ঢাকা, শুক্রবার 20 July 2018, ৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ৬ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এমপিওভুক্তকরণ জাতীয় মানবিক দাবিতে পরিণত

ডা. মিজানুর রহমান

[এক]

নন-এমপি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশন তাঁদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে গত কয়েক সপ্তাহ যাবত ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাব এর সামনে অনশন কর্মসূচি পালন করছেন। এরই ধারাবাহিকতায় শুরু হয়েছে আমরণ অনশন। ফেডারেশন এর সভাপতি অধ্যক্ষ গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ ড. বিনয় ভুষণ রায় সহ অনশনরত অন্তত ৮০ জন শিক্ষক-কর্মচারী অসুস্থ হয়ে শুয়ে পড়েছেন। তাঁদের মধ্যে অর্ধশতাদিক অনশনকারীকে স্যালাইন পুশ করা হয়েছে। খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টিতে ভিজার কারণে এবং পুষ্টি হীনতায় অসুস্থ ৭ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানা যায়। 

গত বুধবার সন্ধায় ফেডারেশনের সভাপতি ও সম্পাদক এর সাথে এক সাক্ষাতকার গ্রহণের সময় তাঁরা দু’জন স্যালাইন পুশরত অবস্থায় অনেক কষ্টে শুয়া থেকে উঠে বসেন এবং জানান- গত ৫ জানুয়ারী প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক এপিওভুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবিতে লাগাতর এ কর্মসূচি শুরু করেছি। এবার মৃত্যু হলেও এমপিও ছাড়া বাড়ি ফিরব না। এমন প্রত্যয় নিয়ে আমরণ অনশন শুরু করা হয়েছে। 

গত ১০ জুন থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের বিপরীত পাশের রাস্তার ওপর অবস্থান নেওয়া চলমান আন্দোলনকারীরা গত সোমবার থেকে সংগঠনের ব্যানারে গত পাঁচ মাস পূর্বের দেয়া প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবিতে আমরণ অনশনে সহ¯্রাধিক শিক্ষক-কর্মচারীরা অংশগ্রহণ করছে। দিন যতই যাচ্ছে আন্দোলনের তীব্রতা ততো বৃদ্ধি পাচ্ছে। যোগ হচ্ছে বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে আগত নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা। নেতারা বলেন, সরকারি বিধি অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বীকৃতি এবং নিয়োগ পেলেও ২০ বছরেও এমপিওভুক্ত করা হয়নি এমন প্রায় ৮০ হাজার শিক্ষক বিনা বেতনে চাকরি করায় পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছে। 

মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তানদের ভরনপোষণ করতে না পেরে নিজেরাই বয়সের ভারে মুহ্যমাণ হয়ে বোঝা হয়ে দাড়িয়েছেন। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা হারিয়ে রাতের অন্ধকারে কেউ কেউ ভ্যান, রিকশা ও টেক্সি চালানোসহ দিনমজুর খাটতে শুরু করেছেন বলে জানা যায়। ধৈর্য্যরে সকল বাঁধ ভেঙে গিয়ে মৃত্যুকে পরোয়া না করে তাঁরা রাজপথে এ অনশন শুরু করেছে বলে জানায় সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।

 তাঁরা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, টানা ১৮ দিন ধরে রাজপথে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চললেও তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা বা আশ্বাস পাওয়া যায়নি। দাবি আদায় হওয়ার আগ পর্যন্ত চলমান আমরণ অনশনের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে তারা জানান। সেই সাথে অসুস্থ শিক্ষকদের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার আগেই আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রীর দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আশা করেন। আন্দোলনকারীদের রাজপথে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জালড়া স্যালাইন পুষকৃত অনশনকারীদের ছবিসহ দেশের জাতীয় প্রধান প্রধান দৈনিক সমূহে গুরুত্বের সাথে গত বৃহস্পতিবার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তন্মধ্যে বাংলাদেশ টুডে, প্রথম আলো, নয়া দিগন্ত, ইনকিলাব, যায় যায় দিন, সংগ্রাম, সমকাল, সংবাদ ও বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকাসহ আরও অনেক পত্রিকায় তাঁদের দাবি ও বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

দেশের ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের বাজেট আলোচনায় গত বুধবার সমাপনি ভাষণে অর্থমন্ত্রী জানান-প্রায় নয় বছর এমপিও বন্ধ রাখার পর ১ জুলাই থেকে এমপিওভুক্তি খাতে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কতগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি করা হবে, তা পরিস্কার করে ঘোষণা করা হয়নি, যে কারণে অনশন কর্মসূচি চলমান থাকবে বলে নেতৃবৃন্দ উল্লেখ করেন। 

গত বুধ ও বৃস্পতিবার আন্দোলনরত আমরণ অনশণ কারীদের সাথে সময় কাটিয়ে কষ্টার্জিত বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। গত ২৭ জুন মাঝরাতে মূষলধারে বৃষ্টিপাত এবং ২৮ জুন বৃস্পতিবার সকাল থেকে মূষলধারে বৃষ্টির কারণে ৪র্থ দিনের মতো আমরণ অনশণকারীরা পলিথিনের নিচে সেলাইন পুশরত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। বাকীরা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন স্লোগানে মুখরিত করেন ঢাকার রাজপথ। এ সময় বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে যথেষ্ট আন্তরিকতার পরিচয় দিতে দেখা যায়। তাঁরা সংগঠনের নেতা ও কর্মীদের সাক্ষাৎ গ্রহণ করে তাদের আকুতি মিনতি ও দাবিসহ পরবর্তী কর্মসূচির  কথা জানতে চেষ্টা করেন। 

যানযটে ট্রাফিক জামে আটকা পড়া যাত্রীরাসহ সাধারণ মানুষ তাঁদের এ পরিস্থিতি দেখে হতভাগ হয়ে যান। এ সময় দেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে  আগত নতুন করে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সহকারী শিক্ষক- শিক্ষিকাবৃন্দ যোগদান করতে দেখা যায়। এছাড়া ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ তাঁদের স¦ স্ব দায়িত্ব পালনে বেশ তৎপর দেখা যায়।

জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার চরনান্দিনার সুপার মাওলানা মিনহাজ উদ্দিন ও জামালপুরের  এক মাদরাসা সুপার শাহজান সিরাজ এক সাক্ষাৎকারে জানান, গত ঈদে অর্থের অভাবে কোন কেনা কাটা করতে পারিনি, আমাদের মতো সারাদেশের নন এমপিও ভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের একই অবস্থা। ফেডারেশনের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে বগুড়া জেলার একটি কলেজের অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম জানান - এবারের আমরণ অনশণ একটি অস্তিত্বের লড়াই। এবার দাবি আদায় না হয়া পর্যন্ত এ চলমান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।  

গত বৃহসস্পতিবার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনের সভাপতি অধ্যক্ষ গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার উল্লেখ করেন - সকল প্রকার সংবাদ কর্মী, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, পুলিশ প্রসাশনের কর্মকর্তা, সুশিল সমাজের সম্মানিত ব্যক্তিদের দৃষ্টি গোচরের জন্য বলেন, ৫ জানুয়ারী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির পর আমরা বিছিন্ন ভাবে সরকারের একাধিক মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের জন্য সকল প্রকার চেষ্টা চালিয়েও অজ্ঞাত কারণে সাক্ষাত পাইনাই।  আমরা বিশ্বাস করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত হলে, আমাদের সমস্যা সমাধান হওয়া সম্ভব। তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর সংগে দ্রুত সাক্ষাতের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। 

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ ড. বিনয় ভুষণ রায় দৃঢ়চিত্তে উক্ত প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে বলেন, আজকে সংসদে অর্থ বাজেট পাশ হতে যাচ্ছে, যদি আমাদের দাবির বিষয়ে সুস্পষ্ট কার্যকরি পদক্ষের না থাকে তাহলে আরো কঠোর কর্মসূচী দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ণ এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত প্রয়োজনে সকল  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষনা করে শিক্ষক- কর্মচারীদের দলে দলে ঢাকার রাজপথের আমরণ অনশনে যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান। 

প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও  জানা যায় রাজপথে একটি বৈধ ও ন্যায্য দাবি নিয়ে আন্দোলন কারী শিক্ষকরা নিরাপত্তা হীনতা ও পুলিশ প্রশাসনের গ্রেপ্তার অতঙ্কে রয়েছেন। শিক্ষকবৃন্দের সাথে দুর্ব্যবহার, হয়রানির অভিযোগ আনা হয়েছে। হাজার হাজার অনশনকারী ও আন্দোলন কারীদের দিক নির্দেশনা দেয়ার জন্য মাইক ব্যবহার করতে দেওয়া হচ্ছেনা। বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য মাথার উপর পলিথিন গুলোও ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

সর্বোপরি এমপিওভূক্ত বিষয়টিকে দেশের শীর্ষনেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবি, জনপ্রতিনিধি এখন আর সাধারণ  কোনো দাবি হিসাবে মনে করছেন না, তাঁরা এখন বিষয়টিকে একটি জাতীয় মানবিক দাবি হিসেবে মূল্যায়ণ করছেন। কাজেই রাষ্ট্রযন্ত্রকে বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দাবি মেনে নেওয়াই কল্যাণকর।

লেখকঃ  প্রাবন্ধিক গবেষক ও সাংবাদিক, ই-মেইল: dr.mizanur470@gmail.com

[দুই]

সীমান্ত হত্যা বন্ধ, অবৈধ ব্যবসা ও গরু পাচার বন্ধ ও তার প্রতিকার

মো. জাহিদ

বাংলাদেশ ও ভারত- দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সীমান্ত হত্যা, মানব পাচার, মাদক ব্যবসা, গরু বাণিজ্য ও পাচারের মতো অনেক সমস্যা বিরাজমান। এসব সমস্যা কার্যকর ভাবে মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশে জাতীয় ঐক্যমত এবং সব মহল ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতার গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের উপর গুরুত্ব দিতে হবে। সীমান্ত নিরাপত্তা, পানি, বাণিজ্য, অভিবাসনসহ অন্য যে সব বিরোধ পূর্ণ ইস্যু দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই রাষ্ট্রের সম্পর্কের ওপর অব্যাহত ছায়াপত করে চলেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাহ্যিক দৃষ্টিতে অনেক ইতিবাচক উন্নয়ন লক্ষ্য করা যায়। আজ থেকে অনেক বছর আগে সই হওয়া সীমান্ত চুক্তিও সম্প্রতি বাস্তবায়িত হয়েছে। তবুও বিতর্ক শুধু বেড়ে চলেছে । বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের মধ্যে ভারতের অনেক দাবি নীরবে মেনে নেয়ার একটি ক্রমবর্ধমান প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, ‘চাহিবা মাত্র দাবি পূরণ’ মানসিকতার কারণে কোনো ভারসাম্যপূর্ণ বা ইতিবাচক ফলাফল আশা করা যায় না।

বাংলাদেশের জনগণের কাছে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো সীমান্ত হত্যা। “হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’র হিসাবে গত এক দশকে ভারতীয় বাহিনী প্রায় এক হাজার বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে। এর মানে হলো প্রতি চার দিনে গড়ে একটি হত্যাকা- হয়েছে। দুই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সীমান্তে যত হত্যাকা- হয়েছে তা স্নায়ুযুদ্ধের সময় দুই জার্মানির সীমান্তেও হয়নি।

দুঃখ জনক হলো কিছু ভারতীয় কর্মকর্তা অবৈধ অনুপ্রবেশের অজুহাতে এসব হত্যাকা-ের পক্ষে সাফাই গাইছেন। সাধারণ মানুষ, না অপরাধী এসবের কিছু তোয়াক্কা তারা করছেন না। বিএসএফ’র এই ‘দেখা মাত্র গুলি’ নীতি বিরুদ্ধে বাংলাদেশে জনগণের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের নীতি নির্ধারকরা এ ধরনের হত্যাকাণ্ডকে খাটো করে দেখাতে চাইলেও বিএসএফ’র নৃশংসতার বিরুদ্ধে জনমত তীব্র হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সৌহার্দ্য- দু’য়ের ওপরই এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অধিকার, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর ও ডেইলি স্টার পত্রিকা ও অন্যান্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যমতে, আন্ত:সীমান্ত হত্যাকাণ্ড শুধু বেড়েই চলেছে। এতে বলা হয় যে, ২০০০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১০০৬ বাংলাদেশীকে হত্যা করে ভারতের বিএসএফ। এক জরীপে দেখা যায় আটমাসে ২১ বাংলাদেশীকে হত্যা করা হয়েছে। ২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি দি ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার খবরে বলা হয়: “১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হতে ভারত বাংলাদেশকে সহায়তা করেছে। তখন থেকে গত মাস পর্যন্ত প্রতিবেশী দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী ও সে দেশের নাগরিকদের হাতে ১,৩৯১ বেসামরিক বাংলাদেশী এবং বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষাবাহিনী বিজিবি (সাবেক বাংলাদেশ রাইফেলস- বিডিআর) সদস্য নিহত হয়। বিজিবি’সহ বিভিন্ন সরকারি সূত্রে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, একই সময়ে বাংলাদেশের ১,২০৬ বেসামরিক নাগরিক ও ২২ বিজিবি সদস্য বিএসএফ ও ভারতীয় নাগরিকদের হাতে আহত হয়েছে।”

দুই দেশের সম্পর্ক নির্দেশিত হয় মূলত অর্থনীতির দ্বারা। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ ভাগ, এরপর বাংলাদেশের জন্ম থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত অর্থনৈতিক বৈষম্য একটি নির্ণায়ক ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে। এই বৈষম্যের প্রতিকার হলো শক্তিশালী জাতীয়তাবোধ। তিনি দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য ও অনানুষ্ঠানিক রাজস্বকে একটি ‘ব্লাকহোল’র মত। তিনি বলেন, এরজন্য জাতীয়তাবাদী চেতনা শক্তিশালী করতে হবে, মূল্যবোধ জোরদার করতে হবে।

একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা দরকার। সীমান্তে ফুলেফেপে ওঠা অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বাস্তবিক ক্ষেত্রে এমন জোন ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম বন্দর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে সুবিধা দিতে পারতো। কিন্তু ভারত ও ভারতের এসব রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারেনি। উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত।

সীমান্তের দু’পাশেই গরু ব্যবসা লাভজনক বিধায় বিচক্ষণতার সঙ্গে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে এবং এর স্বীকৃতি দিতে হবে।

আন্ত:সীমান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অধিকতর আত্মনিষ্ঠ হওয়া উচিত। ভারত তার স্বার্থ দেখছে। আমরা দেখছি না। আমরা ভারতকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছি। ভারত আমাদেরকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছে। কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। আমাদের দিক দিয়ে, আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ঐক্যের প্রয়োজন। ঐক্যের সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।

ভারত সম্পর্ক ছাড়াও রোহিঙ্গাদের কারণে মিয়ানমার সীমান্তের সমস্যা মানবিক সমস্যা হিসেবে আখ্যায়িত করে সমস্যা রদ নিরসনে রাজনৈতিক আলোচনা করা প্রয়োজন। সামরিক জান্তা বিদায় নিয়ে অং সাং সুচি’র গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই সমস্যার ইতি ঘটবে। কিন্তু তা না হয়ে বরং আরো অবনতি হয়েছে।

আন্ত:সীমান্ত চ্যালেঞ্জ ও সমাধানের জন্য আসলে মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। ‘সমান স্বার্থের ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে চান। ভারতও কি একই মানসিকতা পোষণ করে? সমস্যার মূল এখানেই। এই প্রশ্নের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সমস্যা থেকেই যাবে।’

বর্তমান সরকার দেশকে ক্রীতদাসে পরিণত করছে। ক্রীতদাসের আবার কি অধিকার?

নেপাল ও ভুটানের মতো দেশও এখন ভারতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। অথচ নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বাংলাদেশ অকাতরে সব কিছু ভারতের হাতে তুলে দিচ্ছে।

ভারত একটি বড় ও শক্তিশালী প্রতিবেশী, বাংলাদেশকে চারপাশ থেকে ঘিরে আছে। তার মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র নীতিতেই দুর্বলতা রয়েছে। ‘আমাদের কলকাতা বা দিল্লী মিশনের লোকজন কি সীমান্ত এলাকায় কখনো গেছেন ফেনসিডিলের কারখানাগুলো দেখার জন্য? এসব কারখানায় তৈরি মাদক বাংলাদেশে পাচার হয়ে আসছে। মিয়ানমার থেকে আসা মাদক ইয়াবা একটি আন্ত:সীমান্ত সমস্যা। এর প্রতিও নজর দেওয়া উচিত।

আমরা সব দিয়েছি ঠিকই। এরপরও যা অবশিষ্ট আছে তা নিয়েই এখন আমাদের রুখে দাঁড়ানো উচিত। সমস্যার অন্ত নেই। গরুর গোশতের জন্য হত্যা করা হচ্ছে, ভারত আমাদের জামদানির অধিকার নিয়ে টানা হেঁচড়া করছে, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে। আমাদের চুপ থাকা চলবেনা। সীমান্তে ভারতীয়দের হত্যাকা- একটি মানবাধিকার ইস্যু। এর সঙ্গে নৈতিকতা ও মানবতা জড়িত। বাংলাদেশ সরকারের একজন সিনিয়র নেতার ফেলানি হত্যাকাণ্ডকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে অভিহিত করেন। যা বাংলাদেশের জন্য দুঃখজনক।

লেখক : সভাপতি, সুশীল ফোরাম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ