ঢাকা, শনিবার 21 July 2018, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এগারো বছরের সর্বনিম্ন পাসের হারের নেপথ্যে

স্টাফ রিপোর্টার : এইচএসসি, আলিম ও সমমানের পরীক্ষায় এবার গড় পাসের হার ৬৬.৬৪ শতাংশ। ২০১৩ সাল থেকে ক্রমান্বয়েই কমছে পাসের হার। আর এবার পাসের হার এগারো বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইংরেজি, আইসিটি ও মানবিক বিভাগে খারাপ ফল, নতুন পদ্ধতিতে যথাযথ খাতা মূল্যায়ন নিশ্চিত করার প্রভাব পড়েছে এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলে। পাশাপাশি গাইড বইয়ের উপর বাড়তি নির্ভরতায় ফল বিপর্যয়ের কারণ বলে মনে করছেন তারা। শুধু পাস করা দিয়ে নয়, শিক্ষার গুণগত মানের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন শিক্ষাবিদরা।
গত বৃহস্পতিবার এইচএসসি, আলিম ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। এবার মোট ১২ লাখ ৮৮ হাজার ৭৫৭ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। এর মধ্য পাস করেছে ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৮০১ জন। এবার গড় পাসের হার ৬৬.৬৪ শতাংশ। গত বছর পাসের হার ছিল ৬৮.৯১ শতাংশ। এর আগে পাসের হার ছিল ২০১৬ সালে ৭৪.৭০; ২০১৫ সালে ৬৯.৬০; ২০১৪ সালে ৭৮.৩৩; ২০১৩ সালে ৭৪.৩০; ২০১২ সালে ৭৮.৬৭; ২০১১ সালে ৭৫.০৮; ২০১০ সালে ৭৪.২৮; ২০০৯ সালে ৭২.৭৮ এবং ২০০৮ সালে ৭৬.১৯ শতাংশ।
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খাতা মূল্যায়ন করায় পাসের হার কমেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তিনি বলেন, আমরা মানসম্মত শিক্ষার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, তাই পাসের হার কমলেও সকল খাতা যাতে সঠিকভাবে মূল্যায়ন হয় সে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। আমরা এখন গুণগত মানের দিকে বেশি নজর দিচ্ছি। আমরা ভালো পরিবেশে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নিতে চাই।
এবার পাসের হার ও জিপিএ ৫-এর মতো অন্য কিছু সূচকও নিম্নগামী। এবার মোট জিপিএ ৫ পেয়েছে ২৯ হাজার ২৬২ জন। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৩৭ হাজার ৯৬৯। এবার শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪০০, গত বছর ছিল ৫৩২। কমেছে ১৩২টি। শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবার ৫৫, গত বছর ছিল ৭২, কমেছে ১৭টি।
এবার ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে খারাপ ফল করেছে শিক্ষার্থীরা। ইংরেজিতে ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৭৫.৪৮ শতাংশ, রাজশাহীতে ৭২.৬৭, কুমিল্লায় ৭৩.৩৫, যশোরে ৬৫, চট্টগ্রামে ৭৩.৭৪, বরিশালে ৭১.০৬, সিলেটে ৮২.৩৩, দিনাজপুরে ৬৫.৫১ ও মাদরাসা  বোর্ডে ৮৮.৮৯ শতাংশ। আর আইসিটিতে  বেশির ভাগ বোর্ডের ফলই ৮০-র ঘরে। আইসিটিতে ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৮২.৮৩ শতাংশ, রাজশাহীতে ৯৩.৫৪, কুমিল্লায় ৯২.১৫, যশোরে ৮৫.৬০, চট্টগ্রামে ৮৩.৯৪, বরিশালে ৮৭.৬১, সিলেটে ৯২.৪৬, দিনাজপুরে ৮৮.৩৩ এবং মাদরাসা বোর্ডে ৯৩.৯৯ শতাংশ।
এবার পদার্থবিজ্ঞানেও শিক্ষার্থীরা বেশ খারাপ করেছে। এই বিষয়টিতে কিছু শিক্ষার্থী খারাপ করার কারণে জিপিএ ৫ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। চট্টগ্রাম বোর্ডে এ বিষয়ে পাসের হার ৭৫.২৬ শতাংশ, দিনাজপুরে ৭৭.৪৪, বরিশালে ৭৮.৮৬, ঢাকায় ৮৬.১৫, রাজশাহীতে ৮৬.১০, কুমিল্লায় ৯২.৫০, যশোরে ৮১.১৩, সিলেটে ৯০.৩২ ও মাদরাসা বোর্ডে ৯৬.১১ শতাংশ।
এবার মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেকই ছিল মানবিক বিভাগে। এ বিভাগ থেকে পাঁচ লাখ ৬৪ হাজার ২৩১ জন অংশ নিয়ে পাস করেছে তিন লাখ ১৮ হাজার ৫৪৪ জন। মানবিকে পাসের হার ৫৬.৪৬ শতাংশ। গড় পাসের চেয়ে তা প্রায় ১০ শতাংশ কম। আর মানবিক থেকে জিপিএ ৫ পেয়েছে এক হাজার ৯৫৪ জন। তবে বিজ্ঞান বিভাগে এবার পাসের হার ৭৯.১৪ শতাংশ ও জিপিএ ৫ পেয়েছে ২১ হাজার ১৭১ জন। ব্যবসায় শিক্ষায় পাসের হার ৬৪.৫৫ শতাংশ ও জিপিএ ৫ পেয়েছে দুই হাজার ৪৩৭ জন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত বছর থেকে নতুন পদ্ধতিতে খাতা দেখছেন পরীক্ষকরা। এতে যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে। এবার পরীক্ষকদের একটি মডেল উত্তর দেওয়া হয়। কম লিখে কেউ যাতে বেশি নম্বর না পায় আবার ভালো লিখে কেউ যাতে বঞ্চিত না হয়, সে জন্যই এ ব্যবস্থা। পরীক্ষকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রধান পরীক্ষকরাও ১২ শতাংশ খাতা পুনর্মূল্যায়ন করেন।
বিজ্ঞানের কয়েকটি বিষয়ের ফলাফল এগিয়ে থাকলেও পদার্থবিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগের ফলাফলে কিছুটা ধস নেমেছে।
জানা যায়, সৃজনশীলে এখনো শিক্ষকরাই কাঁচা। এখনো অর্ধেক শিক্ষক নিজেরা সৃজনশীল প্রশ্ন করতে পারেন না। তাহলে এই শিক্ষকরা কিভাবে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতিতে পড়ালেখা করান? সেই প্রশ্নও তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। অথচ এবার ২৬টি বিষয়ে ৫০টি পত্রে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতিতে পরীক্ষা হয়েছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী যারা সৃজনশীল বোঝে না তারা পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করেছে।
শিক্ষাবিদরা যা বলেন: বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ক্লাস রুমে সঠিকভাবে লেখপড়া হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে নজর দিতে হবে। অভিজ্ঞ শিক্ষক দ্বারা সঠিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে কিনা তা নজরদারিতে আনা দরকার। সেগুলো না করে পরীক্ষার ফলের দিকে নজর রাখলে শিক্ষার জন্য উপকারি হবে না। শিক্ষার মান ক্রমশ নীচে নামছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষার মান নামছে, উঠছে না। পরীক্ষামুখী শিক্ষা গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষামুখী শিক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে। ক্লাসে সঠিকভাবে পড়াতে হলে কোচিংয়ে যেতে হবে না।
শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, গাইড বইয়ের উপর নির্ভরতা বেড়ে গেছে। এর ফলে অনেকে কাঙ্খিত ফল করতে পারেনি। ইতিপূর্বে দেখা গেছে, ইংরেজিতে যত সংখ্যক পাস করে ফল তেমনই হয়। এবারও তার ব্যতয় ঘটেনি। খাতার নাম্বার বাড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ থেকে এবার মন্ত্রণালয় বেড়িয়ে এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি এবার পরীক্ষার খাতা মূল্যয়নে নাম্বার বাড়িয়ে দেয়া কিংবা কমিয়ে দেয়ার কোন নির্দেশনা ছিলনা। ফলে শিক্ষকরা নিরপেক্ষভাবে খাতা দেখেছে।
উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষা আরও কঠিন হওয়া দরকার বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা ফেল করলে পড়ালেখার প্রতি মনোযোগ বাড়বে। তাই উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষা প্রশ্ন আরও কঠিন হওয়া দরকার। তবেই শিক্ষার্থীরা কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারবে। আমাদের দেশে এখনো বড়কাজের জন্য বিদেশিদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। দেশের সন্তানদের মেধাবী হিসেবে তৈরি না করতে পারলে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। আগে পাসের হার অনেক কম ছিল, পাসের হার যত বেড়েছে মেধার মূল্যায়ন ততই কমেছে।
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা বেগম বলেন, পাঠ্যবইয়ের চেয়ে নোট বই ও বিভিন্ন নোট সিটের উপর বেশি নির্ভরতা বাড়ার কারণে পরীক্ষায় ফলাফল খারাপ হচ্ছে। একইসঙ্গে পড়ালেখার মানও অবনতি হচ্ছে। শাহান আরা বেগম বলেন, কলেজগুলোতে এখন পাঠ্যবইয়ের চেয়ে নোট বই ও বিভিন্ন নোট সিটের উপর বেশি জোর দেয়া হয়। পাঠ্যবই তেমন পড়ানো হয় না। এতে করে শিক্ষার্থীরা এখন নোট সিটের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, আমরা যখন পড়ালেখা করেছি তখন নতুন বই পেলে গল্প ও ছড়াগুলো আনন্দ নিয়ে পড়তাম। এমন কি পরের দিন কোন অধ্যায় শিক্ষক পড়াবে তা আগের দিন পড়ে রাখতাম। যেখানে বুঝতাম না যে লাইন টিক দিয়ে রাখতাম। কিন্তু এখন শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবই পড়তে চায় না। পরীক্ষায় পাসের জন্য বিভিন্ন নোটের উপর নির্ভর করে বসে থাকে। এতে করে শিক্ষার্থীরা পাস করছে কিন্তু প্রকৃত মেধাবী হচ্ছে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ