ঢাকা, শুক্রবার 20 July 2018, ৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ৬ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দ্য কোয়ালিশন ইয়ারস ১৯৯৬-২০১২

মুহাম্মদ নূরে আলম : বাংলাদেশে এখন আলোচনার বড় বিষয় ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর আত্মজীবনী ‘বাই দ্য কোয়ালিশন ইয়ারস ১৯৯৬-২০১২’। হোক প্রতিবেশী দেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, তারপরও অন্য একটি দেশের সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানের লেখা বইয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কেন আলোচনার ঝড়? গত বছরের ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত বইটিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বড় অংশ উঠে আসাতেই মূলত এত আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। সেখানে উঠে এসেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কিছু সময় পরিক্রমা, তত্ত্ববধায়ক সরকারের সময়কার কিছু বিষয়। সে সময়ে আটক হয়ে বিশেষ কারাগারে থাকা শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে তিনি ভূমিকা নিয়েছিলেন বলেও উলে¬খ করেছেন প্রণব মুখার্জী। তিনি দুজনকে মুক্ত করার জন্য হস্তক্ষেপ করতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশকেও অনুরোধ করেন। কিন্তু এখানে প্রশ্ন উঠে ভারত বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন দেশের ব্যাপারে এমন অনৈতিক অবৈধ হস্থক্ষেপ করতে পারে কি না?। তিনি তারঁ বইয়ে আরও একটি পরিস্কার মিথ্যাচার করেছেন যে, তিনি খালেদা ও হাসিনাকে মুক্ত করতে জর্জ বুশকে অনুরোধ করেছিলেন। এখানে এই বিষয়টিও পরিস্কার মিথ্যাচার কারণ বাংলাদেশে তৎকালীন সেনা সমর্থিত সরকার জেনারেল মইন উ আহমেদ ভারতের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আর প্রণব মুখার্জী বক্তব্য অনুযায়ী তিনি যেহেতু বাংলাদেশের ১/১১ এর তৎকালীন জেনারেল মইন উ আহমেদকে সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রনে নিয়েছিলেন সেখানে খালেদা কিংবা হাসিনার মুক্তির বিষয়ে জর্জ বুশকে অনুরোধ করা ছিল টোটাললী লোকদেখানু এবং কুটনৈতিক আইওয়াস। তিনি তো মইনকে বলেদিলেই খালেদা হাসিনাকে মুক্তি দিয়েদেয়। তখন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল মইন উ আহমেদ। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর তাকে সরিয়ে দেওয়া হবে এমন আশঙ্কা ছিলো তার। তবে হাসিনা ফিরলেও তেমনটা হবে না বলে নিজে দায়িত্ব নেন প্রণব। বাংলাদেশের সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাথে ভারতের সম্পৃক্ততা অব্যাহত থাকার বিষয়টিও তিনি পরিষ্কার ভাবে উল্লেখ করেছেন। আত্মজীবনটিতে আরো বড় ধরনের গোপন তথ্য প্রকাশ করে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় আসার পর হাসিনা আশ্বাস দেন, মঈনই থাকবেন দায়িত্বে। তারঁ এই বক্তব্য বাংলাদেশের জন্য ভয়ংকর কিনা পাঠক আপনারা একটু চিন্তা করেন। ভারত আমাদের প্রতিবেশি রাষ্ট্র মাত্র তারাঁ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের উপরে ভয়াবহ হস্থক্ষেপ কিনা?

এরপর ২০০৯ সালের পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন মইন উ আহমেদ। প্রণব মুখার্জীর বইটিতে উঠে এসেছে আরও নানান কথা: ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ জরুরি অবস্থা জারি করেন। ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে প্রধান উপদেষ্টা করে তিনি একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করেন। প্রথম সারির বেশির ভাগ রাজনৈতিক নেতা ছিলেন কারাগারে। জেলে ছিলেন শেখ হাসিনাও। এ সময়ে তত্ত্ববধায়ক সরকারের সঙ্গে অব্যাহতভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে ভারত। এমনটা জানিয়ে প্রণব মুখার্জী তার বইতে লিখেছেন, এর মধ্য দিয়ে আমরা শান্তিপূর্ণ উপায়ে, বিশ্বাসযোগ্য, মুক্ত ও অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরি।

বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ তুলে ধরা হয়েছে ভারতের প্রভাবশালী ইংরেজি সাময়িকী ইন্ডিয়া টুডের গত বছরের সংখ্যায়--In February 2008, Bangladesh army chief Moeen Ahmed came to India on a six-day visit. He called on me too. During the informal interaction, I impressed upon him the importance of releasing political prisoners. He was apprehensive about his dismissal by Sheikh Hasina after her release. But I took personal responsibility and assured the general of his survival after Hasina’s return to power. I also sought an appointment with the US President George W. Bush to request his intervention in the matter and ensure the release of both Khaleda Zia and Sheikh Hasina. With my intervention through the then National Security Advisor M.K. Narayanan, I ensured the release of all political prisoners and the nation’s return to stability. Several years later, I also facilitated General Moeen’s treatment in the US when he was suffering from cancer.India today 13 October 2017 about panab book review.

প্রণব মুখার্জীর বইতে উলে¬খ আছে, ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ ছয় দিনের ভারত সফরে যান। এ সময় প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় মইনের। প্রণব মুখার্জী তার বইতে লিখেছেন, অনানুষ্ঠানিক আলোচনার সময়, আমি তাকে রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির গুরুত্ব বোঝাই। তিনি এই ভয় পাচ্ছিলেন যে শেখ হাসিনা বের হয়ে আসার পর তাকে (জেনারেল মইন) চাকরিচ্যুত করতে পারেন। বেশ কয়েক বছর পর, জেনারেল মইনের যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসার পথ সহজ করে দিই, তখন তিনি ক্যান্সারে ভুগছিলেন। প্রণব মুখার্জী লিখেছেন, শেখ হাসিনা আমাদের ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধু। আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির মাধ্যমে ভারত তার দাবি পূরণে সহায়তা করার চেষ্টা করেছে। শেখ হাসিনা কারাগারে থাকার সময় আওয়ামী লীগের কিছু নেতা তাকে পরিত্যাগ করলে আমি তাদের ভর্ৎসনা করে বলি, কেউ যখন এমন বিপদে থাকে, তখন তাকে ত্যাগ করা অনৈতিক। এত খোলামেলা আর সততার জন্য প্রণব ধন্যবাদও পেতে পারেন! তবে কিছুটা সমস্যাও আছে! তিনি আমাদের জানাচ্ছেন, তিনি নিজে ভারতীয় রাজনীতিবিদ হওয়া সত্ত্বেও নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতেন, ভারতীয় স্বার্থের দিকে বাংলাদেশের রাজনীতিকে পরিচালিত করতেন। এখান পর্যন্ত ভালোই! আমরা জানি, ভারত সবসময়ই বড় ভাইসুলভ অনধিকারচর্চা করে থাকে, দেশটি বাংলাদেশের জন্য এক মারাত্মক প্রতিবেশী। 

এখানে আর একটি বিষয় উলে¬খযোগ্য: ২০০৬ সালে নয়া দিলি¬তে শীর্ষ পর্যায়ের একটি বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাথে কী ধরনের আচরণ করেছিলেন, তার প্রত্যক্ষ অকপট বর্ণনা দিয়েছেন খালেদা জিয়ার তৎকালীন মূখ্যসচিব ড. কামাল সিদ্দিকী : “এটি ছিল ২০০৬ সালের মার্চে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠক। আমাদের পক্ষে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোর্শেদ খান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমান, মুখ্যসচিব হিসেবে আমি, পররাষ্ট্রসচিব শমশের মুবিন চৌধুরী। বৈঠক শুরু হওয়ামাত্র আমি দেখলাম, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার সীমা ভয়াবহ মাত্রায় অতিক্রম করে ভারতের সাথে ‘খারাপ ব্যবহার’ নিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে কামান দাগছেন। আমরা উলফাকে সমর্থন করছি বলেও অভিযোগ করলেন। অভিযোগটা ছিল ডাহা মিথ্যা। তিনি কথা বলার সময় আমাদের প্রধানমন্ত্রীর দিকে অত্যন্ত অমার্জিত ভঙ্গিতে আঙুল তুলছিলেন। বোঝা গেল তিনি ভদ্রলোক নন। তার ব্যবহৃত ভাষা ছিল পশ্চিমবঙ্গের কেরানিদের ব্যবহার করা বাবু ইংরেজি।” কামাল সিদ্দিকীর ভাষ্যে বাবু প্রণব মুখার্জির পরিচয় জানা যায়। তিনি একসময় ছিলেন উচ্চমান কেরানি।

ভারতের হস্থক্ষেপে ২০০৮ সালে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন হয়। শেখ হাসিনা বিপুল বিজয় পান। এই বই প্রকাশিত হওয়ার পরে টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে প্রণব মুখার্জী বলেন, ১৯৭১ সালে জন্ম নেয়া ১২ বা ১৩ কোটি মানুষের এই দেশ। আমি এখনও স্মরণ করি তখনকার ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পার্লামেন্টের উভয়কক্ষে একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন। 

যুক্তরাষ্ট্রের অস্টিন পেই স্টেট ইউনিভার্সিটির সিকিউরটি স্টাডিজের শিক্ষক ড. তাজ হাশমী গত বছরের ৪ নভেম্বর ২০১৭ প্রণব মুখার্জির বইয়ের উপরে লেখা এক আর্টিকেলে বলেন, ভারতের সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি (৮২) তার দি কোয়ালিশন ইয়ার্স, ১৯৯৬-২০১২ গ্রন্থে, এটি তার দ্বাদশ গ্রন্থ, তার সক্রিয় রাজনীতির শেষ ১৬ বছরের অভিজ্ঞতার কাহিনী তুলে ধরেছেন। এতে ভারতের রাষ্ট্রপতি হওয়ার সময় তথা ২০১২ সাল পর্যন্ত ঘটনাবলী স্থান পেয়েছে। তিনি ৪৩ বছর ধরে (১৯৬৯-২০১২) রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তবে মিডিয়ায় এই বই থেকে যেসব উদ্ধৃতি তুলে ধরা হয়েছে তাতে বোঝা যাচ্ছে, এতে বাংলাদেশ সম্পর্কিত খুবই গোপন ও প্রাসঙ্গিক তথ্য রয়েছে। এই লেখাটি উদ্ধৃতির আলোকে, আমার বিবেচনায় বাংলাদেশী দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই আলোড়ন সৃষ্টিকারী। বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে ছোট অনুচ্ছেদটি আমাদের অনেক কিছু বলছে। বাংলাদেশে ভারতের আধিপত্যবাদী পরিকল্পনা এবং ছোট প্রতিবেশী দেশগুলোর ব্যাপারে ভারতের দাদাগিরি মনোভাব সম্পর্কে জানে, এমন লোকজনকে আমি চিনি। শেখ হাসিনা এবং তার পরিবারের সদস্য এবং বাংলাদেশের আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাথে তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে প্রণব মুখার্জির খোলামেলা বক্তব্য সাধারণভাবে বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক মানুষজনের কাছে খুবই অস্বস্তিকর। অবশ্য যারা চায় ভারতের অনুগ্রহভাজন হয়ে থাকুক বাংলাদেশ, তারা বাংলাদেশের ২০০৮ সালের নির্বাচনে তার হস্তক্ষেপমূলক ভূমিকার জন্য কৃতজ্ঞ হয়েই থাকবে।

আত্মজীবনীর দ্বিতীয় খ-ে তিনি এমন একটি ঘটনার কথা বলেছেন, যা কার্যত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের সামিল। মুখার্জি লিখেছেন: ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে (তিনি তখন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী) বাংলাদেশের সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ ছয় দিনের সফরে ভারত এলেন। তিনি আমার সাথেও সাক্ষাত করলেন। অনানুষ্ঠানিক আলাপচারিতায় আমি তাকে রাজবন্দিদের মুক্তি দেওয়ার গুরুত্ব বোঝালাম। তারপর প্রণব উলে¬খ করেছেন, হাসিনা সরকারের আমলে জেনারেলের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে তার উদ্বেগও দূর করলেন এই বলে: ‘আমি ব্যক্তিগত দায়দায়িত্ব গ্রহণ করলাম, জেনারেলকে হাসিনার ক্ষমতায় ফেরার পরও তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার আশ্বাস দিলাম। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এম কে নারায়নকে দিয়ে আমার হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সব রাজবন্দির মুক্তি এবং দেশটির স্থিতিশীলতা প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করলাম।’ 

ভারতীয় রাজনীতিবিদদের মধ্যে এমন কাজ তিনি একমাত্র লোক হিসেবে করেছেন, এমনটি ভাবার কোনো সুযোগ নেই। এমনকি অনেক সময় সিনিয়র ভারতীয় সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তারা পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশাী ও ক্ষমতাধর নেতাদের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাধর দেখা যায়। আমরা ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিংয়ের কথা জানি। তিনি রাজনীতিবিদ ছিলেন না, ছিলেন স্রেফ সরকারি কর্মচারী। তিনি পর্যন্ত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি তথাকথিত পার্লামেন্টারি নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন। তিনি ঢাকা এসেছিলেন আক্ষরিকভাবেই এরশাদকে চাপ দিয়ে বশে আনার জন্য। ঢাকায় সুজাতা সিংয়ের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পূর্ব পর্যন্ত তিনি হাস্যকর নির্বাচনটিতে অংশ নিতে অনিচ্ছুক ছিলেন। বৈঠকের পর তিনি তার মন পরিবর্তন করেন। তিনি ভোটারবিহীন নির্বাচনে অংশ নেন এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ হন। ভারতের ইচ্ছানুযায়ী এরশাদ আরো পাঁচ বছরের জন্য হাসিনাকে ক্ষমতায় থাকার বৈধতা দিয়েছিলেন। 

সম্ভবত মোরারজি দেশাই, ভি পি সিং, আই কে গুজরালকে বাদ দিলে ১৯৭১ সালের পর সব ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীই বাংলাদেশের ব্যাপারে ছিলেন অনধিকারচর্চামূলক ও আধিপত্যবাদী। প্রণব মুখার্জির সর্বশেষ গ্রন্থ এবং ২০০৬ সালে বাংলাদেশের সফররত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাথে তার অসৌজন্যমূলক আচরণ থেকে যেটুকু পাচ্ছি তা আসলে ‘ভারতের বাংলাদেশ নীতি’র দৃশ্যমান অতি সামান্য অংশবিশেষ। ভারত আসলে বাংলাদেশের সাথে তার ওপর নির্ভরশীল দেশের মতো আচরণ করে, সার্বভৌম দেশ বিবেচনা করে না। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রণব মুখার্জির দৃশ্যমান হস্তক্ষেপমূলক মানসিকতা অস্বস্তিদায়ক। জেনারেল মইনের সাথে তিনি কেমন আচরণ করেছেন তা প্রকাশ্যে জোরালোভাবে প্রকাশ করাটা এবং ২০০৭-২০০৮ সালে সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বাধীন ‘তত্ত্বাবধায়ক’ সরকারের আমলে কারাগারে থাকার সময় শেখ হাসিনাকে পরিত্যাগকারী নেতাদের তার তিরস্কার করার ঘটনাও একই ধরনের। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রণব মুখার্জিকে এ ব্যাপারে ব্যক্তিক্রম হিসেবে গ্রহণ করা বাংলাদেশের জন্য উচিত হবে না। নরেন্দ্র মোদি, সুষমা স্বরাজ এবং মোদি সরকারের অন্য সদস্যদের কোনো ধরনের ইচ্ছা নেই বা তাদের কোনো হস্তক্ষেপমূলক নীতি নেই, এমনটি বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। 

বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার সম্পাদক নঈম নিজাম তারঁ পত্রিকায় লেখা একটি আর্টিকেলে বলেছেন, জেনারেল মইনকে বিদায় করেছিলেন প্রণব মুখার্জি প্যান্ডোরার বাক্স খুললেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। আত্মজীবনীমূলক লেখা বই  কোয়ালিশন ইয়ারস ১৯৯৬-২০১২’-এ বাংলাদেশের রাজনীতির অজানা তথ্য তুলে ধরলেন তিনি। প্রণব মুখার্জির এই বই প্রকাশের কথা আগেই শুনেছিলাম। তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়ার পরই আমি দেখা করতে গিয়েছিলাম। দিলি¬র রাজাজি রোডে নতুন বাড়িতে মাত্র উঠেছিলেন তিনি। সবকিছু গোছানোও শেষ হয়নি। তখনই আমাকে সময় দিলেন। দীর্ঘ এক ঘণ্টা গল্পের ভা-ার খুলেছিলেন। শুরুতেই কথায় কথায় জানালেন, আমি যাওয়ার আগ মুহূর্তে তিনি পড়ছিলেন শহীদজননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইটি। বইটি আগেও পড়া ছিল। অনেক দিন পর আবার শুরু করেছেন। আমি বললাম, এত দিন অনেক ব্যস্ত ছিলেন। এখন অবসর সময়গুলো বই পড়ে কাটবে আপনার। 

সাংবাদিক নঈম নিজাম আরও বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময় তিনি কীভাবে কাজ করেছেন। আমার এখনো মনে আছে, ওয়ান-ইলেভেনের শাসনকালে কলকাতায় আমাদের অনেক রাজনীতিক বন্ধু পালিয়ে ছিলেন। আমি মাঝে মাঝে তাদের ফোন দিতাম। তারাও ফোন করতেন। কথা হতো। সেই সময়ে আগরতলা সীমান্তে থাকতেন জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজম। তাদের সঙ্গে কথা হতো ফোনে। সীমান্তে থাকার কারণে তারা বাংলাদেশের মোবাইল সিম ব্যবহার করতেন। আলাউদ্দিন নাসিম আর শামীম ওসমান বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ করেছিলেন প্রণব মুখার্জির সঙ্গে। শামীম ওসমান কানাডা ছেড়ে চলে আসেন ভারতে। একবার প্রণব মুখার্জির দুই পা ধরে শামীম ওসমান চিৎকার করে কাঁদতে থাকেন। আর বলতে থাকেন, দাদা আপনি যেভাবে পারেন আমাদের নেত্রী, আমাদের আপাকে বাঁচান। তারা মেরে ফেলেছে নেত্রীকে। প্রণব মুখার্জি বিস্ময় নিয়ে তাকান শামীমের দিকে। এবার শামীম বললেন, আমি স্বপ্নে দেখেছি দাদা কাল রাতে। আপনি খোঁজ নিন। ওয়ান-ইলেভেনের এই অজনা অধ্যায় আমাদের জানা দরকার ছিল। কারণ এ নিয়ে অনেক গল্প শোনা যেত। বাস্তবে ভারতের কী ভূমিকা ছিল তা দেশবাসীর কাছে এখনো অজানা। ওয়ান-ইলেভেনের আগের দিন জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে কোন রাজনীতিকদের কথা হয়েছিল? বারীরা কার নির্দেশ শুনেছিলেন তা বের হওয়া দরকার। কয়েক বছর আগে আমেরিকায় অবস্থানরত ব্রিগেডিয়ার বারীকে আমি ফোনে বলেছিলাম আত্মজীবনী লিখতে। ওয়ান-ইলেভেনের মূল নায়কদের বারী একজন। সেনাপ্রধানের লেখায় সবকিছু উঠে আসেনি। অনেক কিছু এখনো রয়ে গেছে বাকি। বারী আমাকে বললেন, মুখ খুলব। সব কথা বলব। লিখব। আমি তার এই বক্তব্য বাংলাদেশ প্রতিদিনের পাঠকদের জানিয়েছিলাম। এর পর থেকে বারীর আর খোঁজ নেই। তিনি হাওয়া।

প্রণব মুখার্জির বক্তব্যের পর আমার মনে কিছু প্রশ্ন জেগেছে। সেদিন ওয়ান-ইলেভেনকে কারা সমর্থন দিয়েছিল প্রথম? অভিনন্দন কারা জানিয়েছিল? আজ অনেক মানুষ ওয়ান-ইলেভেন নিয়ে অনেক কথা বলছেন। কিন্তু এত দ্রুত বাস্তবতা ভুলে গেলে চলবে না। মনে রাখতে হবে একটি ইতিহাস আরেকটিকে টেনে আনে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে আসে আসল সত্য। ওয়ান-ইলেভেনে শুনেছিলাম, ফেরদৌস আহমদ কোরেশীর টাকার শেষ নেই। এখন শুনি চিকিৎসার অভাবে তিনি ধুঁকে ধুঁকে জীবন কাটাচ্ছেন। প্রকৃতি বড় রহস্যময়। এই রহস্য ভেদ করা জটিল। যে ওয়ান-ইলেভেন নিয়ে এত কথা সেই সময়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া  ১২৫০ কোটি টাকা তারা এখনো ফেরত পাননি। এমনকি আদালতের নির্দেশের পরও। ওয়ান-ইলেভেন দেখিয়ে কত রাজনীতিবিদের সর্বনাশ হয়েছে তার শেষ নেই।  প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশের জন্য একটি বিষাক্ত নাম। ‘বাংলাদেশের জামাইবাবু’ ভাব ধরে এই ব্যক্তির বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে বিগত দুই দশক ধরে। বাঙালী পরিচয়ের সুবাদে আর ভারতের রাজনীতির উচ্চমহলে অবস্থান করার কারণে প্রণবকেই সব সময় বাংলাদেশের রাজনীতি-কূটনীতি দেখার দায়িত্ব দিত ভারতের সবগুলো সরকার। প্রণব শেখ হাসিনার পারিবারিক বন্ধু। ফলে এটা পরিষ্কার ভারতপন্থী আওয়ামী লীগকেই সব সময় ক্ষমতায় রাখা বা আনার জন্য কুশেশ করে গেছেন আজীবন।সম্প্রতি প্রণবের প্রকাশিত বইয়ে তিনি নিজে এসব কথা স্বীকার করেছেন। ২০০৯ ও ২০১৪ তে হাসিনাকে ক্ষমতায় আনতে তিনি প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেছিলেন তার প্রমাণ নিচে তার বই থেকে উলে¬খ করা উদ্ধৃতি প্রণব লিখেছেন, “সেই সময়ে ভারতের ভূমিকা লিখতে গিয়ে প্রণববাবু লিখেছেন- ভারত সরকার ক্রমাগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলত। ভারত সরকারের আর্জি ছিল, শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। ড. ফখরুদ্দীন আহমদ চতুর্দশ সার্ক সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত আসেন। আমিও ২০০৭ সালে সাইক্লোনে বিধ্বস্ত বাংলাদেশে সাহায্য দেওয়ার জন্য যাই। ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান মইন উ আহমেদ ছয়দিনের সফরে ভারতে আসেন। তিনি আমার সঙ্গে দেখাও করেন। তখন ঘরোয়া কথাবার্তায় আমি রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির কথা বলি। তখন ভারত বাংলাদেশকে ৬টি ঘোড়া উপহার দিয়েছিল অনেকেই বলেন সেই ৬ ঘোড়া এখনও বাংলাদেশ ধাবিয়ে বেড়াচ্ছে। প্রণব বলেন, আমি যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হই তখন বাংলাদেশের সাহায্য করার জন্য অনেক উদ্যোগ নিই এবং আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করে বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করানোর জন্য কূটনৈতিক চাপ তৈরি করি। ২০০৮ সালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো এবং শেখ হাসিনা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হলেন। এরপর শেখ হাসিনা ২০১০ সালে ভারতে আসেন এবং তার সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এক মাইলফলক বলে স্বীকৃত হয়ে রয়েছে।” চলতি বছর আবারও ঢাকায় এসেছেন প্রণব। ৫ দিনের দীর্ঘ সফর। সামনে নির্বাচন। এবারও নিশ্চয়ই হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখার ফন্দি ফিকির করতেই ঢাকায় আগমন করেন তিনি। 

২০১৪ এর নির্বাচনের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির ভূমিকা নীতি নির্ধারকের ছিল। বিএনপিসহ বেশকিছু রাজনৈতিক দল ওই নির্বাচন বর্জন করে। ১৫৪ টি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়। ভারতে কংগ্রেস সরকার ওই নির্বাচন সমর্থন করে। নির্বাচনের পর নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলে ভারত সমর্থন প্রত্যাহার করতে পারে বলেও অনেকে ধারণা করেছিল। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি কংগ্রেসের অনেক বিদেশ নীতি পাল্টে দিলেও বাংলাদেশের ব্যাপারে কংগ্রেসের নীতিই অনুসরণ করে। এর পেছনেও প্রণব মুখার্জির অবদান আছে বলেও রাজনৈতিক বিশে¬ষকরা মনে করেন। বাংলাদেশে আগামী নির্বাচনেও ভারত একটি বড় ফ্যাক্টর। নির্বাচন নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যেই ২০১৪ এর টানাপোড়েন ও অচলঅবস্থা এখনো বিদ্যমান। আওয়ামী লীগ যেমন সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন করতে চায়। তেমনি বিএনপিও সহায়ক সরকারের দাবিতে অটল। এরকম একটি রাজনৈতিক সংকটে, ভারতের ভূমিকা কী হবে তা স্পষ্ট নয়। প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফর কী বাংলাদেশ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে ভারত সরকারকে প্রভাবিত করবে? কিংবা প্রধানমন্ত্রীর অভিভাবক হিসেবে প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশের করণীয় সম্পর্কে সাউথ ব¬ককে কি কোনো পরামর্শ দেবেন।” এসব প্রচারণা আওয়ামী লীগ করাচ্ছে। এর মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশে তার প্রভাব বিস্তারের বিষয়টিকে গ্রহণযোগ্য করতে চায়। সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ভারতবিরোধী মনোভাব আছে সেটিকে চ্যালেঞ্জ করে বিষয়টিকে সহজ করে তুলতে চায় আওয়ামী লীগ ও ভারত। মূল কথা হচ্ছে, শেখ হাসিনাকে আবারও ক্ষমতায় বসানোর ফন্দি আঁটতেই ঢাকায় এসেছেন প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের  পরোক্ষ প্রণব মুখার্জি। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ