ঢাকা, রোববার 22 July 2018, ৭ শ্রাবণ ১৪২৫, ৮ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে যাবে খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল

খুলনা পাটকলের আভ্যন্তরীণ দৃশ্য

আব্দুর রাজ্জাক রানা : খুলনা অঞ্চলে ষাটের দশকে স্থাপিত তাঁত দিয়েই চলছে ৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল। দীর্ঘদিনেও হয়নি বিএমআরই, লাগেনি আধুনিকতার ছোঁয়া। দেশে-বিদেশে পাটের বহুমুখী পণ্যের চাহিদা থাকলেও খুলনার পাটকলগুলোতে তা তৈরির উপযোগী মেশিন নেই। আর বিকল রয়েছে অসংখ্য তাঁত। এসব তাঁত বন্ধ থাকায় পাটজাত পণ্যের উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে উৎপাদিত প্রায় ৩শ’ কোটি টাকার পাটপণ্য মজুদ রয়েছে পাটকলগুলোতে। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে পাটকলগুলোর লোকসানে পড়তে হচ্ছে। দেখা দিচ্ছে আর্থিক সংকট। এছাড়া অর্থ সংকটের কারণে চলতি অর্থবছরে পাটক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাটকলগুলোর ঐতিহ্য ফেরাতে প্রয়োজন মেশিনগুলো বিএমআরই করা, বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন উপযোগী আধুনিক মেশিন স্থাপন, বিশ্বে বাজার সৃষ্টি, দেশের পাটপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং মওসুমে পাট ক্রয়ের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা।  
বাংলাদেশ জুট মিলস্ করপোরেশন (বিজেএমসি) সূত্রে জানা গেছে, খালিশপুর, আটরা-গিলাতলা ও যশোরের অভয়নগর শিল্পাঞ্চলে রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকল রয়েছে। যার অধিকাংশই ষাটের দশকে স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, দৌলতপুর, পিপলস (খালিশপুর), স্টার, ইস্টার্ণ, আলিম, কার্পেটিং এবং যশোর জুট ইন্ডাস্ট্রি (জেজেআই) জুটমিল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭২ সালে এসব পাটকল বিজেএমসি’র আওতায় আনা হয়। এ ৯টি পাটকলে ৫ হাজার ১০৯টি তাঁত স্থাপন করা হয়। তবে এর মধ্যে অসংখ্য তাঁত অকেজো হয়ে পড়েছে। আর যা চালু রয়েছে তা বাজেটের চেয়েও কম। এসব পাটকলে স্যাকিং (মোটা বস্তা), হেসিয়ান (পাতলা চট), সিবিসি (কার্পেট বেকিং ক্লথ) এবং ইয়ার্ন (সুতা) চার ধরনের পণ্য উৎপাদন হচ্ছে। উৎপাদিত এসব পণ্য সিরিয়া, ইরাক, ইরান, সুদান, মিসরসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হয়। কিন্তু বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়া এবং নতুন বাজার সৃষ্টি করতে না পারার কারণে খুলনা অঞ্চলে ৩০ হাজার ৯১২ মেট্রিকটন উৎপাদিত পাট পণ্য মিলগুলোতে অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। যার মূল্য অনুমানিক ৩শ’ কোটি টাকা।
সূত্রটি জানায়, চলতি ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে পাটক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ লাখ ৩৫ হাজার ২৫২ কুইন্টাল। এর মধ্যে গত ২৬ জুন পর্যন্ত পাট ক্রয় করা হয়েছে  ৫ লাখ ২৩ হাজার ২৬৭। যা লক্ষ্যমাত্রার ৬৩ শতাংশ। ফলে পাট পণ্যের উৎপাদন কমেছে। 
মিলের শ্রমিকরা জানায়, মিল স্থাপনে খুলনা পাট শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়। খুলনাকে শিল্পনগরী বলা হতো। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এখানে বসবাস  করতে শুরু করে। কিন্তু সম্প্রতি মিলগুলো লোকসানের কারণে তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। মেশিনগুলো পুরাতন হওয়ায় এগুলো থেকে পরিপূর্ণ উৎপাদন হচ্ছে না। সঠিক সময়ে অর্থ বরাদ্দ না দেয়ায় পরবর্তীতে চড়া মূল্যে পাট কিনতে হয়। এতে ব্যক্তি মালিকানা মিলগুলো লাভবান হয়। এছাড়া নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি না হওয়ায় পণ্য মজুদের পরিমাণ বাড়ছে। লোকসানে এবং আর্থিক সংকটে পড়তে হচ্ছে পাটকলগুলোকে। ফলে শ্রমিকদের নিয়মিত মজুরী পরিশোধে হিমসিম খেতে হচ্ছে মিল কর্তৃপক্ষকে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ত জুট মিল সিবিএ-ননসিবিএ পরিষদের কার্যকরী আহ্বায়ক ও ক্রিসেন্ট জুট মিলের সাধারণ সম্পাদক মো. সোহরাব হোসেন বলেন, খুলনা অঞ্চলের হারানো ঐতিহ্য ফেরাতে মেশিন আধুনিকায়ন বা বিএমআরই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি করা, মওসুমে সঠিক সময়ে বাজেট অনুযায়ী পাটক্রয় করা এবং বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনের জন্য আধুনিক মেশিন স্থাপন করা প্রয়োজন। তাহলে পাটকলগুলো লোকসানের হাত থেকে রক্ষার পাশাপাশি হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে বলে তিনি আশাবাদী।   
খুলনার প্লাটিনাম জুট মিলের প্রকল্প প্রধান মো. মুজিবর রহমান মল্লিক জানান, পাটপণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় উৎপাদিত পণ্যের মজুদ বাড়ছে। বর্তমানে মিলে প্রায় ৬০ কোটি টাকা মূল্যের পাটপণ্য মজুদ রয়েছে। তিনি জানান, সঠিক সময়ে পাটক্রয়ের অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ার কারণে পরবর্তীতে ৩শ’ থেকে ৫শ’ টাকা অধিকমূল্যে পাট ক্রয় করতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এ জন্য সঠিক সময়ে পাট ক্রয়ের জন্য অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন। মিল বিএমআরই করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মজুদ পণ্য বিক্রি হলে এবং মেশিন বিএমআরই করা হলে পাটকলের হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসবে। বর্তমান সরকার এ বিষয়ে আন্তরিক।
বিজেএমসির আঞ্চলিক সমন্বয়কারী শেখ রহমত উল্লাহ জানান, মিলগুলো প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিএমআরই করা হয়নি। তবে বর্তমান সরকার কয়েকটি মিল বিএমআরই করার উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, মজুদকৃত পণ্য অচিরেই বিক্রি করা সম্ভব হবে। সম্প্রতি বিদেশী বায়ারদের সাথে আলোচনা করা হয়েছে। আগামী মধ্য জুলাইয়ে সিরিয়ায় ৩৬ কোটি টাকা মূল্যের ১০ হাজার বেল পাটপণ্য রপ্তানী করা হবে। এর মধ্যে ১৮ হাজার টাকা মূল্যের ৫ হাজার বেল পাটপণ্য খুলনা থেকে রফতানি হবে। এরপর আরো ১০ হাজার বেল পাট একই দেশে রফতানি হবে। এছাড়া আগস্ট নাগাদ সুদানে ১ লাখ ৫০ হাজার বেল পাট রফতানি হবে। যার মূল্য প্রায় সাড়ে ৪শ’ কোটি টাকা। ফলে মজুদকৃত পণ্য আর থাকবে না। তিনি বলেন, আফ্রিকার আমাদের দেশের জন্য বড় একটি বাজার। এই বাজারকে ধরে রাখতে পারলে পণ্য মজুদ থাকা তো দূরের কথা দিয়ে পারা যাবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ