ঢাকা, শনিবার 21 July 2018, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মাদক বাণিজ্য ও অপব্যবহার ভয়ংকর মাত্রায়

জিবলু রহমান : [নয়]
এরপর জনি নামের নিরীহ এক ব্যক্তিকে আটক করে থানায় হাজির হন। তাকে আসামি দেখিয়ে মামলা সাজানোর প্রস্তুতির মধ্যেই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে মাঠে নামে নারায়ণগঞ্জ গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
নারায়ণগঞ্জ ডিবির এসআই মাসুদের নেতৃত্বে আটজনের একটি টিম মদনগঞ্জে এএসআই সারোয়ার্দির বাসায় হানা দেয়। কিন্তু তাকে সেখানে পাওয়া যায়নি। পরে নারায়ণগঞ্জ সদর থানা থেকে সারোয়ার্দিকে গ্রেফতার করা হয়।
এ সময় তার পকেটেই পাওয়া যায় ৫ হাজার ইয়াবা। পরে তার বাসায় তল্লাশি চালিয়ে আরও ৪৫ হাজার ইয়াবা ও ৪ লাখ ৯৫ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পরদিন ৮ মার্চ মাদকদ্রব্য আইনে মামলা করে পুলিশ। মামলাটি প্রায় ১ মাস তদন্ত করে নারায়ণগঞ্জ ডিবি।
এরপর উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে ৫ এপ্রিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির কাছে মামলা হস্তান্তর করা হয়। এ মামলায় এখন পর্যন্ত দু’জন এসআই ও এএসআই পদমর্যাদার ৩ কর্মকর্তা এবং এক কনস্টেবলসহ চার পুলিশসহ নয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ঘটনার পর এসআই বেলাল উদ্দিন মুন্সীগঞ্জ থেকে রাজবাড়ি হাইওয়ে পুলিশে বদলি হন। ১৫ মে তাকে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজির কার্যালয় থেকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া এসআই মোর্শেদকে ২০ মে নরসিংদীর বেলাবো থানা থেকে এবং কনস্টেবল আসাদকেও ১৫ মে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় সিআইডি।
৮ মার্চ মামলা হওয়ার পর একে একে মাদক ব্যবসায় জড়িত অসৎ পুলিশ কর্মকর্তাদের নাম বেরিয়ে আসতে শুরু করে। ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন আসামিদের কেউ কেউ। এরই মধ্যে হঠাৎ জামিন হয়ে যায় মুন্সীগঞ্জের ইয়াবা ডন আরিফের। এরপর ২৫ এপ্রিল রাতে মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশের সঙ্গে ক্রসফায়ারে মারা পড়েন তিনি।(সূত্র : দৈনিক যুগান্তর ১ জুন ২০১৮)
শুধু রাজধানী নয়, সারাদেশে মাদক নির্মুল অভিযানে যাওয়ার আগেই আগাম তথ্য পুলিশের এক শ্রেণির কর্মকর্তা সোর্সের মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। এ কারণে অধিকাংশ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী গা-ঢাকা দেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে তারা ধরাছোয়ার বাইরেই থাকছেন। আর যারা ধরা পড়ছে তাদের বেশিরভাগ সেবনকারী ও খুচরা বিক্রেতা।
বড় মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক শ্রেণির কর্মকর্তার সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। নিয়মিত তারা বড় অঙ্কের টাকা পেয়ে থাকেন। মাদকের গডফাদাররা গ্রেফতার না হওয়ার মূলে রয়েছে অভিযানের আগাম তথ্য ফাঁস হওয়া।
কয়েকবছর আগে সংবাদপত্রে শিরোনাম হয়েছিল-দুদক কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি’র সম্পদ অনুসন্ধান করছে। প্রাথমিক তদন্তে দুদক তথ্য পেয়েছে যে, মিয়ানমারের সঙ্গে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের আড়ালে চোরাইপথে ইয়াবা ব্যবসা হলো বদির মূল ব্যবসা। অবৈধভাবে ইয়াবা ব্যবসা করে সম্পদ গড়ে তুলেছেন তিনি। (সূত্র : দৈনিক ইনকিলাব ২৩ মার্চ ২০১৪)
সংবাদপত্রে প্রকাশ, প্রায় সাড়ে তিনশ’ কোটিপতি মাদক ব্যবসায়ীর তালিকা নিয়ে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ইতিমধ্যে তালিকার দেড় শতাধিক মাদক ব্যবসায়ীর সম্পদের অনুসন্ধান কাজ শুরু হয়েছে। কঠোর নজরদারিও চলছে। অনুসন্ধান কর্মকর্তাদের কাজ তদারকির জন্য দু’জন পরিচালকের নেতৃত্বে গঠিত পৃথক দুইটি টিম কাজ করছে।
দুদকের উপ পরিচালক (জনসংযোগ) প্রনব ভট্টাচার্য্য বলেছেন, দুদকের নির্ধারিত কার্যক্রমের আওতায় মাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কোন সুযোগ নেই। তবে যারা মাদক ব্যবসা করে অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে দুদকের ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা রয়েছে। যাদের কারণে সমাজের সাধারণ মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে তাদের ব্যাপারে দুদক কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
অবৈধ সম্পদের পাহাড়গড়া ১৪১ মাদক ব্যবসায়ীর তালিকা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর দুদককে দিয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের তৈরি করা রাজধানীর শীর্ষ ৮২ মাদক ব্যবসায়ীর তালিকা দুদক সংগ্রহ করেছে। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা থেকে আরো ১১০জন মাদক ব্যবসায়ীর তালিকা পেয়েছে দুদক। এর বাইরে দুদকের কাছে সরাসরি কয়েকজন কোটিপতি মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে।
এ তালিকায় চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীর পাশপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় সহায়তা করে অঢেল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া দুদকের এ তালিকায় কক্সবাজার ও খুলনা এলাকার দুইজন সংসদ সদস্যের নাম রয়েছে। এর বাইরেও দুদকের তালিকায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কয়েকজন রাজনীতিবিদের নামসহ বড় বড় ব্যবসায়ীর নাম রয়েছে। এসব ব্যবসায়ী ভিন্ন ব্যবসার আড়ালে মাদক ব্যবসা করেন।
দুদকের অনুসন্ধানে চট্টগ্রামের মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে নিজ নামে, স্ত্রীর নামে, শ্বশুর বাড়ির আত্মীয়দের নামে জমি-ফ্ল্যাট ক্রয় এবং ব্যাংকে কোটি টাকা গচ্ছিত রাখার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বারিধারার সহিদুজ্জামান ওরফে নাভিদ, মোহাম্মদপুরের এশতিয়াক, মিরপুরের নজরুলসহ (২৭ মে ২০১৮ রাতে পুলিশের বন্দুক যুদ্ধে নিহত) ৩২জনের অবৈধ সম্পদের খোঁজ পেয়েছে কমিশন। এছাড়া নারায়নগঞ্জের শাহীন ওরফে বন্ধক শাহী, বজলুর রহমান, কক্সবাজারের শিলাবনিয়া পাড়ার হাজি সাইফুল করিম, টেকনাফ পৌরসভার মেয়র হাজি মোহাম্মদ ইসলাম, প্যানেল মেয়র মজিবর রহমান, ওই পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার রাকিব আহমেদ, টেকনাফের লামা বাজারের মিসেস উয়ালী, আলিয়াবাদের আব্দুস শুকুর, মিরবানিয়া পাড়ার হায়দার আলী, জালিয়া পাড়ার ফরিদ আহমেদ, টেকনাফের আমিন জিয়াউর রহমান, রাশেদ, সফিক, সাহেদুর রহমান, ফেনীর পেয়ার আহমেদ, ছালাহ উদ্দিন, জিয়াউর আলম, আমজাদ হোসেন, ইসমাইল হোসেন, লক্ষ্মীপুরের আলী হোসেন, শাহ আলম মিন্টু, ফরিদুপরের বোয়ালমারীর মিজানুর রহমানসহ রাজশাহীর ২২জন কোটিপতি শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের খোঁজ পেয়েছে দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তারা। (সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক ২৯ মে ২০১৮)
রাজধানীতে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে ১১৬ নারী ও পুরুষ। এদের মধ্যে কেউ কেউ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানে গ্রেফতার হলেও অধিকাংশই রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ধুরন্ধর এই মাদক ব্যবসায়ীরা পর্দার আড়ালে থেকে তাদের নিয়োগ করা লোকদের মাধ্যমে এ ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মেট্রো উপ-অঞ্চলকে ঢাকা মহানগরীর মাদক ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করতে ১৪টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। এসব অঞ্চলে যারা মাদক ব্যবসায় জড়িত, তাদের একটি তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। এসব এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের সহযোগীদের গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে অভিযান শুরু হয়েছে।
রাজধানীতে প্রধান ১৪টি চক্র মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। যদিও এরা কেউ সরাসরি মাদকের স্পটে উপস্থিত থাকে না। সহযোগীদের দিয়ে তারা দীর্ঘদি ধরে এ ব্যবসায় চালিয়ে আসছে। তালিকা অনুযায়ী রাজধানীতে হেরোইনের ব্যবসা করছে কামরাঙ্গীরচরের পাকাপুল এলাকার হানিফ, আশরাফাবাদের ইদ্রিস, বাড্ডার শহিদুল ইসলাম, কল্পনা, জোসনা ওরফে রাবেয়া, শাহিদা আক্তার, লাইলি, মর্জিনা, গুলবাহার, বাড্ডার তাঁতারকুল পাকুরপাড়ের কিরণ মিয়া, পাপিয়া বেগম পক্ষী, উত্তর গোড়ানের ভম্বর, বারিধারা নতুনবাজারের পুষ্প বেগম, সূত্রাপুরের শরৎগুপ্ত রোডের মালু মিয়া, হেলোনী বেগম, নীলক্ষেত বাবুপুর বস্তির মিনারা বেগম, নাছিমা বেগম, গনকটুলি সুইপার কলোনির আলী হোসেন, হাফিজ উদ্দিন, মনেশ্বর রোড ১ নম্বর লেনের আরমান, পল্লবীর হাফিজ উদ্দিন, মোস্তাক ও আগারগাঁওয়ের আবুল হোসেন লিটন। ইয়াবা-ব্যবসা করছে সিদ্ধেশ্বরীরর আলমগীর হোসেন, সাইফুল আজম জনি, শাহরিয়ার ইমন, মালিবাগের ফারুকুজ্জামান, বড় মগবাজারের বাশার, মিরপুরের জগলুল পাশা পাপেল, গুলশানের জুয়েল ও তাল।
আগাম তথ্য ফাঁসের প্রেক্ষিতে এখনো রাজধানীর অলিগলি, পাড়া-মহল্লায় অবাধে বিক্রি হচ্ছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের একসময়ের বাসিন্দা ইশতিয়াক মাদক কারবারি হিসেবে চিহ্নিত। রাজধানীতে ইয়াবার পাইকারি কারবার শুরু করার ১০ বছর পর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) গোয়েন্দারা তাকে শনাক্ত করে, তবে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। বহু কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া ইশতিয়াকের নাম আছে ডিএনসিসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তালিকায়। তবে অভিযানের আগাম তথ্য পায় বলে সে এখনো ধরাছোয়ার বাইরে। রাজধানীর গুলশানের কড়াইল, কমলাপুরের টিটিপাড়া বস্তি ও কাওরানবাজার রেললাইন সংলগ্ন বস্তিতে অভিযান পরিচালনার তথ্য আগেই পেয়ে যায় মাদক ব্যবসায়ীরা। এ কারণে অনেক শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী পালিয়ে যায়।
ফেনসিডিল ব্যবসা করছে পুরান ঢাকার লালবাগ থানার ললিতমোহন দাস লেনের ওয়াসিম, ক্ষিলক্ষেত বটতলার আবু সাঈত, গোপীবাগের আরিফুল ইসলাম পিপন, নীলক্ষেতের বাটপার খোকন, শাহীদ পাইন, যাত্রাবাড়ীর কাজলার আহাদ, শ্যামপুর আইজি গেটের মোখলেছ ওরফে মোকা, শুক্রাবাদের নিজাম উদ্দিন ওরফে মিজু, পল্লবীর বাহার ও শাহিদ।
মাদকের মধ্যে চরস বিক্রি করছে মৌলভীবাজারের জসিম টিডিজেসিক ইনজেকশন বিক্রি করে লালবাগের হোসেনী দালান এলাকার সাইদও মোবা।
কারাগার হলো সংশোধনের জায়গা। অথচ সেই কারাগারে বসেই চলছে রমরমা মাদক ব্যবসা। সন্ত্রাসী ও অপরাধীরা কারাগারে থেকে অবাধে চালাচ্ছে মাদক ব্যবসা। একই সঙ্গে তারা নিয়মিত মাদক সেবনও করে যাচ্ছে। মাদক সেবন ও ব্যবসায় সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন কারাগারগুলোতে দায়িত্বে থাকা শতাধিক কর্মকর্তা ও কারারক্ষী। এমন অভিযোগ ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে এসেছে। কারাগারে বন্দিদের মাদক সরবরাহে বিভিন্ন কারা কর্মকর্তা ও কারারক্ষীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নানা সময়েই উঠেছে। অভিযান শুরু হওয়ার পর আস্তে আস্তে সকল তথ্য বের হয়ে আসছে। মাদক সেবন ও পাচারে জড়িত থাকার অভিযানে ইতিমধ্যে কয়েকজনকে চাকরিচ্যুত ও শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। ২৯ মে ২০১৮ তিনজনকে চাকরিচ্যুত এবং ১৪ জনকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। কারা অধিদপ্তরের উপ মহাপরিদর্শক তৌহিদুল ইসলাম বলেছেন, মাদক সংরক্ষণ, সেবন এবং বন্দিদের সরবরাহ করার অভিযোগে ব্যবস্থা গত এক বছর ধরেই নিচ্ছেন তারা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ