ঢাকা, বৃহস্পতিবার 19 July 2018, ৪ শ্রাবণ ১৪২৫, ৫ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক ব্যাধি কমলেও আশঙ্কা রয়েই গেছে

মুহাম্মদ নূরে আলম: বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক ব্যাধি, বর্তমানে দেশে তুলনামূলকভাবে বাল্যবিবাহ কমলেও আশঙ্কা রয়েই গেছে। তবে রংপুর বিভাগে বাল্যবিবাহের হার ৭৬ শতাংশ এবং বরিশাল বিভাগে ৭০ শতাংশ বেড়েছে। এই অবস্থা থেকে উন্নতির জন্য দরকার সমাজের মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন। কিশোরী মায়েরা কম ওজন এবং অপুষ্ট শিশু জন্ম দেন আর কিশোরী বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণে তাদের পড়াশুনা ছেড়ে দিতে হয় পরবর্তীতে তারা কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে নারীর ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে পড়ে এই মায়েরা নিজগৃহে নির্যাতনের শিকার হন অর্থনৈতিক ও সামাজিক এবং পারিবারিকভাবে তাদের সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটে  দেশে গত ৬ মাসে বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে ৮৪ জন অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশু। এছাড়াও  ৬৬ জনের সঙ্গে বাল্যবিয়ের চেষ্টা করা হয়েছে। বাল্য বিবাহের জন্য শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে ১৭১ জনকে। পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে তিনজন। ২০ জনের জোরপূর্বক বিয়ের ঘটনা ঘটেছে। আরও ৬৮টি বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন করা হয়েছে। গত সোমবার প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এই তথ্য জানায়। তবে বাংলাদেশে গত দুই দশকে বাল্যবিবাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে এই সময়ে বাল্যবিবাহের হার শতকরা ৬২ দশমিক ৩ ভাগ থেকে কমে ৪৩ ভাগ হয়েছে ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক আইএফপিআরআই-এর এক গবেষণায় এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে
‘ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিচার্স ইন্সটিটিউট’ আইএফপিআরআই-এর গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৯৬ থেকে ২০১৫ সালে বাংলাদেশে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার ছিল শকরা ১৫ দশমিক ৯ ভাগ, ১৫ থেকে ১৮ বছর ‘বয়সীদের বিয়ের হার ছিল ৪৬ দশমিক ৫ ভাগ সব মিলিয়ে বাল্য বিবাহের হার ছিল শতকরা ৬২ দশমিক ৩ ভাগ আর ২০১৮  সালে এসে ১৫ বছরের কম ‘বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার শকরা ৫ দশমিক ৪ ভাগ, ১৫ থেকে ১৮ বছর ‘বয়সীদের বিয়ের হার ৩৭ দশমিক ৪ ভাগ সব মিলিয়ে বাল্য বিবাহের হার শতকরা ৪৩ দশমিক ২ ভাগ
এই গবেষণা প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে প্রকাশ করা হলো যখন বাংলাদেশ সরকার  বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া ১৮ বছরের আগে মেয়েদের বিবাহ নিষিদ্ধ আইনের খসড়া অনুমোদন করেছে  বাল্যবিবাহ রোধ আইন-২০১৬ এর ওই খসড়ায় বলা হয়েছে মেয়েদের বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স ১৮ বছর তবে পিতা-মাতা ও আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে বিশেষ বিবেচনায় ১৮ বছরের নীচেও বিয়ে বৈধ হবে আর ছেলেদের বিয়ের বয়স ২১ বছর
২০১৫  সালের হাউজহোল্ড সার্ভে করা হয় দেশের সাতটি বিভাগ ঢাকা, বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর ও সিলেটের ৬ হাজার ৫শত পরিবারের কাছ থেকে নেয়া এবং দেশে প্রকাশিত সংবাদপত্রের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় এই গবেষণা  গবেষণায় যে বিষয়টি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে তা হলো, অনিরাপদ মাতৃত্ব বাংলাদেশের গর্ভবর্তী মায়েদের শতকরা ৬০ ভাগই কিশোরী। ফলে সন্তান জন্ম দেয়ার সময় নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়
নারী নেত্রী এবং মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, অনিরাপদ মাতৃত্ব আরো বেড়ে যাবে। তারা কম ওজন এবং এবং অপুষ্ট শিশু জন্ম দেন আর কিশোরী বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণে তাদের পড়াশুনা ছেড়ে দিতে হয় পরবর্তীতে তারা কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে নারীর ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে পড়ে এই মায়েরা নিজগৃহে নির্যাতনের শিকার হন অর্থনৈতিক ও সামাজিক এবং পারিবারিকভাবে তাদের সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটে
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কানিজ হাসিনা বলেন,১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সের মেয়েদের গর্ভধারণ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এই বয়সে গর্ভধারণ নানা শারীরিক জটিলতার সৃষ্টি করে  তা দীর্ঘমেয়াদে মায়ের শরীরের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এর ফলে অপুষ্ট এবং কম ওজনের শিশু জন্ম নেয় ওই শিশু নানান জটিল রোগে আক্রান্ত হয় তাই তাঁর পরামর্শ, ‘‘ওই বয়সে মাতৃত্ব বা গর্ভধারণ কোনোভাবেই উৎসাহিত করা ঠিক না’’বাল্যবিবাহ কমলেও আশঙ্কা রয়েই গেছে।
বিশ্বে বছরে ‘বাল্য বিবাহের’ শিকার ১২ মিলিয়ন শিশু- ইউনিসেফ: সরকারি তথ্যানুযায়ী, ২০১১ সালের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে ৫২ শতাংশ মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হতো। আর সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি বাল্যবিবাহ হয় ভারতে। সেখানে বছরে ২ কোটি ৬৬ লাখ শিশুর বাল্যবিবাহ হচ্ছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ হচ্ছে ৩৯ লাখ ৩০ হাজার শিশুর। বিশ্বে প্রতি বছর অন্তত ১২ মিলিয়ন শিশু ‘বাল্য বিবাহের’ শিকার হয় বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশু তহবিল- ইউনিসেফ। ২০১৮ সালে এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে সংস্থাটি।  পাশাপাশি গত ১০ বছরে দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকায় বাল্যবিবাহের হার প্রায় ২০ শতাংশ কমে এসেছে বলে জানানো হয়। সেই সাথে বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে বিভিন্ন পদক্ষেপের বিষয়ও উঠে আসে ইউনিসেফের  প্রতিবেদনে। এদিকে, ভারত, বাংলাদেশ, চীন, ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া, সুদানসহ আফ্রিকা মহাদেশের অধিকাংশ দেশেই ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ মেয়ের ১৮ বছরের আগেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে হয়। ফলে পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় সেখানে শিশু জন্মের হার অনেকাংশেই বেশি। পাশাপাশি মাথাপিছু আয়, গর্ভকালীন জটিলতায় মাতৃ-মৃত্যুর হার ও অপুষ্টিজনিত শিশুর সংখ্যাও বেশি। ২০১৫ সালে ইউনিসেফের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএসের করা বহুমাত্রিক সূচক নির্ধারণে পরিচালিত গুচ্ছ জরিপ অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৫২ শতাংশ নারীর ১৮ বছর পার হওয়ার আগেই বিয়ে হয়েছে। আর ১৫ বছর পার হওয়ার আগে বিয়ে হয়েছে ১৮ শতাংশের। সরকারিভাবে ৫২ শতাংশকেই বাল্যবিবাহের সর্বশেষ পরিসংখ্যান হিসাবে ধরা হচ্ছে।
বাল্যবিবাহ রোধে পাঁচ চ্যালেঞ্জ: নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ আশাব্যঞ্জক উন্নতি করেছে। কিন্তু এখনও বাল্যবিবাহ রোধে কাঙ্কিত সাফল্য অর্জিত হয়নি। দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি বাল্যবিবাহ সংঘটিত হয় বাংলাদেশে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে এটি রোধে নানা উদ্যোগ গৃহীত হলেও মূলত পাঁচটি কারণে এটি পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। সেগুলো হলো- সিদ্ধান্ত গ্রহণে মেয়েদের মতামতকে কম গুরুত্ব দেয়া, প্রত্যন্ত অঞ্চলে তথ্যপ্রাপ্তির সীমিত সুযোগ, স্থানীয় উন্নয়নে মেয়েদের কম অংশগ্রহণ, পারিবারিক ও সামাজিক বাধা, সর্বোপরি মেয়েদের ভবিষ্যত কর্মসংস্থানের বিষয়টি অভিভাবকগণের বিবেচনায় না আনার প্রবণতা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পাঁচ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারলে বাল্যবিবাহ রোধে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে। গত সোমবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘তারুণ্যের শক্তি : আমরাই পারি বাল্যবিবাহ রুখে দিতে’ প্রকল্পের অভিজ্ঞতা বিনিময় সভায় বিশেষজ্ঞ বক্তারা এ অভিমত ব্যক্ত করেন। ‘গার্লস নট ব্রাইডস’র আয়োজন করে এই সেমিনার। দুই বছর মেয়াদের এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন শেষ হবে ২০১৮ সালের ২৪ জুলাই। প্রকল্পের প্রায় শেষ সময়ে এর কার্যকারিতা ও প্রাপ্ত অভিজ্ঞতাসমূহ তুলে ধরতে এ সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, প্রকল্পটি মূলত প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে মেয়েদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধকরণে ভূমিকা রাখে। এটি বাস্তবায়নে জোটের সচিবালয়ের দায়িত্বপালনকারী সংস্থা ব্র্যাকের নেতৃত্বে সদস্য সংস্থাসমূহ সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকে। রংপুরের মিঠাপুকুর, গঙ্গাচড়া, তারাগঞ্জ, পিরগাছা ও কাউনিয়া এবং বরিশালের আগৈলঝরা, মুলাদি, হিজলা, বাকেরগঞ্জ ও মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ