ঢাকা, শুক্রবার 20 July 2018, ৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ৬ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

যত্র-তত্র সাহিত্য সম্মেলন

খুরশীদ আলম বাবু : এ লেখার শিরোনাম দেখে পাঠকের হয়তো পিলে চমকে যাবার অবস্থা হবে। কারণ আমরা সাহিত্য নিয়ে ব্যবসা করবো কোন ভাবেই এ রকম চালক জাতি নই। সাহিত্য নিয়ে আবার ব্যবসা হয় সেটা পশ্চিমবঙ্গের ‘আনন্দ বাজার’ গোষ্ঠী আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন।  বাঙালি মুসলমানকে খুব চালাক জাতি বলে সমালোচনা করেছিলেন প্রয়াত কবি সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দ। আমরা অল্প পরিশ্রমে অনেক কিছু পাওয়ার আশা করি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার হাল হাকিকত দেখে আশংকা হচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে আমরা ভালো মানের গল্পকার, উপন্যাসিক নিদেন পক্ষে একজন ভালো কবিও পাবো কিনা? নানা বিধ সমস্যা আমাদের জাতির জীবনে ভর করেছে। অর্থনৈতিক অবস্থার কথা বাদই দিলাম। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, আমরা চাইলেও এই সমস্যা সমাধান করতে পারবো না। কারণটা খুব স¦াভাবিক। একে অপরকে শ্রদ্ধা না করা শিক্ষা আর কেবলমাত্র ধনী হওয়ার চেষ্টা আমাদের ক্রমাগত বই বিমুখ করে তুলেছে। বলা বাহুল্যঃ এখনকার পিতামাতারা কোন ভাবেই চাননা তার ছেলেমেয়েরা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বাদে অন্য কিছু হোক। পড়ালেখার বাইরে অন্য ধারার বই পড়ার জন্য কোন ভাবেই তারা অনুপ্রেরণা যোগাননা। আমি জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্রছাত্রীদের দেখেছি উন্নতমানের কোন রচনা লেখার ক্ষমতা তাদের নেই। এই ধরনের সমস্যা আমাদের দেশের ষাট-সত্তর দশকের ছাত্রছাত্রীদের ছিলনা। তখন ছাত্র-ছাত্রীদের বাইরের বই পড়তেন, জ্ঞান চর্চার আগ্রহ ছিল। আজকের ছাত্রছাত্রীদের সামনে সেই রকম আদর্শের পরিবেশ নেই। শিক্ষকরা কেবলমাত্র একটি ভালো পদবী পাওয়ার জন্য লোভে অহরহ নিজের মান সম্মান খোয়াচ্ছেন। এমনকি শারীরিক ভাবে লাঞ্চিত হচ্ছেন। যেখানে লেখাপড়ার কোন পরিবেশ নেই- সেখানে এক নতুন উপদ্রুপ শুরু হয়েছে যত্রতত্র সাহিত্য সম্মেলন। শুধু সাহিত্য সম্মেলন হলে কোন সমস্যা ছিলোনা- যে সমস্ত লেখকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাদেরকে রীতিমত চাঁদা দিতে হয়। এই চাঁদার দেয়ার ফায়দা কি? আয়োজকরা নানাবিধ লোভের আয়না লেখকদের চোখের সামনে তুলে ধরেন। যেমন ধরেন-কোন অখ্যাত লেখক যদি দশ হাজার টাকা দেন তাহলে নির্ঘাত একটা পুরস্কার তিনি পাবেনই। এমনকি তার দু’একটি কবিতা এমনকি গল্প যৌথ প্রকাশনার গ্রন্থে ঠাই পাবে। সম্মেলনের দিন হয়তো প্রধান অতিথির আসনে বসিয়ে উপস্থাপকরা এমন সব গুনে গুণান্বিত করবেন যা শুনে মৃত অগ্রজ কবি সাহিত্যিকদের আত্মাও চমকে উঠবে। কারণ আমাদের দেশে পাঠকের তুলনায় লেখকের সংখ্যাই বেশি। এই সমস্ত লেখকদের অনেকেই ভালো পত্রপত্রিকায় লেখা প্রকাশ পায়না। ফলে এই ধরনের প্রস্তাব তার কাছে লোভনীয় হয়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। বলতে গেলে এটাই হলো অলেখকদের তথাকথিত সাহিত্য সম্মেলনে আনার উত্তম অবৈধ কায়দা। এ ধরনের কাজে ওস্তাদ ব্যক্তিরা আমাদের সমাজেই বসবাস করেন। তথাকথিত একটি সাহিত্য প্রতিষ্ঠান খুলে বসেন, সেখানে এনে জড়ো হয় যশোপ্রার্থী কবি ও গল্পকার। তবে এদের  বেশির ভাগই অকবি। আমাদের সাহিত্য জগতে একটা প্রবাদবাক্য চালু আছে সেটি হলো কবিদের মধ্যে বন্ধুত্ব স্থাপনে যতটা সময় লাগে, ভাঙতে ততটা সময় লাগে না। মূলতঃ এদের ভালোভাবেই ব্যবহার করেন কোন ধড়িবাজ অসাহিত্যিক সভাপতি। তিনি খুঁজে পেতে জোগাড় করেন গল্পকার। সরকারী কর্মকর্তাকে ভেড়াতে দেরী হয়না, কারণ প্রতিষ্ঠানে নারীদের উপস্থিতি ভালোই থাকে। আমি এই রকম ধড়িবাজ ব্যক্তিকে চিনি এবং জানি। লেখালেখির কোন বালাই নেই, নাম ওয়াস্তে কয়েকটি কবিতার বই ছাপিয়ে লেখক বনে গেছেন। সময় সুযোগ পেলেই সরকারী বড় কর্মকর্তাকে  (কোন ভাবে যদি খোঁজ পেয়ে যায় ভদ্রলোক লেখালেখি করেন।) বাগিয়ে স্পন্সার জোগাড় করেন। আর এখান থেকে শুরু হয় মহান সাহিত্যিক ব্যবসার তোড়জোড়। বলা বাহুল্যঃ সেটাই এখন মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। আমার জানামতে রাজশাহীর প্রয়াত সাংবাদিক এই কাজটা শুরু করেন। এই ধরনের কয়েকটা সম্মেলন শেষে ঐ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যাপক ভাবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে লেনদেনর মতোবিরোধ সৃষ্টি হয়। শেষাবধি, দলাদলির কারণে প্রতিষ্ঠানটি খ- বিখ- হয়ে যায়। তবে যে রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল তা এখন আবার তরুণ লেখকদের মধ্যে ছড়িয়ে গেছে। সেটাই এখন বিপদের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। সাহিত্য চর্চা একটা সাধনার বিষয়। দেশ জাতির ঐতিহ্যকে অন্বেষণ করাটা সাহিত্যিকের লক্ষ্য। সেই চেতনাও এখন উধাও আকাশে উড্ডিন পদধুলির মত। বেশ কিছুদিন আগে এইরকম একটি সম্মেলনে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। তবে আয়োজক আমাকে আমন্ত্রণ জানায়নি। গিয়েছিলাম একলোকের পাল্লায় পড়ে। মূলতঃ ছিল বইয়ের মোড়ক উন্মোচন ও আলোচনা অনুষ্ঠান। আলোচনা যা শুনলাম তাতে মনে হয়েছিল না আসায় ভালো ছিল। সমাপ্তি পর্বে আয়োজকদের একজন জোরে জোরে ঘোষণা দিলেন, রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন বিরোধী কাব্য সংকলন বের হবে। প্রত্যেক কবিকে একটি কবিতা ও একহাজার টাকা দিতে হবে। শুনে আমার পিলে চমকে উঠলো। ভাবলাম তিরিশজন কবি যদি এই শর্ত মেনে টাকা দেন। তাহলে যোগাড় হবে তিরিশ হাজার টাকা। সংকলন  বের করতে খরচ হবে নিদেন পক্ষে পনের হাজার টাকা। বাকী পনের হাজার টাকা আয়োজকদের পকেটে থেকেই যাবে। 

ভারী চমৎকার প্রতারণার আয়োজন।  আর এই কারণে বাড়ছে যত্রতত্র এই ধরনের সাহিত্য সম্মেলন। এতে সাহিত্যের কোন লাভ হয় না, কেবলমাত্র ঠোকবাজীর উপর অলেখকদের পকেট হাতিয়ে নেয়ার মাধ্যমে সাধারণ জনগণ বুঝতে পারে না কি হচ্ছে। আমাদের দেশের সাহিত্য সংগঠনগুলো এখন নানা দলে বিভক্ত। সরকারদলীয় হলে বেশ সুযোগ সুবিধা মেলে। কারণ এই ধরনের সম্মেলনে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আনা হয়। দুঃখের বিষয় এরা মোটেও সাহিত্যের বই পড়েন না। লেখকদের সম্বন্ধে সামান্যতম জ্ঞানও নেই। অথচ উপদেশের ব্যাপারে লেখকদের ভাসিয়ে দেন। এতে করে আগের তুলনায় সাহিত্যিকদের মধ্যে দলাদলি বেড়ে গেছে। রাজনৈতিক পরিচয়ে এখন লেখক-কবি চিহ্নিত হন। 

সুতরাং এক্ষেত্রে সৎ সাহিত্যিকরাই হবে  ভূক্তভোগী। এই সাহিত্য সম্মেলনের নাম যদি নেতার নামকরণে হয় তাহলে অন্যের দলের লেখকরা আসতে গররাজী থাকেন। এবার আসা যাক পুরস্কার প্রদানের বিষয়ে। লেখক সম্মেলনে যারা পুরস্কার পান বা পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন তাদের অধিকাংশেরই লেখা পত্র-পত্রিকায় আমরা পাইনা। বাংলাদেশের কবির সংখ্যা এত বেশি যে দেখে তাক লাগবার জো। কিন্তু প্রকৃত কবির সংখ্যা হাতে গোনা। কবিতা লেখার জন্য যে প্রস্তুতি বা গুণাবলি থাকার দরকার তাদের মধ্যে দেখা যায় না। তবুও তারা পুরস্কৃত হচ্ছেন। কারণ একটাই বড়দরের সরকারী কর্মকর্তা। এবং সম্মেলন করার জন্য চাঁদা দানের ক্ষমতা রাখেন। এই কারণে আজকাল পুরস্কার পাওয়ার বিষয়ে শুধু জনসাধারণ নয়, সাধারণ পাঠকদেরও ক্রমান্বয়ে দীপ্র আগ্রহ কমে গেছে। বলা যায় এখন শূন্যের কোঠায় গিয়ে পৌছেছে। আর যারা শক্তিশালী সাহিত্যিক তাদেরকে টেনে আনার আগ্রহ এই সমস্ত ব্যবসায়ী সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজকদের থাকে না। প্রকৃত সাহিত্যিকরা এখনো ধনেমানে একক ব্যক্তি হয়ে উঠতে পারেনি। আজ থেকে পাঁচ দশক আগে সাহিত্যিকদের পুরস্কার কম ছিলো বলে এই সমস্ত বিষয়ে আগ্রহহীন ভাবেই সাহিত্য সাধনা করে গেছেন। আর আজকাল পুরস্কারে সংখ্যা বেড়েছে বলেই সাহিত্যের মান কমে গেছে। ভাবতে অবাক লাগে যখন দেখি শক্তিমান কথা সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কোন পুরস্কার পাননি। এই কারণে একটি কবিতা লিখেছিলাম :-

 

পুর®ৃ‹ত হয়েছো শেষ বয়সে। মঞ্চে তোমাকে ওরা বানিয়ে দিয়েছে মহৎ সাহিত্যিক।

যদিও তোমার লেখার হাতটা বরবরই ভাল ছিলো।

তোমার লেখা নিয়ে আলোচনা ছিল যতটা বই বিক্রিও হতো অসম্ভব কম।

কালেভদ্রে যদিও জুটতো দু’একটা প্রকাশক। বই ছাপিয়েইটের পেত তোমার আসল সাহিত্যিক কারিশমা।

এতদিন ছিলে তুমি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাতারে ।

ভালোই হলো। বাকি দু’তিনটে বছর কাটবে এখন তোমার মহৎ পদবীর ডামাডোলে।

যদিও বিষয়টা অত মহৎ ছিলো না। 

(ধীমান পাঠকের তিরস্কার)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ