ঢাকা, বৃহস্পতিবার 19 July 2018, ৪ শ্রাবণ ১৪২৫, ৫ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ক্রোয়েশিয়া দলের দেশে বিচিত্র অভিজ্ঞতা

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : বিশ্বকাপ জয়ের খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছে ক্রোয়েশিয়া। ফাইনালে গতিময় ফুটবল খেলেও কাপটা জিততে পারেনি তারা। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ আর প্রতিপক্ষকে বেশিরভাগ সময় চাপে রাখা। এ তিন কৌশলই ছিল এবারের বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার অস্ত্র। যা দিয়েই গ্রুপ পর্ব থেকে দুর্দান্ত গতিতে পথ চলছিল জলাতকো ডালিচের শিষ্যরা। আর্জেন্টিনা, ডেনমার্ক, রাশিয়া ও ইংল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ক্রোয়েটরা পৌঁছেও গিয়েছিল স্বপ্নের ফাইনালে। কিন্তু সুযোগ এসেও অধরাই থেকে গেল বিশ্বকাপ শিরোপা। তারপরও দেশটির নতুন প্রজন্ম নান্দনিক ফুটবলে সবার মন কেঁড়ে নিয়েছে। যা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বহু দিন। ফাইনালে ওঠার পর থেকেই ক্রোয়েশিয়া সমর্থকদের প্রত্যাশার পরদ বেড়ে গিয়েছিল অনেক। তারা হয়তো ধরেই নিয়েছিল এবারের বিশ্বকাপে চমক জাগানিয়া দলটির হাতে উঠবে ট্রফি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও তার প্রতিফলন ছিল। কিন্তু সাফল্য তো আর আবেগ-অনুভূতি, যুক্তির মাধ্যমে আসে না। সে জন্য দরকার শক্তি, দক্ষতা আর নৈপূণ্যের। রবিবার মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ফ্রান্সের কাছে এ তিন জায়গায় ম্যাচের মাঝে পেছনে পড়ে দালিচের শিষ্যরা। যে কারণে স্বপ্নের ট্রফি ছুঁতে পারেননি লুকা মদ্রিচের দল। তবুও ভক্তদের মন জয় করে নিয়েছেন ইভান রাকিটিচরা। তবে বিশ্বকাপ জিতে নিজ দেশে অনেক পরিবর্তন আনতে পেরেছেন তারা। অর্থনৈতিক সংকটই শুধু নয়, দুর্নীতি পেছনে ঠেলে দিয়েছিল ফুটবলকে। সেই অবস্থা থেকে ফাইনালে উঠে এসে মডরিচ-রাকিতিচরা নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছেন ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলকে। ক্রোয়েশিয়া ফুটবলের দুর্নীতি নিয়ে কয়েক মাস আগে আদালতে মামলা হয়। মামলায় ফেঁসে গিয়েছিলেন দেশটির সবচেয়ে নামি ক্লাব ডায়নামো জাগরেবের সভাপতি দ্রাভকো মামিচ। বিপুল পরিমাণ আয়কর ফাঁকি দিয়েছেন তিনি। মামিচের ক্লাব থেকে যেসব ফুটবলার ইউরোপের বিভিন্ন নামিদামি ক্লাবে যেতেন, তাদের ট্রান্সফার ফি থেকে বিশাল অঙ্কের অর্থ পেতেন মামিচ। সেই আয় লুকিয়ে ফেঁসে যান তিনি। অবস্থা বেগতিক দেখে প্রতিবেশী দেশ বসনিয়া-হার্জেগভেনিয়ায় পালিয়ে যান। সেখানেই আছেন তিনি। মামিচের মামলায় কিছুটা কলঙ্কিত হয়েছিলেন লুকা মডরিচও। এখন তাকে দেশের সেরা ফুটবলার বলা হলেও সেসময় তার ছবিতেই কালি মাখা হয়েছিল। কী করেছিলেন মডরিচ? মামিচের মামলায় সাক্ষী দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ট্রান্সফার মূল্য থেকে মামিচের লাভ করার ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। এতেই চটেছিলেন দেশের ফুটবলভক্তরা। তাদের দাবি, ভাবমূর্তি ঠিক রাখতেই সত্য গোপন করেছেন মডরিচ। এই অভিযোগে তখন সারা দেশে বিদ্রুপের মুখেও পড়েছিলেন রিয়াল তারকা।
বিশ্বকাপে একধাপ করে এগিয়েছে ক্রোয়েশিয়া আর দেশের মানুষ একটু একটু করে ভুলে গেছে কলঙ্কের কথা। সবাই মেতে উঠছে উৎসবে। পরিস্থিতি অনেকটাই ২০০৬ সালের ইতালির মতো। তখন সেদেশের সেরা ক্লাব জুভেন্টাস গড়াপেটায় জড়িয়ে অবনমনের শাস্তি পেয়েছিল। সেবারই আবার সবাইকে অবাক করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইতালি। দলের সাফল্য উদযাপনে দেদার খরচ করছেন ক্রোয়েশিয়ানরা। ঢিমেতালে চলা দেশের অর্থনীতিতে গতি এনেছে বিশ্বকাপ সময়ের বেচাকেনা। বিশ্বকাপ চলাকালীন অবশ্য ক্রোয়েশিয়ার অর্থনীতি লাভের মুখ দেখে দু-তিনটি ক্ষেত্রে। এ সময় বিয়ারের বিক্রি বেড়েছে অনেকটা। সেইসঙ্গে বিক্রি বেড়েছে চিপস ও টেলিভিশনের। তবে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠার আগে অনেক সমস্যার মুখে ছিল দলটি। মাঠে উপস্থিত থেকে দেশটির প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন দর্শকের ভুমিকায়। কিন্তু দেশে তাদের অবস্থা তেমন একটা ভাল নয়। ক্রোয়েশিয়ায় এত খেলোয়াড় থাকতে বিশ্বকাপে জয়-পরাজয় নির্ধারক পেনাল্টি মিস করতে হলো লুকা মডরিচকে! ১লা জুলাই ডেনমার্কের সঙ্গে নকআউট পর্বের প্রথম ম্যাচে পেনাল্টি পেয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া। তখন ১-১ গোলে সমতায় ছিল দু’দল। ওই পেনাল্টিতে গোল দিতে পারলেই হয়তো জয় পেয়ে যেত ক্রোয়েশিয়া। কেননা খেলা চলছিল তখন অতিরিক্ত সময়ের; বাকিও ছিল মাত্র ৪ মিনিট। পরে অবশ্য টাইব্রেকারে ম্যাচটি জিতে ক্রোয়েশিয়া। এ ধরনের অন্তিম মুহূর্তে কোনো খেলোয়াড় যদি পেনাল্টি মিস করে বসেন, তখন সচরাচর ভক্তরা হতাশ হন। তবে কিছুক্ষণ বাদেই ওই খেলোয়াড়ের জন্য সহানুভূতির জন্ম নেয়। তবে লুকা মদ্রিচের ব্যাপারটা ছিল একেবারে ভিন্ন। দলের ক্যাপটেন তিনি। ক্লাবে তিনি খেলেন বর্তমানের ও ইতিহাসের অন্যতম সেরা ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে। তাকে ভাবা হয় বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হিসেবে। আর ক্রোয়েশিয়া এখন খেলবে সেমিফাইনাল। ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম দলটি বিশ্বকাপে এত ভালো করছে। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে গিয়ে বা চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রাক্তন রেকর্ড ভাঙার সুযোগ তো আছেই। সেই হিসেবে ক্রোয়েশিয়ায় মদ্রিচদের পাওয়ার কথা ছিল নায়কোচিত মর্যাদা। এমনকি ২০ বছর আগের ওই বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের নায়কেরা ক্রোয়েশিয়ায় এখনও আইকনের মর্যাদা পান। অথচ, বর্তমান বিশ্বকাপ দলের অনেক সদস্য, বিশেষ করে মদ্রিচ, দেশে যতটা না ভালোবাসার পাত্র, তার চেয়ে বেশি ঘৃণিত! ফরেইন পলিসি ম্যাগাজিনের নিবন্ধে উঠে এসেছে এই কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য। এতে বলা হয়, ভক্তদের ক্রোধের মূল লক্ষ্যবস্তু হলেন দ্রাভকো মামিচ। তিনি ক্রোয়েশিয়ান ক্রীড়াঙ্গনে একসময় সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও বৈচিত্র্যময় ব্যক্তিত্বদের অন্যতম ছিলেন। এই বছরের জুন মাসে একটি প্রতারণার মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন মামিচ। ওই মামলার সঙ্গে মদ্রিচেরও সম্পর্ক ছিল। ২০০৮ সালে স্থানীয় ক্লাব ডায়নামো জাগরেভ থেকে বৃটিশ ক্লাব টটেনহ্যাম হটস্পারে মদ্রিচের দলবদল এবং ২০১০ সালে ডায়নামো থেকে ফ্রান্সের অলিম্পিক লিয়োনাসে দেজান লভরেনের দলবদলই ছিল ওই মামলার মূল ইস্যু। সমস্যাটা হলো, দ্রাভকো মামিচ একাধারে ডায়নামো জাগরেভের প্রধান নির্বাহী ছিলেন, আবার মদ্রিচ ও লভরেনের এজেন্টও ছিলেন! স্বাভাবিকভাবেই তার এই দুই ভূমিকা পরস্পরবিরোধী। অভিযোগ উঠে, ওই দুই দলবদল থেকে অঢেল অর্থের ভাগ পেয়েছেন মামিচ। মামিচের বিরুদ্ধে মূলত অভিযোগ ছিল যে, ডায়নামো জাগরেভ থেকে খেলোয়াড়দের দলবদল করিয়ে তিনি অবৈধভাবে ব্যক্তিগত লাভ ঘরে তুলেছেন। এখানে সমস্যাটা হলো, ডায়নামো কোনো ব্যক্তি-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান নয়। এর মালিক হলো ভক্তরা! অনেকটা সমিতির মতো চলে এই ক্লাব। মামিচ এখানে যেই কাজটা করেছেন সেটা হলো, তিনি ক্রোয়েশিয়ান তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল খেলোয়াড়দের বিদেশি ক্লাবে চুক্তি পাইয়ে দিতে সহায়তা করতেন। বিনিময়ে তিনি ওই খেলোয়াড়দের প্রাপ্য অর্থ বা বেতন থেকে অর্ধেক অর্থ নিতেন! কিন্তু তিনি নিজে একটি ক্লাবের কর্তা; তার ভূমিকা হওয়া উচিত ছিল, তিনি নিজ ক্লাবের স্বার্থ দেখবেন। অথচ, তিনি ব্যক্তিগত লাভের জন্য ক্লাবের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে খেলোয়াড়দের বেচতে সহায়তা করতেন। এজন্যই প্রতারণা ও বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে। মমিচের বিচার প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্যও দিয়েছিলেন মদ্রিচ।
নিজের দেওয়া সাক্ষ্যে মদ্রিচ প্রথমে বলেছিলেন, মামিচের ছেলে বা ভাইকে নিয়ে তিনি ব্যাংকে যেতেন; আর নিজের হাতে লাখ লাখ ডলার উত্তোলন করে তা নগদে তাদের হাতে তুলে দিতেন। এই পর্যন্ত ঠিক ছিল। ভক্তরা বরং এক প্রভাবশালী ফুটবল কর্তার শোষণের শিকার হওয়ায় মদ্রিচ ও লভরেনের প্রতি সহানুভূতিশীলই ছিলেন। কিন্তু সমস্যাটা হলো, পরে মামিচের বিরুদ্ধে দেওয়া এই বক্তব্য থেকে সরে আসেন তারা! তখনই মুহূর্তেই ভীষণ অজনপ্রিয় হয়ে যান মদ্রিচ ও লভরেন। কারণ, মামিচ তখন দেশের প্রায় প্রত্যেক ফুটবল ভক্তের কাছে ঘৃণিত। আর মদ্রিচ ও লভরেন কিনা তাকে রক্ষা করতেই বক্তব্য পালটে ফেলেছেন! টেলিভিশনে সম্প্রচারিত শুনানিতে দেখা যায়, বিচারক প্রথমে মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী মদ্রিচকে তার পূর্বতন বিবৃতি দেখান। ওই বিবৃতিতে মামিচের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন মদ্রিচ। কিন্তু সেদিন আদালতের সামনে আমতা আমতা করে নিজের পুরোনো বক্তব্য থেকে সরে আসেন মদ্রিচ। এটি ছিল ২০১৭ সালের ঘটনা। এরপর মদ্রিচ ও লভরেনের বিরুদ্ধে মিথ্যা বিবৃতি দেওয়ার অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়। ভাবা হয়, একজন ঘৃণিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে বাঁচাতেই তারা মিথ্যা বলছেন। এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া হয় ভয়াবহ। যাদারে একটি হোটেলে নব্বইয়ের দশকে শরণার্থী হিসেবে থাকতে হয়েছিল মদ্রিচের পরিবারকে। সেই হোটেলের দেওয়ালে কেউ একজন লিখে যায়, ‘লুকা (মদ্রিচের ডাক নাম), এই একটা দিন তোমার অনেকদিন মনে থাকবে।’ ডায়নামো জাগরেভ দলের চিরপ্রতিদ্বন্ধী হাজদুক স্লিট দলের ভক্তরা মদ্রিচ-বিরোধী শ্লোগানও তোলে! যদিও মদ্রিচ ডায়নামো ছেড়েছেন এক দশক আগে, আর এখন খেলেন বিদেশের এক ক্লাবে! মূলত, মামিচকে দমানোর সুযোগ নষ্ট করে দেওয়ায় মদ্রিচের ওপর এত ক্ষোভ ভক্তদের। তবে মদ্রিচের পল্টি সত্ত্বেও, মামিচকে সাড়ে ছয় বছরের কারাদন্ড দেয় একটি আদালত। মামিচের ভাই জোরান, যিনি নিজেও ডায়নামোর সাবেক খেলোয়াড় ও কোচ, পান ৫ বছরের সাজা। তবে মামিচ রায় ঘোষণার আগেই পালিয়ে যান প্রতিবেশী দেশ বসনিয়া ও হার্জেগোভেনিয়ায়।  ফুটবল ক্রোয়েশিয়ায় স্রেফ একটি খেলা নয়, বরং ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আর মামিচ কেবল একজন ক্রীড়া নির্বাহীই ছিলেন না। ডায়নামো জাগরেভের প্রধান নির্বাহী হিসেবে তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক ও উঠাবসা ছিল বিচারক, রাজনীতিক, গণমাধ্যম প্রধান ও পুলিশের সঙ্গে। আর ডায়নামো জাগরেভ এতটাই ক্ষমতার কেন্দ্রের নিকটে ছিল, এটি অনেক সময় ছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও মনোভাবের প্রতীক। ফলে এটি আর দশটা সাদামাটা ফুটবল ক্লাব ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্শাল টিটো যখন যুগোস্লাভিয়াকে ঐক্যবদ্ধ করলেন, তখন ডায়নামোর সঙ্গে সার্বিয়ার বেলগ্রেড-ভিত্তিক রেড স্টার ও পার্টিজান দলের খেলা ছিল ভয়াবহ জাতীয়তাবাদী বৈরিতার বিষয়। ফুটবল মাঠে যদিও এসব বিষয়ের গুরুত্ব নেই তবে তা ঠিকই আলাদা জায়গা করে নিয়েছে ক্রোয়েশিয়ায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ