ঢাকা, শনিবার 21 July 2018, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কুরআনের প্রথম বঙ্গানুবাদক কে?

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : পবিত্র কুরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদ করেন কে? এমন প্রশ্নে অবাক হতে পারেন অনেকেই। এর কারণ হচ্ছে সকলেই জানেন যে, বাবু গিরিশচন্দ্র সেন কুরআনের প্রথম বাংলায় অনুবাদ করেছেন। এ তথ্য অনেক বই-পুস্তকে পাওয়া যায়। অনেকে বিভিন্ন সভাসমাবেশ, সেমিনারেও এতথ্য পরিবেশন করে বিভ্রান্তি ছড়ান। এমনকি পাঠ্যপুস্তকেও দুঃখজনকভাবে এতথ্য পাওয়া যায়। শুধু কি তাই? সরকারি প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত গিরিশচন্দ্র সেনের জীবনী বিষয়ক পুস্তিকাতেও তাঁকে কুরআন শরীফের প্রথম বাংলা অনুবাদক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য এটা নয়।
সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় কুরআন আংশিক অনুবাদ করেন মাওলানা আমীরুদ্দীন বসুনিয়া ১৮০৮ সালে। এরপর বাংলা ভাষায় কুরআন পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ করেন মৌলভী নঈমুদ্দীন ১৮৩৬ সালে। গিরিশচন্দ্র সেন শুধু উক্ত অনুবাদ পুস্তক আকারে সন্নিবেশ করেন। তাই গিরিশচন্দ্র সেন হচ্ছেন প্রকাশক মাত্র। তাও ৫০ বছরপর ১৮৮৬ সালে। সুতরাং কুরআন শরীফের প্রথম বাংলা অনুবাদক গিরিশচন্দ্র সেন নন। বরং মৌলভী নঈমুদ্দীনই পূর্ণাঙ্গ কুরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদক। আর মাওলানা আমীরুদ্দীন বসুনিয়া হলেন বাংলভাষায় প্রথম কুরআনের আংশিক অনুবাদক।
উল্লেখ্য, গিরিশচন্দ্র সেনের জন্ম ১৮৩৫ এবং মৃত্যু ১৯১০ সালে। গিরিশচন্দ্রের জন্মেরও আগে অর্থাৎ ১৮০৮ সালে কুরআন বাংলায় অনুবাদের কাজ শুরু করেন মাওলানা আমীর উদ্দীন বসুনিয়া। এরপর গিরিশচন্দ্র সেনের জন্মের এক বছর পরই অর্থাৎ ১৮৩৬ সনে মৌলভী নঈমুদ্দীন পূর্ণাঙ্গ কুরআনের বাংলা অনুবাদ সম্পন্ন করেন। মৌলভী নাঈমউদ্দীন সম্পর্কে তাঁর ছেলে মৌলভী রোকনউদ্দীন আহমদ তাঁদের কুরসিনামা থেকে যেসব তথ্য পরিবেশন করেছেন তাতে দেখা যায়: তাঁদের পূর্বপুরুষ শাহ সৈয়দ মুহাম্মদ খালেদ বাগদাদ থেকে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমন্ত্রণে দিল্লী আসেন। তাঁর অধঃস্তন পঞ্চমপুরুষ সৈয়দ মুহাম্মদ তাহের দিল্লী থেকে শিক্ষকতার উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসেন। এরপর বিবাহ সম্পন্ন হয় এবং মানিকগঞ্জের গালা গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বংশধররা ‘সৈয়দ’ উপাধি পরিত্যাগ করেন এবং গালা গ্রাম থেকে টাঙ্গাইলের করটিয়ার কাছে সুরুজ গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন। মৌলভী মুহাম্মদ নঈমউদ্দীন সুরুজ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সলিমউদ্দীন এবং মাতা তাহেরা বানু।
পিতার কাছ থেকে আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষা শিক্ষা লাভের পর উচ্চশিক্ষার জন্য নঈমউদ্দীন ঢাকা চলে আসেন এবং আট বছর কাল এক বিশিষ্ট আলেমের তত্ত্বাবধানে থেকে আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় এবং হাদিস, তাফসির, ফিকাহ ও মান্তেক প্রভৃতি শাস্ত্রে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। এরপর তিনি বিহার, এলাহাবাদ, মুর্শিদাবাদ, জৌনপুর, আগ্রা, দিল্লি প্রভৃতি স্থানে অবস্থান করেন। এসব স্থানের খ্যাতনামা আলেমদের কাছ থেকে অগাধ দীনিইলম আয়ত্ত করেন। তিনি তাঁর সর্বশেষ উস্তাদের কাছ থেকে আলিম-উদ-দহর বা জ্ঞানসমুদ্র উপাধি লাভ করে ৪১ বছর বয়সে টাঙ্গাইলে ফিরে আসেন। সত্যিকার অর্থেই তিনি ছিলেন  জ্ঞানসুমদ্র। সেসময় হিন্দুসমাজে যেমন ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মুসলিম সমাজে তেমনই ছিলেন মৌলভী মুহাম্মদ নঈমউদ্দীন।
মৌলভী নঈমউদ্দীনের অর্থসম্পদ ছিল না ঠিক। তবে ছিল জ্ঞান এবং সমাজসেবা করবার মতো তাঁর বিশাল হৃদয়। সেকালের করটিয়ার প্রখ্যাত জমিদার হাফেজ মাহমুদ আলী খান পন্নী তাঁকে সহযোগিতা করবার জন্য এগিয়ে আসেন। করটিয়ায় তিনি স্থাপন করেছিলেন ‘হাফেজ মাহমুদিয়া যন্ত্র’ নামে একটি প্রিন্টিং প্রেস। এ প্রেস তিনি তাঁকে ব্যবহার ও পরিচালনা করতে দিয়েছিলেন। এখান থেকে মৌলভী নঈমউদ্দীন ‘আখবারে এসলামিয়া’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এতে ইসলামের বিভিন্ন দিক নিয়ে ফিচার ও মুসলিমজাহানের বিশেষ খবরাদি ছাপা হতো। এর প্রতিসংখ্যার সম্পাদকীয় কলামটি ছিল খুব আকর্ষণীয়। তাঁর সমাজ সংস্কারমূলক কাজগুলো পাঠকসমাজে দারুণ সাড়া জাগায়। ‘আখবারে ইসলামমিয়া’ মুসলিম সম্পাদিত পত্রিকাগুলোর মধ্যে ছিল উল্লেখযোগ্য। তৎকালে কোলকাতা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সারাদেশে চলতো এ পত্রিকা।
মীর মশাররফ হোসেন এবং মৌলভী নঈমউদ্দীন ছিলেন সেসময়ের দু’জন বিশাল ব্যক্তিত্ব। চিন্তাচেতনা ও জীবনদর্শনের কারণে পৃথক দু’টি ধারায় সাহিত্য রচনা করেন তাঁরা। বলতে গেলে দু’জন ছিলেন দুই দিগন্তের অধিবাসী। মীর মশাররফ হোসেনের ‘গোজীবন’ নামে ৬৬ পৃষ্ঠার একটি বই প্রকাশিত হলে এর কঠোর সমালোচনা করে নঈমউদ্দীন আখবারে এসলামিয়াতে ফতোয়া প্রকাশ করেন। এতে আখবারে এসলামিয়া সম্পাদক ও মীর মশাররফ হোসেনের মধ্যে কলমযুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধ শুধু টাঙ্গাইল-করটিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলা ভারতের বিভিন্ন স্থানে এর প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তখনকার বিখ্যাত পত্রিকা ‘সুধাকর’ মীর মশাররফ হোসেনকে সমর্থন করেনি। এ বিরোধের কথা উল্লেখ করে মুন্সী মুহাম্মদ রেয়াজুদ্দীন আহমদ বলেন :
‘যখন প্রধান সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন ‘গোজীবন’ নামক পুস্তক লিখিয়া মুসলমানদিগের গোমাংস ভক্ষণ ও গো কুরবানির বিরুদ্ধে অন্যায় দোষারোপ করিয়া তীব্র মন্তব্য প্রকাশ করেন এবং তদুত্তরে অন্যতম সাহিত্যিক ও ধর্মগ্রন্থ প্রণেতা আখবারে এসলানিয়ার সম্পাদক মৌলভী নঈমউদ্দীন সাহেব ঐরূপ গ্রন্থলেখক মুসলমানের ওপর কাফেরী ফতোয়া দিয়া আখবারে এসলামিয়াতে তা প্রকাশ করিলে মীর সাহেব মৌলবী সাহেবের নামে আদালতে মানহানির মামলা দায়ের করেন। তখন আমরা সুধাকরে অবশ্যই মৌলভী সাহেবের পক্ষ সমর্থন করিতেছিলাম। কিন্তু প-িত (রেয়াজুদ্দীন আহমদ মাশহাদী) সাহেবও এ বিষয়ে আমাদিগকে বিশেষভাবে উজ্জীবিত করিয়া ধর্মের পবিত্র মর্যাদা রক্ষা করিতে অনুরোধ করিয়াছিলেন। তিনি বিপন্ন মৌলভী সাহেবকে নানাপ্রকার সাহায্য করিতে কুণ্ঠিত ছিলেন না। এ ক্ষেত্রে মীর সাহেবের দিকে তিনি আদৌ দৃকপাত করেন নাই।’
মৌলভী নঈমউদ্দীন মীর মশাররফ হোসেনকে কাফের ফতোয়া দিলে টাঙ্গাইল থেকে মীর মশাররফ হোসেন সাহেবের সম্পাদনায় পাক্ষিক হিতকরীতেও বাদানুবাদ শুরু হয় এবং তা দীর্ঘকাল চলে। তারপর পন্ডিত রেয়াজুদ্দীন আহমদ মাশহাদীর চেষ্টাতে শেষপর্যন্ত উভয় পক্ষের একটা মিটমাট হয়ে যায়। মীর সাহেব ‘গৌজীবন’ পুনঃমুদ্রিত করবেন না বলে আশ্বাস দিলে মৌলভী সাহেব তাঁর তারিফ করেন। আদর্শের দিক থেকে দুই সাহিত্যেকের মধ্যে কলমযুদ্ধ হলেও ব্যক্তিজীবনে তাঁদের মধ্যে আন্তরিকতা ছিল প্রচুর। প্রায়ই তাঁরা একত্র মিলিত হয়ে পারিবারিক সুখ-দুঃখ থেকে মুসলমানদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন।
মৌলভী নঈমউদ্দীনের জীবনের সবচেয়ে বড় কাজ, আল কুরআনের বঙ্গানুবাদ। তাঁর অনুবাদের প্রত্যেকটি আয়াতের অংশসমূহ আলাদা আলাদাভাবে আরবি হরফে মুদ্রিত করে তার নিচে সে অংশের বাংলা তরজমা এবং অপেক্ষাকৃত ছোট অক্ষরে ব্যাখ্যা ও বিস্তৃত তফসির করেছেন। তাঁর অনূদিত কুরআন শরীফ প্রথম খণ্ড ১৮৯১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় খণ্ডের প্রথম সংস্করণ ১৮৯২ সালে হাফেজ মাহমুদ আলী খান পন্নী জমিদার সাহেবের সহায়তায় করটিয়ার মাহমুদিয়া প্রেস থেকে ছাপা হয়। এই প্রেস থেকে তৃতীয় খণ্ডও প্রকাশিত হয়। তৃতীয় খণ্ড ছাপা হবার পর তিনি কোলকাতা চলে যান এবং জলপাইগুড়ির জমিদার খানবাহাদুর রহিম বক্স খানের অর্থানুকূল্যে তাঁর অনূদিত কুরআন শরীফের ৭ম, ৮ম ও ৯ম পারা পর্যন্ত প্রকাশ করেন। ১০ম পারা মুদ্রণ শেষ হবার আগেই ১৯০৮ সালে ২৩ নবেম্বর মৌলভী নঈমউদ্দীন ইন্তিকাল করেন। তিনি সর্বমোট তেইশ পারা পর্যন্ত অনুবাদ করেন। অবশিষ্ট অংশ তাঁর পুত্র কাসেমউদ্দীন ও ফখরউদ্দীন আহমদকে অনুবাদ ও প্রকাশ করবার নির্দেশ দিয়ে যান।
মৌলভী নঈমউদ্দীন ফতোয়ায়ে আলমগিরি বাংলায় অনুবাদ করে চার খণ্ডে প্রকাশ করেন। তিনি বুখারী শরীফেরও অনুবাদ করেন।
অন্যান্য রচনাবলী : মৌলভী নঈমউদ্দীন রচিত আরও কিছু পুস্তক রয়েছে। এগুলো হচ্ছে :
১. কালেমাতল কোফর, ২. এছাবাতে আখের জ্জোহর, ৩. এনসাফ, ৪. রফা-এদায়েন, ৫. আদেল্লায়ে হানিফিয়া, ৬. মায়াদানোল ওলুম, ৭. ইউসুফ সুরার সুবিস্তৃর্ণ তফসির, ৮. সেরাতল মস্তাকিম, ৯. সেরাতল মস্তাকিম (নব পর্যায়), ১০. ধর্মের লাঠি, ১১. বেতের, ১২. তারাবিহ।
এগুলো ছাড়াও পুঁথির ভাষায় এবং পুঁথির আদর্শে আরও কয়েকটি জীবনচরিত লিখেছিলেন। এগুলো হচ্ছে : ১. ছহী শাহ আলমের কিচ্ছা, ২. ছহী শের সাহেবের কিচ্ছা, ৩. ছহী আলমগীরের কিচ্ছা, ৪. ছহী নূরজাহান বেগমের কিচ্ছা, ৫. ছহী আলাউদ্দীনের কিচ্ছা, ৬. ছহী হোসেন শাহের কিচ্ছা, ৭. গোকাণ্ড।
মৌলভী নঈমউদ্দীন তাঁর আরদ্ধ কাজ সম্পন্ন করে যেতে না পারলেও মুসলিমসমাজে আল কুরআনের প্রথম বঙ্গানুবাদক হিসাবে অক্ষয় হয়ে আছেন। এই মহাপুরুষের কর্মতৎপরতায় বাংলার অনেক অমুসলিম তখন ইসলাম সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং মুসলিমদেরও বহু ভ্রান্ত ধারণা দূর হয়। সেসময় মুসলিমসমাজে তাঁর মতো অসাধারণ জ্ঞানী আলেম এবং বহু গ্রন্থপ্রণেতা ও অনুবাদক আর কেউ ছিলেন না। সুবক্তা হিসেবেও তিনি সারাদেশে খ্যাতি অর্জন করেন। সব তথ্য-উপাত্ত ইন্টারনেটের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ