ঢাকা, শুক্রবার 20 July 2018, ৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ৬ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আমদানির নামে অর্থ পাচার

পণ্য আমদানির আড়াল নিয়ে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। গতকাল একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বড় বড় কোম্পানির নামে অর্থ পাচারকারীরা ব্যাংকে এলসি বা ঋণপত্র খোলা থেকে পণ্যের দেনা পরিশোধ করাসহ সকল কার্যক্রম নিয়মিতভাবেই সম্পন্ন করছে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে আইনত কোনো অভিযোগ আনার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু অর্থ পাচারের আসল কাজটুকু করা হচ্ছে আমদানিকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে। কোনো কোনো ঘটনায় যে পণ্যের জন্য এলসি খোলা হয়েছিল সে পণ্যই দেশে আনা হচ্ছে না। তাছাড়া কন্টেইনারে নির্ধারিত পণ্যের স্থলে পাওয়া যাচ্ছে রড, লোহা, সিমেন্ট এবং চাল-ডাল ধরনের এমনসব পরিত্যক্ত ও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য, যেগুলো বিক্রি করে ব্যংকের ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোকে কিন্তু এলসির বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রায় ঠিকই ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এসব আমদানির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে এমনকি ভুয়া বিল অব এন্ট্রির কাগজপত্র ব্যাংকে জমা দিয়ে প্রমাণ দেখাচ্ছে যে, তারা ঘোষণা অনুযায়ী পণ্য আমদানি করেছে। এভাবে মিথ্যা ঘোষণা ও প্রতারণার মাধ্যমে দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে।

বিষয়টি জানা গেছে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরের তদন্তে। অর্থ পাচার বন্ধের উদ্দেশ্যে এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের পক্ষ থেকে কয়েকটি কোম্পানি ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের এলসি না খোলার ব্যাপারে সকল ব্যাংককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ঘুষ-জালিয়াতির মতো বিভিন্ন অভিযোগে কয়েকটি ব্যাংকের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সরকার। বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবসার লাইসেন্স স্থগিত হয়ে যাওয়ায় এসব ব্যাংক আর আমদানির কার্যক্রম চালাতে পারছে না। 

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদসহ তথ্যাভিজ্ঞরা জানিয়েছেন, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে সরকার অনেক দেরি করে ফেলেছে। কারণ, আমদানির আড়ালে অর্থ পাচার করা হচ্ছে বহুদিন ধরেই। গত বছরও এ বিষয়ে গণমাধ্যমে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ার ফলে পাচারকারীরা উল্টো প্রশ্রয় পেয়েছে। চলতি বছর নির্বাচনের বছর বলে পাচারকারীদের তৎপরতাও অনেক বেড়ে গেছে। কারণ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে ক্ষমতার সম্ভাব্য রদবদল, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে সহিংসতার আশংকায় বড় দলের নেতা, ঠিকাদার ও অসৎ ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি দুর্নীতিবাজ পুলিশ ও সরকারি কর্মকর্তাসহ আরো অনেকেই দেশে টাকা রাখার চাইতে বিদেশে পাচার করে দেয়াকে নিরাপদ মনে করছেন। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে নানা ধরনের জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতা থাকায় এ ধরনের ব্যক্তিরা হুন্ডিসহ বিভিন্ন অবৈধ পন্থার আশ্রয় নিচ্ছেন। 

তাছাড়া টাকা যেহেতু পাচার করা যায় না এবং করা গেলেও সেটা যেহেতু লাভজনক ও নিরাপদ নয় সেহেতু সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো মার্কিন ডলারকে বেছে নিয়েছে। একই কারণে রাতারাতি ডলারের দামও বাড়তে শুরু করেছে। তথ্যাভিজ্ঞরা আশংকা প্রকাশ করে বলেছেন, পাচারের এই ধারা প্রতিহত না করা গেলে ডলারের দাম তো বাড়তে থাকবেই, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে সরাসরি প্রভাব পড়বে আমদানি ও রফতানিসহ পণ্যের মূল্যের ওপরও। আমদানি কার্যক্রমে ফাঁকির পাশাপাশি আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে বলে পণ্যের মূল্যও বাড়তে থাকবে। বাস্তবে দেশে এরই মধ্যে তেমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

আমরা কিন্তু আমদানি কার্যক্রমে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ পাচারের বিষয়টিকে অত্যন্ত আপত্তিকর ও অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করি। কারণ, গত বছরই ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) তার এক রিপোর্টে জানিয়েছিল, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর পাচার হয়ে যাচ্ছে গড়ে ৪৪ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। জিএফআই-এর ওই রিপোর্টে আরো জানানো হয়েছিল, ‘নির্বাচনের বছর’ ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছিল ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ আরো একটি নির্বাচনের বছরেও অর্থ পাচার  অনেক বেড়ে যাবে।

উল্লেখ্য, মার্কিন সংস্থার ওই রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্যাভিজ্ঞরা সে সময় জানিয়েছিলেন, এত বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়ার ফলে দেশের ভেতরে কোনো বিনিয়োগ হয়নি। সৃষ্টি হয়নি চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগও। মূলত রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের কারণেই দেশী-বিদেশী কোনো শিল্প উদ্যোক্তাই বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার সাহস পাননি। এখনো পাচ্ছেন না। তথ্যাভিজ্ঞরা প্রসঙ্গক্রমে সরকারের প্রতিহিংসামূলক নীতি ও কর্মকা-কে পরিস্থিতির জন্য দায়ী হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। 

মূলত সে কারণেই নতুন এক নির্বাচনের বছর ২০১৮ সালে এসেও পরিস্থিতিতে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেনি। বরং জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টে আমদানির আড়ালে অর্থ পাচার সম্পর্কে নতুন পর্যায়ে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই সচেতন সকল মহলে ভীতি ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়বে। বাস্তবে পড়তে শুরুও করেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, আমদানিতে জালিয়াতির পাশাপাশি বিভিন্ন অবৈধ পথে লক্ষ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাওয়ার ফলে শিল্প-বাণিজ্যসহ অর্থনীতির প্রতিটি খাতে সংকট ক্রমাগত আরো মারাত্মক হয়ে উঠবে। তাই টাকা পাচারকারীদের চিহ্নিত করার এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনসম্মত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য দাবি জনগণের। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ