ঢাকা, রোববার 22 July 2018, ৭ শ্রাবণ ১৪২৫, ৮ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

‘আমি জনগণের সেবক, জনগণ কী পেল সেটাই আমার বড় চাওয়া॥ আমার সংবর্ধনার প্রয়োজন নেই’ -শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল শনিবার ঢাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভা ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন -পিআইডি

স্টাফ রিপোর্টার : আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যতক্ষণ জীবন আছে ততক্ষণ বাংলার মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনে কাজ করে যাবো। তিনি বলেন, মৃত্যুর ভয় পাই না। মৃত্যুর আগে মরতে রাজি না। যতক্ষণ জীবন আছে বাংলার মানুষের সেবা করে যাবো। ভাষণের শুরুতেই তাঁকে দেয়া সংবর্ধনার জবাব প্রধানমন্ত্রী দেন এভাবে, আমি জনগণের সেবক। জনগণ কী পেল সেটাই আমার বড় চাওয়া। আমার সংবর্ধনার প্রয়োজন নেই।
গতকাল শনিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের দেয়া গণসংবর্ধনায় ভাষণ দিতে গিয়ে তাঁর এই দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন শেখ হাসিনা। মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, গ্লোবাল উইমেন্স লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড, কলকাতা থেকে ডি-লিট উপাধি পাওয়াসহ নানা সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গণসংবর্ধনা দেয় আওয়ামী লীগ। গণসংবর্ধনায় অভিনন্দন পত্র পাঠ করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহমুদ এবং উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।
সংবর্ধনা মঞ্চে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সভাপতি সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়রসহ ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা উপস্থিত ছিলেন। আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে ১৪ দলের শরিক নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করে সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী।
বিকেল ৪টা ৪২ মিনিটে ভাষণ দিতে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে বেলা সাড়ে তিনটার দিকে তিনি লোকে লোকারণ্য উদ্যানে গিয়ে পৌঁছান। শেখ হাসিনা মঞ্চে উঠতেই স্লোগানে আর হর্ষধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে এই ঐতিহাসিক উদ্যান। আধা ঘণ্টার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার বক্তব্যের পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের মানপত্র পাঠ করেন। এই মানপত্র তিনি প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন।
স্বাধীকার থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন, বাংলাদেশের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন, স্বাধীনতার দেশের মানুষ ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসামান্য ত্যাগের কথা তুলে ধরেন হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের মানুষ যা কিছু অর্জন করেছে, মহান ত্যাগ করেই অর্জন করেছে।
দুপুর সাড়ে ১২টার পর থেকেই সংবর্ধনাস্থলের আশপাশের প্রায় সব সড়কে ডাইভারশন দেওয়া হয়। বেলা একটার পর থেকে ভিআইপি রোড, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, পল্টন, মৎস্য ভবন এলাকাসহ আশপাশের এলাকায় যানজট দেখা দেয়। শাহবাগ এলাকায় ছোট ছোট মিছিলে ব্যানার, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড বহন করতে দেখা গেছে। এসব ব্যানারে শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে নানা অর্জনের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
ভাষণের শুরুতেই তাঁকে দেয়া সংবর্ধনার জবাব প্রধানমন্ত্রী দেন এভাবে, আমি জনগণের সেবক। জনগণ কী পেল সেটাই আমার বড় চাওয়া। আমার সংবর্ধনার প্রয়োজন নেই।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশকে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত দেখতে চাই। এটাই বড় চাওয়া। তিনি বলেন, বাংলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করে যাব। তাতে আমার বাবার আত্মা শান্তি পাবে। আমি শুধু সেইটুকুই চাই। আমার কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। শুধু একটা জিনিসই দেখতে চাই, এই বাংলাদেশ ক্ষুধামুক্ত দারিদ্রমুক্ত, সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে উঠেছে, যা আমার পিতার স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন পূরণই আমার লক্ষ্য।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি তাঁর দল আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ইতিহাসও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। এই দলটির প্রতীক নৌকার বিজয়ের সঙ্গে দেশের মানুষের বিজয় ও অর্জন যে সম্পর্কিত, সে কথাই তুলে ধরেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী। তিনি বলেন, দেশের একটি শ্রেণি আছে, যাদের কথা নৌকা ঠেকাতে হবে। কেন নৌকা ঠেকাতে হবে? নৌকার অপরাধ কী?
 শেখ হাসিনা বলেন, এ দেশের মানুষ মায়ের ভাষায় কথা বলার সুযোগ পেয়েছে নৌকার জন্য। স্বাধীন দেশ পেয়েছে। দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে নৌকায় ভোট দিয়ে। দেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে নৌকার জন্য, পরমাণু যুগে প্রবেশ নৌকার হাত ধরে, স্যাটেলাইট যুগে প্রবেশ করেছে নৌকার কারণেই।
 শেখ হাসিনা বলেন, সামরিক সরকারদের উচ্ছিষ্টভোগীরা নৌকা ঠেকাতে চায়। নিজের রাজনৈতিক জীবনের অনেক কথা তুলে ধরেন শেখ হাসিনা তাঁর আজকের বক্তৃতায়। তিনি বলেন, ‘অনেক ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করতে হয়েছে। তবে সব সময় নিজের আদর্শে অবিচল থেকেছি। বাবার স্বপ্ন পূরণ করতেই হবে এ প্রত্যয় সব সময় ছিল।’
১৯৯৬ থেকে ২০০১ ও ২০০৮ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডের বর্ণনা দেন শেখ হাসিনা। তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রথমবার ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার কথা, পার্বত্য চুক্তি, গঙ্গার পানি চুক্তি, বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার রোধকারী ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের কথা বলেন শেখ হাসিনা।
 শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০০১-এ ক্ষমতায় আসতে পারিনি। নীতির সঙ্গে আপস করিনি বলেই ক্ষমতায় আসতে পারিনি। গ্যাস বিক্রি করার আপস করার প্রস্তাব ছিল, কিন্তু তা না করাতেই তিনি ক্ষমতায় আসতে পারেননি বলে জানান
 শেখ হাসিনা বলেন, ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসা বিএনপি-জামায়াতের সরকার দেশে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মানি লন্ডারিং করে। বাংলাদেশ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়। শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দিনবদলের সনদে দেশের মানুষ অকুণ্ঠ সমর্থন দেয়ায় তাঁর দল আবার ক্ষমতায় আসে।
 শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে হওয়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং রায়ের ফলে বাংলাদেশ কলুষমুক্ত হয়েছে। এগিয়ে যাওয়ার পথ পেয়েছে। উন্নয়নের দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘৬৮ বছরের সমস্যা ছিটমহল সমস্যার সমাধান করেছি। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমার সমস্যা সমাধান করেছি। পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশে ৫৩তম দেশ হিসেবে যোগ দিয়েছে পরমাণু ক্লাবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছি। এর মধ্য দিয়ে স্যাটেলাইট যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ।’
 শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিশ্বমন্দার প্রভাব বাংলাদেশে পড়তে দিইনি। প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৭ ভাগে উন্নীত হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৬ ভাগে নামিয়ে আনা হয়েছে।’ তিনি বলেন, দেশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করলে কারও কারও আঁতে ঘা লাগে।
শেখ হাসিনা বলেন, জঙ্গিবাদের যে বীজ বিএনপি বপন করেছিল, তা থেকে মুক্ত করতে চেষ্টা চলছে। মাদককে দেশ ও সমাজের জন্য ভয়াবহ বিষ হিসেবে তুলনা করে তিনি বলেন, মাদকের প্রভাব থেকে সমাজ ও দেশকে মুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় ৪০ লাখ বয়স্ক মানুষ, ১২ লাখ বিধবা, ১০ লাখ প্রতিবন্ধীকে প্রতি মাসে ৭০০ করে টাকা দেয়া হচ্ছে। সরকার ২ কোটি ৪ লাখ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেয় বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
 শেখ হাসিনা বলেন, অনগ্রসর সব শ্রেণি ও পেশার মানুষকে যে ভাতা দেয়া হয়, তা মুঠোফোনের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
 শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি বরদাশত করব না। এগিয়ে চলার পথ যেন অব্যাহত রাখতে পারি, সে জন্য দেশের মানুষের দোয়া চাই।’
বিএনপিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অগ্নিসন্ত্রাস, রাস্তায় গাছ কেটে ফেলে দেওয়া, বাস- ট্রেনে অগ্নিসংযোগ করা সব তারা করেছিল। তারা নির্বাচন প্রতিহত করতে চেয়েছিল। নির্বাচন প্রতিহত করলে কারা ক্ষমতায় আসত? শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের মানুষ বিএনপি-জামায়াতের সেই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন হতে দেয়নি। তারা আমাদের ভোট দিয়ে উন্নয়নের পথ খুলে দিয়েছে।
 শেখ হাসিনা বলেন, আমার পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে। আমাকে দেশে যেতে বাধা প্রদান করা হয়েছে। আমি আবার দেশে ফিরতে পারবো এটার কোন নিশ্চিয়তা ছিলো না। আমি বিদেশ থেকে দেশের রাজনীতি করি। আমার ধরণা ছিলো না আমি আওয়ামী লীগের মতো এতো বড় সংগঠনে নেতৃত্ব দিবো।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ও আমার চাওয়া পাওয়ার কিছুই নেই। আমরা জনগণের কল্যাণে কাজ করতে চাই। আওয়ামী লীগের কর্মকান্ডের সুফল জনগণ পেতে শুরু করছে। আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রেখে যাওয়া স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করছি। 
এসময় জিয়াউর রহমানকে সমলোচনা করে তিনি বলেন, জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করে তাদের এমপি মন্ত্রী করেছিলো। আমরা ক্ষমতায় এসে যুদ্ধপরাধী ও বঙ্গবন্ধু খুনিদের বিচার করতে সক্ষম করেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আমাদের দেশকে এগিয়ে নেয়ার যে পরিকল্পপনা, সে পরিকল্পনা আমরা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি এবং করে যাব। একটা মানুষের তো ২৪ ঘণ্টা সময়। এই ২৪ ঘণ্টা সময় থেকে আমি মাত্র ৫ ঘণ্টা নিই, আমার ঘুমানোর সময়। এ ছাড়া প্রতিটি মুহূর্ত আমি কাজ করি, দেশের মানুষের জন্য। দেশের জনগণের উন্নয়নের জন্য। এই বাইরে আমার জীবনের আর কোনো কাজ নেই। আমি কোনো উৎসবে যাই না। শুধু সারাক্ষণ আমার একটাই চিন্তা, এই দেশের উন্নয়ন। দেশের মানুষের উন্নয়ন।
 শেখ হাসিনা বলেন, ২০২১ সালে অবশ্যই আমরা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে অধিষ্ঠিত হবো এবং আরও উন্নত করব। আর ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ, যে কথা তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশ হবে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড, সেই বাংলাদেশ একটি শান্তিপূর্ণ দেশ, উন্নত দেশ সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে। ‘আমরা চাই, আমার দেশের মানুষও উন্নত জীবন পাবে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলুক সেটা আমরা কখনো বরদাশত করব না।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ