ঢাকা, বৃহস্পতিবার 19 July 2018, ৪ শ্রাবণ ১৪২৫, ৫ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

উচ্চতর মানবিক উপলব্ধির দৈন্য

১৫ জুলাই রোববার দুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় সংঘটিত ঘটনা নিয়ে প্রথম আলোসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন মুদ্রিত হয়েছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, কোটা সংস্কার আন্দোলনে হামলার প্রতিবাদকারীদের ওপর আবারও হামলা করেছে ছাত্রলীগ। আন্দোলনে সংহতি জানানো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককেও তারা ধাক্কা দেয় ও অপদস্থ করে। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলে দফায় দফায় ধাওয়া, মারধর, কটূক্তি। উল্লেখ্য যে, এ মাসের শুরু থেকেই কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হতে থাকে ছাত্রলীগ। এ পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের ১৩ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। কিন্তু যারা হামলা করেছে, সন্ত্রাস করেছে তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। এই বিদ্যাপীঠের ইতিহাস-ঐতিহ্য এখনও দেশের মানুষকে জীবন সংগ্রামে প্রেরণা জোগায়। অধিকার আদায়ে ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও পেশাজীবীদের রয়েছে উজ্জ্বল ভূমিকা। কিন্তু বর্তমান সময়ে এমন কি হলো যে, ছাত্র-ছাত্রীরা এই ক্যাম্পাসে তাদের অধিকার আদায়ে কর্মসূচি পালন করতে পারবে না, আন্দোলনে যোগ দিতে পারবে না। সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন প্রকাশ্যে তাদের ওপর সন্ত্রাসী কায়দায় হামলা চালাচ্ছে। পুলিশ হামলাকারীদের গ্রেফতার না করে আক্রান্ত কোটা আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করছে, রিমান্ডে নিচ্ছে। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের এ কেমন উদাহরণ? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকাও সৃষ্টি করেছে বড় প্রশ্ন। তারা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের সন্ত্রাস চলতে দিচ্ছে। আক্রান্ত ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকদের নিরাপত্তা বিধানে সঙ্গত ভূমিকা রাখছে না। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিরাজ করছে এক ভীতিকর পরিস্থিতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবজনক ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাথে এমন পরিস্থিতি মোটেও মানায় না।
অন্ধ দলবাজি ও কর্তৃত্ববাদী চেতনা আমাদের অহংকারের জায়গাগুলোকে মলিন করে দিচ্ছে। আমরা জানি, একুশ মানে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা। মহান একুশের চেতনায় গড়ে উঠেছে শহীদ মিনার। সেই শহীদ মিনার এলাকায় এখন দাবি আদায়ের আন্দোলনে হামলা চালানো হয়, শিক্ষকদের অপদস্ত করা হয়। যারা একুশকে, শহীদ মিনারকে সম্মান করে, সমীহ করে তারা এমন অনাচারে যুক্ত হয় কেমন করে? এর প্রকৃত কারণ উপলব্ধিতে প্রয়োজন দলীয় যুক্তির বদলে সত্যনিষ্ট ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গী।
ভারসাম্যগুণেই টিকে আছে মহাবিশ্ব এবং আমাদের এই প্রিয় পৃথিবীও। মানব জীবনে আমাদের শরীর বৃত্তেও ভারসাম্য রক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটলে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ি, কর্মক্ষম থাকি না। প্রান্তিকতার বদলে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা রাজনীতি, অর্থনীতি, শাসন-প্রশাসন সবক্ষেত্রেই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দার্শনিক বিবেচনায় ভারসাম্যের বিষয়টিকে ন্যায় ও স্থিতি হিসেবেও বর্ণনা করা যায়। এ কারণেই হয়তো দেশে দেশে কালে-কালে আমরা ভারসাম্য তথা ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতে দেখেছি মনীষীদের এবং নিপীড়িত জনতাকেও। প্রশ্ন জাগে, বর্তমান সময়ে রাজনীতি, অর্থনীতি, শাসন প্রশাসন, উৎপাদন, বন্টন, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি তথা মানব সভ্যতায় ভারসাম্য তথা ন্যায় কতটা প্রতিষ্ঠিত আছে? এমন প্রশ্ন আমাদের দেশেও উচ্চকিত।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান বলেছেন, প্রতিবাদ করলেই স্টিমরোলার চলবে, চলতেই থাকবে। এই ভয়ে আমরা প্রতিবাদ করতে ভুলে গেছি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। এ জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নামার আহ্বান জানান তিনি। ১৪ জুলাই রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ আয়োজিত ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও ন্যায্য দাবি আদায়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার : কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। হাফিজউদ্দিন খান আরো বলেন, আজ মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই। কেন নেই এ প্রশ্নের উত্তর আমি সরকারি দলের সমর্থক বন্ধুদের কাছে পাই না। বাঙালির প্রতিবাদের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ’৫২, ’৬৬’তে আমরা প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু এখন কোনো প্রতিবাদ হচ্ছে না। আমি এর জবাব কোথাও পাই না। যারা আন্দোলন করছেন তাদের কাছেও পাই না। এটি আমার দুঃখ। সবকিছু এভাবে চলতে দেয়া যায় না, মন্তব্য করে তিনি বলেন, আর দেরী করা যাবে না। আমাদের জোরালোভাবে মাঠে নামতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ। কেবল সেমিনার নয়, মাঠের আন্দোলনও প্রয়োজন।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও ন্যায্য দাবি আদায় প্রসঙ্গে হাফিজউদ্দিন খান যে বক্তব্য রেখেছেন তা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে আমরা মনে করি। তিনি দুঃখ করে বলেছেন, আজ মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই, প্রতিবাদও নেই, কিন্তু কেন নেই তার জবাব আমি কোনো পক্ষ থেকেই পাই না। তবে একটি জবাব তো হতে পারে, ক্ষমতায় টিকে থাকার লক্ষ্যে দমন-অবদমন তথা স্টিমরোলারের কৌশল অবলম্বনের কারণে সৃষ্ট ভীতিকর পরিবেশ। আর একটি কারণ কি এটা হতে পারে যে, সৃষ্টি জগৎ, মানবজীবন, সমাজ, শাসন-প্রশাসন স্বাভাবিক ও সুষমভাবে পরিচালনার জন্য ভারসাম্য তথা ন্যায় চেতনার সূত্রটি ধরতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। সরকারি দল, বিরোধী দল নির্বিশেষে সবাই কি ভারসাম্য তত্ত্বের গভীরতর সত্য ও ব্যঞ্জনা উপলব্ধিতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে না? এ কারণেই হয়তো একদিকে চলছে নিপীড়নের স্টিমরোলার, আর অন্যদিকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা। উভয় ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে উচ্চতর মানবিক উপলব্ধি ও মর্যাদাবোধের ক্ষেত্রে দৈন্য। এ দৈন্য দূর না হলে সুশাসন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের আকাক্সক্ষা পূরণ হবার নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ