ঢাকা, শনিবার 21 July 2018, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাংলা সনের পরিগণক আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজী

আখতার হামিদ খান : রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসনসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় যে সকল মুসলিম মনীষী নিজেদের বিরল প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন তার মধ্যে আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজী অন্যতম। আমীর ফতেউল্লাহর পুরো নাম ফতেহউল্লাহ সিরাজী মীর, আজুদুদ্দৌসা। তিনি মোগল বাদশা আকবরের ভূমি ও আইন শৃংখলা বিভাগের অধিকর্তা ছিলেন। এছাড়াও বাদশার ব্যক্তিগত চিকিৎসকও ছিলেন সিরাজী। ধর্মশাস্ত্র, জ্যোতির্বিজ্ঞান, আধ্যাত্মিকতা, চিকিৎসা বিজ্ঞান, দর্শন, রসায়ন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ভূগোলসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তার স্বচ্ছন্দ পদচারণা ছিলো। অধিকন্তু তিনি রাষ্ট্র ও প্রশাসন ভূমি প্রভৃতি ব্যবস্থা সংস্কার এবং সর্বোপরী ফসলী পঞ্জিকা তথা বাংলা সন প্রবর্তন করে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। তাঁর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলো আজো বিস্ময়ের উদ্রেক করে। তাঁর এ অসামান্য প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ বাদশা আকবর তাকে ‘আমিন উল মূলক’ আজুদ উল মূলক, আজুদুদ্দৌলাহ প্রভৃতি খেতাবে ভূষিত করেন। তিনি ছিলেন আকবরের অন্যতম নবরত্ন এবং তার ছয়জন সদরের এক সদস্য ছিলেন। আমীর সিরাজী তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শাস্ত্রে এতটাই পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা, যুদ্ধ চালনা, চিকিৎসা, জাগতিক ইত্যাদি কোনো ব্যাপারে রাজকীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে আকবর তাঁর সঙ্গে সলাপরামর্শ করতেন। কেননা তাঁর মতামত সম্রাটের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। যুদ্ধ, বৈদেশিক ঘটনা প্রভৃতি নানা ক্ষেত্রে সিরাজীর অনেক ভবিষ্যদ্ববাণী অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হওয়ায় রাজদরবারে তাঁর সম্মান ও প্রতিপত্তি যথেষ্ট বেড়ে যায়। তিনি ছিলেন একদিকে যেমন খোদাভীরু, নিঃস্বার্থ তেমনি রাজকর্ম সহায়তায় অভূতপূর্ব দক্ষতার পরিচয় দেন।
প্রাথমিক জীবন : আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজীর জন্ম, বাল্য জীবন, শিক্ষা ইত্যাদি সম্পর্কে প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায় না। তাঁর সম্বন্ধে এতোটুকু কেবল জানা যায় যে, তিনি পারস্যের সিরাজ নগরে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকাল থেকেই ধর্ম ও জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বুৎপত্তি অর্জন করেন। তিনি খাজা জামালুদ্দীন মাহমুদ, মির্জাখান সিরাজী প্রমুখ প-িতের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। অত:পর পরিণত বয়সে ভাগ্যান্বেষণে ভারতে আসেন। তিনি মুজাফফর খান ই তুরের কন্যাকে বিয়ে করেন। তাঁর ভাই মীর কারিগ সিরাজী ছিলেন একজন নামজাদা কবি এবং তাঁর পুত্রদ্বয় যথাক্রমে মীর তকী ও মীর শরীফ পরবর্তী সময়ে মোগল দরবারে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হন।
আকবরের দরবারে সিরাজী : ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১৫৭৫ খৃষ্টাব্দের দিকে বাদশাহ আকবরের দরবারে আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজী এসেছিলেন। উল্লেখ্য, ১৫৫৬ খৃষ্টাব্দে আকবর বাদশাহ সিংহাসনে আসীন হয়েছিলেন। আকবর তাকে ‘কাদের’ পদে (ভূমি রাজস্ব আদায়কারী) অভিষিক্ত করে সম্মানিত করেছিলেন। এ পদে থাকাকালীন তিনি দরিদ্র প্রজাদের ভূমি রাজস্বের পরিমাণ নিজস্ব জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নতুন করে নির্ধারণ করেন। এছাড়া এ সময়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজেও তিনি অবদান রাখেন, তা হলো শিক্ষা। সে যুগে আজকের মতো শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত ছিলো না। শিক্ষা লাভের জন্য ছাত্রদের গুরুগৃহে গমন অথবা অবস্থাপন্ন লোকেরা প-িত নিজের বাসায় অবস্থাপন্ন লোকেরা প-িত নিজের বাসায় রেখে ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতেন। তৎকালীন আমীরদের সন্তানদের শিক্ষার বিষয় সিরাজী নিজে দেখাশোনা করতেন।
রাজ কর্মচারী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্তির মাত্র বছর তিনেকের ভেতরেই তিনি এতোটাই পান্ডিত্যের স্বাক্ষর রাখতে সমর্থ হলেন যে, আকবর তাতে খুশী হয়ে তাকে ‘আমীন উল মুলক’ খেতাবে ভূষিত করেন। অত:পর তাকে ভূমি রাজস্ব মন্ত্রী রাজা টোডরমলের অ্যাসিস্টেন্টের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। এখানে তিনি ভূমি রাজস্ব বিষয়ক পুরাতন নথিপত্র সংশোধন, সংস্করণ এবং রাজস্ব পদ্ধতির পুনর্মূল্যায়ন করেন। এ কাজে দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ ‘আজুদুদ্দৌলা’ বা সা¤্রাজ্যের বাহুর খেতাবে তিনি বরিত হলেন। বাদশা আকবর তার পদমর্যাদা আরো বৃদ্ধি করে তাকে সদর পদে উন্নীত করেন। উল্লেখ্য, আকবরের আমলে ফতেহউল্লাহ সিরাজী ছাড়া আর কেউই সামান্য কদর পদ থেকে সদর পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি। খৃষ্টীয় ১৫৮৬ সালে তাঁকে এ পদে মনোনীত করা হয়।
ফতেহউল্লাহ শুধুমাত্র সা¤্রাজ্যের ভূমি ব্যবস্থাপনা নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাদশা আকবরের ব্যক্তিগত চিকিৎসক রাজ সভার অন্যতম নবরতœ। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, সামরিক এমনকি ব্যক্তিগত গুরুত্ব বিষয় নিয়েও আকবর তার সঙ্গে পরামর্শ করতেন, আগেই উল্লেখ করা হয়েছে সে কথা। বাদশাহর শিকার সঙ্গী হিসেবে তিনি সবসময় ঘাড়ে বন্ধুক বহন করতেন। এছাড়া তিনি আকবরের সাড়ে তিন হাজার যোদ্ধা সেনার প্রধান কমা-ারের দায়িত্ব ও পালন করেন।
বিভিন্ন বিষয়ে আমীর সিরাজীর অবদানগুলো সৌর পঞ্জিকা প্রবর্তন : আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজীর জীবনের বহু সংস্কার ও আবিষ্কারের মধ্যে সৌর বছরের প্রবর্তন অন্যতম। বলা দরকার যে, উপমহাদেশে বৃটিশদের আগমনের আগে। সৌর পঞ্জিকার প্রচলন ছিলো না এখানে। চান্দ্র হিসাব মতোই প্রশাসনিক ও অন্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো ফসল বোনা এবং ভূমির বাৎসরিক খাজনা প্রদান করা। কিন্তু চান্দ্র সন অনুসরণ করে কৃষিকাজ ও চাষাবাদের কাজটি সুবিধাজনকে ছিলো না কৃষকদের। নির্দিষ্ট সময় ফসল তোলা সাপেক্ষে তার খাজনা প্রদানের ব্যাপারটিও প্রজাসাধারণ এবং সরকারি রাজস্ব বিভাগের জন্য একটা বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স¤্রাট আকবর হিজরী সনকে ভিত্তি করে একটি সৌর বছর গণনার পদ্ধতি বের করার জন্য সিরাজীকে দায়িত্ব দেন।
এক বছর গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ফতেহউল্লাহ সিরাজী উলুগবেগের জ্যোতিষ ছক এবং প্রাচীন পারস্যের সৌরপঞ্জি মিলিয়ে তৈরি করলেন নতুন এক বর্ষপঞ্জি। আকবরের সিংহাসনে আরোহণের বছর ১৫৫৬ খৃষ্টাব্দ মোতাবেক ৯৬৩ এলাহী সনে রূপান্তরের মাধ্যমে গণনা শুরু হলো এলাহী সনের। আকবরের ইচ্ছানুসারে বর্ষপঞ্জির এরকম নামকরণ করা হয়েছিলো। এই সন সুবে বাংলা তথা বাংলা প্রদেশে এসে বাংলা সন নামকরণ করে।
মুদ্রা ব্যবস্থা সংস্কার : সম্রাট আকবরের নির্দেশে সিরাজীকে মুদ্রা সংস্কারের মতো জটিল আরেকটি কাজে ভূমিকা রাখতে হয়। তৎকালীন প্রচলিত মুদ্রা রূপিয়া এবং মোহরের ভগ্নাংশ নিরূপণের সুনির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি ছিলো না। ফতেউল্লাহ সিরাজী এগুলোর মান যথাযথভাবে নিরূপণের এবং একই সঙ্গে স্বর্ণের সঙ্গে তাদের একটি আনুপাতিক সম্পর্ক স্থির করে প্রচলিত মুদ্রা ব্যবস্থাতেও আনেন পরিবর্তন। এর ফলে হিসাব-নিকাশ পদ্ধতি সহজতর এবং নকল মুদ্রা তৈরির সম্ভাবনাও রোধ করা হয়। আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিলো তার এই সংস্কার কর্মসূচীর তা হলো মুদ্রার আগেকার ওজন কমিয়ে বাজারে পর্যাপ্ত মুদ্রা ছাড়ার ব্যবস্থা গ্রহণ, এটি ছিলো আধুনিক অর্থ ব্যবস্থার সঙ্গে অনেকটা সঙ্গতিপূর্ণ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ