ঢাকা, শুক্রবার 20 July 2018, ৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ৬ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পেশীশক্তির ব্যবহার সরকার পতনের কারণ হতে পারে

 

স্টাফ রিপোর্টার: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনে জড়িতদের ওপর হামলা এবং শিক্ষকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সমাবেশ থেকে সরকার পতনের সতর্কতা দেয়া হয়েছে। একজন শিক্ষক বলেছেন, পেশীশক্তির ব্যবহার সরকার পতনের কারণ হতে পারে। অন্য একজন শিক্ষক বলেছেন, ছাত্রলীগ শব্দটি তার কাছে গালি।

নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবি ও মামলার শিকার শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক’দের ব্যানারে সংহতি সমাবেশ হয়।  তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭২ জন শিক্ষক অংশ নেন।

সমাবেশে শিক্ষকরা হামলাকারী ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বিচারের পাশাপাশি কোটা আন্দোলনের গ্রেপ্তার নেতাদের মুক্তি দাবি করেন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন শিক্ষকরা। সরকারের যৌক্তিক আচরণ প্রত্যাশা করেন তারা। সমাবেশ থেকে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার নিন্দা ও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা বিধানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতার নিন্দা জানানো হয়। দ্রুত আটককৃতদের মুক্তি ও কোটা সংস্কার প্রজ্ঞাপনসহ ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারীদের বিচার দাবি জানান সংহতি সমাবেশে যোগ দেয়া শিক্ষার্থীরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আহমেদ কামাল বলেন, ‘সরকার জনগণের আন্দোলনকে পেশীশক্তি দিয়ে চাপিয়ে রাখার যতই চেষ্টা করুক না কেন, একদিন না একদিন তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে এবং সরকারের পতনের কারণ হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর গোলাম রব্বানীরও সমালোচনা করেন এই অধ্যাপক। বলেন, ‘আপনাকে ভুলে যেতে হবে যে আপনি ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন। কারণ, আপনি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এবং অনেকদিন ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।’

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নাসরিন ওয়াদুদ বলেন, ‘এখন ছাত্রলীগ আমার কাছে একটা গালির নাম।’

ভিসি আখতারুজ্জামানের এই পদে থাকার কোনো যোগ্যতাই নেই বলেও মনে করেন নাসরিন। বলেন, ‘যদি তার লজ্জা থাকে তাহলে তিনি এখনি পদত্যাগ করবেন।’

ভিসির পদত্যাগ দাবি করে অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে দ্বৈত প্রশাসন দেখতে পাচ্ছি। প্রথমটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং অন্যটি হলো যারা আধিপত্য বিস্তার করে গেস্টরুমে শিক্ষার্থীদের নানা রকমের নির্যাতন করছে, তাদের প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি যদি হলের কর্তৃত্ব হল প্রশাসনকে দিতে ব্যর্থ হন, যদি তিনি ক্ষমতাসীনদের চাপে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হন, তাহলে আপনাকে বলব যে, আপনি নিজ ইচ্ছায় পদত্যাগ করুন।’

একই বিভাগের অধ্যাপক সি আর আবরার বলেন, ‘রাশেদ ও ফারুকদের (কোটা আন্দোলনের গ্রেপ্তার নেতা রাশেদ খাঁন ও ফারুক হাসান) নেতৃত্বে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাব।’

‘যদিও বা বয়সের অনুপাতে তারা আমাদের চেয়ে অনেক ছোট তারপরও তারা আমাদের আগামী দিনের পথিকৃৎ ও চলার প্রেরণা।’

কোটা আন্দোলনকে যুক্তিসঙ্গত উল্লেখ করে আবরার বলেন, এটাকে যুক্তি দিয়ে না পেরে অবশেষে রাজনীতি ও পেশীশক্তি দিয়ে খ-ানোর চেষ্টা হচ্ছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা চিহ্নিত। তাদেরকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। একইসাথে ছাত্রলীগের এসব কর্মকা-ের দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক এবং তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব আনু মুহাম্মদ বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের বিপদে ফেলতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের বাসায় হামলা করা হয়েছে।’

‘প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন ভিসির বাসায় যারা হামলা করেছে, তাদের ধরা হচ্ছে। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে কেউ ছাত্র নয়। সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ের সত্যতা দেখিয়ে বলা হয়েছে যে, তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নয়। তাহলে হঠাৎ করে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতারা ভিসির বাসায় হামলা করেছে, এ তথ্য সরকার কীভাবে পেল?’

আনু মুহম্মদের দাবি, এই আক্রমণটা ছিল পরিকল্পিত অন্তর্ঘাত। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের বিপদে ফেলতেই এ হামলা করা হয়েছে। আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তদন্তের নামে প্রতারণা করছে।

দেশে কোনো ‘ন্যায্য’ আন্দোলন করলেই একে ‘জামায়াত-শিবিরের’ আন্দোলন আখ্যা দিয়ে জামায়াত-শিবিরকেই শক্তিশালী করা হচ্ছে বলে মনে করেন আনু মুহাম্মদ।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এই আন্দোলনে শিক্ষকরাও কেন যুক্ত হয়েছে। আপনাকে বলতে চাই আপনি যদি এক ঘণ্টার জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলতেন, তাহলে দেখতে পারতেন যে, আন্দোলনকারীদের ক্ষোভের মাত্রা কতটুকু এবং এ আন্দোলন কীভাবে গভীর ক্ষোভ থেকে তৈরি হয়েছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানজীম উদ্দিন খানের সঞ্চালনায় এতে আরও বক্তব্য রাখেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদুল হক, সহযোগী অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক খান, মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নাসরীন ওয়াদুদ, ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুব, সমাজবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক হাসিবুর রশিদ প্রমুখ।

সমাবেশ শেষে শিক্ষকরা ক্যাম্পাসে মিছিল করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ