ঢাকা, শুক্রবার 20 July 2018, ৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ৬ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নাজিব ওয়াদুদের গল্প ও শিল্পচৈতন্য

তিতুমীর ঋষভ : প্রাগ-ঐতিহাসিক প্রচলন ও প্রথাকে প্রকর্ষতার প্রকাশে অধুনা বিশ্বের কাছে পরিচিত করবার কালোত্তীর্ণ দায়িত্বটি কাঁধে নিয়ে থাকেন কথাশিল্পীরা। সেই দায়িত্ববোধের চেতনা নিয়ে বিংশ শতকের শেষ দিকে আবির্ভাব গল্পকার নাজিব ওয়াদুদের (জন্ম ২০ জুলাই ১৯৬১)। গল্পের ভূবনে কাকচক্ষু জলের মতো দীঘি ছাড়িয়ে কোরাল কোরাসের কীর্তিমান সমুদ্র আর উজ্জ্বয়নী ফেনিল ঢেউয়ের এক সম্মোহনী তট নিয়ে হাজির হলেন তিনি ‘কাক ও কারফিউ’ হাতে নিয়ে। সালতামামির শিরায়ত হীরক মুকুটে তখন খোদিত ১৯৯৮ সাল। মনে হয় শিলোঞ্ছ সংসারের সবুজ মাঠ থেকে তিনি সোনালী শস্য খুটে খুটে তুলে এনেছেন গল্পে।

প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘কাক ও কারফিউ’ র ক্ষেত্র যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছে তাকে কোনও ভাবেই ভ্যানগগ, মুকবুল ফিদা হুসেন কিংবা এস.এম. সুলতানের চিত্রশিল্প থেকে আলাদা করা যায় না। গ্রামীণ জীবনের জৈবিক সাংঘর্ষিক গূঢ়তা, মাটি ও মানুষের ভেতরের সূক্ষ্মতা, আত্মশ্লাঘার সমাবর্তনীয় সনদ কিংবা নর-নারীর কামজ কামনার কোলাজ কলাপসিবল আকারে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর গল্পে। গ্রন্থের প্রথম গল্প ‘কাক’ ১৯৮৯ সালে প্রকাশ পায়, যখন জাতির প্রত্যাশার আকাশে নানা রকম অপ্রাপ্তি আর হতাশার বীজ দানা বেঁধে একটু একটু করে ’৯০-এর গণ অভ্যুত্থানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। স্বৈরাচারী শাসকের শোষণ নিপীড়নের প্রেক্ষাপটটি গল্পের প্রধান চরিত্র বুড়ির আত্মকথনের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। নারী-লোলুপ জফির গল্পে স্বৈরাচারী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এ গল্পে যেমন উৎপ্রাস দেখানো হয়েছে ছোট ছোট বিষয় নিয়ে, তেমনি উৎপ্রেক্ষাও এসেছে- ‘খিচুড়ির খোশবু ছুটছে বাতাসে। মাঝে মধ্যে নাক দিয়ে গলা বেয়ে পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে পড়ে’। আর উপমার ব্যবহারের মুন্সিয়ানা মোকাম্মেল রাখতে পেরেছেন তাঁর প্রতিটি গল্পে-‘বুড়ির শুকনো বাদামের মতো ঠসঠসে শরীরেও ঘামের তরল আঠা’, অথবা ‘আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ গাঢ় নীলে কাশফুলের গোছার মতো ভাসছে’। 

মোট আটটি গল্পের সংকলনে পুরো গ্রন্থটি জুড়েই রয়েছে গ্রামীণ জীবনযাত্রার জোয়ার-ভাটা, আর নিত্যকার রোজনামচা একেবারে আঞ্চলিক ভাষায় উঠে এসেছে এবং এখানেই গল্পকারের জটিল ভাষা থেকে সরে আসার স্বতঃসিদ্ধ প্রবণতা ((Axiom propensity) লক্ষ করা যায়। 

দ্বিতীয় গল্প ‘মেঘ ভাঙা রোদ’, যে গল্পে লেখক তৎকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে অন্তরে যে স্বাধীনতার সাজুয্য এসে সামিল হয়েছিল তাই তুলে ধরেছেন গল্পের প্রধান চরিত্র রমিজের মাধ্যমে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আত্মরক্ষা ও পররক্ষার দোলাচলে দুলিত মানুষের অবস্থা কেমন হয় এ গল্পে তারই দেখা মেলে। নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে তারপর অন্যের প্রাণ রক্ষার্থে রমিজ প্রাণপণ চেষ্টা করে কিন্তু মা আর অর্ধাঙ্গিণীকে রক্ষা করতে পারেনি, অপর দিকে রমিজের পিতা তমিজুদ্দীনের চরিত্রের মাধ্যমে পরিস্থিতির শিকার একটা অবস্থা যে ঘৃণ্যতার অনলে কতোটা পোড়াতে পারে তা এখানে অসাধারণ শিল্পগুণে ফুটে উঠেছে। তৎকালীন রাজনীতির অঙ্গার এ গল্পে কিছুটা আঁচর কাটলেও লেখক রমিজের প্রতিবাদ প্রজ্ঞার দিকে জোর দিয়ে স্বাধীনতাকেই সামনে নিয়ে আসতে চেয়েছেন। 

এরপর অনুগল্পের আকারে ‘অন্ধগলি’ এসেছে। সেখানেও মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টায় গল্পাকার আপন রক্ত বেচা টাকা নিয়ে অন্ধগলির ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছেন। গল্পকারের শিল্পবোধ, ইনটেলেকচুয়াল প্রকাশভঙ্গি ও সর্বোপরি প্রকাশে রুর‌্যাল প্যাটার্ন উপাখ্যানের রৈখিক প্লটকে জৈবনিক সূত্রে গল্পে গেঁথে দিয়েছেন। গল্পের চরিত্র পরিক্রমায় গ্রামীণ প্রতিচ্ছবি ঘুরে ঘুরে আসার প্রপেনসিটি গল্পকে অনেক বেশি হৃদয়গ্রাহী করেছে। এখানে কথাশিল্পী জীবনের যান্ত্রিকতা থেকে অনেক দূরে সরে এসে প্রকৃতির সাথে মানুষকে অনেক বেশি জীবন্ত করে তুলেছেন। 

‘মাররে লাথি ভাঙরে তালা স্বৈরাচারের বন্দিশালা’ কিংবা ‘স্বৈরাচারের গদিতে আগুন জ্বালো এক সাথে’ অথবা ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ এমনসব সংগ্রামী সংলাপের মধ্য দিয়ে ‘কারফিউ’ গল্পের ভিত ছাওয়া হয়েছে। শক্তিমান লেখক আবু রূশদ-এর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠালগ্নকে কেন্দ্র করে রচিত ‘নোঙর’-এর মতো বিদগ্ধ, বুদ্ধিযোগি সুচারু শিল্পীসত্তার অধিকারী সাহিত্যিক নাজিব ওয়াদুদও বাংলাদেশে গণতন্ত্রের মুক্তির প্রাক্কালে কারফিউকে দেখিয়েছেন। স্বৈরতন্ত্রের ধ্বংস এবং গণতন্ত্রের মুক্তির স্ফুরণ গল্পের পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সখিনার জীবনে কারফিউ ভাঙার ভাষ্য ভুবনজোড়া আঙরণে এখানে ফুটে উঠেছে। ‘পরনে তেনা শাড়ি, ব্লাউজহীন অঙ্গে নখের আঁচড়, কচি ঠোঁটে পীড়নের বিষ’ এসব যন্ত্রণা ছাড়িয়ে এ পৃথিবীর নাগালের বাইরে যেতে চেয়েছিলো সখিনা কিন্তু মানুষ সে, তাই পারে না। আধুনিক জীবনা রায় গণতন্ত্রের মুক্ত বাতাস লাগলেও কোথায় যেন এখনো গণতন্ত্র অবরুদ্ধ হয়ে আছে, যে অবরুদ্ধ দেয়াল ভাঙার প্রয়াস সখিনার অসচেতন কিন্তু স্বাভাবিক মানবিক চেতনায় উৎসারিত হয়েছে। 

গ্রাম্য উপজীব্যতার ভেতর দিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন ‘পদ্মা নদীর মাঝি’কে কথার শিল্পতরীতে ভাসিয়েছেন তেমনি গল্পকার নাজিব ওয়াদুদও খানিকটা একই ধারার আলেখ্য আলোচনায় রাজনীতির মতানৈক্য দ্বন্দ্ব থেকে সরে এসে মুক্ত চেতনাকে প্রতিষ্ঠা দেবার লক্ষ্যে রোকন-মিলির পড়–য়া চরিত্রের অবতারণা করেছেন ‘বৃত্ত’ নামক গল্পে। 

ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবোধের চেয়ে শিল্পী শরৎচন্দ্রের কাছে যেমন সমাজ প্রাধান্য পেয়েছে উপন্যাসের মৌল উপজীব্য বিষয় হিসেবে,  সামাজিক অত্যাচার ও উৎপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের রূপ দেখা দিয়েছে, হাসান হাফিজুর রহমান যেমন পল্লীর নিরন্ন মানুষের জীবনযাপনের কথা উঠিয়ে এনেছেন, তেমনি ‘কাক ও কারফিউ’ গ্রন্থে গল্পের আধার সৃষ্টি হয়েছে ‘পিছুটান’ গল্পে, দরিদ্র নিম্নবিত্ত পরিবারের কৃষিকাজের ভেতর দিয়ে জীবিকা নির্বাহের কথা এসেছে। ছোটগল্পের মধ্যে জীবনের অনেক গল্প তিনি ম্যাগনিফাইড করে দেখিয়েছেন নিঃসন্দেহে তা সূক্ষ্ম  (Acute)  ও সর্বজনগ্রাহ্য (অফসরংংরনষব)।

সাতচল্লিশ পরবর্তী সময়ে বাংলা গল্প ও উপন্যাস অঙ্গনে উঠে এসেছে একটা ভগ্ন, অভাবকাতুরে সাংঘর্ষিক সমাজের চিত্র। তবে প্রায় সব লেখকই মধ্যবিত্ত জীবনের জটিলতাকে শিল্পব্যক্তিত্বের বৈভবে, বীক্ষণিক কৌশলে, কার্যকর সূত্রে বাঁধবার সঞ্জীবনী প্রয়াস চালিয়েছেন, কিন্তু সে জীবনের মধ্যে থেকে যিনি বর্ণব্যঞ্জনায় জীবনের দার্শনিক অনুষঙ্গকে আলুলায়িত করতে পেরেছেন, শিল্পের বাতাবরণে তিনিই মার্জিত ও মননঋদ্ধ কথাকার হিসেবে অমর হয়ে থাকবেন। নাজিব ওয়াদুদ পরিশীলিতভাবে সেই পথে উদ্ভাসিত হয়েছেন। রাজনৈতিক, সামাজিক ও জীবনঘনিষ্ঠ বিমূর্ত ছবিগুলোকে তিনি তার গল্পে মূর্ত(concrete) করে তুলেছেন বিচক্ষণ ক্ষমতায়। গল্পের যে সনাতন প্রথাÑ প্রতিটি চরিত্রকে চিরে তার ভেতর থেকে অর্ন্তনিহিত রস বের করে আনাÑ সে কিন্তু নাজিব ওয়াদুদ তার প্রথম গল্পগ্রন্থে, দু’একটি বাদ দিলে, পুরোমাত্রায় আনতে পেরেছেন এবং বলা যায় সেগুলো সার্থক ছোটগল্প।

দেশ বিভাগোত্তর বাংলাদেশে যখন ধর্ম রাজনীতি আর কুসংস্কারের বিতল চট্টান মেঘ পুরো আকাশকে একটু একটু করে গ্রাস করছে তখনকার জীবনব্যবস্থায় তা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে যে সমাজকে তা হলো নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্ত সমাজ। মধ্যবিত্ত জীবনের গল্প নিয়ে একজন প্রচারবিমুখ কথাশিল্পী আনিস চৌধুরী ‘প্রশ্ন জাগে’ (১৯৫১) তে যে আমেজ এবং ইমেজ তুলে ধরেছেন তারই বিদগ্ধ হাওয়া বয়ে গেছে নাজির ওয়াদুদের ‘বাঁচামরা’ কিংবা ‘পিছুটান’ গল্পের ওপর দিয়ে। গল্পে হামেদ আলী সবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় জীবনের যন্ত্রণা কেমন। এখানে হামেদ আলী অথবা ‘ভগ্নযাত্রা’র নওয়াব আলী প্রত্যেকেই আলোড়ক //(Stirrer)/ হয়ে গল্পে কাজ করেছে। সমাজের শ্রেণীস্তর   যখন যুগে যুগে জাতিসত্তার অন্তরিত গভীরে অনুচ্চারিত হয়ে ব্যাদান বর্মের আঘাত সৃষ্টি করে তখনই লেখকের অজান্তেই কলমের ডগা দিয়ে উচ্চারিত হয় সেসব যন্ত্রণার ভাষা। আর সেসব নানামুখী জীবন যন্ত্রণার যুথবদ্ধ প্রতিনিধিত্বকারী লেখক হিসেবে নাজিব ওয়াদুদ তার শিল্পীসত্তা নিংড়ানো নির্যাস অকৃত্রিম সাধনায় সাহিত্যসমাজে সংযুক্ত করবার প্রয়াস করেছেন এবং সাহিত্যের আদর্শ নিক্তিতে তা শীর্ষস্থানীয় ভর নিয়ে কথাশিল্পাঙ্গনে আসন করে নিয়েছে। অন্যদিকে জীবন যে একই বৃত্তে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচালিত হচ্ছে এবং তাই সংসার সংস্কৃতির বৃত্তে উঠে আসে, জীবন সংগ্রামের এই মাইক্রোএনালিসিস তাঁর গল্পে জায়গা করে নিয়েছে, সেটা বলিষ্ঠতারই পরিচয়। যেমন ‘বৃত্ত’ গল্পটি। লেখক এখানে তার লেখকসত্তার ষোল আনা মেলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। 

নাজিব ওয়াদুদ নিঃসন্দেহে একজন কমিটেড লেখক। আর কমিটেড বলেই সামাজিক জীবন শৃংখলাহীনতায় স্বপ্রণোদিত হয়ে ২০০৮ সালে ছোটগল্পের আকাশে সংযুক্ত করেন নতুন নক্ষত্র গল্পগ্রন্থ ‘নষ্ট কাল অথবা হৃদয়ের অসুখ’। এ গ্রন্থেরও ভিত-ভাঁজে রয়েছে আঞ্চলিকতার আকর। পল্লীর জীবনচিত্র যেমন মাহবুব উল আলম মধুর ও বিধুর রসে সরস করেছেন, অথবা আবু ইসহাক তার ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ নিয়ে যেমনভাবে সাহিত্য জগতে এসেছেন, কিংবা সরদার জয়েনউদ্দিন, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ক্লিষ্ট জীবনের জয়গান গেয়েছেন তেমনি নাজিব ওয়াদুদ গল্প বলতে গিয়ে গল্প না বলে গল্প অঙ্কন করেছেন, একেকটা গল্পকে ‘এ্যক্রিলিক সেগমেন্টে’র আলোছায়ায় নিপুণভাবে দাঁড় করিয়েছেন। তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ বলা যায় এ গল্পগ্রন্থের প্রথম গল্প ‘আবাদ’। নিম্নবিত্ত জগলু এখানে প্রতীকী ঝা-া হাতে এসেছে। বাস্তববাদী ও নিরীক্ষাধর্মী এ গল্পে জগলুর মনে যে বাসনা বাসা বাঁধে তারই প্রকাশ পায় আঞ্চলিক ভাষায় এভাবেÑ ‘আমি অনেক ভাবনু চাচা। আমি রূপাক্ বিয়া কইরবো। আমি সত্যিই রূপাখে বিয়া কইরবো। আপনে কী বুলেন?’ ‘না, না।’ চিৎকার করে ডুকরে ওঠে রূপা।’ ...তালগাছের আড়ালে মুখ লুকিয়ে চাঁদ হাসে।’ ...আর কারো অদৃশ্য কারসাজিতে পৃথিবীর গোপন কোণে কোণে বুঝি কিসের আবাদের প্রস্তুতি চলতে থাকে।’ 

সংসারের জটিল সংকটে নিয়ত মানুষ মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছে আবার তার ভেতর থেকেই মানুষ উঠে আসছে। সারাক্ষণ একটা মৃত্যু চেতনা চরিত্রে তাড়া করে ফিরছে। আলিফ মামার প্রকৃতিতেও সেই চেতনার স্তর (Seam) থরে থরে গজিয়ে উঠেছে। অপূর্ব শিল্পরীতির শৈলীতে এ গল্পের আকৃতি জীবনের গভীর থেকে আকীর্ণ হয়েছে। গল্পকার এখানে সত্যি এক দক্ষ প্রতœতাত্ত্বিক শিল্পশ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন আর মৃত্যুচেতনার ভেতর থেকে খনন করে খনিরত্ন ‘খনন’কে তুলে এনেছেন। 

অপরদিকে ‘স্বামীর কথার পিঠে কথা গেঁথে যুক্তি দাঁড় করায় সায়রা- ‘ক্যান পারবে না? ম্যাডার বি’ হয়া গেলে ঝাড়া হাত পা।’ এরকম নির্মোদ পল্লøীর ভাষায় হাজির হয় গল্প ‘কসাই’। ‘জীয়নকাঠি’, ‘গ্রীণ হাউস উপকথা’, ‘মৃত্যুঞ্জয় মারা গেছে’, ‘আরো দু’টি খুন’ সবগুলোই উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প। বিজ্ঞানের কথাও এসেছে নাজিব ওযাদুদের গল্পে যেমন ‘গ্রীণহউস উপকথা’। শিল্প এবং শিল্পীসত্তা সাহিত্যের ইজেলে জীবনের ছবি আঁকে। নাজিব ওয়াদুদ ছোটগল্পের শিল্প খামার সেসব ছবি দিয়ে ভরে তুলেছেন। ২০১০ সালে সেই খামারে এলো ‘কমরেড ও কিরিচ’। 

এই গ্রন্থের ‘দখল’ গল্পে মাহবুব ও আক্কাসের মাঝখানে লুৎফাকে নিয়ে প্রেমের যে টানাপোড়েন তা সামাজিক স্তর পেরিয়ে দার্শনিক ও নৈতিক প্রশ্ন সৃষ্টি করে। অন্যদিকে রাজনীতি, সমাজ, নৈতিকতা ও প্রেমকে সমান্তরালে স্থাপন করে লেখা নামগল্প ‘কমরেড ও কিরিচ’। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিকভাবে সচেতন মানুষও যৌবনকালীন জৈবিক ক্রিয়াকলাপের অনুনয় আবেদনে বিপথের পদান্ধে পা মিলিয়ে কীভাবে ভুল করেন তা কমরেড শাকুর পরিচয় বর্ণনার মাধ্যমে লেখক দেখিয়েছেন। 

‘নোনাপ্রেম’-এ দিকে তবে গ্রাম্যতার গরিমা দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে ওঠে। সমাজপতিদের সাথে সাধারণ মানুষের দূরত্ব, বাদশা আর সেরেনার মধ্যে সাংসারিক কলহ, আঞ্চলিকতার সাথে গল্পকারের নিজের সংলাপ আঞ্চলিকতার আবরণস্থান বিশেষ বিবর্ণ করতে যে মনন মাধুর্য অবচেতনে আসে এ গল্পে তা আচ্ছন্ন করতে পারেনি। রফিজা-আলীমকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে ‘কান্না হাসির উপাখ্যান’। সন্তানহীন মাতৃত্বের বেদনা আর সন্তান-বিচ্ছেদী মায়ের ক্রন্দন এ গল্পে ফুটে উঠেছে। নগর জীবনের সাথে গ্রামীণ জীবনের অপূর্ব মিশেল সৃষ্টিতে সিদ্ধহস্ত বলতে হবে গল্পকারকে। মানবজীবনের সমস্ত পর্বই সাহিত্যের মুকুরে ভেসে উঠে। ‘ভালো ও মন্দ’-এ লেখক সেলিনাকে সে দৃশ্যে চিত্রায়িত করেছেন। 

শিল্পের কাছে দায়বদ্ধ লেখক নাজিব ওয়াদুদ। প্রতি গল্পের অন্তর্গত বৈশিষ্ট্যের কারণে তিনি গল্পে সবার থেকে আলাদা ও অনন্য। একাধারে অনুবাদ, প্রবন্ধ, উপন্যাস, ছড়াগ্রন্থ রচনা করেও বিবেকের কাছে সমাজের কাছে সাহিত্যের কাছে তাড়িত হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। হচ্ছেন জৌলুসিত। ২০১১ সালে সেই জৌলুসের জীবন্ত জুলফি ধরে এলো এক ব্যতিক্রমী নামের ছোটগল্প গ্রন্থ ‘পদ্মাবতী কিংবা সুন্দরী মেয়েটির নাক বোঁচা’ সংঘবদ্ধ সপ্ত সংখ্যায় গল্পে গ্রন্থের ক্রমিক। কবি আলাওলের পদ্মাবতীর রূপবর্ণনা যেমন মোহিত করে পল্লীবালা পদ্মাবতীও তেমন, আর তার মধ্যে ঘটেছে অসাধারণ কল্পনার মিশেল। শহীদ মুক্তিযোদ্ধার যুবতী বিধবা স্ত্রীর জীবনালেখ্য নিয়ে এ গল্পগ্রন্থে এসেছে ‘শহীদ ইদু কানার বউ’। সাহিত্যে আবেগের প্রাধান্য যেমন তেমন যুক্তিরও। ‘আপস’, ‘নাকফুল’, ‘অন্তর্গত’, ‘একজন প্রতিবন্ধী ও একটি মহাসড়কের গল্প’, ‘সুন্দরী মেয়েটির নাক বোঁচা’- এসব গল্পে গল্পকার জীবনের কাহিনীতে তার আপন মাধুরীর সিসৃক্ষায় অসামান্য করে তুলেছেন। কথাশিল্পী কোনও না কোনও কালের সমাজবাস্তবতায় ও গতিশীল আবহের মধ্য দিয়ে নিজে যেমন বেড়ে উঠে তেমনি তার শিল্পকর্মের আধারেও দেশ-কাল-সমাজবাস্তবতার খনিমৃত্তিকা থাকে। নাজিব ওয়াদুদের সে প্রয়াস এখনও অব্যাহত। তিনি গল্পের বিষয় বৈচিত্র্য ও আঙ্গিকে নতুন ধারার সূচনা সংযুক্ত করে বাংলা ছোটল্পের জগতে স্থায়ী আসন করে নিবেন তার আভাসও দৃশ্যমান। তাঁর শিল্পচৈতন্যে প্রকৃতি, মানুষ ও আধ্যাত্ম অটুট বন্ধনে বাঁধা থাকবে, তিনি বাংলাসাহিত্যের ভাঁড়ার তাঁর সৃষ্টিকর্মে ভরিয়ে তুলবেন, দিকে দিকে তার মূল্যায়ন ও পুনর্মূল্যায়নই খুলে দিবে তার ভূয়সী সাফল্যের দ্বার শিল্পঋদ্ধ ভুবনে। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ