ঢাকা, শুক্রবার 20 July 2018, ৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ৬ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মাদক বাণিজ্য ও অপব্যবহার ভয়ংকর মাত্রায়

জিবলু রহমান

[আট]

ইয়াবার চালান আটক নয়, খোদ পুলিশই প্রটেকশন দিয়ে কেনাবেচায় সহায়তা করেছে। অবাক হলেও এটিই সত্য। ঘটনার শুধু এখানেই শেষ নয়, ৫ লাখ টাকা আর ৫০ হাজার পিস ইয়াবা চালানের ভাগাভাগিতে জড়িয়ে পড়ে পুলিশের একটি নেটওয়ার্ক।

যারা আগে থেকেই সংশ্লষ্ট ইয়াবা গডফাদারের বিশেষ সহযোগী। সম্প্রতি চাঞ্চল্যকর এমন একটি সিনেম্যাটিক ঘটনার অবতারণা হয়েছে রাজধানীর পার্শ্ববর্তী জেলা নারায়ণগঞ্জে।

যার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন দুই থানা ও পুলিশের আরও একটি সংস্থার পথভ্রষ্ট কতিপয় সদস্য। নিয়মিত মাসোয়ারা না পাওয়ার দ্বদ্বে ঘটনা ফাঁস হলে পুলিশের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত আসে।

এরপর একে একে গ্রেফতার হন তিন পুলিশ কর্মকর্তাসহ নয়জন। ওদিকে ইয়াবা ডন হিসেবে যিনি কারাগারে থাকা অবস্থায় মুঠোফোনে স্ত্রী ও পুলিশের সহায়তায় এমন অবিশ্বাস্য কারবার চালিয়ে যাচ্ছিলেন সেই ‘বাবা আরিফ’ কথিত ক্রসফায়ারে ইতিমধ্যে মারা পড়েছেন। সরকার প্রধানের নির্দেশে যখন দেশজুড়ে মাদক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অলআউট সাঁড়াশি অভিযান চলছে তখন খোদ পুলিশের বিরুদ্ধে এমন খবর সত্যিই পীড়াদায়ক। ‘কবির ভাষায় সত্য যে বড় কঠিন, সেই কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।’

চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের একটি বিশেষ টিম এখন শুধু বহনকারীকেই ধরছে না, গডফাদারসহ পুরো নেটওয়ার্ক কব্জায় আনতে মরিয়া হয়ে সর্বত্র চষে বেড়াচ্ছে। উল্লিখিত নারায়ণগঞ্জের ঘটনাটিও এর বাইরে নয়। এ চক্রের প্রত্যেককে ধরতে রাত-দিন অভিযান চলছে। যে তালিকায় পুলিশের আরও বেশ কয়েকজন রথী-মহারথীও আছেন।

মুন্সীগঞ্জের ইয়াবা ডন আরিফ ওরফে বাবা আরিফ স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় তার ইয়াবা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। ইয়াবা আনা-নেয়ার কাজে তিনি পুলিশের প্রটেকশনও পেতেন।

কিন্তু আচমকা র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হলে তার মাদক ব্যবসায় পুলিশি সহায়তায় ছেদ পড়ে। মাদক ব্যবসার সুবিধার্থে অসুস্থতার ছুতোয় কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হন আরিফ। মেডিকেলের প্রিজন সেল থেকে তিনি মোবাইল ফোনে তার পূর্ব পরিচিত মুন্সীগঞ্জ থানার এসআই বেলাল উদ্দীনকে ডেকে পাঠান।

৬ মার্চ ২০১৮ ভোরে ঢাকা মেডিকেলে হাজির হন এসআই বেলাল। প্রিজন সেলে বসেই তাদের কথা হয়। আরিফ তাকে জানান, নারাণয়গঞ্জের বন্দর এলাকায় তার স্ত্রী সাবিনা আক্তার রুনু একটা ইয়াবার বড় চালান নিয়ে যাবে।

নিরাপদে চালান ডেলিভারির জন্য বেলালকে পুলিশ প্রটেকশনের ব্যবস্থা নিতে বলেন তিনি। কথা অনুযায়ী ৭ মার্চ ৫০ হাজার ইয়াবা ডেলিভারি দিতে আরিফের স্ত্রী মদনগঞ্জ বাস স্ট্যান্ডে হাজির হন। এ সময় রুনুর নিরাপত্তায় সরকারি অস্ত্র নিয়ে অদূরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন এসআই বেলাল। কিন্তু পার্টি আসতে দেরি হওয়ায় সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়।

এদিকে মাসোয়ারা নিয়ে বিরোধ থাকায় আরিফের মোবাইল ফোন নম্বর অবৈধভাবে ভয়েস ট্র্যাকিং (কথোপকথন রেকর্ড) করছিলেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এএসআই হাসান। তিনি ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারে ডিবির পক্ষ থেকে সন্দেহভাজনদের কথোপকথন শুনতেন। সুযোগ বুঝে আরিফের কথোপকথনও শোনা শুরু করেন তিনি। একদিন ভয়েস রেকর্ড থেকেই তিনি জেনে যান ৭ মার্চ আরিফের স্ত্রী রুনু ইয়াবার চালান ডেলিভারি দিতে মদনগঞ্জের দিকে যাচ্ছেন। ইয়াবার চালান ডেলিভারির বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে এএসআই হাসানের মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি খেলে যায়। তিনি তার পূর্বপরিচিত নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় কর্মরত এএসআই আলম সারোয়ার্দিকে ফোন করেন। জানান, ইয়াবা ডন আরিফের স্ত্রী বড় একটি চালান নিয়ে বন্দর থানার দিকে যাচ্ছেন। তাকে আটকাতে পারলে মোটা অংকের টাকা পাওয়া যাবে। তাদের ফোন কল যাতে রেকর্ড না হয় সেজন্য হাসান তাকে মেসেঞ্জারে (কথা বলার ইন্টারনেটভিত্তিক অ্যাপস) কল দিতে বলে। এরপর হাসান মেসেঞ্জারে কিছুক্ষণ পরপর আরিফের স্ত্রীর অবস্থান জানাতে থাকেন।

একপর্যায়ে এএসআই সারোয়ার্দি তার দীর্ঘদিনের সোর্স কাওসার আহমেদ রিয়েল ও কনস্টেবল আসাদকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে হাজির হন। অভিযানের নাটক সাজিয়ে তিনি সাবিনা আক্তার রুনু ও রহমান নামের ২ মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করেন। তাদের কাছ থেকে ইয়াবা বিক্রির ৫ লাখ টাকা ও ৫০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। কিন্তু মাদক ব্যবসায়ীদের থানায় না এনে নিজের বাসায় আটকে রাখেন তিনি। একপর্যায়ে রুনু ফোন করেন ঢাকা মেডিকেলের প্রিজন সেলে থাকা তার স্বামী আরিফকে। ঘটনার বিস্তারিত শুনে আরিফ মুন্সীগঞ্জ থানার আরেক এসআই মোর্শেদকে ফোন করে বিষয়টি সুরাহা করতে বলেন। এসআই মোর্শেদ ফোন করে সারোয়ার্দিকে ঝামেলা মিটিয়ে ফেলতে বলেন। 

এদিকে ইয়াবার চালান ডেলিভারির নিরাপত্তায় থাকা এসআই বেলাল উটকো পুলিশি ঝামেলায় ক্ষুব্ধ হন। তিনিও ঢাকা মেডিকেলের প্রিজন সেলে থাকা মাদক ব্যবসায়ী আরিফকে ফোন করে ঘটনার বিস্তারিত জানান। আরিফ এসআই বেলালকে ঘটনাটা পুলিশের উপর মহলে জানাতে বলেন।

এরপর এসআই বেলাল নারায়ণগঞ্জ সদর থানার ওসিকে ফোন করে ঘটনার বিষয়ে জানান। কিন্তু ওসি সব শুনে চুপ থাকলে বেলাল আরও উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ শুরু করেন। তিনি ঢাকায় কর্মরত এক ডিআইজিকে ফোন করে ঘটনার বিস্তারিত জানান।                                                            সব শুনে ওই ডিআইজি নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপারকে ফোন করে ঘটনার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেন। পুলিশ সুপার তাৎক্ষণিক সদর থানার ওসিকে ফোন করেন। এসপির ফোন পেয়ে ভড়কে যান ওসি। তিনি এএসআই সারোয়ার্দিকে ফোন করে আসামিসহ তাড়াতাড়ি থানায় আসতে বলেন।

 সারোয়ার্দি জানান, তিনি তো আসামি ছেড়ে দিয়েছেন। এখন আসামি কোথায় পাবেন। তখন ওসি তাকে বলেন, ‘যারে পাও একটা ধইরা থানায় আনো। ইয়াবাসহ চালান দিতে হবে।’ ওসির এমন নির্দেশ পেয়ে প্যাকেট খুলে ৫ হাজার পিস ইয়াবা আলাদা করেন সারোয়ার্দি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ