ঢাকা, বৃহস্পতিবার 19 July 2018, ৪ শ্রাবণ ১৪২৫, ৫ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সরকার সব রকমের ব্যবস্থা নিয়েছে -প্রধানমন্ত্রী

বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা-২০১৮ জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা ২০১৮ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের স্মরণে সারাদেশে একযোগে ৩০ লাখ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা -সংগ্রাম

সংগ্রাম ডেস্ক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, ’৭৫ পরবর্তী শাসকরা সুন্দরবনের নদ-নদী, খাল ও চ্যানেলগুলো বন্ধ করে চিংড়ি চাষ প্রকল্প করায় এখানকার পানি লবনাক্ত হয়ে পড়েছিল। তাঁর সরকার এই নদী এবং খাল পুর্নখনন করে নাব্যতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তা জাহাজ চলাচলের উপযুক্ত করে তুলেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল বুধবার সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা, ২০১৮ এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষ মেলা ২০১৮ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন।
এ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী ৩০ লাখ বীর শহীদের স্মরণে সারাদেশে একযোগে জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৩০ লাখ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিরও উদ্বোধন করেন। দেশে প্রথম বারের মত এই ধরণের কর্মসূচি নেয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার বনের দস্যুতা দূর করার জন্য আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের পুনর্বাসন এবং বনের অপরাধ দমনের উদ্যোগের পাশাপাশি সেখানে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার জন্য সহ-ব্যবস্থাপনা এবং বিকল্প আয়েরও ব্যবস্থা করেছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপমন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড হাছান মাহমুদ বক্তৃতা করেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল্লাহ মহসিন চৌধুরী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন।
তিনি অনুষ্ঠানে পরিবেশ পদক ২০১৮ এর জন্য নির্বাচিত ব্যক্তি ও সংস্থা এবং বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন-২০১৮, বৃক্ষরোপণে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার-২০১৭ ও সামাজিক বনায়নের লভ্যাংশের চেক প্রাপ্তদের মাঝে পদক ও চেক বিতরণ করেন।
 শেখ হাসিনা বলেন, সুন্দরবনের জীব বৈচিত্র্য রক্ষা করা এবং আমাদের গর্ব রয়েলে বেঙ্গল টাইগারের ব্রিডিং পয়েন্ট উন্নত করা এবং এই রয়েল বেঙ্গল টাইগার যাতে সুরক্ষিত হয় তার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছি।
‘৯৬ সালে সরকারে এসেই ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি সম্পাদনের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই পানি চুক্তি করার পর আমরা সুন্দরবনের গড়াই নদী খননের কাজ শুরু করি।
গড়াই নদী খননের ফলে সুন্দরবন অঞ্চলের লবনাক্ততা দূর হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই লবনাক্ততা দূর করা একান্তভাবে প্রয়োজন ছিল। কারণ, এই গড়াই নদীর হোগলা বন এলাকাটিই বাঘের ব্রিডিং পয়েন্ট। গড়াই, সালনাসহ সুন্দরবনের নদীগুলো খননের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, মিঠা পানির স্রোত যত বেশি হবে জলের লবনাক্ততা ততই কমে আসবে। সেজন্যই এই পদক্ষেপ আমরা নিচ্ছি।
সুন্দরবনের অভ্যন্তরে জাতির পিতার ঘাসিয়ার খাল খননের কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই চ্যানেলটি বন্ধ করে পরবর্তীকালে ক্ষমতায় আসা শাসকগণ সেখানে চিংড়ি চাষের প্রকল্প গ্রহণ করে। ফলে জীববৈচিত্রের জন্য সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ এবং ডলফিনের আবাসস্থল সালনা নদীতে জাহাজ চলাচল শুরু হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঘাসিয়ার খালের সঙ্গে সংযুক্ত প্রায় আড়াইশো ছোট ছোট খাল বন্ধ করে শুরু করা চিংড়ি চাষ বন্ধ করে চ্যানেলটি পুনরুদ্ধারে তাঁর সরকারকে বেগ পেতে হয়।
তিনি বলেন, একে একে প্রায় সব খালের মুখ আমরা খুলে দিয়েছি। যেগুলোর মধ্যে ৮০টা এখনও বাকী আছে এবং ঘাসিয়ার খাল পুণর্খনন করে সেখান দিয়েই জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। তাতে জাহাজ চলাচলের সময়ও বেঁচে যাচ্ছে। তা না হলে জাহাজগুলোকে অতিরিক্ত ১৪/১৫ কিলোমিটার ঘুরে সালনা নদী দিয়ে আসতে হত। এখন খুব সহজেই জাহাজগুলো মংলা বন্দরে চলে আসতে পারছে।
পলিথিন ও প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে সকলকে দেশীয় বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত পাটের পলিমার হতে প্রস্তুত পঁচনশীল সোনালী ব্যাগ ব্যবহারের আহবান জানান এবং সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় এবং সংস্থাসমূহকে প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যাগ উৎপাদনে এবং প্রচলনে উদ্যোগী হওয়ার অনুরোধ জানান।
এ বছরের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘আসুন প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করি প্লাস্টিক পুনঃব্যবহার করি, না পারলে বর্জন করি,’ এর আলোকে প্রধানমন্ত্রী প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভাসমূহকে পুনঃব্যবহার এবং পুনঃচক্রায়ন এর উপর অধিকতর গুরুত্বারোপ করার আহবান জানান।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবেলায় তার সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ, পলিসি ডায়ালগ এবং কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে কারো মুখাপেক্ষী না থেকে জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সমস্যা মোকাবেলায় নিজেদেরকেই উদ্যোগী হওয়ার আহবান জানান তিনি।
সরকার প্রধান বলেন, ‘বৈশ্বিক উষ্ণায়নে আমাদের তেমন ভূমিকা নেই। কিন্তু বাংলাদেশেকে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সড়ক, অফিস-আদালত, সরকারি ভবন, পার্ক, নদীর তীর, লেক, খেলার মাঠ, কবরস্থানসহ পতিত, পরিত্যক্ত জমিতে, এমনকি বাড়ীর ছাদে যথাযথ কৌশল অবলম্বন করে সবুজ এলাকার সংখ্যা বাড়ানো যায়।
তিনি বৃক্ষরোপণ করে বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, ‘আসুন, আমরা প্রত্যেকে অন্তত একটি করে বনজ, ফলদ ও ভেষজ গাছের চারা রোপণ করি এবং বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা নির্মাণে এগিয়ে যাই।’
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে, পরিবেশ পদক ২০১৮ এর জন্য নির্বাচিত ব্যক্তি ও সংস্থা এবং বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন-২০১৮, বৃক্ষরোপণে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার-২০১৭ ও সামাজিক বনায়নের লভ্যাংশের চেক গ্রহীতাদের অভিনন্দন জানান।
শিল্প দূষণ রোধ করে আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করে পরিবেশবান্ধব একটি সবুজ অর্থনীতির দেশ গড়ে তোলার এখনই উপযুক্ত সময় বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
এবারের জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০১৮ এর প্রতিপাদ্য ‘সবুজে বাঁচি, সবুজ বাঁচাই, নগর-প্রাণ-প্রকৃতি সাজাই’ এর সঙ্গে কন্ঠ মিলিয়ে শেখ হাসিনা আহবান জানান- ‘আসুন আমরা সবাই মিলে সবুজে-সবুজে দেশটা ভরিয়ে তুলি।’
প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পশ্চিম পার্শ্বে একটি ছাতিম গাছের চারা রোপন করেন।
পরে প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ মেলা এবং বৃক্ষ মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ