ঢাকা, রোববার 22 July 2018, ৭ শ্রাবণ ১৪২৫, ৮ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে রাসূলুল্লাহ (স.)-এর আদর্শ

মনসুর আহমদ : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
রসুল (সঃ) ছিলেন ন্যায় বিচারকের সর্বোত্তম আদর্শ।  আল্লাহর ঘোষণায় প্রতিফলিত হয়েছে বিচারক হিসেবে রসুলের চরিত্র। আল্লাহর বাণী -“ হে মুমিনগণ ! “তোমরা ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাকারী হও। যদিও তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে অথবা তোমাদের পিতামাতা ও আত্মীয় স্বজনদের বিরুদ্ধে কোন বিরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। তবুও যে কোন মূল্যে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা কর” । আল্লাহর এ ঘোষণা বাস্তবায়নে অত্যুজ্জ্বল আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছেন রসুল (সঃ)।  বিশর নামে এক মুসলমানের বিরুদ্ধে জনৈক ইহুদীর
বিচার প্রার্থনা ও বিচারের রায় ইহুদীর পক্ষে প্রদান, চুরির অপরাধে সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারীকে অব্যাহতি প্রদানে  অস্বীকৃতি এবং এ ধরনের অসংখ্য ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার উদাহরণ রয়েছে রসুলের জীবনে। মদীনায় হিজরতের পর জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলে সম্মিলিত ভাবে রসুলকে বিচারক হিসেবে গ্রহণ করেছিল। তাঁর সামনে সকল ধরনের মোকাদ্দমা পেশ করা হতো। তিনি আল্লাহর বিধান অনুযায়ী রায় প্রদান করতেন যা সকলে বিনায়বনত চিত্তে  মেনে নিত।
একটি জাতির অশান্তির অন্যতম কারণ জাতির মধ্যে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত না থাকা । ন্যায় বিচারের অবর্তমানে জাতির নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে, কর্তৃত্ব লোপ পায়। এ ব্যাপারে রসুল (সঃ)-এর বাণী স্মরণীয়। তিনি ফরমান-“যত দিন কোরায়েশগণ ক্ষমা প্রার্থীকে ক্ষমা করবে, ন্যায়বিচার প্রার্থীর প্রতি সুবিচার করা হবে, তত দিন পর্যন্ত তারা খেলাফত ও নেতৃেত্বর উপর যুক্ত বলে বিবেচিত হবে এবং খেলাফত ও নেতৃত্ব  তাদের মাঝে থাকবে।
পক্ষান্তরে  যখন তারা ক্ষমা প্রার্থীর প্রতি ক্ষমা ও বিচার প্রার্থীর প্রতি সুবিচার পরিহার করবে, তখন তাদের প্রতি আল্লাহর ও ফেরেশতাদের অভিশাপ পতিত হবে।” রসুলের এ হাদিস সে কালের এবং কোরায়েশদের জন্যই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সমস্ত কালের সমস্ত মানুষের জন্য একই সত্য - সুবিচার সমাজের কল্যাণ ও তার স্থায়িত্বের জন্য মূল শর্ত।
বিচার প্রার্থীদের উপরে অত্যন্ত মহব্বতের দৃষ্টিতে বিচার ফায়সালা করাই ছিল রসুলের নীতি। প্রতিশোধ, হিংসা বা ঘৃণা নয়, বরং অন্তরে একটি পবিত্র মমতা বোধ নিয়ে বিচার প্রার্থীদেরকে ফয়সালা প্রদান  ন্যায় বিচারের দাবি। হজরত মায়েয বিন মালেক (রাঃ) এবং আযদ্ বংশের গামেদী গোত্রের মহিলার বিচার এবং তাদের ব্যাপারে রসুলের মন্তব্য শ্রদ্ধাভরে সকল বিচারকের স্মরণ করা প্রয়োজন। (১৬)
বিচারের নামে প্রহসন নয়, বরং মামলার বিষয়টি পুংঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বিশ্লেষণ, উপযুক্ত সাক্ষ্য গ্রহণ, নিরপেক্ষ ভাবে প্রজ্ঞা ও বিবেকের প্রয়োগ সুষ্ঠু ও ন্যায় বিচারের শর্ত।  রসুল (সঃ) এ  বিষয় গুলোর উপরে তীক্ষè দৃষ্টি রেখে বিচার ফায়সালা করেছেন এবং সমস্ত বিচারক যেন এ গুলো মেনে চলে তার প্রতি জোর তাগিদ দিয়েছেন। রসুল (সঃ ) ইরশাদ করেন, “বিচারক যদি সত্য নির্ধারণে, ন্যায়ের উদ্ধার কল্পে তার সর্ব শক্তি নিয়োগ করেন, তার চেষ্টায় এতটুকু ত্রুটি না করেন এবং যথার্থ সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে রায় দেন, তবে আল্লাহ রব্বুল আ’লামীনের দরবারে তিনি সাধারণ মুসলমান অপেক্ষা দ্বিগুণ পুরস্কার লাভ করবেন।”
রসুল (সঃ) আরও ফরমান, “বিচারক তিন প্রকার। তার মধ্যে দুই প্রকারই নারকীয়, শুধু এক প্রকার স্বর্গীয়। যারা জেনে শুনে অন্যায় অবিচার করে, প্রকৃত সত্যর বিরূদ্ধে রায় দেয়, তারা উভয়ই দোজখী । আর যে ন্যায় বিচারক, যে সত্য ও ন্যায়কে উপলব্ধি করে, ন্যায়ভিত্তিক রায় দেয় সে বেহেশতী। (১৭)
ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা রসুলের আগমনের লক্ষ্য। তিনি এক শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার পথ দেখিয়েছেন। ইসলামী বিধানের উদ্দেশ্যই হল মানুষকে সৎ পথে পরিচালিত করা। যখন কোন অবাধ্য ব্যক্তি বা জাতিকে শিক্ষা দীক্ষা, তালিম তরবিয়ত, ওয়াজ নসীহত দ্বারা সত্য ও ন্যায়পথে পরিচালিত করা সম্ভব হবে না, তখন তাদেরকে প্রশাসনিক আইন অনুসারে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করে সৎপথে আসতে বাধ্য করা হবে। দুষ্টু ও অবাধ্য লোকেরা যখন ন্যায়নীতিকে পদদলিত করে নিজেরা ন্যায়নীতির উপরে চলবে না এবং অন্যদেরকে ন্যায় নীতির উপর স্থির থাকতে দেবে না, তখন তাদেরকে দমন করার জন্য অইনের শাসন ও উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা অপরিহার্য।
আইনের শাসন পৃথিবীতে বর্তমানে নেই বললেই চলে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে আইন প্রণয়নের জন্য সৃষ্টি করা হচ্ছে সংসদ। সংসদ কর্তৃৃক রচিত আইন রাষ্ট্রে কার্যকরী করার জন্য রয়েছে সরকারের বিরাট প্রশাসন যন্ত্র।
আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের বিপুল আয়োজন থাকা সত্ত্বেও সমাজ থেকে অন্যায় অবিচার শেষ হয়নি;কারণ ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার করার জন্য প্রয়োজন শাসক ও শাসিত ও সমগ্র জনগণের পরকালের প্রতি গভীর বিশ্বাস। পরকাল বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে একটি জাতির রুচি ও সংস্কৃতি গড়ে  উঠলে সেখানে আইনের শাসন সুষ্ঠু ও সুন্দর ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
আইনবেত্তা ও সমাজ সচেতন ব্যক্তিগণ নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে রসুলের আনীত পয়গাম সম্পর্কে চিন্তা করলে স্পষ্ট ভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন যে আইন ও দ-দান করেই পৃথিবীতে কখনো শান্তি ও নিরাপত্তা অর্জিত হয়নি, এবং ভবিষ্যতেও হবে না। একমাত্র খোদা ভীতি ও আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস ভিত্তিক আইনের প্রয়োগই বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদানের যোগ্যতা রাখে।  একটি রাষ্ট্রের শাসক ও শাসিত, প্রশাসক -প্রজা সকলে যখন রসুল (সঃ) প্রদত্ত খোদায়ী আইনকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে গ্রহণ করবে, তখনই পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। আমাদের আজ তাই বড়ই প্রয়োজন রসুলকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা। (সমাপ্ত)
তথ্য সূত্র :
সুরা মুলক- আয়াত ৩
সুরা দাহর- আয়ত  ৩ 
স্যার আবদুর রহীম -এর ইসলামী আইনতত্ত্ব
ইসলামী আইন- গাজী শামসুর রহমান
গ্রোটিয়াস: De JureBelli Ac Pacis, Book  I
উদ্বৃত :
রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাস,  নির্মলকুমার সেন।  (পৃঃ ১৪৭)
রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাস,  নির্মলকুমার সেন।
ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি ও যুদ্ধ - মজিদ কাদ্দুরী
সুন্নতে রসুলের আইনগত মর্যাদা - সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী
মেশকাত শরিফ- হাদিস নং ৪৪৪০
Roussau: Scial Contract,  রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাস,  নির্মল কুমার সেন।
নীতি বিজ্ঞানের মূল কথা - ড. এম হুদা
ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার দ্বন্দ  - সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী
লোক প্রশাসনের রূপরেখা - ড. মুহম্মদ আবদুল ওয়দুদ ভূইয়া
বোখারী  ; মুসলিম
মহানবীর শাশ্বত পয়গাম - আবদুর রহমান আয্যাম
মেশকাত - কিতাবুল হদুদ
মানব মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় রসুল মুহম্মদ (সঃ) - মওলানা মুহম্মদ  আমিনুল ইসলাম

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ