ঢাকা, রোববার 22 July 2018, ৭ শ্রাবণ ১৪২৫, ৮ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বড়পুকুরিয়া থেকে উধাও ১ লাখ ৪২ হাজার টন কয়লা

এইচ এম আকতার ও কামাল উদ্দিন সুমন: দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বড়পুকুরিয়া খনির কোল ইয়ার্ড থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার টন কয়লা উধাও হয়ে গেছে। এত সব কয়লার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। ১৬ হাজার টাকা দরের উধাও হওয়া এ কয়লার বাজার মূল্য ২২৭ কোটি টাকা। এ ঘটনায় পেট্রোবাংলার পরিচালক (মাইন অপারেশন) মো. কামরুজ্জামানকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা উধাও হওয়ার ঘটনা ঘটলেও কয়লা উধাও ঘটনা এর আগে আর কখনও ঘটেনি। এ ঘটনায় বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। বন্ধ রয়েছে কয়লা উত্তোলনের কাজও।
শুক্রবার (২০ জুলাই) দুপুরে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফয়েজ উল্লাহ বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এদিকে, এত বিপুল পরিমাণ কয়লা উধাও হয়ে যাওয়ায় খনির মহাব্যবস্থাপক (মাইন অপারেশন) নুরুজ্জামান চৌধুরী ও উপ-মহাব্যবস্থাপক (স্টোর) খালেদুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহমদকে অপসারণ ও মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও কোম্পানি সচিব) আবুল কাশেম প্রধানিয়াকে বদলি করা হয়েছে।
এদিকে, কয়লার অভাবে চার/পাঁচদিনের মধ্যে বড়পুকুরিয়া ৫২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।
জানা গেছে, উত্তোলনযোগ্য কয়লার মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় গত ১৬ জুন থেকে বড়পুকুরিয়া খনির কয়লা উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। পুনরায় কয়লা উত্তোলন শুরু হবে আগস্ট মাসের শেষে। এ সময়ের মধ্যে পার্শ্ববর্তী বড়পুকুরিয়া কয়লা ভিত্তিক ৫২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কয়লার মজুদ রয়েছে বলে ইতোপুর্বে কয়েক দফা পিডিবিকে নিশ্চিত করে খনি কর্তৃপক্ষ।
কিন্তু খনি কর্তৃপক্ষ তিন/চারদিন আগে পিডিবিকে জানিয়ে দেয় খনির কোল ইয়ার্ডে কয়লার মজুদ প্রায় শেষ পর্যায়ে, বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আর বেশিদিন কয়লা সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। সেইসঙ্গে বিদ্যুৎ কেন্দ্র কয়লা সরবরাহ কমিয়ে দেয়। বর্তমানে প্রতিদিন মাত্র ৮শ’ থেকে ১ হাজার টন কয়লা সরবরাহ করা হচ্ছে। তা দিয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মধ্যে একটি ইউনিট চালু রাখা হয়েছে এবং উৎপাদন কমে দাঁড়িয়েছে ১৪০ মেগাওয়াটে।
সূত্রমতে, খনি কর্তৃপক্ষের হিসাবে কোল ইয়ার্ডে কয়লা থাকার কথা প্রায় দেড় লাখ টন। কিন্তু বাস্তবে শুক্রবার (২০ জুলাই) পর্যন্ত ছিল মাত্র পাঁচ-ছয় হাজার টন কয়লা। এক লাখ ৪২ হাজার টন কয়লার কোনো হদিস নেই।
খনির একটি সূত্র জানায়, খনি ভূগর্ভ থেকে কয়লা উত্তোলনের সময় পানির সঙ্গে মিশে, ডাস্ট হয়ে বাতাসে উড়াসহ বিভিন্নভাবে কয়লা বিনষ্ট হয়। কিন্তু উৎপাদন ঠিকাদার আন্ডার গ্রাউন্ডে যে পরিমাণ কয়লা সরবরাহ করে কাগজে কলমে সেই হিসাব সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে।
এছাড়া ২০০৫ সালের অক্টোবর মাস থেকে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার পর থেকে খনির কোল ইয়ার্ড কখনও খালি হয়নি। এর মাঝে আগুনে পুড়েও বিপুল পরিমাণ কয়লা বিনষ্ট হয়। দীর্ঘদিন ধরে কোল ইয়ার্ডে বিপুল পরিমাণ কয়লার ঘাটতি ছিল। খনি কর্তৃপক্ষ এতদিন তা সমন্বয় করেনি এবং কোল ইয়ার্ড খালি না হওয়ায় এতদিন বিষয়টি ধরাও পড়েনি।
সূত্রমতে, কয়লার অভাবে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ার দারপ্রান্তে উপনিত হওয়ায় পেট্রোবাংলা ও খনি কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার (১৯ জুলাই) সন্ধ্যায় পেট্রোবাংলা এক অফিস আদেশে খনির মহাব্যবস্থাপক (মাইন অপারেশন) নুরুজ্জামান চৌধুরী ও উপ-মহাব্যবস্থাপক (স্টোর) খালেদুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করে।
এছাড়া ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহমদকে অপসারণ করে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের দফতরে সংযুক্ত করা হয় এবং মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও কোম্পানী সচিব) আবুল কাশেম প্রধানিয়াকে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড সিরাজগঞ্জে বদলি করা হয়। বড়পুকুরিয়া খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পেট্রোবাংলার পরিচালক আইয়ুব খানকে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফয়েজ উল্লাহ জানান, হঠাৎ করে কেন কয়লা নেই এ বিষয়টি তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পরেই বলা যাবে কেন কয়লা মজুদ নেই।
তিনি আরও বলেন, পিডিবিকে গ্যাস সরবরাহ বাড়িয়ে দিয়ে অন্যান্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদন বৃদ্ধি করে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। সে অনুয়ায়ী উৎপাদন বৃদ্ধির চেষ্টাও চলছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা যায়, বড়পকুরিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে ২৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ইউনিট ছাড়াও ১২৫ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম আরও দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রয়োজনীয় কয়লার অভাবে ১২৫ মেগাওয়াটের ইউনিট দুটো আগে থেকেই বন্ধ; চলছিল শুধু ২৩০ মেগাওয়াটের ইউনিটটি। 
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, চলমান কেন্দ্র্রট পুরোপুরি উৎপাদনে রাখতে প্রতিদিন ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার মেট্রিক টন কয়লা দরকার। সেই হিসাবে এক মাসের জন্য দেড় থেকে দুই লাখ মেট্রিক টন কয়লা রিজার্ভ রাখার নিয়ম। বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) সঙ্গে বৈঠক করে কয়লার রিজার্ভ সম্পর্কে নিশ্চিত থাকে পিডিবি। পেট্রোবাংলার আওতাধীন বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি এ কয়লা সরবরাহ করে থাকে।
পিডিবি বলছে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সর্বশেষ বৈঠকেও পেট্রোবাংলা নিশ্চিত করেছে, কয়লার মজুদ আছে। কিন্তু সম্প্রতি পিডিবির বোর্ড সদস্য (উৎপাদন) আবু সাঈদ বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরেজমিন গিয়ে দেখেন, সেখানে ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার মেট্রিক টন কয়লা মজুদ আছে, যা দিয়ে দুদিনও বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব নয়।
প্রশ্ন উঠেছে পেট্রোবাংলা থেকে পিডিবিকে নিশ্চিত করা হয়েছিল যে, প্রায় দুই লাখ টন কয়লা মজুদ আছে। মজুদ এ কয়লা কোথায়, এ কয়লা কি আদৌ মজুদ করা হয়েছিল, নাকি কালোবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে, এমন সব প্রশ্নও উঠে আসছে। কিন্তু কে দিবে এসব প্রশ্নের জবাব। সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আর দায়িত্ব প্রাপ্তরা তদন্ত রিপোর্টের আগে কথা বলতে রাজি নয়।
সূত্রমতে, বড়পুকুরিয়ার খনি থেকে কয়লা ক্রয়ে হাজারো শিল্প ও কারখানা আগ্রহী। সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশে ক্ষেত্রবিশেষে কয়লা বিক্রি হয় অবৈধ কমিশন গ্রহণের মাধ্যমে। অভিযোগ রয়েছে, কয়লার ক্রম-ঊর্ধ্বগামী চাহিদাকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এতে যোগসাজশ রয়েছে বড়পুকুরিয়া কোল কোম্পানির কিছু কর্মকর্তারও। এ সিন্ডিকেট অতি উচ্চমূল্যে কালোবাজারে নিয়মিত কয়লা বিক্রি করে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, হয়তো বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সংরক্ষিত কয়লাও কালোবাজারে চলে গেছে।
জানা গেছে, উপমহাদেশের সব চেয়ে দামি কয়লা হলো এই বড়পুকুরিয়ার কয়লা। এই কয়লা ভারতের কয়লার চেয়ে কয়েকগুন বেশি তেজক্রিয়। এতে করে পরিমানে কয়লা অনেক কম লাগে। আর এ কারণেই দেশিয় এবং বিদেশি অনেক কোম্পানি এই বড় পুকুরিয়া থেকে কয়লা ক্রয় করতে বেশি আগ্রহী। কিন্তু চাহিদার তুলনায় উত্তোলন কম থাকাতে বিক্রি করা সম্ভব হয় না। আর এ কারনেই শুরু থেকে এখানে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।
এদের সাথে রয়েছে কয়লা খনি কর্মকর্তাদের সু-সম্পর্ক। আর এদের মাধ্যমেই কালো বাজারে কয়লা বিক্রির অভিযোগ নতুন কিছু নয়। কিন্তু ১ লাখ ৪২ হাজার টন কয়লা তো আর কম নয়। এতো কয়লা এক সাথে উধাও হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। কিভাবে কার মাধ্যমে এই কয়লা খনির রিজার্ভ থেকে উধাও হলো তা নিয়ে রহস্যের শেষ নেই।
এর আগেও রাষ্টীয় ব্যাংক এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও টাকা উধাও হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এত কয়লা এক সাথে উধাও হওয়ার ঘটনা নতুন। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে টাকা উধাও হওয়ার ঘটনার কোন সুরহা হয়নি। আর্থিক খাতে সব কেলেঙ্কারির ঘটনাকেই ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। এই ঘটনা কি একই পথে যাবে এমন প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ