ঢাকা, শুক্রবার 20 July 2018, ৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ৬ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সাহসের সমুদ্র

 

সাজজাদ হোসাইন খান : রাজ-রাজড়াদের ব্যাপার-স্যাপারই যেন কি রকম কি রকম। রঙ-চঙে। ঘটনার পিঠে ঘটনার পাহাড়গুলো লেপটে থাকে। যেমন শরতের আকাশ। কখনো মেঘ। কখনো বৃষ্টি। আবার কখনো সুনীল উদার। যোজন যোজন উধাও প্রান্তর। এক রাজা যায় আবার আর-এক রাজা সিংহাসনে বসে। চাকার মতই ঘুরে ঘুরে চলে রাজ-রাজড়াদের ইতিহাস। কেউ রেখে যায় কিছু কালো স্মৃতি। আবার কেউ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায় গোলাপের পাঁপড়ির মত কিছু স্মৃতিময় উজ্জ্বল খোশবু।

ইমাম আবূ হানীফা (র.)। তিনি রাজ-রাজড়াদের কেউ ছিলেন না। কিন্তু তাঁর জীবনাচরণ, ন্যায়নিষ্ঠ ও আদর্শপ্রেম রাজ-রাজড়াদের মর্মর সিংহাসনকে আন্দোলিত করেছিল। সেখানে প্রবল ঢেউ তুলেছিল। জন্মেছিলেন ইরাকের কূফা নগরীতে। সময়টা ৬৯৯ খৃস্টাব্দ। তখন সেখানে বইছে মরুভূমির লু হাওয়া। মানুষের মনের নদীতে অশান্তির উথাল-পাতাল ঢেউ। ঢেউয়ের আঘাতে খসে খসে পড়ছে শান্তির জাফরানী পাটাতন। সে দেশের সিংহাসনে তখন উমাইয়া সুলতান আবদুল মালিক। যার চকচকে তরবারির খোঁচায় উড়ে যেত অনেক উন্নত মাথা। 

ইমাম আবূ হানীফা (র.) তো রাজা নন। তিনি একজন প্রজা মাত্র। তবে তাঁকে বলা যায় একজন অসামান্য প্রজা; একজন অবাধ্য প্রজা। হ্যাঁ, তিনি ছিলেন এমন একজন প্রজা, যাকে লোভ দেখিয়ে, ঘুষ দিয়ে, রক্তচোখে শাসিয়ে, অবশেষে- শারীরিক অত্যাচার করেও বশে আনা যায়নি। তিনি অত্যাচারী সুলতানদের ছিলেন তুখোড় সমালোচক। তখনকার সুলতানগণ সত্যের আলোকিত পথ ছেড়ে অন্ধকার পথে হাঁটছিলেন। অন্যায় অবিচারে ডুবেছিলেন। ইমাম তাদের এ অন্যায়ের বিরোধিতা করতেন। যে কারণে তার মত একজন মহাপ-িতকে জীবনটাই হারাতে হয়েছিল।

ইমাম ছিলেন একজন জ্ঞানসাধক। জ্ঞানের মহাসমুদ্রে তিনি সাঁতার কাটতেন। সেখানে হাবুডুবু খেতেন। ডুবতেন, আবার ভাসতেন। জ্ঞান-প্রাসাদের সিংহ-দরোজাগুলো তিনি খুলে খুলে দেখতেন। প্রাসাদের ভেতরকার মনি-মাণিক্যগুলো তাঁর জুব্বার ভেতর ভরে নিতেন। অবশেষে এক সময় তিনি নিজেই জ্ঞানের এক মহাসমুদ্র হয়ে গেলেন। তিনি জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত অন্যায়ের সাথে আপোস করেননি। তাঁর ন্যায়ের নিশান কখনো মাটিতে লুটোপুটি খায়নি। শিরদাঁড়া খাড়া করে পতপত করে উড়তো।

উমাইয়া আমীর ভীষণ খাপ্পা। কিছুতেই ইমামকে বশে আনা যাচ্ছে না। ইমাম আবূ হানীফা (র.)’র সমর্থন পেলে অনেক অন্যায় কাজই তাঁর কাছে সহজ হয়ে যায়। কূফার আমীর ইমামকে প্রধান বিচারপতি করতে চাইলেন। কিন্তু ইমামের এক কথা। তিনি জুলুমবাজ শাসকের অধীনে চাকরি করবেন না। যে শাসক আল্লাহর কথা মেনে চলে না, যার কাজে সত্যের সুগন্ধি নেই, তাকে তিনি সমর্থনও করেন না। চাকরি করা তো পরের কথা। আমীর শুনলেন সে কথা। রাগে তাঁর চোখ দুটো লাল মার্বেল হয়ে গেল। ‘না, এ অপরাধ কিছুতেই ক্ষমা করা যায় না। সামান্য একটা লোকের এত বড় সাহস!’ ইমামকে তিনি জেলে ঢোকালেন। কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা হলো। কিন্তু ইমাম সাহসের সমুদ্রে ডুব দিলেন। ইচ্ছার সোনালী পায়রাগুলো উড়িয়ে দিলেন। জেলখানায় তাঁকে অনাহারে-অর্ধাহারে রাখা হতো। তাঁর মাথায় দশটি করে চাবুক মারা হতো প্রতিদিন। ইমাম খুবই দুর্বল হয়ে পড়লেন। কিন্তু এর প্রতিবাদ কে করে।

বেশ কিছুদিন পর। তিনি তখনো বন্দি। ইমামকে জানানো হলো, তিনি যদি এখনো আমীরের প্রস্তাব মেনে নেন, তবে তাঁকে এ অবস্থা থেকে রেহাই দেয়া হবে। এটা আমীরের ইচ্ছা।

জ্ঞানী ইমাম একটা কূটনীতির খেলা খেললেন। তিনি আমীরের কাছে সময় চাইলেন। বুঝ-পরামর্শের ব্যাপার। তাঁকে মুক্তি দেয়া হলো বোঝাপড়ার জন্যে। ইমাম দেখলেন, এ সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। তাঁর হৃদয়ে সত্যের সুবাতাস তখন হু হু করে বইছে। অন্যায়ের সাথে সন্ধি, ইমাম আবূ হানীফা (র.)-র কাজ নয়। তিনি রাতের আঁধারে দেশ ছেড়ে চলে গেলেন মক্কায়।

সূর্য অনেকবারই সাঁতার কেটে কেটে পূর্ব থেকে পশ্চিমে গেল। ইমাম দেশে ফিরলেন।

অত্যাচারী উমাইয়াদের পতন হয়েছে। সিংহাসনে তখন আব্বাসীয় সুলতান আল-মনসুর। আল-মনসুরও উমাইয়া সুলতানদের পথেই হাঁটলেন। জনগণের তখন নাভিশ্বাস। সুলতান জনগণের ইচ্ছাকে টুকরো টুকরো করে বাতাসে উড়িয়ে দিয়েছেন। ইমাম আবার তাঁর ন্যায়ের সবুজ নিশান দোলালেন। জনগণের হয়ে কথা বললেন। আল্লাহর নির্দেশের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন সুলতানকে। কিন্তু কে তাঁর কথা শোনে! সুলতানের হৃদয়ে তখন শয়তানের রঙমহল। সুলতান ইমামের সমর্থন চাইলেন। ইমাম বললেন, আমি আপনাকে, আপনার কাজকে সমর্থন করতে পারি না। আপনি অসত্যের পথে চলেছেন। আল্লাহর নির্দেশ ভুলে গেছেন। তাছাড়া আপনি জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী সুলতান নির্বাচিত হননি। আপনি আল্লাহর পতে আসুন, সত্যের পথে আসুন, ন্যায়ের পথে আসুন। আমি আপনাকে অবশ্যই সাহায্য করবো। অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে সথ্য কথা বলা আমার কর্তব্য। কারণ আমি মৃত্যুকে ভয় করি না, আল্লাহকে ভয় করি।

সুলতান মনসুরও ইমামকে প্রধান বিচারপতির পদ দিয়ে হাত করতে চাইলেন। কিন্তু ইমাম সে কথায় কান দিলেন না। কারণ তাঁর মনে ভয় ছিল, এই দায়িত্ব গ্রহণ করে স্বাধীনভাবে বিচার করা যাবে না। সুলতানের নির্দেশেই বিচারের রায় দিতে হবে। কিন্তু ইমাম তা করতে পারেন না। ইমাম বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। ইমামের জবাব, ‘না’। মনসুর ক্ষেপে গেলেন। তাঁর হৃদয়ের রঙিন ঘরটায় তখন শয়তানের সুদিন। ইমামকে বন্দি করা হলো। তাঁকে জেলখানায় অন্ধকার ঘরে রাখা হলো। তাঁর গতর চাবুকের আঘাতে ছিঁড়ে ছিঁড়ে গেল। তবুও ইমাম তাঁর বিশ্বাসে অটল। অসত্যের সাথে তাঁর কোনো আঁতাত নয়।

সবুজ নিশান তখনও পতপত করে উড়ছে। বইছে হিমেল বাতাস। ইমামের খাবার এবং পানীয় বন্ধ করে দিল মনসুর। অনাহারে ইমামের শরীরে ভেঙে গেল। পানি নেই, খাবার নেই। তিনি তখন মৃত্যুর দিকে হাঁটছেন। সত্যের দিকে হাঁটছেন। ন্যায়ের দিকে হাঁটছেন। মনসুর দেখলেন, ইমাম আবূ হানীফার সাহসের ক্ষুরধার তরবারি তখনও চকচক করছে। জালিম সুলতান পাগল হয়ে গেলেন। জ্ঞানের এই মহাসমুদ্রকে বিষ খাইয়ে মারলেন সুলতান আল-মনসুর। গ্রীক প-িত সক্রেটিসের মত তাঁকেও বিষ খাওয়ানো হলো। জনগণ তা জানলো না।

ইমাম চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর কাজ? ন্যায়ের জন্যে, সত্যের জন্যে আমরাও কি তাঁর পথে হাঁটতে পারি না?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ