ঢাকা, রোববার 22 July 2018, ৭ শ্রাবণ ১৪২৫, ৮ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মাদক বাণিজ্য ও অপব্যবহার ভয়ংকর মাত্রায়

জিবলু রহমান : [দশ]
২০১৭ সালের মার্চ মাসে শরীয়তপুর কারাগারের সালাউদ্দিন, পলাশ হোসেন ও ফারুক হোসেন নামে তিন কারারক্ষীর বিরুদ্ধে ইয়াবা সেবনের অভিযোগ আসে। অভিযোগ আসার পরপরই তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এরপর বিভাগীয় তদন্তে প্রমাণ পাওয়ায় ২৯ মে ২০১৮ তাদের স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। এছাড়া মাদক সেবনের অভিযোগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কারারক্ষী রায়হান উদ্দিন ও আশরাফুল ইসলামকে অন্যত্র শান্তিমূলক বদলি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
বর্তমানে জেলার, ডেপুটি জেলার এবং কারারক্ষীসহ প্রায় শতাধিক কর্মকর্তারা বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে তদন্ত চলছে। এদের কেউ বন্দিদের কৌশলে মাদক সরবরাহ করেছেন, কেউবা আসক্ত, আবার কেউ নিজের কাছে সংরক্ষণ করে সময় ও সুযোগ মতো বিক্রি-সরবরাহ করে থাকেন। ইতিমধ্যে কারা কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে প্রায় ১০০ জনের সাময়িক বরখাস্ত করেছে।
উদ্ধার করা ইয়াবা বিক্রির অভিযোগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার মোমিনুল ইসলামকে ২০১৮ সালের মার্চ মাসে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। এছাড়া মাদকের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে অনেকের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসাবে পদাবনতি, পদোন্নতি না দেওয়া, অন্যত্র বদলি করা হয়েছে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সাত হাজার আসামির মধ্যে প্রায় ৫ হাজারই মাদক সেবন, ব্যবসা ও পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার হয়ে বন্দি রয়েছে। কারাগারের ভেতরেও এসব আসামি জমজমাট মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। বন্দিদের পাশাপাশি জমাদার ও কারারক্ষীদের একটি অংশ এ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। অসাধু কিছু কারারক্ষী ও কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ও কয়েকজন দাগি কয়েদি মাদক ব্যবসার একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। আদালতে হাজিরা দিতে যাওয়া বন্দিরা পায়ুপথসহ নানা কৌশলে শরীরের বিভিন্ন অংশে মাদক নিয়ে কারাগারে ঢুকে পড়ে। কারা অভ্যন্তরে স্বজনদের দেওয়া খাবারের সঙ্গে ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য প্রবেশ করছে। তাছাড়া কতিপয় কারারক্ষী মাদকদ্রব্য ভেতরে বহন করে নিয়ে মাদক ব্যবসায়ীর (কয়েদি) হাতে পৌঁছে দিয়ে আসে। এসব চলে কমিশনের ভিত্তিতে। ফলে অনেক অধূমপায়ীও কারাগার থেকে ভয়ানক মাদকসেবী হয়ে বাইরে বের হচ্ছে। কারাগারের ভেতরে ও বাইরে মাদক ব্যবসায়ীদের একটি বড় সিন্ডিকেট রয়েছে। বন্দি মাদক ব্যবসায়ীদের লোকজন আদালত চত্বরে এসে তাদের হাতে ছোট ছোট মাদকের পুটলি তুলে দেয়। ওই মাদকদ্রব্য বহন না করলে কারাগারের নির্যাতনের শিকার হতে হয়। নির্যাতনের ভয়ে অনেকে মাদকদ্রব্য বহন করতে বাধ্য হন। (সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক ৩০ মে ২০১৮)
একজন খুনী হয়তো একজন নিরাপরাধ মানুষকে খুন করে কিন্তু মাদক ব্যবসায়ীরা পুরো সমাজকে হত্যা করছে। তারা পুরো সমাজ ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলে। মাদক দেশ ও জাতির জন্য ভয়ঙ্কর পরিণাম ডেকে আনছে। অকালে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে যুবসমাজ।
মাদকবিরোধী ব্যাপক অভিযান শুরুর পর বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধুবাদ জানানো হলেও কেউ কেউ মন্তব্য করেন, ‘কেবল চুনোপুঁটি নয়, মাদকের গডফাদারদের দ্রুত আইনের আওতায় নিতে হবে। তাদের ছাড় দেওয়া হলে অভিযানের মূল লক্ষ্যই ব্যর্থ হবে।’
চলমান অভিযানে এখনও মাদকের গডফাদার পর্যায়ের তেমন কোনো ব্যক্তি পুলিশ-র‌্যাবের গোয়েন্দা জালে ধরা পড়েননি। মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার কারণে দেশব্যাপী পরিচিত এমন কারও ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। যারা ধরা পড়ছেন বা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হচ্ছেন, তারা স্থানীয় পর্যায়ের মাদক ব্যবসায়ী। যারা নেপথ্যে থেকে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন, তাদের গ্রেফতার করাই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছে। তাদের আইনের আওতায় নেওয়া গেলে জনগণের কাছে মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে আরও ইতিবাচক সাড়া মিলবে।
আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের অভাব, আদালতের দীর্ঘসূত্রিতা আবার কখনো কখনো আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে মাদক মামলায় গ্রেফতারকৃতরা অনেক ক্ষেত্রে পার পেয়ে যাচ্ছে। মাদক দ্রব্যের ব্যবহার রোধ করতে হলে সামাজিক মূল্যবোধ ও সামাজিক জনসচেতনা সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে হবে। প্রত্যেক পিতা-মাতাকেই তার সন্তনের দিকে সার্বক্ষণিক খেয়াল রাখতে হবে। পাশাপাশি সকলকে সচেতন হতে হবে।
মাদক মাফিয়াদের কালো থাবায় থাকা বাংলাদেশে প্রতিবছরই মাদক বিরোধী দিবস আসে পরিহাসের হাসি হেসে। উৎপাদনকারী দেশ না হলেও যেভাবে ‘ট্রানজিট কান্ট্রি’ হিসেবে ব্যবহৃত বাংলাদেশ বদনাম ও ধ্বংসের শিকার হচ্ছে তাতে সচেতনমহল উদ্বিগ্ন হলেও নীতিনির্ধারকদের নির্লিপ্ততা সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে। জাতি বিনাশী মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার পরিবর্তে শুধু ‘জনসচেতনতা আরো বাড়ানোর’ কথা বলে নীতি-নির্ধারকরা যেভাবে দিবসকেন্দ্রিক অনুষ্ঠানে দায়সারা বক্তব্য দেন তাতে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের লাখ লাখ পরিবার দারুণভাবে মর্মাহত হন।
অবশ্য আমাদের দেশে মাদকাসক্তির পেছনে বেকারত্বজনিত হতাশারও একটা বড় ভূমিকা থাকে। দেশের সকল বেকারকে রাতারাতি কাজের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়ত সম্ভব নয়। কিন্তু যে কোনো দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক সরকারকে দেশের তাবৎ কর্মক্ষম যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার চিন্তা অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। বেকারত্ব যে কোন মানুষের জীবনে একটা অভিশাপ হিসেবেই বিবেচিত হয়। বিশেষত শিক্ষিত বেকারদের মধ্যে প্রকৃত পক্ষেই মাদকাসক্তির মত আত্মঘাতী প্রবণতা সহজেই গড়ে উঠতে পারে।
এক্ষেত্রে যাদের ছেলে-মেয়েরা মাদকাসক্ত, সেই সব অভিভাবকদের দায়িত্বই সবচেয়ে বেশি। তারা পরিবারের সবার জন্য কিছু বিধি-নিষেধ তৈরি করবেন এবং এর সুফল সম্পর্কে সবাইকে পরিষ্কার ধারণা দিবেন। মাদকাসক্ত টিনেজারদের গতিবিধি লক্ষ্য রাখবেন। মাদক নেয়ার ফলে বর্তমান ও ভবিষ্যতে তার জীবনে কি কি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হতে পারে এবং কি কি সমস্যায় সে পড়তে পারে, সে বিষয়ে ধারণা দিতে হবে।
মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ অসৎ সঙ্গ। মাদকাসক্ত তরুণ বা তরুণির পরিবারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে যদি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, তা যথেষ্ট ফলপ্রসু হতে পারে। আমাদের দেশে যারা রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামান, তারা যতটা দেশের মানুষের সার্বজনীন কল্যাণের চিন্তা করেন তার চাইতেও অনেক বেশি মাথা ঘামান ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থ নিয়ে। ফলে মাদকাসক্তির মত অরাজনৈতিক সামাজিক সমস্যা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করার সময় তাদের কোথায়? তারা মাদকাসক্তির মত একটা সামাজিক সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাবার বদলে নিজের বা দলের স্বার্থ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা, চেষ্টা-সাধনা করতে অধিক আনন্দ লাভ করেন। তারা বরং চেষ্টা করেন তাদের দলীয় কোন লোক মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার কারণে ধরা পড়লে তাকে অবৈধ পন্থা ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে হলেও মুক্ত করে আনতে।
সমাজে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা না থাকলে, নানা ক্ষেত্রে অবক্ষয়, হতাশা বাড়তে থাকলে মাদকাসক্তি ক্রমেই বাড়বে। তাই, অসুস্থ সংস্কৃতির বলয় থেকে আমাদের বের হতে হবে, মানবিক মূল্যবোধকে আবার জাগরিত করতে হবে। তবেই আসবে মুক্তি। সুতরাং আমাদের আবার পূর্ব পরিচয়ে ফিরে যেতে হবে, যেখানে একটি পরিবারে বাবা-মা, সন্তান, চাচা-চাচি, মামা-মামি, ফুফা-ফুফু, নানা-নানী, সবাইকে নিয়ে আমরা বসবাস করতাম, সবাই সবার আনন্দ, সুখ, ব্যথা, বেদনাকে ভাগাভাগি করে নিতাম। তাতে পরস্পরের যে সমস্যা দুঃখ যন্ত্রণা আছে তা সহজেই সমাধান করতে পারতাম, ফলে মাদকাসক্তির মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি তখন সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু বর্তমানে আমরা সবাই এককেন্দ্রিক হয়ে গেছি, আমরা পরস্পরকে শ্রদ্ধা করি না, ফলে দেখা দিচ্ছে অবক্ষয়, অসামাজিক কা-কীর্তি। তাই এখন প্রয়োজন সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করা। প্রয়োজন, বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক আরো নিবিড় করা। [সমাপ্ত]
jiblu78.rahman@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ