ঢাকা, শনিবার 21 July 2018, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ডিপ্লোমা শিক্ষায় সনদসর্বস্বতার অবসান হোক

আবুল হাসান/খনরঞ্জন রায় : মানব তখনই মানবসম্পদ হয়ে ওঠে যখন সে দেশ ও সমাজের ইতিবাচক কাজে আত্মনিয়োগে যোগ্যতা ও সামর্থ্য অর্জন করে। এই সঙ্গে একথাও সত্য যে, দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া কল-কারখানা কিংবা অর্থনীতির চাকা সচল রাখার যে কোন কর্মযজ্ঞ সক্রিয় ও সফল হতে পারে না। সে কারণেই দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির কথাটি গুরুত্বের সঙ্গে বারবার উচ্চারিত হয়ে থাকে।
ডিপ্লোমা শিক্ষা সুষ্ঠু সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক মৌল উপাদান। আর এই উপাদান যে সমাজে যত বেশি প্রবেশ করেছে সেই সমাজ ততবেশি উন্নয়ন, উৎপাদন ও কল্যাণের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
একটি জাতির সভ্যতার প্রধান মাপকাঠি ডিপ্লোমা শিক্ষা। ডিপ্লোমা শিক্ষাকে যুগে যুগে জাতির মেরুদ-- হিসাবে সকল মহল স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্বায়নের যুগে ইন্ডাষ্ট্রির সংখ্যা বাড়ার কারণে বাড়ছে ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার গুরুত্ব। সার্বিক জাতীয় উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন মানসম্পন্ন ডিপ্লোমা শিক্ষা, যে জাতির নানাবিধ বিষয়ে ডিপ্লোমা শিক্ষায় শিক্ষিতের হার যত বেশি সে জাতি তত বেশি উন্নত।
একটি দেশের সার্বিক উন্নতি নির্ভর করে ওই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। প্রাথমিক শিক্ষা, উচ্চ শিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ কথা স্বীকার করতে হবে যে, ডিপ্লোমা শিক্ষার পথ ধরেই দেশ উন্নতির পথে এগিয়ে যায়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, কৃষি, স্বাস্থ্য, রাজনীতি, সুশাসনসহ সব ক্ষেত্রেই উন্নয়ন অর্জন ও তা টেকসই করার স্বার্থে ডিপ্লোমায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কর্মতৎপরতা প্রয়োজন। ডিপ্লোমা শিক্ষার গুরুত্বও স্বীকার্য। বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতার কারণে উন্নয়ন সুপরিকল্পিত ও টেকসই হচ্ছে না। দেশের ডিপ্লোমা শিক্ষা হয়ে পড়েছে রুগ্ন, মানহীন ও ক্ষেত্রবিশেষ সনদসর্বস্ব।
দেশের ডিপ্লোমা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে যে পরিমাণ প্রয়োগিক দক্ষতা নিয়ে বের হওয়ার কথা, শিক্ষার্থীরা তা অর্জন করতে পারছেন না। ডিপ্লোমা ডিগ্রির সনদ পেলেও তাদের কাক্সিক্ষত দক্ষতা অর্জিত হচ্ছে না। বাংলাদেশ ও জার্মানির শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় এই চিত্র ফুটে উঠেছে। এতে দেখা যায়, দক্ষতার দিক থেকে জার্মানির টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের তুলনায় বাংলাদেশ পলিটেকনিকের শিক্ষার্থীরা অনেক পিছিয়ে আছেন।
দক্ষতা নিরূপণে বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের এক-চতুর্থাংশ নম্বর পেয়েছেন।
ডিপ্লোমা শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ জন্য শিক্ষকের অভাবকে অনেকাংশে দায়ী করছেন। শুধু পলিটেকনিক নয়, শিক্ষক ও টেকনিক্যাল কর্মচারীর স্বল্পতার কারণে ব্যাহত হচ্ছে দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকদের পদের বেশিরভাগই শূন্য। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো চলছে গোঁজামিল দিয়ে। সবাই বিষয়টি জানলেও সমাধানে কেউ এগিয়ে আসছেন না।
কারিগরি শিক্ষা অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, দেশে এখন সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট আছে ৪৯টি। এছাড়া আছে বস্ত্র, প্রকৌশল, কৃষি ইনস্টিটিউটসহ মোট ১৫ ধরনের প্রতিষ্ঠান। এসব মিলে সরকারি মোট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৫১টি। এর মধ্যে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, মনোটেকনিক ও ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটগুলোতে মোট স্থায়ী ও অস্থায়ী শিক্ষক পদের ৪৬ শতাংশই শূন্য। এ ছাড়া তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর পদের ৫৬ শতাংশ খালি রয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:৪৬।
সারাদেশের টিটিসি, মনোটেকনিক, পলিটেকনিক, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোতে স্থায়ী-অস্থায়ী মিলিয়ে প্রথম শ্রেণির (শিক্ষক) মোট সৃষ্ট পদ আছে এক হাজার ৩৬১টি। এর মধ্যে শূন্য ৬৪৯টি। দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষকের মোট ৭১২টি পদের মধ্যে ৩৭৪টি শূন্য। এ ছাড়া তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষকের মোট পদ ২০০, এর মধ্যে ২৫টি পদ শূন্য। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সাড়ে চার দশকেরও বেশি সময় পার হয়েছে। কিন্তু অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দেশটি সমৃদ্ধি অর্জনের পথে বেশিদূর এগোতে পারেনি। অর্থনৈতিকভাবে দেশটি এখনও মধ্যম আয়ের দেশ হতে পারেনি। দেশে অর্থনৈতিক অবস্থা এখনও রুগ্ন। ডিপ্লোমা শিক্ষার সংস্কৃতি সাংঘর্ষিক।
ছোট বড়, মাঝারি, শিল্প, প্রকৌশল, কৃষি, প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জনবল প্রত্যাশিত মাত্রায় কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারছে না। আর এ সবকিছুর জন্য বড় দায় বর্তায় কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের উপর। প্রশাসনসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে যারা সেবা দিচ্ছেন, তাদের সবাই শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘ ৪ বছর সময় কাটিয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি নিয়ে এসব পদে আসেন। আর ডিপ্লোমা শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেই যদি গলদ থাকে, এ ব্যবস্থা থেকেই যদি তারা শৃঙ্খলা, নিয়মতান্ত্রিকতা ও সুশাসনের সঙ্গে পরিচিত হয়ে না আসেন, তাহলে কর্মজীবনে তারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে কীভাবে নিয়ম শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করবেন? কাজেই ডিপ্লোমা শিক্ষার নিম্নগতি রোধ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মতান্ত্রিকতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
এজন্য প্রশাসনিক কিছু কঠোর অবস্থান নিতে হবে। কারিগরি শিক্ষাবোর্ড থেকে ডিপ্লোমা শিক্ষা ব্যবস্থা পৃথক করতে হবে। প্রতিষ্ঠা করতে হবে জবাবদিহিমূলক ডিপ্লোমা শিক্ষা ব্যবস্থার আলাদা স্বাধীন স্বতন্ত্র বোর্ড।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ