ঢাকা, শনিবার 21 July 2018, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

‘মৃত্যু ফাঁদে’ পরিণত হয়েছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথ

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথের দুইধারে এভাবে অবৈধ দখলদারের কারণে অহরহ ঘটছে দুর্ঘটনা

কামাল উদ্দিন সুমন : মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হয়েছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের রেলপথ। আইন ভঙ্গ করে ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রেলের ইঞ্জিনের সামনে এবং বগির ছাদে উঠে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী চলাচল করলেও তা রোধ করা যাচ্ছেনা। এছাড়া ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের রেলপথের ২২ কিলোমিটারের বেশীর ভাগ স্থানে অবৈধ দখলদারের ফলে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। রেলপথের দুইধার দখল করে গড়ে উঠেছে কাঁচা বাজার। ফলে দুর্ঘটনা আরো বড়ছে। এ অবস্থায় জনগণকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি লোকবল বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করে রেল কর্তৃপক্ষ ও রেলওয়ে থানা পুলিশ।
রাজধানীর কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ২২ কিলোমিটারের রেলপথে স্টেশন রয়েছে ছয়টি। সকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে রাত সোয়া এগারোটা পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি তিনটি ট্রেন ৩২ বার যাতায়াত করে। প্রতিদিন আনুমানিক ৩০ হাজার যাত্রী ট্রেনের ভেতরে, ইঞ্জিনে ও বগির উপরে বসে যাতায়াত করে থাকেন।
প্রতি ঘন্টায় ট্রেন থাকা সত্ত্বেও স্বল্প সময়ে যাতায়াতের সুবাদে যাত্রী সংখ্যা বেশি হওয়ায় চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। টিকিট কেটেও যাত্রীরা বসার সিট পাচ্ছেননা। দুর্ভোগ কমাতে ও দুর্ঘটনা রোধে ট্রেনের বগি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন যাত্রীরা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ইঞ্জিন ও বগির উপরে বসে চলাচল করছে আরো শত শত মানুষ। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটছে। সমস্যা স্বীকার করে যাত্রীদের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি বগি ও লোকবল বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা জানালেন নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশন সিনিয়র স্টেশন মাস্টার গোলাম মোস্তফা। তিনি বলেন, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথে গত এক বছরে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় ৩৬ জন।
এদিকে কমলাপুর থেকে নারায়ণুগঞ্জ নগরীর ১নং রেল গেইট পর্যন্ত প্রায় সময় ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। এ রেলপথকে ‘মৃত্যুকূপ’ হিসেবেই মনে করেন অনেকে। কমলাপুর থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথের দুই পাশে গড়ে উঠেছে একাধিক কাঁচা বাজার। এর মধ্যে জুরাইন, দোলেশ্বর বউবাজার, পাগলা, আলীগঞ্জ, ইসদাইরসহ বিভিন্ন এলাকায় রেলপথ দখলকরে গড়ে উঠেছে শতাধিক কাঁচ বাজার। প্রতিনিয়ত রাস্তা পারাপারের সময় দুর্ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে নানা ক্ষোভ, নানা প্রশ্ন থাকলেও এর কোনো সুরাহ হয়নি। প্রাণ যাচ্ছে আকালে, দু’দিন তোড়জোড় করে সব আবার আগের মতো। ফের যখন ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে তখন আবার নড়েচড়ে বসেন সংশ্লিষ্টরা।
সর্বশেষ গত ০৭ জুলাই শনিবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ নগরীর ফকিরটোলা মসজিদের সামনে ট্রেনে কাটা পড়ে মঞ্জুর হোসেন (৫০) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুর পর থেকে সব মহলেই চলছে তীব্র সমালোচনা। ওঠেছে প্রশ্ন এবং প্রায় সময় এমন দুর্ঘটনা ঘটার নেপথ্য কারণ।
কোনো রকম ভান বা ভনিতা ছাড়া সাধারণ মানুষ এক বাক্যেই এমন অনাকাঙ্খিত মৃত্যুর জন্য রেলওয়ে কৃর্তপক্ষকেই দায়ী করছেন। তাঁরা বলছেন, এই স্থানে রেল লাইনের দু’পাশ দখল করে দোকান-পাট গড়ে ওঠায় এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এ জন্য এখানকার দোকানী থেকে শুরু করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষই দায়ী।
একই সাথে তাঁরা দাবি করেন, কখনো কখনো এসব দোকানীদের উচ্ছেদ করা হলেও পুনরায় এসে দখল করে নিচ্ছে তারা রেল লাইনের দু’পাশ। এর নেপথ্যে ক্ষমতাসীন দলের চাঁদাবাজিটাও রয়েছে। মূলত এ কারণেই দখল হয়ে যাওয়া রেল লাইন দখল অবমুক্ত করা সম্ভব হয় না।
তবে সাধারণ মানুষ একই সাথে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, চাঁদাবাজরা নিশ্চিয় প্রশাসন থেকে বেশি ক্ষমতাধর নয়, তাহলে আর কত নিরিহ মানুষের প্রান গেলে স্থায়ীভাবে দখল মুক্ত হবে রেল গেইটের দু’পাশ?
এদিকে শনিবারে রেলে কাটা পড়ে মৃত্যুর ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে এ নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা। বিভিন্ন জনই রেলে কাটা পড়ে মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড বলেই দাবি করছেন। তাঁরা বলছেন, দু’পাশ দখল থাকার কারণে হুট করে ট্রেন চলে আসায় দ্রুত সরে যেতে পারে না পথচারীরা। আর তখনই ঘটে এমন অনাকাঙ্খিত ঘটনা।
এরমধ্যে পমেল নামের একজন যাত্রী লিখেছেন, হুট করে গ্রাম থেকে কোনো ব্যক্তি যদি নারায়ণগঞ্জের রেললাইনের কাছে আসেন তখন তাঁর কাছে এটিকে পরিত্যক্ত রেললাইন বলেই মনে হবে। কেননা, দুই পাশ দখল করে যেভাবে দোকানপাট হয়েছে এবং শুধু যে দুপাশ দখল তাও নয়, অনেক স্থানে রেললাইনের ওপরে মাল-সামান রাখা হচ্ছে যা ট্রেন আসার সাথে সাথে সরিয়ে নেয়া হয়। এমন অবস্থা দেখে নতুন যে কারো পক্ষেই এটিকে পরিত্যক্ত বলে মনেই হবে। আর তখনই যদি হুট করে কোনো ট্রেন এসে যায় রেললাইন ধরে হেঁটে যাওয়া ব্যক্তিটি ডানে না বামে, কোন দিক যাবেন সে দিশা পাবেন না। অমনিই দুর্ঘটনার শিকার হন।
আরেকজন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে লিখেছিলেন, শনিবার যখন ট্রেনে কাটা পড়ে লোকটি মারা যায় তখন আশপাশের কোনো ব্যক্তিই লাশটি উদ্ধারে এগিয়ে আসেনি। দীর্ঘক্ষণ মরদেহটি ঘটনাস্থলেই পড়েছিলো। এমনকি দখলদার দোকানিরাও দোকান বন্ধ করে দৌঁড়ে পালিয়ে যান।
এদিকে নগরবাসী বলছেন, এসব দখলদারের জন্য প্রতিবছরই দুই চারজন লোক এ খানে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যাচ্ছে। উভয় পাশ দখল করে রাখায় বাধ্য হয়ে পথচারীরা রেললাইনের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। ফলে ট্রেন এসে পড়ায় সারিবদ্ধ ভাবে সাজানো দোকানগুলোর জন্য দ্রুত নিরাপদে সরে যেতে পারছে না তাঁরা। আর এতে করেই দুর্ঘটনা ঘটে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ