তাড়নায় তারা এবং তাদের পরিবার সদস্যরা চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই ধরনের অপরাধেও জড়িয়ে পড়বে। পরিণতিতে সমাজে মারাত্মক বিশৃংখলার সৃষ্টি হবেÑ যে সম্পর্কে বিএসিআই ও রিহ্যাবসহ তথ্যাভিজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। এমন নিশ্চিত অশুভ ও ভয়ংকর পরিণতি এড়াতে হলে সরকারকে অবশ্যই রড ও সিমেন্টের মূল্যবৃদ্ধির কর্মকা- প্রতিহত করতে হবে এবং ফিরিয়ে আনতে হবে স্বাভাবিক পরিস্থিতি। আমরা আশা করতে চাই, সরকার এ ব্যাপারে বিলম্ব করবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ