ঢাকা, বৃহস্পতিবার 19 July 2018, ৪ শ্রাবণ ১৪২৫, ৫ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিশ্বকাপ ফ্রান্সের আবার অভিবাসীদেরও!

অরণ্য আলভী তন্ময় : পাক্কা কুড়ি বছর পর আবারো বিশ্বসেরা দলের খেতাব পেয়েছে ফ্রান্স। ১৯৯৮ সালের পর ২০১৮ তে এসে জিতল দ্বিতীয় শিরোপা। সেখানে ফ্রান্সের খেলোয়াড়দের যেমন তেমন বেশি অবদান হচ্ছে অভিবাসী খেলোয়াড়দের। এবারের বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে থেকেই জানা ছিল ফ্রান্সে অভিবাসী ফুটবলারদের সংখ্যাই বেশি। ফ্রান্সের ২৩ সদস্যের প্রাথমিক দলে ছিলেন ১৭ জন অভিবাসী ফুটবলার। পল পগবা, কিলিয়ান এমবাপ্পে, স্যামুয়েল উমতিতির ধারাবাহিক পারফরম্যান্সেই শিরোপা জয়ের পথ সুগম হয় ফ্রান্সের। ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে চারটি গোলের ম্যাচে আত্মঘাতী ছাড়া অন্য তিনটির মধ্যে দুটি করেছেন পল পগবা ও এমবাপ্পে। পগবার বাবা এসেছেন গিনি থেকে, আর এমবাপ্পের মা আলজেরীয় ও বাবা ক্যামেরুনের। তুর্কি দৈনিক সাবাহর হিসাবে বিশ্বকাপে ফরাসি দলের হয়ে যারা খেলেছেন, তাদের ৭৮ শতাংশই হচ্ছেন অভিবাসী। এই অভিবাসীদের আবার এক-তৃতীয়াংশই মুসলিম। ফাইনালে ফ্রান্সের জয়ের পরে দেশটির অভিবাসন প্রক্রিয়া, বর্ণবিদ্বেষ এবং ইসলামবিরোধী মনোভাবের প্রতি সমালোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের ম্যাধ্যমগুলোয় এ নিয়ে ঝড় চলছে। দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে শিরোপা জিতেছে ফ্রান্স। ১৯৯৮ সালে জিদান জাদুতে বিশ্বকাপ ঘরে তুলেছিল ফ্রান্স। জিদানও ছিলেন আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মুসলিম ফুটবলার। ফাইনালে গোল করা এমবাপ্পে এবং পগবাও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মুসলিম ফুটবলার। তাই শিরোপা জয়ের পর ভিন্ন ধরনের সমালোচনায় ফ্রান্স। বিশেষ করে মুসলমান অভিবাসনের বিরুদ্ধে ইউরোপে বর্তমানে যে রাজনৈতিক হাওয়া উঠেছে, তার সূত্রপাত কিন্তু ফ্রান্সেই মেরি লোপেনের দল ন্যাশনাল ফ্রন্টের উত্থানের মাধ্যমে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রটিতে মুসলমানরা আগে যেসব ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করতেন, সেগুলোর বেশ কয়েকটিই তারা হারিয়েছেন। ফ্রান্সের শিরোপা জয়ের সঙ্গে সঙ্গেই ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় নীতিতে দ্বিচারিতার সমালোচনার ঝড় উঠেছে। অভিবাসীরা এবং মুসলমান তারকারা যে ভূমিকা রেখেছেন, তার আলোকে দেশটির প্রতি অভিবাসননীতি সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন অনেকে। এদের মধ্যে কেউ লিখেছেন, ‘অভিবাসীরা ফ্রান্সকে শক্তিশালী করেছে’, ‘আফ্রিকান এবং মুসলমানরা তোমাকে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছে, তুমি এখন তাদের ন্যায়বিচার দাও’ ইত্যাদি।
ফাইনালে খেলা ক্রোয়েশিয়ার ও নানান ধরনের দল নিয়ে বিশ্বকাপ খেলেছে। মাত্র সাত বছর বয়সে যুদ্ধ ঘরছাড়া করেছিল লুকা মডরিচকে। সার্বিয়ান বাহিনীর গুলি ও বোমা থেকে বাঁচতে মডরিচ আশ্রয় নিয়েছিলেন জাদারের উদ্বাস্তুু শিবিরের হোটেল কলোভারে। সেখানেই কেটেছে আট বছর। যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে উঠে আসেন মডরিচ। রাশিয়া বিশ্বকাপ মডরিচের মতো আরও অনেক উদ্বাস্তুর উত্থানের গল্প লিখেছে। লিখেছে ঘৃণা ও উপেক্ষা জয় করে কী করে লিখতে হয় যুদ্ধবিরোধী ভালোবাসার গল্প। এবারের বিশ্বকাপ উদ্বাস্তুুদের বিশ্বজয়ের স্বপ্নময় অধ্যায়। ফ্রান্স দলের সেরা তরকাদের প্রায় সবাই উদ্বাস্তু। পল পগবা, মাতুইদি, কিলিয়ান এমবাপ্পে, উমতিতি, কান্তে- কেউই জন্মগতভাবে ফ্রান্সের অধিবাসী নন। ১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্স দলে মাত্র দু’জন ছিলেন মূল অধিবাসী। বাকিরা সবাই অভিবাসী। রাশিয়া বিশ্বকাপে অংশ নেয়া ১০টি ইউরোপীয় দলে অভিবাসী খেলোয়াড় ছিলেন ৮৩ জন। তারাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইউরোপের। ফুটবলবিশ্বে ইউরোপের যে আধিপত্য, সেটা অভিবাসী ফুটবলারদের কল্যাণেই। সোনালি প্রজন্মের বেলজিয়াম দলের অন্যতম তারকা রোমেলু লুকাকু। তার শৈশবও কেটেছে উদ্বাস্তু শিবিরে। চরম দারিদ্র্য ও অবহেলা অতিক্রম করে আজ তিনি বিশ্বজয়ী এক ফুটবলার। বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় ফুটবল দলে রয়েছে অভিবাসী ফুটবলারের আধিক্য। সবচেয়ে বেশি ফ্রান্সে। ফ্রান্স জাতীয় দলের ৭৮.৩ শতাংশ ফুটবলার অভিবাসী। সুইজারল্যান্ডের ৬৫.২, বেলজিয়াম ও ইংল্যান্ডের ৪৭.৮, জার্মানির ৩৯.১ ও পর্তুগালের ৩০.৪ শতাংশ ফুটবলার অভিবাসী। স্বদেশ থেকে বিতাড়িত, যুদ্ধতাড়িত প্রজন্মের এই ফুটবলাররা নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিশ্ব ফুটবলে। তাদের পায়ের ছন্দে ছন্দে খেলা করছে ভালোবাসার জয়গান। যুদ্ধের বিপরীতে তারাই রাশিয়ায় লিখেছেন শান্তির মহাকাব্য। যা আলাদা জায়গাই করে দিয়েছে দলটিকে। 
এবার অবশ্য মিলোপা জিতে নিজেদের তৃতীয় শ্রেনীর নাগরিক থেকে উত্থানের চেষ্টায় রয়েছেন তারা। বিশ্বকাপ জেতার পর উৎযাপনটাও হয়েছে দেখার মতো। অবসর কিংবা ঘুমের নয় সময় এখন উৎযাপনের সময়। পগবা ও স্টিভেন এনজোনজি বিশ্বকাপ ট্রফিটি নিয়ে আসলেন। এনগোলো কান্তে ট্রফিটি দেখলেন। স্টিভেন বললেন, নাও ধরো।’ কান্তে বললেন, সত্যিই ধরব!’ স্টিভেন আকাশ থেকে পড়লেন। বিশ্বকাপ জয়ের পরেও লাজুক কান্তে! ট্রফিটি ছুঁয়ে দেখতে কেমন ভারানেকে প্রশ্ন করা হলে বলেন, আমি তো রাতে কোলে নিয়ে ঘুমাব। অ্যান্তোয়েন গ্রিজম্যান বেশ শান্ত। অনেক কেঁদেছেন জয়ের পর। এখন বুঝতে পারছেন বিশ্বকাপের দাবিদার ছিলই। বেরসিক বৃষ্টিও লুজনিকিতে ফ্রান্সের উচ্ছ্বাস রুখতে পারেনি। আগুনের নদী পার হয়ে আসা এই দলটি কি আর ওসবে ভয় পায়! মাঠে ফরাসি, রাশিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্টও ভিজেছেন। তাতে কি। দুটো সেরা দেশের প্রধান তারা। মাঠের পার্টি তো হলো। পগবা, উমতিতি, ডেম্বেলে ও মাতুইয়িদিরা তো থামছেন না। মাঠের সীমানা পার হতেই বিয়ারে বৃষ্টি শুরু হয়। ড্রেসিংরুমে তো ভয়াবহ পরিস্থিতি। অবশ্য এজন্য ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন দায়ী। তিনি ও ক্রোয়েশিয়ার প্রধান কলিন্ডা এই পার্টির উদ্বোধন করেন। আবার ক্রোয়েশিয়ার ড্রেসিং রুমে যান রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ও কলিন্ডা। সে এক আবেগঘন ব্যাপার। ওদিকে প্যারিসে পার্টি শুরু হয়েছে ৪-২ গোলে জয় নিশ্চিত হওয়ার পরই। দিদিয়ার দেশম এসেছিলেন ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে। পগবার নেতৃত্বে দলের সবাই বিয়ার দিয়ে কোচকে গোসলই করিয়ে ছাড়লেন। দেশম এই জোয়ার কি রুখতে পারেন? ডেম্বেলের হাতে বিশাল সাউন্ডবক্স। সেখানে বাজছে, উইলি উইলিয়ামের আলে, আলে, আলে! পগবা যাওয়ার সময় শুধু বলে গেলেন, ফ্রান্সে বড়সড় পার্টি আছে। আমি আর নিজেকে বেঁধে রাখতে পারছি না। ফ্রান্সে নিশ্চয় চ্যাম্পিয়নরা দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে পার্টি করবেন। মিক্সড জোনে সাংবাদিকরা খুব একটা প্রশ্ন করতে পারলেন না। আর যারা কথা বলছেন, উত্তেজনায় থর থর কাঁপছেন। বিশ্বজয় করে এসেছেন একটু আগে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ