ঢাকা, শনিবার 21 July 2018, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

‘রোহিঙ্গাদের হত্যা করতে স্থানীয়দের হাতে তুলে দেয়া হয় তরবারি’

২০ জুলাই, ফরটিফাই রাইটস : মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের পক্ষে লড়াই করা সশস্ত্র সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) এর হামলার আগে থেকেই রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কাঠামোবদ্ধ ও পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন ফরটিফাই রাইটস। দুই শতাধিক রোহিঙ্গা, ত্রাণকর্মী ও সেনাকর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে তারা জানায়, অভিযানের এক সপ্তাহে আগেই রোহিঙ্গাদের বাড়ি থেকে ছুরি কেড়ে নিয়ে নিরস্ত্র করে দেওয়া হয়েছিলো তাদের। অন্যান্য স্থানীয়দের ‘পুলিশ’ বানানোর নাম করে তুলে দেওয়া হয়ে তরবারি। দেওয়া হয় প্রশিক্ষণও।  

নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলার পর গত বছরের আগস্টের শেষ সপ্তাহে রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর পূর্ব পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরোলো করে মিয়ানমার। নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে থাকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা। পৃথিবীর সবচেয়ে বিপন্ন জাতিগোষ্ঠীর পরিচয় পাওয়া রোহিঙ্গাদের বয়ানে উঠে আসতে থাকে রাখাইনে স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চালানো নৃশংসতার চিত্র। জাতিসংঘ এই ঘটনাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ বলে উল্লেখ করেছে। একে নিধনযজ্ঞ বলেছে যুক্তরাষ্ট্রও।

ফরটিফাই রাইটসের করা ওই ১৬২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনের শিরোনাম দেওয়া হয়ে ‘ দে গেভ দেম লং সোর্ডস।’ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, মিয়ানমার সেনাবাহিনী হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী কিভাবে নিরস্ত্র রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা পরিকল্পনা করেছ তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। 

সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী ম্যাথিউ স্মিথ বলেন, ‘মিয়ানমার সেনাবহিনী বিশ্বকে বোঝাতে চায় যে আরসার হামলার পরেই তারা নিধনযজ্ঞ শুরু করেছে। কিন্তু আমাদের কাছে এমন নথিপত্র আছে যা প্রমাণ করে ২৫ আগস্ট হামলার অনেক আগে থেকেই সেনাবাহিনী নিধনযজ্ঞের পরিকল্পনা করছিলো।’ 

গত ২০ মাস ২০০ জনেরও বেশি জনের সাক্ষাতকার নিয়েছে সংগঠনটি। এর মধ্যে ছিলেন রোহিঙ্গা, বাংলাদেশি সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, মিয়ানমারের সেনাসদস্য, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ত্রাণ কর্মী ও চিকিৎসকরা।

 রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে প্রতিরোধে ব্যবহার হতে পারে এমন ধারালো বস্তু সরিয়ে ফেলা, স্থানীয় রোহিঙ্গাবিরোধীদের প্রশিক্ষণ, বেড়া বা স্থাপনা ধ্বংস, রোহিঙ্গাদের খাবার ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধ বা অস্ত্র সরিয়ে ফেলা, অপ্রয়োজনে রাখাইন রাজ্যে প্রচুর নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য জড়ো করার মতো বিষয় রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই অভিযানের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছলো। সবাইকে নিরস্ত্র করে ফেলেছিল। ৫০ বছর বয়সী রাহানা নামে এক রোহিঙ্গা নারী বলেন, ‘সেনারা এসে আমাদের কাছ থেকে সব ছুরি নিয়ে যায়।   

এছাড়া রোহিঙ্গা ছাড়া যে স্থানীয়রা ছিল তাদের ‘স্থানীয় পুলিশ’ হিসেবে প্রশিক্ষণও দেয় সেনারা। রফিক নামে এক রোহিঙ্গা বলেন, ‘তাদের হাতে লম্বা তরবারি তুলে দেওয়া হচ্ছিলো। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম। সব তরুণদেরই তরবারি তুলে দেওয়া হয়। সেগুলো নিয়েই রাখাইনে ঘুরে বেড়াচ্ছিলো তারা।

এছাড়া রোহিঙ্গাদের সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া ও তাদের বাড়ি ভেঙে দেওয়া তো চলছিলোই। শুধুমাত্র রোহিঙ্গাদের জন্য জারি করা হচ্ছিলো কারফিউ।

স্মিথ বলেন, ‘২০১৬ সালের অক্টোবরের সহিংসতার পর রোহিঙ্গাদের দিকে আন্তর্জাতিক নজর কমে যায়। সেই সুযোগেই হত্যাযজ্ঞের পরিকল্পনা করতে থাকে মিয়ানমার। আশা করছি এবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যবস্থা নেবে।’

ইতোমধ্যে এই প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যর এখন এটি খতিয়ে দেখবেন। প্রতিবেদনে নিরাপত্তা পরিষদের কাছে আহ্বান জানানো হয় যেন মিয়ানমারের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। স্মিথ বলেন, জেনারেল মিন অং হ্লাংয়ের মতো কয়েকজন এই হত্যাযজ্ঞের পরিকল্পনা করলেও তাদের বিরুদ্ধে এখনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এই প্রতিবেদনের বিষয়ে সরকারি মুখপাত্রের সঙ্গে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি কথা বলার চেষ্টা করলেও কোনও মন্তব্য করেননি তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ