ঢাকা, শনিবার 21 July 2018, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খেলা হোক সম্প্রীতি ও সৌভ্রাতৃত্বের

১৫ জুলাই শেষ হয়ে গেল বিশ্বকাপ রাশিয়া ‘১৮ ফুটবলের জমজমাট আসর। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ইটালি, জার্মানি, ইংল্যান্ড একেএকে বিদায় নেবার পর অনেকে ভেবেছিলেন এবার বিশ্বকাপের খেলা লবণ ছাড়া তরকারির মতো পানসে হয়ে গেল। কিন্তু না, কুড়ি বছর পর ফ্রান্স এবং নতুন ক্রোয়েশিয়া ফাইনালে উঠে আসায় দর্শকদের পানসে ভাবের অনেকটাই কেটে যায়। কে শিরোপা জিতবে? ফ্রান্স না ক্রোয়েশিয়া? সৃষ্টি হয় সবার মধ্যে  নতুন আগ্রহ। অনেকে মনে করেন বিশ্বকাপ এভার ফ্রান্সের ঘরে যাওয়া উচিত। আবার কেউ কেউ মনে করেন, না। নতুন হিসেবে ক্রোয়েশিয়া বিশ্বকাপ জিতলে মন্দ হয় না। ফাইনাল খেলা শুরুর কয়েক মিনিটে পেনাল্টি বক্সের কাছ থেকে  ক্রোয়েশিয়া একটা ফাউল করলে ফ্রান্স ফ্রিকিক পেয়ে যায়। অনিবার্যভাবে গোলটা ক্রোয়েশিয়ার জালে ঢুকে পড়ে। তবে প্রথমার্ধেই গোল পরিশোধ করে দেয় ক্রোয়েশিয়া। এরপর খেলা জমে ওঠে। পরে একটি বিতর্কিত হ্যান্ডবল। পেনাল্টি কিকে গোল দেয়া হয় ক্রোয়েশিয়াকে। ৩-১ গোলে এগিয়ে থাকে ফ্রান্স। ফ্রান্সের গোলির অসতর্কতার দরুন ক্রোয়েটরা এক গোল শোধ করতে পারলেও পরবর্তীতে ফ্রান্সের আরেক গোলে ক্রোয়েশিয়ার হার নিশ্চিত হয়ে যায়। পরে ক্রোয়েশিয়া প্রায় নিষ্প্রভ হয়েই শেষপর্যন্ত খেলে। রেফারির শেষ বাঁশি বাজবার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায় এবারকার মতো ক্রোয়েশিয়ার বিশ্বকাপ জেতার আশাও।
পুরস্কার বিতরণের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। ফিফার সভাপতি ইনফাস্তিনো মঞ্চে। আছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন, ক্রোয়েশিয়ার মহিলা প্রেসিডেন্ট কোবান্দ গ্রাবার কিতারভিচ, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাকরনসহ অন্যরাও। সবাই প্রস্তুত। কিন্তু হঠাৎ নেমে এলো আকাশ ভেঙে বৃষ্টি। অথচ মস্কোর আকাশে বৃষ্টির নামগন্ধ ছিল না। কোত্থেকে এলো এতো বৃষ্টি? দর্শকরা বলছেন: এ বৃষ্টি ক্রোয়েশিয়ার কান্না। তবে ফ্রান্সের সমর্থকরা বলছেন: এ বৃষ্টি হলো জয়ের আনন্দধারা। বিশ্বকাপ জয়ে আকাশও নাকি আনন্দের ফোয়ারা ছুটিয়েছে। বৃষ্টি ছড়িয়েছে মস্কোর আকাশজুড়ে। সে যাই হোক, সমাপনি মঞ্চের সবাই ভিজে জুবুথুবু। ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট কোবান্দ গ্রাবা দারুণ খুশি। তার দল ফাইনালে খেলেছে। বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। তাতে কী হয়েছে? যদিও খেলাশেষে ক্রোয়েট দলের কেপ্টেইনকে সান্ত¡না দিতে গিয়ে তিনি নিজেও কেঁদে ফেলেন। যাই হোক, তুমুল বৃষ্টির মধ্যেই পুরস্কার বিতরণ শুরু হলো। ফিফার কর্মীরা এসে মাথায় ছাতা ধরলো। ক্রোয়েশীয় প্রেসিডেন্ট ছাতা সরিয়ে দিলেন। ফিফার সভাপতি নিজের টাকমাথা বারবার হাত দিয়ে মুছছিলেন। ভ্লাদিমির পুতিনের মাথায়ও ছাতা ধরলো তাঁর নিরাপত্তা কর্মীরা। ঝমাঝম বৃষ্টিতেই চললো পুরস্কার প্রদানের কার্যক্রম। থেমে থাকা নেই। ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে ফাইনাল জিতলো ফ্রান্স। তাই আনন্দে সবাই সিক্ত হচ্ছেন। কোনও কার্পণ্য নেই। পরাজিত ক্রোয়েশীয় খেলোয়াড়রাও ভিজলেন। তবে তাঁদের শরীর ভিজলো। বৃষ্টিভেজা কান্না দেখলেন সব। কিন্তু ক্রোয়েটদের মন যেন ভিজলো না কিছুতেই। কোথায় যেন খানিকটা শূন্যতা থেকে গেল তাদের। এরই মধ্যে শুরু হলো আতশবাজির স্ফুরণ। পুরোমঞ্চে যেন সোনার বৃষ্টি নামলো। সোনালি রঙের ফুলঝুরিতে সবুজ মাঠ ভরে গেল ক্ষণিকের জন্য। সবাই হাসলো। উল্লাস করলো। নাচলো। কিন্তু ক্রোয়েশিয়ার সমর্থকরা একচুলও নড়লেন না। একটুও হাসলেন না। ফ্রান্স সোনার কাপ নিয়ে নাচানাচি করলো। কোচ-খেলোয়াড়ে কাড়াকাড়ি চললো। ফরাসি আনন্দোৎসব আর ক্রোয়েটদের ফিরে যাবার গল্প নিয়েই শুরু হলো আরেকটি নতুন বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখা।
খেলায় হারজিত থাকবেই। একপক্ষ জিতবে। অন্যপক্ষ হারবে। এটাই খেলার নিয়ম। বিশেষত বিশ্বকাপের খেলা অমীমাংসিত রাখবার নিয়ম নেই। নির্ধারিত সময়ে হারজিত হলে ভালো। না হলে খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। এতে ফয়সালা না হলে টাইব্রেকার। অর্থাৎ হারজিত খেলায় থাকবেই। অতএব হারজিত বড়কথা নয়। খেলায় অংশগ্রহণই বড়কথা। ক্রোয়েশিয়া বিশ্বকাপে প্রথম এসেই ফাইনালে খেলতে পারলো এও কিন্তু কম প্রাপ্তি নয়। ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্টও তেমনটাই মনে করেছেন। ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগরেভেও আনন্দ করেছে মানুষ। কিন্তু প্যারিসে ঘটেছে অনাকাক্সিক্ষত কা-। সেখানে মানুষ মারামারি করেছে। উল্লাসের নামে বাড়াবাড়ি হয়েছে। দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে। টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করতে হয়েছে পুলিশকে। এটা সভ্যতার পরিচায়ক নয়। বরং এটা বিজয়কেই কলঙ্কিত করা। খেলা খেলাই। জিতলে সীমা ছাড়িয়ে যেতে হবে আনন্দে অথবা হারলে কেঁদেকেটে ব্যাকুল হয়ে পড়তে হবে এমন নয়। তাহলে আর খেলা কেন? খেলাকে খেলা হিসেবেই নেয়া উচিত সবার। তাই খেলা হোক সম্প্রীতি এবং সৌভ্রাতৃত্বের। নির্মল বিনোদন ও আনন্দের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ