ঢাকা, শুক্রবার 20 July 2018, ৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ৬ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিকল্প শুঁটকি ও সামুদ্রিক মাছ

খুলনা অফিস : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এখন আর পুকুর ভরা মাছ নেই। ‘মাছে ভাতে বাঙালী’ এ প্রবাদটি এখন হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। দেশীয় অর্ধশত প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব প্রায় বিলীন এ অঞ্চল থেকে। এ এলাকার মানুষ বিকল্প হিসেবে শুঁটকি ও সামুদ্রিক মাছের দিকে ঝুঁকছেন। জলবায়ুর পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অসচেতনতা, অবাধে লবণপানি তুলে বাগদা চিংড়ি চাষ, ফসলের ক্ষেতে ক্ষতিকর কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং মিঠাপানির অভাবে মৎস্য খনি খ্যাত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় অর্ধশত প্রজাতির মিঠাপানির দেশীয় মাছের অস্তিত্ব বিলীন হতে চলেছে। সুস্বাদু দেশীয় মাছের এখন আর তেমন দেখা মিলছে না। যদিও বিদেশি ক্রস ও কার্প জাতীয় মাছে মানুষের আমিষের চাহিদা মেটানো সম্ভবপর হচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে সর্বত্রই দেশীয় মাছের চরম সঙ্কট। আর যা পাওয়া যাচ্ছে তা অগ্নিমূল্য।

মৎস্য গবেষকদের মতে, কয়েক দশক পূর্বেও এ অঞ্চলে প্রায় আড়াইশ’ প্রজাতির মিঠাপানির মাছ ছিল। কিন্তু মনুষ্যসৃষ্ট নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে এসব মাছের অনেক প্রজাতিই এখন চোখে পড়ে না। তাছাড়া বর্ষা মওসুমের সময় নদী-খাল-বিল থেকে কারেন্ট জালের মাধ্যমে ব্যাপকহারে দেশীয় মিঠা পানির বিভিন্ন প্রজাতির ডিমওয়ালা মাছ ধরার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে এসব মাছ। দুই দশক পূর্বেও খুলনার রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া, বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া, পাইকগাছা, কয়রা, ফুলতলা, বাগেরহাটের শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ, মংলা, রামপাল এবং খুলনাসহ এর আশপাশ এলাকায় এ সব মাছ পাওয়া যেত। যার মধ্যে শোল, টাকি, কৈ, গজাল, টেংরা, চিতল, শিং, খয়রা, বাটা, পারশে, কালিবাউশ, বেলে, কাজলি, সরপুঁটি, পাবদা, খৈলশা, ডগরি, জাবা, ভোলা, বাগাড়, বাশপাতা, ভাঙ্গন, কাইন, খল্লা, দেশী পুঁটি, গোদা চিংড়িসহ অর্ধশত প্রজাতির মিঠাপানির মাছ এখন বিলুপ্তির পথে। এ সকল মাছ স্বাদে ও পুষ্টিগুণে ছিল ভরপুর। বিশেষ করে খুলনা বিভাগের মধ্যে বাগেরহাটের শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ, মংলা, রামপাল, সাতক্ষীরার শ্যামনগর, খুলনা, কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ উপজেলার কালাবগী, নলিয়ানসহ এ অঞ্চলের ২১ জেলায় মাছের চাহিদা এখন আসছে চাষের মাছ এবং চট্রগ্রাম কক্সবাজার বা সমুদ্র থেকে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ এন্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের প্রফেসর ড. মো. নাজমুল আহসান জানান, জলবায়ুর পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অসচেতনতা, অবাধে লবণ পানি তুলে বাগদা চিংড়ি চাষ, ফসলের ক্ষেতে ক্ষতিকর কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের যথেচ্ছ ব্যবহার, প্রকৃতিক জলাশয় ধ্বংস, কৃষি জমি নষ্ট করা, খাল বিলের পরিমাণ কমে আসা, অপরিকল্পিত নগরায়ন, নদীর নাব্যতা সঙ্কট, নদীর সঙ্গে খাল এবং বিলের যোগাযোগ নষ্ট হওয়া, পরিবেশ দূষণ, পানি দূষণসহ নিজেদের অসচেতনতার ফলে এ এলাকার ৬-৭ প্রজাতির মাছ একেবারে হারিয়ে গেছে এবং বাকী ৪০-৫০ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে।

খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবু ছাইদ জানান, দেশীয় মাছ বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষায় বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যার মধ্যে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ জেলার বিভিন্ন উন্মুক্ত জলাশয়ে ৮২.৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৮.৮৮ মেট্রিক টন রুই জাতীয় মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়েছে। যা থেকে ১৪৮.৩৩ মেট্রিক টন অতিরিক্ত মাছ উৎপাদন হবে এবং প্রায় ৫ হাজার মানুষের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন হবে। জেলার ৩৩টি বিলে ২৯.৮৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নার্সারী স্থাপন করা হয়েছে। উন্মুক্ত জলাশয়ে ৪৫.৮০ মেট্রিক টন রুই জাতীয় মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়েছে। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ