ঢাকা, শনিবার 21 July 2018, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আব্বাসীয় খেলাফতের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মনসুর আহমদ : আরবী খেলাফত শব্দটি গুণবাচক বিশেষ্য। খলিফা শব্দটি আরবী ‘খালাফ’ ধাতুমূল থেকে উৎপত্তি, যার অর্থ পশ্চাৎ বা বিপরীত। প্রথম মানুষ আদম (আঃ) কে যখন খলিফা হিসেবে বিভূষিত করা হলো তখন খলিফা দ্বারা বুঝান হয়েছিল আল্লাহর প্রতিনিধি, যিনি পৃথিবীতে আল্লাহর বিরাটত্ব ও মহানত্বকে প্রকাশ করার জন্য আল্লাহ যে দায়িত্ব তাঁর উপরে অর্পণ কেেছন তা তিনি যথাযথ ভাবে পালন করবেন।
যখন খলিফা শব্দটি ইসলামের চার খলিফার ব্যাপারে প্রয়োগ করা হয় তখন খলিফা দ্বারা রসুল (সঃ)-এর উত্তরাধিকারী বুঝান হয়, যারা রসুলের অবর্তমানে তার পক্ষ হয়ে তাঁর সমস্ত কাজকর্ম সম্পাদনা করবেন। খলিফা শব্দটি ধর্মীয় নেতা, পীর মুর্শিদদের শাগরিদদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। যে সমস্ত লোক তাদের ধর্মীয় নেতার হাতে হাত রেখে পীর মুর্শিদদের কাজ তাদের পক্ষ থেকে সম্পন্ন করার ওয়াদা করে এ কাজের জন্য অনুমতি প্রাপ্ত হন তাদেরকেও খলিফা বলা হয়।
আমাদের আলোচিত ‘খেলাফত’ বিষয়টি আরও ব্যাপক। হজরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ইন্তেকালের পরে হজরত আবুবকর (রাঃ) কে সর্বপ্রথম খলিফা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। তিনি তাঁর ইন্তেকালের প্রক্কালে হজরত ওমর (রাঃ)কে খলিফা হিসেবে মনোনয়ন প্রদান করেন। হজরত ওমর (রাঃ) আবুলুলুর হাতে আহত হয়ে মৃত্যু যন্ত্রণায় অস্থির অবস্থায় মদীনার মধ্য থেকে ৬ জন নেতার একটি পরিষদ গঠন করে দেন যেন সহজে তাদের মধ্য থেকে খলিফা নির্বাচন করা সহজ হয়। তাদের মধ্য থেকে হজরত ওসমান (রাঃ) কে তৃতীয় খলিফা হিসেবে নির্বাচিত  করা হয়। হজরত ওসমান (রাঃ) একটি বিদ্রোহী গ্রুপের হাতে শাহাদাত বরণ করলে হজরত আলী (রাঃ) ইসলামের চতুর্র্থ খলিফা নির্বাচিত হন। কিন্তু হজরত মুয়াবিয়া (রাঃ) খলিফা হিসেবে হজরত আলী (রাঃ) কে মেনে নিতে রাজি হননি।  যে কারণে পরবর্তীতে হজরত আলী ও হজরত মুয়াবিয়া (রাঃ)’র মধ্যে সিফ্ফিনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তাঁদের মধ্যে খেলাফতের অমিমাংসিত বিষয়টি শেষ হবার পূর্বেই হজরত আলী (রাঃ) শাহাদাত বরণ করেন। হজরত আলী (রাঃ)-এর ইন্তেকালের পরে মুসলিম সমাজের দ্বন্দ্ব বিবাদ এড়াবার জন্য হজরত হাসান হজরত মুয়াবিয়ার পক্ষে খিলাফত পরিত্যাগ করেন।
কথা ছিল হজরত মুয়াবিয়া (রাঃ)-এর পরে জনগণ খলিফা নির্বাচিত করবেন। কিন্তু হজরত মুয়াবিয়া তাঁর ইন্তেকালের পূর্বেই পুত্র ইয়াজিদকে  উত্তরাধিকারী নিযুক্ত করে খেলাফতের পবিত্র প্রতিষ্ঠান ভেঙ্গে দেন। এ ভাবে খেলাফতে রাশেদার পরিসমাপ্তি ঘটে এবং খেলাফতের স্থান দখলকৃত হয় উমাইয়া রাজবংশের দ্বারা। আব্বাসীয় রাজ বংশের ধারা প্রতিষ্ঠত হওয়া পর্যন্ত উমাইয়া রাজ বংশ খেলাফতের নামে শাসন কার্য পরিচালনা করেন। সিন্ধু থেকে স্পেন পর্যন্ত দুনিয়ার এক বিরাট অঞ্চলে দোর্দ- প্রতাপের সাথে বনি উমাইয়াদের শাসন চলে। কিন্তু এক শতাব্দী শেষ হতে না হতেই আব্বাসীয়রা অতি সহজেই তাদের পতন ঘটাল।
আব্বাসীয় বংশের নাম করণ করা হয়েছিল হজরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর চাচা হজরত অব্বাস (রাঃ)-এর নাম অনুসারে। হজরত আব্বাস (রাঃ) ৩২ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। তিনি মৃত্যুকালে ৪ সন্তান রেখে যান, তারা হলেন আবদুল্লাহ, ফজল , ওবায়েদুল্লাহ ও কাইসান। আবদুল্লাহ যিনি  ইতিহাসে ইবনে আব্বাস নামে পরিচিত ৬১৯ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। হজরত হাসান (রাঃ)-এর অস্বাভিক মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে তিনি ৬৭ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। ইবনে আব্বাসের পুত্রের নাম করণ করা হয় মহান খলিফা হজরত আলীর নাম করণে আলী। তিনি ১১৭ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করলে তার সুযোগ্য পুত্র মুহাম্মাদ ধর্মীয় নেতৃত্বের উত্তরাধিকারী হন। প্রচুর যোগ্যতার অধিকারী ও উচ্চাকাঙ্খী মুহাম্মাদ সর্বপ্রথম ব্যক্তি যিনি খেলাফতকে তাঁর জন্য বৈধ করার প্রচেষ্টা চালান এবং একটি নতুন চিন্তাধারার উদ্ভাবন করেন। উক্ত চিন্তা ধারায় প্রকাশ করা হয় যে, কারবালায় হজরত হোসাইনের শাহাদাতের পর ধর্মীয় নেতৃত্ব তাঁ পুত্র ( জয়নুল আবেদীন) আলীর উপর অর্পিত না হয়ে তা অর্পিত হয় মুহাম্মাদ আল হানিফার উপর। তিনি ছিলেন হানিফ বংশীয় এক মহিলার গর্ভজাত সন্তান যাকে হজরত আলী (রাঃ) হজরত ফাতিমার ( রাঃ) এর ইন্তেকালের পরে বিবাহ করেন। মুহাম্মাদ আল- হানিফা হজরত হোসাইন (রাঃ)-এর শাহাদাতের সময় কারবালায় উপস্থিত ছিলেন। তার হাতেই আব্বাসীয়রা খেলাফতের দাবি করে। তাঁর ইন্তেকালের পর পুত্র আবু হাশিমের উপর খেলাফতের দায়িত্ব আসে। তিনি খেলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করেন মুহাম্মাদ বিন আলী বিন আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের উপর। এ ভাবেই আব্বাসীয় বংশের নাম করণ হয়।
১২৫ হিজরীতে মুহাম্মাদ মৃত্যুর পূর্বে তাঁর পুত্র ইব্রাহিম, আবদুল্লাহ আবুল আব্বাস ও আবদুল্লাহ আবু জাফর (আল মনসুর) কে একের পর এক তাঁর উত্তরাধীকারী হিসেবে ঘোষণা দেন। মুহাম্মাদের জীবদ্দশায় খেলাফত নিয়ে যে চক্রান্ত শুরু হয়েছিল , তা তাঁর মৃত্যুর পরে একই ধারায় চলতে থাকে। অবশেষে আবু মুসলিম (মারওয়ান-২) এর নেতৃত্বে একদল মুসলমান এক বিপ্লব সংঘটিত করে এবং উমাইয়া বংশের শেষ খলিফাকে হত্যা করে আব্বাসীয় খেলাফতের বীজ বপন করেন। ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে মঙ্গোলীয় নেতা হালাকু খান কর্তৃক বাগদাদ নগরী ধ্বংস হওয়ার সাথে সাথে আব্বাসীয় খেলাফতের সমাপ্তি ঘটে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ