ঢাকা, শনিবার 21 July 2018, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রিজার্ভ চুরির মতো ভল্টের সোনার ঘটনাও ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা

সংগ্রাম রিপোর্ট : রিজার্ভ চুরির কেলেঙ্কারির পর এবার ভল্টের সোনায় নজর সিন্ডিকেটের। ব্যাংক বর্তমান সরকারের সময়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। রিজার্ভ চুরি কূল-কিনারা না হতেই রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ভল্টে রাখা সোনা কেলেঙ্কারির ঘটনা। দেশের সবচেয়ে নিরাপত্তার জায়গা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের এ নাজুক অবস্থার কারণে জনগণের মনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। রিজার্ভ চুরির ঘটনার মত ভল্টের সোনার ঘটনাও ধামাচামা চেষ্টার চেষ্টা চলছে। গোটা ব্যাংকিং খাতে আন্ধকারের কালো ছায়া গ্রাস করেছে।
জানা যায়, রিজার্ভ চুরির মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাকেও সরকার ধামা চাপা দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সিআইডি গঠিত তদন্ত রিপোর্ট গত দুই বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। ১৭ বার সময় চাওয়া হয়েছে আদালতের কাছে। এ ঘটনায় সাবেক গর্বনর ফরাস উদ্দিনকে প্রধান করে রিপোর্ট দেয়া হলেও তা এখনও আলোর মুখ দেখেনি।
সরকার বলছে, কৌশলগত কারণে তারা এ রিপোর্ট প্রকাশ করছে না। এ রিপোর্টের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখার ৬ জনের নাম এসেছে। কিন্তু কোন ছয় জন এ কাজে জড়িত তাদের নাম এখনও আন্ধকারেই রয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ সহায়তা রিজার্ভ চুরির এই ঘটনা ঘটেছে। অথচ তারা এখনও ধরা ছোয়ার বাহিরে।
অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে আদৌ এ ঘটনার রহস্য প্রকাশ পাবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এ ঘটনার বিচার কিংবা জড়িতদের নাম প্রকাশ না পাওয়াতে আবারও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে রাখা সোনা নিয়ে নয় ছয় করার সাহস পাচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এ সিন্ডিকেট খুবই শক্তিশালী। তারা চাইলেই যে কোন কেওলেঙ্কারি করতে পারে। সরকারের উচু পর্যায়ে তাদের যোগসাজশ রয়েছে। তা না হলে তাদের নাম কেন প্রকাশ পাচ্ছে না। একের পর এক ব্যাংক কেওলেঙ্কারির ঘটনায় সাধারণ মানুষ আকঙ্কিত হলেও এই চক্র নির্বিক। তারা একের পর এক ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে।
এ নিয়ে দেশের অর্থনীতিবিদরা ক্ষোভ প্রকাশ করলেও সরকার তা আমলে নিচ্ছে না। এতে করে ব্যাংকের গ্রাহকরা আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। ব্যাংক থেকে টাকা প্রত্যাহার করে অনিরাপদ খাতে বিনিয়োগ করছে। অনেকে আবার ভোগ বিলাস কাজে বেশি টাকা ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে। সরকার লোক দেখানো ক্ষোভ প্রকাশ করলেও কার্যত কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
  বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো মতামতকে তোয়াক্কা না করে একের পর এক জনবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়ে যাচ্ছে সরকার। সম্প্রতি বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ফজলে কবিরকে একটি হোটেলে ডেকে নিয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন। সে সময় গবর্নরকে ব্যাংকের সিআরআর কমানোসহ বেশ কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে বলা হয়। ব্যাংকিং খাত বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের বিরোধিতা সত্ত্বেও সরকার তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে তারা বলেন, সরকারের এ সব সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে না। এমনকি তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদেরও সমালোচনা করে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে বিচার বিশ্লেষণ করার অনুরোধ জানান।
 বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংককে যদি তাদের ইচ্ছামতো কাজ করতে দেয়া না হয় তাহলে সে প্রতিষ্ঠান রাখার যৌক্তিকতা থাকেনা। তারা কিছু লোকের সুবিধার জন্য এমন সিদ্ধান্ত না নেয়ার অনুরোধ জানান। কিন্তু তাদের কোনো মতামতের গুরুত্ব না দিয়ে সরকার নিজেদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে। ফলে ব্যাংকিং খাতে এক ধরণের অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে যা স্বীকার করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নরও। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রক্ষিত সোনায় হেরফের হওয়ায় এ প্রতিষ্ঠানকেও বিতর্কের মধ্যে পড়তে হচ্ছে। দূর্নীতি যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কোষাগারকেও গ্রাস করেছে তা এখন দেশের মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে।
উল্লেখ্য, বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রিজার্ভ চুরির এই ঘটনাটি ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ঘটলেও তা বাংলাদেশের মানুষ এম মাস পর ৫ মার্চ জানতে পারে। ৭ মার্চ থেকে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। এরপর ফিলিপাইনের দৈনিক পত্রিকা ইনকোয়ারার প্রতিবেদন ও ফিলিপাইনের তদন্তে বেরিয়ে আসতে থাকে নতুন নতুন তথ্য। চুরি হওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের রিজার্ভ ব্যাংকিং করপোরেশনের জুপিটার শাখায় ছিল ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সেখান থেকে অর্থের বড় অংশ চলে যায় দেশটির ক্যাসিনোতে (জুয়ার আসরে)। আবার ক্যাসিনোতেও সেই অর্থ ছিল ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অর্থাৎ আরও ২০ দিন।
পরে ১৫ মার্চ সরকারের পক্ষ থেকে সাবেক গবর্নর ড. ফরাসউদ্দিনকে আহ্বায়ক করে একটি বিশেষ তদন্তকমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে ৭৫ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়। কমিটি নির্ধারিত মেয়াদের আগেই অর্থমন্ত্রীর কাছে রিপোর্ট জমা দেয়। কমিটি যে রিপোর্ট সরকারের কাছে জমা দেয় ওই রিপোর্ট আজও প্রকাশ করা হয়নি। ফিলিপাইন সরকারও ওই রিপোর্টটি চেয়েছে বাংলাদেশের কাছে। কিন্তু অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সাফ জানিয়ে দেন রিজার্ভ চুরির তদন্ত প্রতিবেদন ফিলিপাইনকে দেয়া হবে না।
এ দিকে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের তথ্য ফাঁসে বাংলাদেশ ব্যাংকে তোলপাড় শুরু হয়। এফবিআই বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮০০ কোটি টাকার রিজার্ভ চুরিতে ব্যাংকটির ভেতরকার ব্যক্তিদের যোগসাজশ ছিল। এবং এফবিআইয়ের এজেন্টদের দাবি বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্তত একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য-প্রমাণ তারা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এফবিআইয়ের বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশিত হয়।
এদিকে ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশন (আরসিবিসি) জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার রিজার্ভ চুরির ঘটনায় নিজেদের গাফিলতির দায় এড়াতে তথ্য গোপন করে বাংলাদেশ ব্যাংক আরসিবিসিকে ‘বলির পাঁঠা’ বানাতে চাচ্ছে। ব্যাংকটি অভিযোগ করে, এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকই দায় এড়িয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকটির এ ধরনের অভিযোগের খবর দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে রয়টার্স। ওই প্রতিবেদনে আরসিবিসির হেড অব লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স জর্জ ডেলা কুয়েস্তার বরাতে বলা হয়, আইনত যেসব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব, আরসিবিসি তার সবই ফিলিপিন্সের সিনেট এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকই সবকিছু লুকিয়েছে।
এদিকে গত ১৭ জুলাই একটি জাতীয় দৈনিকে ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে ভুতুড়ে কা-’ শিরোনামে একটি রিপোর্ট হয়। এতেই নড়েচড়ে বসেছে সরকার। ওই রিপোর্টে বলা হয় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক অনুসন্ধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টের সোনায় ভয়ংকর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। দৈবচয়ন ভিত্তিতে নির্বাচন করা বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রক্ষিত ৯৬৩ কেজি সোনা পরীক্ষা করে বেশির ভাগের ক্ষেত্রে এ অনিয়ম ধরা পড়ে। ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর। গত জানুয়ারিতে কমিটি শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর প্রতিবেদন জমা দেয়। গত ২৫ জানুয়ারি প্রতিবেদনটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো হয়। প্রতিবেদনটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড হয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট কাস্টম হাউসের গুদাম কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ গোলাকার কালো প্রলেপযুক্ত একটি সোনার চাকতি এবং একটি কালো প্রলেপযুক্ত সোনার রিং বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেন। বাংলাদেশ ব্যাংক ওই চাকতি এবং আংটি যথাযথ ব্যক্তি দিয়ে পরীক্ষা করে ৮০ শতাংশ (১৯ দশমিক ২ ক্যারেট) বিশুদ্ধ সোনা হিসেবে গ্রহণ করে প্রত্যয়নপত্র দেয়। কিন্তু দুই বছর পর পরিদর্শন দল ওই চাকতি ও আংটি পরীক্ষা করে তাতে ৪৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ (১১ দশমিক ২ ক্যারেট) সোনা পায়। আংটিতে পায় ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ সোনা (৩ দশমিক ৬৩ ক্যারেট)। ধারণা করা হচ্ছে ভল্টে রাখার পর এগুলো পাল্টে ফেলা হয়েছে। প্রতিবেদন বলছে, ভল্টে থাকা সোনার চাকতি এবং আংটি পরীক্ষার পর দেখা গেল এগুলো সোনার নয়, অন্য ধাতুর মিশ্রণে তৈরি। এতে সরকারের ১ কোটি ১১ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬ টাকা ৫০ পয়সা ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিদর্শন দল প্রতিটি রসিদের অনুকূলে জমা হওয়া সোনা যাচাই করেছে। তাতে দেখা গেছে, সোনার অলংকার এবং সোনার বারে ক্যারেটের তারতম্য করা হয়েছে। ২৪ থেকে ২০ ক্যারেটের ৯৬০ কেজি সোনার বেশির ভাগের ক্ষেত্রে ভল্টে ১৮ ক্যারেট হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। কম ক্যারেটে নথিভুক্ত থাকায় নিলাম বা অন্য উপায়ে বিক্রির সময় অতিরিক্ত ক্যারেটের বিপরীতে প্রাপ্য টাকা থেকে সরকার বঞ্চিত হবে। সোনার ক্যারেটের তারতম্য ঘটানোর কারণে সরকারের ১ কোটি ৯০ লাখ ৮৫ হাজার ৩৪৬ টাকা ৬৭ পয়সা ক্ষতির সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
এরপর একই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংক সাংবাদিক সম্মেলন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক রবিউল হাসান জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্ট থেকে সোনা গায়েবের ঘটনা সত্য নয়। ভল্টে রক্ষিত সোনায় কোনও ধরনের হেরফের হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রুটি বলতে যা আছে, নথিভুক্ত করার সময় ইংরেজি-বাংলার ভুল। এর বাইরে অন্য ত্রুটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নেই। ২২ ক্যারেটের জায়গায় ১৮ ক্যারেট হওয়ার বিষয়টি দুটি ভিন্ন যন্ত্রে পরিমাপের কারণে হয়েছে। শুল্ক গোয়েন্দারা যখন সোনা জমা রাখেন, তখন হয়তো তাদের মেশিনে ২২ ক্যারেট দেখিয়েছিল, কিন্তু আমাদের মেশিনে সেটি ১৮ ক্যারেটই হয়েছিল। চিঠি দিয়ে বিষয়টি শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগকে অবহিত করা হয়েছে। ভল্টের দায়িত্বে থাকা কারেন্সি অফিসার আওলাদ হোসেন চৌধুরী দাবি করেন, ভল্টে রক্ষিত সোনায় কোনো ধরনের হেরফের হয়নি; শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ যেভাবে রেখেছিল, সেভাবেই আছে। শুল্ক গোয়েন্দারা আমাদের সোনা দেওয়ার সময় তা ২২ ক্যারেট বললেও আমরা পরিমাপ করে পাই ১৮ ক্যারেট। 
এরপর গত ১৮ জুলাই সচিবালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে অর্থ প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান বলেছেন, জনগণের সম্পদ রক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সামান্য গাফিলতি পেলে সে দায় সরকারের। তিনি বলেন, ‘বিষয়টিকে আমরা ছোট করে দেখছি না। সামান্য ফাঁকফোকড় দিয়ে বড় ঘটনা ঘটতে পারে। অর্থমন্ত্রী দেশে ফিরলে বিষয়টি সম্ভাব্য সব উপায়ে খতিয়ে দেখা হবে। এতে ব্যাংকের কারও সামান্য গাফিলতি পেলেও আইনগতভাবে শাস্তির ব্যবস্থা করবো।
সর্বশেষ গত ১৯ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানকে গণভবনে ডেকে পাঠান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এনবিআরের চেয়ারম্যান দেশে না থাকায় সদস্য (আন্তর্জাতিক চুক্তি) কালিপদ হালদার বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে উভয়পক্ষের বক্তব্য শোনেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টের সোনার হেরফেরের বিষয়ে শুল্ক গোয়েন্দাদের গোপনীয় প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়া ও বিভিন্ন মহলের মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এবং বিষয়টি দ্রুত সমাধানের নির্দেশ দিয়েছেন বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র জানিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গর্বনর এবং এনবিআরের চেয়ারম্যানকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডাকার কারণে বুদ্ধাদের ধারণা এ ঘটনাও রিজার্ভ চুরির ঘটনার মত ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চলছে। এখন সরকার বলছে, ভোল্টের এ সোনা আনবিক কেন্দ্রে পরীক্ষা করা হবে। প্রশ্ন হলো স্বর্ণ কি কোনো দিন আনবিক কেন্দ্র পরীক্ষা করা হয়েছে। স্বর্ণ রাখার সময় যে মেশিনে পরীক্ষা করে মান যাচাই করা হয়েছে ফেরত দেয়ার সময়ও একই মেশিনে পরীক্ষা করে দেয়ার কথা। কিন্তু এত বড় গড় মিলের পরে এখন বলা হচ্ছে মেশিনে ক্রুটি ছিল। ২০১৬ সালে এ ঘটনা ঘটলেও দুই বছর পরে এসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে মেশিন পিস্তলকেও স্বর্ণ দেখায়। তারা আগে কেন এই ক্রুটির কথা বললো না। কখনও এই ত্রুটির কথা কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বীকার করতো না। যদি তা সংবাদপত্রে প্রকাশ না পেতো।
ভল্টের সোনার নিরাপত্তার বিষয়ে ক্যাশের দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ খুরশিদ ওয়াহাব জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকে ৭০ জন পুলিশের একটি কন্টিনজেন্ট রয়েছে যারা অন্য কোথাও পাহারায় যায়না, তারা টাকশাল থেকে টাকাও আনতে যায় না। তারা শুধু এখানেই সার্বক্ষণিক পাহারা দেয়। ভল্ট এলাকাকে বাংলাদেশে ব্যাংকের ভাষায় 'মহা নিরাপত্তা এলাকা' বলা হয়। স্বর্ণের যে ভল্ট সেখানে ঢুকতে গেলে ছয় স্তরের নিরাপত্তা ও গেটি কিপিং পার হতে হয়। শুরুতে পাঞ্চ কার্ড, তার পর কলাপসিবল গেট যেখানে দেহ তল্লাসি হবে। স্বর্ণ বা বুলিয়ন ভল্ট পর্যন্ত তিনটি ভল্টের দরজা রয়েছে। আর সেই ভল্টে আলাদা আলমারির গুলোর আলাদা আলাদা চাবি।
কিন্তু সেই চাবিও আবার সিন্দুকে রাখা হয়। আর তার দায়িত্বে থাকেন মাত্র দুজন। এই পুরো প্রক্রিয়ার বর্ণনা দিয়ে মোহাম্মদ খুরশিদ ওয়াহাব বলছেন, রাত্রে ভল্ট বন্ধ করে যাবার পর এমনকি গভর্নর এসে ঢুকতে চাইলেও তাকে পুলিশ ঢুকতে দেবে না। এখন জনমনে প্রশ্ন উঠেছে কীভাবে এটা হলো। কোন অদৃশ্য শক্তি তা ঘটিয়েছে। এতো নিরাপত্তার চাদর ভেদ করে যে কা-টি ঘটেছে তা আতঙ্কিত হওয়ায়র মতোই ঘটনা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ