ঢাকা, শুক্রবার 20 July 2018, ৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ৬ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নিয়ন্ত্রণ

জাহাঙ্গীর আলম অরণ্য : রক্তশূন্য ধূসর পৃথিবীটাকে চোখরাঙানি দিয়ে গোগ্রাসী পা দুখানিকে আস্তানা থেকে বাইরে ছুটিয়ে দিলো লোকটা। দীর্ঘ অভিজ্ঞ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো অহেতুক কসরত না করে পূর্বাঙ্ক অনুসরণ করেই মনের সাথে সংযোগ অবিচ্ছিন্ন রেখে তাদের কর্তব্য পালন করতে লাগলো। স্নায়ুর মূল স্টেশন আর বার্তা বহনকারি সংযোগগুলো নিরবিচ্ছিন্ন রাখা খুবই জরুরি। 

আর পিস্তলটা! হ্যাঁ, গুলি ভর্তি করে ঠিকঠাক মতোই কোমরে গুঁজে দিয়েছে সহচররা।

সামনে একটা মরা কুকুর। গোটাকয়েক মাছির লোভাতুর গ্রাসের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ। পাগুলো ছড়িয়ে আছে ধুলোর উপর; চিরদিনের জন্য, পঁচনের অপেক্ষায়। হিংস্্র জানোয়ারের জীবনের মহাপ্রয়াণ। যাত্রা পথের কুলক্ষণ। মন বলছে লাথি মেরে আপদটাকে পথের বাইরে ফেলে দেয়। কিন্তু নাহ।

মুখের অলিগলি থেকে জিহ্বা দিয়ে সব তরল একত্রিত করে থু-হ করে ফেলে দিয়ে লোকটা মরা কুকুরের পাশ ধরে এগিয়ে চললো। এবং আরেকবার পিছু ফিরে তাকালো।

রাস্তার মোড় ঘুরছে কিন্তু খানিকটা অশ্বস্তি; সেই প্রথম দিককার অদক্ষ অভিযানের মতো। বরং তারচেয়েও একটু বেশি। একটু ভিন্ন গোছের। আত্মার গহিন খাদ থেকে বহু পুরনো একটি স্বর  বিধ্বস্ত দশা ছেড়ে খানিকটা প্রাণসঞ্চার করে কোঁকিয়ে উঠলো, ‘এই, তুই যাচ্ছিস কোথায়?’ 

প্রায় অপরিচিত বহু পুরনো এ স্বরটাকে তোয়াক্কাই করলো না লোকটা। কিন্তু স্বরটা ক্রমেই জোড়ালো হতে লাগলো; ঠিক, বঞ্চিত শিশুর সহৃদয় আবদারের মতো। 

কী এক উদ্ভট ঝামেলা! লোকটা শেষে একস্থানে দাঁড়িয়ে পড়ে স্বরটাকে চেনার চেষ্টা করতে লাগলো। হ্যাঁ, চেনা চেনা লাগছে বটে। কিন্তু নামটা স্মরণ হচ্ছে না। লোকটা আরেকটু নিগূঢ় হয়ে দাঁড়ালো। হ্যাঁ, স্মরণে এসেছে এবার। এ তো বিবেক! আত্মার একাংশ জুড়ে যার স্থায়ী বসবাস। বহুদিন আগে যাকে অর্ধমৃত বানিয়ে অকার্যকর করে ছুঁড়ে ফেলে রাখা হয়েছিলো আত্মার এক অন্ধকার গহ্বরে। এতোদিন পরে আবার তার পুনরুত্থান হচ্ছে!

আত্মার অবশিষ্টাংশ জুড়ে একচ্ছত্রভাবে আধিপত্য বজায় রাখা মন বিরক্ত হয়ে উঠলো, ‘কিরে, দাঁড়িয়ে পড়লি যে! সময় যে বয়ে যাচ্ছে!’

লোকটা আবার সামনে পা বাড়ালো। কিন্তু বিবেক এবার অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে, ‘একটু দাঁড়া! আমার কথা শুনবি না! আমাকে একদমই ভুলে গেলি!’ 

মন এবার ভারি বিরক্ত হয়ে উঠলো, ‘এসব কী ঘটছে, বল! যাত্রাপথে এসব হবার তো কথা ছিলো না! যার-তার অনুরোধ তো আমলে নেবার কথা নয়! সামনে এগিয়ে চল দ্রুত!’ 

বিবেক এতোক্ষণে অনেকটা তেজি হয়ে উঠেছে, ‘মনের সাথে ইচ্ছাশক্তির যোগসাজশ ঘটিয়ে তুই আমাকে মেরে ফেলেছিলি অনেকদিন আগে। কিন্তু আমি মরি নি। কারণ, আমি অমর। আমাকে কবর দেওয়া যায় কিন্তু চিরতরে শেষ করে দেওয়া যায় না। অনেকদিন পরে হলেও আমি আবারও  সজীব হয়ে উঠেছি। আর নয়। তোকে আমি এই অন্যায়ের পথে, এই পাপের পথে আর যেতে দেবো না। তোর ইচ্ছাশক্তিকে আমার দিকে একবার ঠেলে দে, আমি তোকে আবার ন্যায়ের পথে নিয়ে আসবো।’

লোকটার পা দুটি থেমে গেলো। মন এবার গর্জন করে উঠলো, ’আজকের দায়িত্বে অবহেলার পরিণাম কী হতে পারে, ভেবে দেখেছিস একবার! কী সব আজগুবি মন্ত্রণায় একদম নেতিয়ে পড়লি! তুই কী ভয় পেয়ে গেলি! তোর বীরত্ব কী শেষ! কাপুরুষ কোথাকার!’

মনের অতি-তেজষ্ক্রিয় জ¦ালানির পুনঃসংযোগে লোকটা পূর্ণ উদ্দামে আবার এগুতে লাগলো। কিন্তু শ্রাবণের নির্মেঘ আকাশের হঠাৎ গর্জনের মতোই গর্জে উঠলো বিবেক, ‘আমি আদেশ করছি, তুই থাম! অনেক হয়েছে, আর নয়! যা কিছু সৃষ্টি করেছেন ¯্রষ্টা; সেসব ধ্বংস করার অধিকার তোকে কে দিয়েছে!’

লোকটা আবার থমকে দাঁড়ালো রাস্তার এক মোড়ে। মন এবার মরিয়া হয়ে উঠলো, ‘একি, তুই সত্যি সত্যি থেমে পড়লি যে! তুই কী ভুলে গেলি; এ জীবন কতো গৌরবের, কতো উচ্ছ্বাসের, কতো দর্পের, কতো ভোগের, কতো ক্ষমতার! ঔদ্ধত্বপূর্ণভাবে চলাটা যে কতোটা গৌরবেরÑসেই স্বাদ ইতিমধ্যেই ভুলে গেলি! বিবেকের ওই কাপুরুষোচিত সাবধানতায় তুই একদম নেতিয়ে পড়লি!’

লোকটা সামনের পথের দিকে তাকালো। বিবেক এবার বড়ো নিবিড় হয়ে উঠলো, ‘তুই কী  আমাকে চিনতে পারলি না! আমি হলাম সত্যের প্রতিবিম্ব। মানুষের মঙ্গল সাধন করা, সত্যের সন্ধান দেওয়া, ত্যাগী করা, মানবতাবাদী করাÑএ সবই আমার কাজ। আর ওই মন; ওতো শয়তানের অবতার! ও স্বার্থ সন্ধানী আর বিশ্বাসঘাতক! মিথ্যা আশ্বাস আর মিথ্যা স্বপ্নের জালে ফেলে শুধু প্ররোচনা দেয়; যার পুরোটাই অন্তসারশূন্য আর যার পরিণাম অতি ভয়াবহ। আজ যে পথে সে তোকে মাথা উঁচু করে চলতে বাধ্য করছে, সেই উঁচু মাথা তোর কতোদিন বহাল থাকবে! নাকি তুই অবিনশ্বর যে উদ্ধত শির বজায় থাকবে মহাকাল ধরে!’

বিবেকের যুক্তিপূর্ণ কথার তোড়ে খেই হারিয়ে ফেললো মন। বিবেকের সাথে তর্কে কুলিয়ে উঠা যাবে না ভেবে অন্য পথ খুঁজতে লাগলো। অন্য কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে শেষে সন্ধি করে ফেললো বিবেকের সাথে। সামনে এগিয়ে চলা বা পিছু হঠার ভার একচ্ছত্রভাবে পড়লো স্বতন্ত্র সত্তা ইচ্ছাশক্তির উপর। লোকটা ইতস্তত করতে করতে বসে পড়লো গাছ কয়টির মাঝখানের ঘাসের উপর। 

মৃদু সন্ধ্যাবাতাসে ভর করে সাঁঝের অন্ধকার চারদিক থেকে ধোঁয়ার মতো গুলিয়ে গুলিয়ে ঘনিয়ে আসছে। পাখিরা যার যার ঘরে ফেরার জন্য সঙ্গী-সাথীদের সাথে দিনান্তের কলরবে লিপ্ত। সামনের প্রশস্ত জলাশয়ের পানি আধো-অন্ধকারে জমকালো ধূসর পোশাকে থই থই নাচতে নাচতে বারবার তীরে ছুটে আসছে। লোকটা সেদিকে খানিকটা সময় তাকিয়ে থেকে ঘাসের ডগায় দ্রুত গরম নিঃশ্বাস ছাড়তে লাগলো। 

ঠিক এই সমযটাতেই মন ভিন্ন পথে ফন্দি আটতে লাগলো। সন্ধির শর্ত মেনে বিবেক যখন নিষ্পৃহ, মন তখন ইচ্ছাশক্তিকে নিজের পক্ষে আকর্ষণ করতে লাগলো। লোকটা এবার সামনের পথের দিকে তাকিলো। তারপর উঠে দাঁড়ালো এবং গুঁটি গুঁটি পা ফেলতে লাগলো। কিছুটা পথ এগুনোর পরে কোনোকিছুর বাছবিচার না করে সন্ধির সকল শর্ত ছুঁড়ে ফেলে উত্তেজিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো মন, ‘কীসের এতো হিসাব-নিকাশ! কীসের আবার পশ্চাদপদতা! সামনে এগিয়ে চল! তোর গুরুদায়িত্ব তোকে আজ পালন করতেই হবে! আরেকটু এগুলেই তোর লক্ষ্যস্থল। সময় বয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে চল! তোর দায়িত্বহীনতার জন্য আজ তুই ব্যর্থ হলে তোকে তার চরম মূল্য দিতে হবে!’

মনের এমন বিশ্বাসঘাতকতায় বিবেক হুঙ্কার ছাড়লো, ‘দাঁড়া...! একপা নড়বার ক্ষমতা নেই তোর!’

বিবেকের এমন মর্মভেদী হুঙ্কারে লোকটার চলার গতি শ্লথ হয়ে এলো। এবার মন আর বিবেকের মধ্যে শুরু হলো প্রচ- বাকযুদ্ধ। মনের অগ্রগামী ধাক্কায় লোকটা দুপা সামনে আগায় আর বিবেকের পশ্চাদগামী ধাক্কায় একপা পিছিয়ে আসে। এমন করতে করতে লোকটা গন্তব্যের প্রায় কাছাকাছি চলে আসে। এবার দুজনের বাকযুদ্ধ রূপ নেয় মল্লযুদ্ধে।

যুদ্ধের মধ্যেই বিবেক চেঁচিয়ে বলতে লাগলো, ‘আইন কী, তুই জানিস? এই আমি; বিবেকের রায়ই হচ্ছে আইন। এ আইনই হচ্ছে মুক্তির পথ। এ মুক্তি ব্যক্তিসত্বার পথে, এ মুক্তি মানবতার পথে, এ মুক্তি স্্রষ্টার পথে। এ আইনের পথে তুই ফিরে আয়; কোনোদিন পথভ্রষ্ট হবি না। মনের ও পথ শয়তানের পথ, আমার এ পথ স্্রষ্টার পথ। আত্মা থেকে মনের দৌরাত্ম্য বিলীন করে পুরো আত্মা জুড়ে আমায় প্রতিষ্ঠা কর। আর এর ফলে আত্মার যে শুদ্ধতা আসবে তাকেই বলে আত্মশুদ্ধি। এবার তোর সুযোগ এলো; আত্মাকে শুদ্ধ কর!’

বিবেকের এমন কথা লোকটিকে অনেকটা বিমোহিত করে তুললো। আর বিবেকের এমন অগ্রগতি কিছুতেই মেনে নিতে পারলো না মন। সে অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো বিবেকের উপর। বিবেকও দমবার পাত্র নয়। সেও ঝাঁপিয়ে পড়লো। দুজনের মধ্যে শুরু হয়ে গেলো ভয়ঙ্কর অস্ত্রযুদ্ধ। লোকটা হৃৎপি-ের মধ্যে ঝড় উঠলো। সে উতালা হয়ে এলোমেলো পায়চারী শুরু করে দিলো। এই যুদ্ধের ফলাফলের উপর নির্ভর করছে তার আজকের মিশন। মনের কলাকৌশল বরাবরই বেশ পটু। সে আস্তে আস্তে বিবেককে কোণঠাসা করতে লাগলো। কিন্তু বিবেক মরিয়া, ‘তোকে কোনোমতেই আর পাপের পথে যেতে দেবো না। তোর ইচ্ছাশক্তিকে একবারের জন্য শুধু একবারের জন্য আমার পক্ষে দিয়ে দে; আর কিছু চাই না।’

লোকটার একান্ত নিজস্ব সত্তা ইচ্ছাশক্তির দাবিদার দুজনেই। সে আর সইতে পারছে না এই দ্বন্দ্বের ভার। লোকটা এবার তার ইচ্ছাশক্তিকে হঠাৎ করেই বিবেকের দিকে ঠেলে দিলো। বিবেক এবার প্রচ- শক্তির অধিকারী হয়ে উঠলো এবং মুহূর্তের মধ্যেই মনকে আছড়ে ফেলে দিলো সজোরে। আর তাতেই মনের অবস্থা মূমুর্ষ দশায় চলে গেলো। বিবেক গর্জন করে বলতে লাগলো, ‘জানি, তুইও আমার মতোই অমর, তবুও আজ যে তোকে কবর দিলাম, এ থেকে তোকে আর কোনোদিনই উঠতে দেবো না!’

এবার সমস্ত সত্য লোকটির সামনে ভোরের আলোর মতোই স্পষ্ট হয়ে উঠলো, ‘নাহ, ও জীবন কোনো জীবন নয়। বরং এ জীবনই সত্যিকারের জীবন!’

এই মুহূর্তে ডানপাশের আধো-অন্ধকারাচ্ছন্ন নির্জন রাস্তাটি ধরে একজন মানুষ এগিয়ে আসছে। লোকটি এগিয়ে গিয়ে আগন্তুকের সামনে দাঁড়ালো। লোকটিকে দেখে আগন্তুকের চোখ-মুখ শুকিয়ে মুহূর্তের মধ্যে কাঠ হয়ে এলো। লোকটি পিস্তল বের করছে দেখে আগন্তুক মানুষটি থরথর করে কেঁপে উঠে লোকটির পায়ের উপর পড়ে গেলো। কিন্তু লোকটি তাকে তুলে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলো, ‘এই নাও আমার অস্ত্র। এটা তোমার পায়ের কাছে রাখলাম। আজ থেকে আমি মানুষ, একজন শুদ্ধ মানুষ, সকলের আপন মানুষ!’।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ