ঢাকা, বৃহস্পতিবার 19 July 2018, ৪ শ্রাবণ ১৪২৫, ৫ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিশ্ব ফুটবলে রাশিয়ার অভাবনীয় উত্থান

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : নিজ দেশে প্রথমবারের মতো আয়োজিত বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে রাশিয়া। স্বাগতিক হিসেবেই খেলায় তাদের অন্তর্ভুক্তি। তবে মাঠের খেলায় তারা যে পারফরমেন্স দেখিয়েছে তা কেউ আশাও করতে পারেনি। প্রত্যাশার বাইরে দেশবাসীকে অর্জন এনে দিয়েছে রাশিয়ান ফুটবলাররা। গ্রুপ পর্ব অতিক্রম করাটাই ছিল অস্বাভাবিক এবং প্রথম ঘটনা। এ কারণে এখন রাশিয়াবাসীর কাছে এই ফুটবলরার জাতীয় বীর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। এমনকি দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তিও এই ফুটবলারদের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি মাঠে উপস্থিত থেকে উপভোগ করেছেন, দেখেছেন বীর সেনানিদের লড়াই। বুক চিতিয়ে শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাওয়া। মন্ত্রের সাধন, কিংবা শরীর পাতন এমনটাই যেন রাশিয়ান ফুটবলারদের একমাত্র শপথ ছিল। সেই আপ্ত বাক্যে এবং কোচ চেরচেসভের কঠোর নির্দেশনায় এবার ফুটবলের মাঠে রুশদের উত্থান হয়েছে, রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে যায় স্বাগতিকরা। দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফেবারিট স্পেনকে বিদায় করে রূপকথার জন্ম দেয়। তবে সেই বীরত্ব গাঁথা থেমে গেছে। ক্রোয়েশিয়াকে নির্ধারিত সময়ে রুখে দিতে পারলেও টাইব্রেকারেই শেষ হয়ে গেছে রুশ রূপকথা। বীরত্বের সমাপ্তি ঘটেছে কান্নার বিদায়ে। তবে এই বিশ্বকাপে র‌্যাঙ্কিংয়ে সবার নিচে থেকে, আয়োজক হিসেবে খেলতে নামা রাশিয়া সীমিত কৌশল নিয়েও ইতিহাসের সেরা সাফল্য পেয়েছে। তাই খেলোয়াড়দের এ কান্নার বিদায়েও গর্বিত রাশিয়ার মানুষ। তাদের কাছে এখন ডেনিস চেরিসেভ, আরতেম জিউবা আর ইগর আকিনফিভরা মহানায়ক, বীরসেনানি।
ইউরোপিয়ান ফুটবলের বর্তমান সময়ে চলছে জয়জয়কার। আর বিশ্বকাপের ইতিহাসও লেখা হয়েছে বার বার ইউরোপীয় ফুটবলের জন্যই। ১৯৩০ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ ফুটবল আসর অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম সেই আসরেই ‘অল লাতিন’ ফাইনাল হয়েছিল উরুগুয়ে-আর্জেন্টিনার মধ্যে। পরের বছরই ‘অল ইউরোপিয়ান’ ফাইনালই শুধু নয়, ইউরোপের চারটি দল খেলেছিল সেমিফাইনাল। তবে লাতিন ফুটবল সবসময়ই ইউরোপীয় ফুটবলকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। তবে ইউরোপিয়ানরা বিশ্বকাপ সাফল্যে এগিয়ে। এবার ২১তম বিশ্বকাপ আসর। এর মধ্যে ইউরোপের চারটি দলই শেষ চারে এর আগে পর্যন্ত খেলেছে ৪ বার। ১৯৩৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ আসরে প্রথমবার সেমিতে ওঠে চারটি ইউরোপিয়ান দল। এছাড়া ১৯৬৬, ১৯৮২ ও ২০০৬ সালে একই ঘটনা দেখা গেছে। ১২ বছর পর আবারও ইউরোপের চার দল খেলেছে সেমিফাইনালে। তবে একইসঙ্গে চারটি লাতিন দল কখনোই বিশ্বকাপের শেষ চারে উঠতে পারেনি। এমনকি দুটি লাতিন দলের মধ্যে ফাইনাল শুধুমাত্র ১৯৩০ (উরুগুয়ে-আর্জেন্টিনা) ও ১৯৫০ (উরুগুয়ে-ব্রাজিল) সালেই দেখা গেছে। এর আগে দুটি ইউরোপিয়ান দলের মধ্যে ফাইনাল হয়েছে ৮টি (১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৫৪, ১৯৬৬, ১৯৭৪, ১৯৮২, ২০০৬ ও ২০১০। এবার তৃতীয়বারের মতো দুই ইউরোপের মধ্যকার ফাইনাল দেখলো বিশ্ব। এ কারণেই শিরোপা জেতার দিক থেকে ইউরোপীয় দলই এগিয়ে। লাতিন দেশগুলো শিরোপা জিতেছে ৯ বার, আর ইউরোপিয়ান দেশগুলোর দখলে আছে এবারসহ ১২ শিরোপা। ভবিষ্যতে সেই ব্যবধান নিশ্চিতভাবেই বাড়বে।
তবে এই ইতিহাসে এতদিন রাশিয়ার নামটি ছিল না। এবার বিশ্বকাপে রাশিয়া যে নৈপুণ্য দেখিয়েছে তাতে করে তারাও ইউরোপের একটি শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।অনেকেই অবশ্য বলছেন, স্বাগতিক হিসেবে সরাসরি খেলার সুযোগ পাওয়া রাশিয়া যদি বাছাইয়ে অংশ নিত সেক্ষেত্রে হয়ত ইউরোপের এত কঠিন ও শক্তিধর দলের বিপক্ষে জিতে মূল পর্বেই আসতে পারত না। সেটা তো সাম্প্রতিক ফর্ম, দল হিসেবে রাশিয়ার অবস্থানই প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট। কিন্তু গ্রুপ পর্ব থেকেই এবার রাশিয়া ছিল দুরন্ত। নকআউট পর্বে প্রথমবার উঠেও নজর কাড়ে তারা, শেষ হয়নি অগ্রগামিতা বরং রচিত হয়েছে আরেকটি বীরত্বের ইতিহাস।
২০১০ সালের চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে বিদায় করে দেয়াটাই ছিল সবচেয়ে বিস্ময়কর সাফল্য রাশিয়ার জন্য। তবে গ্রুপ পর্বে দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব অতিক্রম করাটাও সবাইকে অবাক করে দিয়েছিল। স্বাগতিক হিসেবে অবশ্য সেটাকে তেমন অস্বাভাবিক ভাবতে পারেননি কেউ। কিন্তু স্পেনের মতো শক্তিশালী একটি দলকে টাইব্রেকারের স্নায়ুচাপে বিদায় করে দেয়াটা রীতিমতো সাড়া ফেলে দেয়। এমনকি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনও দল দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে স্পেনের মুখোমুখি হওয়ার আগে এক বার্তায় কোচ চেরচেসভকে বলেছিলেন, ‘এখন ফলাফল যেমনই হোক এই দলটিকে কেউ বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারবে না।’ সত্যিই বিষয়টা তেমনই। অপ্রত্যাশিত সাফল্য পাওয়া রাশিয়ানদের নিয়ে সবাই ছিলেন সন্তুষ্ট। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালেও ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে দুরন্ত নৈপুণ্য দেখানো দলটির জন্য বিস্ময়কর ঘটনাই।
কারণ, এবার অংশগ্রহণকারী ৩২ দলের মধ্যে র‌্যাঙ্কিংয়ে সবচেয়ে পিছিয়ে রাশিয়ার অবস্থান ৭০ নম্বরে। খুব সম্ভব বাছাই পর্ব খেলতে হলে এই মঞ্চেই হয়তো ঠাঁই পাওয়া হতো না তাদের। কিন্তু এখন তারা বুঝিয়ে দিল কোনক্রমেই অন্য দলগুলোর চেয়ে নৈপুণ্যে পিছিয়ে নেই রাশিয়া। ১৯৬৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন হিসেবে নিজেদের সেরা সাফল্য ছিল চতুর্থ স্থানে থেকে বিশ্বকাপ শেষ করা। ৭ বার সোভিয়েত ইউনিয়ন হিসেবে খেলেছে তারা। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে ১৯৯৪ সালে রাশিয়া প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মোট তিন বিশ্বকাপ খেলে গ্রুপ পর্ব থেকেই একেবারে নাজেহাল অবস্থায় বিদায় নিতে হয়েছিল। কিন্তু এবার সেই ভাগ্য বরণ করেনি রাশিয়া। খর্বশক্তিমত্তার দল হলেও নিজেদের সামর্থ্যরে প্রমাণটা ভালভাবেই দিয়েছে তারা।
বিশেষ করে, টাইব্রেকার নামের ভাগ্য পরীক্ষাটি স্নায়ুর ওপরে প্রচন্ড এক চাপ, সেই সঙ্গে প্রত্যাশার চাপের মধ্যে আছে দর্শকদের কামনা, চিৎকার, সমর্থনের বিষয়টি। সেখানেই অভিজ্ঞতম স্পেনের স্বপ্নের অপমৃত্যু হয়েছিল। রাশিয়ার খেলোয়াড়দের সাহস বাড়িয়েছে দর্শকদের পূর্ণ সমর্থন, শক্তি জুগিয়েছে নিখুঁত শটে। আর দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তিটির ইতিবাচক মন্তব্যই খেলোয়াড়দের জন্য ছিল অনেক বড় শক্তির উৎস। তাই তো ইতিহাস রচিত হলো অনুপ্রাণিত দলটির মাধ্যমে।
রাশিয়া আগে তিনবার বিশ্বকাপ খেলে দ্বিতীয় রাউন্ডেই উঠতে পারেনি। কিন্তু এবার নিজেদের চেয়ে শক্তিধর এবং শিরোপা জয়ের অন্যতম ফেবারিট স্পেনকে বিস্ময়করভাবে বিদায় করে দিয়ে রাশিয়াবাসীকে বিশ্বকাপ উন্মাদনায় বুঁদ হয়ে থাকার উপলক্ষ্যও দিয়েছিল। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে একই পথে যাচ্ছিল ফলাফল। প্রথমেই গোল করে এগিয়ে গেলেও নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ হয়ে যায় ১-১ গোলে। অতিরিক্ত সময়ের প্রথম ধাপে এগিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া। তখন উপস্থিত হাজার হাজার রাশিয়ান স্তব্ধ হয়ে যান। কিন্তু চেরচেসভ বার বার গ্যালারির দিকে হাত উঁচিয়ে নিজের শিষ্যদের অনপ্রাণিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার সেই প্রচেষ্টা সফল হয়েছে অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় ভাগে। সমতা ফিরিয়ে টাইব্রেকার নামের ভাগ্য পরীক্ষায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু গোলরক্ষকের দৃঢ়তা এবং বড় দল হিসেবে চাপ নেয়ার ক্ষমতাকে পুঁজি করেই এবার রাশিয়ার উৎসব থামিয়ে দিতে পেরেছে ক্রোয়েশিয়া। খেলোয়াড়রা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছেন ও ৪৫ হাজার রাশিয়ান দর্শক নীরব, স্তব্ধ হয়ে গেছেন। কিন্তু পরে রাশিয়া ফুটবল দলের পক্ষ থেকে এক টুইটে বলা হয়েছে, ‘আমরা টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিচ্ছি চোখে অশ্রু নিয়ে, কিন্তু আমাদের মাথা উঁচুই থাকবে।’ জাতির কাছে এখন বীর সেনানি হয়ে গেছেন তারা। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমও সেটা নিয়ে এখন মাতামাতি করছে। এক বহুল প্রচারিত দৈনিকে শিরোনাম করা হয়েছে, ‘আমাদের হৃদয়ের চ্যাম্পিয়ন!’ ফুটবল বোদ্ধারা বলছেন, এবার স্বাগতিক হিসেবে রাশিয়ার যেভাবে উত্থান ঘটেছে সেটি কাতার বিশ্বকাপেও দেখা যাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ