ঢাকা, সোমবার 23 July 2018, ৮ শ্রাবণ ১৪২৫, ৯ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ফিলিস্তিন জনগণের অধিকার! বিশ্ববিবেক ফিরে তাকাও

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন, দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং ইসরায়েল ও আমেরিকার সাথে আরববিশ্বের বিরোধ ও দ্বন্দ্বের চিরস্থায়ী অবসানের ক্ষেত্রে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যার চিরস্থায়ী একটা সমাধান হওয়া সে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তা বিশ্বের রাজনীতি সচেতন সব মানুষই বোধহয় কমবেশি জানেন। বিশেষ করে ‘ইসরায়েল বনাম আরব বিশ্ব’ মনোভাব বা দ্বন্দ্ব আরবি ভাষার ও আরব ভূখণ্ডের গন্ডি পেরিয়ে সময়ের সাথে ক্রমে যেভাবে ‘ইসরায়েল বনাম মুসলিমবিশ্ব’ মনোভাব বা দ্বন্দ্ব হিসেবে রূপ ধারণ করেছে, তা একজন বাংলাদেশি মুসলমান হিসেবে সেই রাজনৈতিক প্রাথমিক জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই আমার কাছে বেশ কৌতূহলপূর্ণ একটা বিষয়। আমি কোনো ইতিহাসবিদ নই। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আমি বিশেষজ্ঞও নই। তারপরও চেষ্টা করব ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের ইতিহাস এবং তাতে একদিকে আমেরিকার সম্পৃক্ততা ও অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের সম্পৃক্ততার বিষয়টা সংক্ষিপ্তভাবে এখানে তুলে ধরার। তৌরাত বা পুরানো বাইবেল অনুসারে বর্তমান ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত ‘ইসরায়েলি ভূমি’ (যাকে ইংরেজিতে ‘The land of Israel’ ও হিব্রু ভাষায় ‘Eretzyisrael’ বলা হয়) আব্রাহামিক ধর্মের আবির্ভাবের প্রায় শুরু থেকেই ইহুদিদের কাছে পুর্ণভূমি হিসেবে বিবেচিত। তৌরাত অনুযায়ী ‘ইসরায়েলি ভূমি’ ইহুদিদের প্রতি ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত ভূমি এবং ইহুদি ধর্মের ইতিহাস অনুযায়ী মুসা নবীর (আ.) আগমনের আগে ও পরে ইহুদিরা বংশানুক্রমে উক্ত এলাকায় বসবাস করে আসছিল। এমনকি, খণ্ডকালের জন্য কখনও কখনও উক্ত এলাকা তাদের শাসনাধীনও ছিল। সপ্তম শতাব্দিতে আরব মুসলিম বাহিনী উক্ত এলাকা বিজয় করার পূর্বে এসেরিয়ান, ব্যাবিলনিয়ান, পারসিয়ান, গ্রিক, রোমান, স্যাসানিয়ান ও বাইজেন্টিন শাসককুল কর্তৃক উক্ত এলাকা শাসিত হয়। এর মধ্যে ব্যাবিলনিয়ান শাসনকালীন উক্ত এলাকায় ইহুদিদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়। এছাড়া রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ইহুদিদের সংগঠিত বিদ্রোহ (ইতিহাসে যা ‘বার কোথায়? বা বিদ্রোহ’ তথা Bar kokhba revolt নামে পরিচিত) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যে বিদ্রোহের পরিণতিতে অসংখ্য ইহুদিকে অত্যাচার ও হত্যা করা হয় যা উক্ত এলাকায় ইহুদিদের উপস্থিতিকে পুনরায় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করে। অসংখ্য ইহুদি সে সময় ইউরোপে মাইগ্রেট (পরিযায়ন) করে। অতঃপর সপ্তম শতাব্দি থেকে ষোড়শ শতাব্দি পর্যন্ত উমাইয়া, আব্বাসিয়া, মামলুক সুলতানাতসহ বিভিন্ন মুসলিম শাসকদের হাত ঘুরে অবশেষে উক্ত এলাকা ‘অটোম্যান এম্পায়ার’ তথা তার্কিশ সাম্যাজ্যের শাসনাধীনে আসে যারা অধূনা বিংশ শতাব্দি পর্যন্ত উক্ত এলাকা শাসন করে। বলাবাহুল্য, আরব বংশোদ্ভূত শাসককুল কর্তৃক উক্ত এলাকা দুদীর্ঘ সময় ধরে শাসিত হওয়ার কারণে আরবি ভাষা ও আরব সংস্কৃতি সেখানে বসবাসরত ইহুদিদের মাঝেও বিস্তৃতি লাভ করে। যে কারণে বর্তমান ইসরায়েলে ও ইসরায়েল কর্তৃক দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূমিতে আজও সম্ভবত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আরবিভাষী ইহুদি খুঁজে পাওয়া যাবে। যা হোকে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ‘অটোম্যান এম্পায়ার’ ব্রিটিশ সাম্যাজ্যের কাছে পরাজিত হলে আরব অধ্যুষিত ফিলিস্তিন ব্রিটিশ প্রশাসনের আওতায় চলে আসে।
এ সময় (অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নাগাদ ও তার পরবর্তী সময়) পূর্ব ইউরোপসহ বলতে গেলে পুরো ইউরোপ জুড়েই বিভিন্ন স্থানে বংশানুক্রমে ইহুদি অভিবাসীদের বসবাস ছিল।অত্যন্ত মেধাশক্তিসম্পন্ন, বুদ্ধিমান ও কর্মঠ জাতি হিসেবে পরিচিত ইহুদিরা ইউরোপে সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও অর্থনীতিকে অনেককাংশ নিয়ন্ত্রণ করত এবং অবধারিতভাবে অর্থের জোরে রাজনীতিকেও তারা কমবেশি প্রভাবিত করতে সক্ষম ছিল। এতে করে কোনো কোনো দেশ সংখ্যাগুরু খ্রিস্টানদের মাঝে অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং সেসব দেশের ক্ষমতাসীন শাসকদের কারও কারও পক্ষে দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ইহুদিদের ভূমিকা নিয়ন্ত্রণ বা সীমিত করা ক্রমে কঠিন হয়ে পড়ে। একদিন অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলক পশ্চাদপদ কিংবা সুবিধাবঞ্চিত সংখ্যাগুরু দেশবাসীর ক্ষোভ এবং অন্যদিকে অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী সংখ্যালঘুদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি ও প্রভাব প্রতিপত্তি-ইহুদিদের নিয়ে দেশে দেশে সৃষ্ট রাজনীতির এই টানাপোড়নে ইউরোপে তৎকালীন সময়ে ‘দ্য জুয়িশ কোয়েশ্চিন’ (ইহুদি প্রশ্ন) নামে বহুল পরিচিত। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের তথাকথিত ইহুদি প্রশ্নের সমাধানকল্পে ব্রিটিশ সরকার স্বদেশের ইহুদিদের সাথে সমঝোতায় আসে এবং ১৯১৭ সালে বেলাফোর ডিক্লারেশন’ (বেলাফোর ঘোষণা) নামে ইতিহাসখ্যাত এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। যে চুক্তি অনুসারে আরব অধুষিত তৎকালীন ফিলিস্তিনে ইহুদিদের স্থানীয়ভাবে বসবাসের জন্য সুনির্দিষ্ট একটা ভূমি (রাষ্ট্র নয় অবশ্য) প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ইহুদিদের সাথে ব্রিটিশ সরকারের ‘বেলফোর’ চুক্তি করার আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ‘অটোম্যান এম্পায়ার’ কে পরাজিত করে ফিলিস্তিন দখল করা যা কৌশলগত কারণে ইহুদিদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন ছাড়া ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে রাজনৈতিকভাবে অর্জন করা সম্ভব ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর নবগঠিত ‘লীগ অব নেশন্স’ (বহুজাতি সংগঠন) ব্রিটিশ সরকারকে দখলকৃত ফিলিস্তিনের ওপর ‘ম্যান্ডেট’ (প্রশাসনিক ক্ষতমা) প্রদান করে মূলত ব্রিটিশ সরকারের ‘বেলফোর’ চুক্তিকে বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে।
ব্রিটিশ সরকার যে সময় ফিলিস্তিনের ম্যান্ডেট পায়, সে সময় ফিলিস্তিনে বসবাসকারী ইহুদিদের আনুমানিক সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার মাত্র ১১ শতাংশ। অবশ্য নিজেদের নির্ধারিত পুণ্যভূমিতে ফিরে যাওয়ার এবং সেখানে ইহুদিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ও পরিকল্পনাকে সামনে রেখে অটোম্যান সুলতান ও তার এজেন্টদের কাছ থেকে ফিলিস্তিনের পতিত জলাশয় ও অনুর্বর ভূমি ইউরোপিয়ান ইহুদিরা গণহারে কিনতে শুরু করেছিল বিংশ শতাব্দীর প্রায় পুরো শেষ ভাগ জুড়েই। পরবর্তী বছরগুলোতে ব্রিটিশ সরকারে পৃষ্ঠপোষকতায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ইহুদিদের অনেকে ফিলিস্তিনে মাইগ্রেট করতে শুরু করে এবং ১৯৩০-১৯৩১ সাল নাগাদ ফিলিস্তিনে ইহুদি জনসংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৭ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। ইতোমধ্যে জার্মানে নাৎসিরা ক্ষমতায় এলে ইহুদি বিদ্বেষ চরমে পৌছে এবং প্রক্রিয়াগতভাবে ইহুদিদেরকে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হয়। ইহুদি জাতিকে নিশ্চিহৃ করার জার্মানদের এই কুখ্যাত পরিকল্পনা ইতিহাসে ‘দ্য ফাইনাল সল্যুশন’ (চূড়ান্ত সমাধান) নামে পরিচিত। নিরাপত্তাহীনতার কারণে ও প্রাণভয়ে প্রচুর ইহুদি সে সময় জার্মান থেকে পালিয়ে ফিলিস্তিনে এসে আশ্রয় নিলে ফিলিস্তিনে ইহুদি অধিবাসীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। স্বভূমিতে ইহুদি জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান ও দ্রুততম বৃদ্ধি ফিলিস্তিনি আরবদেরকে শঙ্কিত করে তোলে অদূর ভবিষ্যতে অত্র এলাকায় নিজেদের জাতীয়তা ও আরব পরিচয় বজায় রাখার প্রশ্নে। এছাড়া ভূমি বেচাকেনা এবং ইহুদি মালিকনাধীন কল-কারখানা ও খামারে আরব মুসলিমদেরকে কাজ করতে না দেওয়ার ইহুদিদের একপেশে ও বক্র নীতিমালা ভীষণ ক্ষিপ্ত করে তোলে ফিলিস্তিনি আরবদের। যার ফলশ্রুতিতে ফিলিস্তিনি আরবরা স্থানীয় ইহুদিদের সাথে পর্যায়ক্রমে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। পরবর্তীকালে দুই দালেই সন্ত্রাসী গ্রুপের জন্ম হয় এবং উভয় পক্ষে অসংখ্য সন্ত্রাসী হামলা ও গুপ্ত হত্যার ঘটনা ঘটে।
১৯৩৬ সাল নাগাদ ফিলিস্তিনে ইহুদি অভিবাসীদের বিপুল উপস্থিতি ও ইহুদিদের প্রতি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত বিক্ষোভ প্রদর্শন করা থেকে শুরু করে পরবর্তীতে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর সাথে সশস্ত্র সংঘর্ষে লিপ্ত হয় ফিলিস্তিনি আরবরা যা ইতিহাসে ব্যর্থ ‘১৯৩৬-১৯৩৯ আরব বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। অবশ্য ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি আরবদের পরিকল্পিত বিদ্রোহ সফল না হলেও শেষ পর্যন্ত ‘হোয়াইট পেপার ১৯৩৯’ প্রণয়ন করে ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদিদের উপস্থিতি ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা করে। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন হিটলারের নেতৃত্বে জার্মানিতে ইহুদিদেরকে নিশ্চিহ্ন করার ‘নাযি হলোকস্ট’ সংঘটিত হলে অসংখ্য ইহুদি পালিয়ে ফিলিস্তিনে এসে আশ্রয় নিলে বেআইনি ইহুদি অভিবাসীর সংখ্যা বহুগুণে বৃদ্ধি পায় যা উক্ত এলাকায় বসবাসকারী ইহুদি-মুসলিম সম্পর্কে চরম অবনতি ঘটায় এবং দুই জাতির ভেতর ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার জন্ম দেয়। এ সময় দুই জাতির মধ্যে দফায় দফায় ‘রায়ট (জাতিগত দাঙ্গা) সংঘটিত হয়। ব্রিটিশ সরকার আরবদের পক্ষে হোয়াইট পেপার ১৯৩৯ প্রণয়ন করার ক্ষুদ্ধ ইহুদিরা এ পর্যায়ে ব্রিটিশ প্রশাসনের সাথে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। ফলে পরিস্তিতি ক্রমশ জটিলতার দিকে ধাবিত হলে ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদি ও মুসলমানদের মাঝে কোনো প্রকার কূটনৈতিক শান্তিপূর্ণ সমাধান প্রতিষ্ঠায় সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়। তখন নবগঠিত জাতিসংঘের হাতে ব্রিটিশ সরকার দায়িত্ব অর্পণ করে ফিলিস্তিনের ইহুদি-মুসলিম সমস্যার একটা শন্তিপূর্ণ সামাধান করে দেওয়ার জন্য। জাতিসংঘ ১১ সদস্যের একটা নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করে এবং তাদের মাসাধিক কাল গবেষণালদ্ধ পরামর্শ অনুযায়ী ১৯৪৭ সালে ইহুদি অধ্যুষিত ‘ইসরায়েল’ ও মুসলিম অধ্যুষিত ‘ফিলিস্তিন’ নামের দুটো পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব করা হয়। তবে মুসলিম ও ইহুদি উভয় ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র ও পুণ্যভূমি হিসেবে বিবেচিত জেরুজালেমকে জাতিসংঘের নিজস্ব ক্ষমতার আওতায় রাখার প্রস্তাব করা হয় উত্থাপিত ওই বিলে। ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ সম্মেলনে ৩৩ বনাম ১৩ ভোট (১০টা দেশের মুখপাত্রের অনুপস্থিতে) ‘রেজ্যুলেশন১৮১-এর মাধ্যমে বিলটি পাশ হয়। নবগঠিত আরবলীগ তথা আরব দেশগুলো বিলের বিপক্ষে ভোট দেয়। এমনকি, দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে জাতিসংঘের ফিলিস্তিন বিভাজনকে বেআইনি বলে দাবি করে আরবলীগ এবং গোটা ফিলিস্তিনকে আরব মুসলিমদের একক শাসনাধীনে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানায় তারা। উল্লেখ্য, পূর্ব আরব সাগর থেকে পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর এবং উত্তরে ভূমধ্যসাগর থেকে দক্ষিণে হর্ন অব আফ্রিকা’ ও ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত, সুবিশাল আরব ভূখন্ডের একক ঐতিহ্য ভাষা ও কৃষ্টি বিনষ্টের আশঙ্কায় আরবলীগ কর্তৃক ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার পেছনে প্রধান কারণ বা চালিকাশক্তি ছিল মূলত আরব জাতীয়তাবাদ ধর্ম নয়। কেননা ব্রিটিশ বা ফরাসী ঔপনিবেশিক শাষক থেকে সম্প্রতি মুক্ত হওয়া ও প্রস্তাবিত ইসরায়েলের সম্ভাব্য প্রতিবেশী এসব আরব রাষ্ট্রগুলোর অনেকের শাসন ক্ষমতায় সে সময় অসীন ছিল সেক্যুলারপন্থিরা (ধর্ম নিরপেক্ষরা)
ইহুদিরা জাতিসংঘ প্রদত্ত প্রস্তাব ও ম্যাপ মেনে নিলেও ফিলিস্তিনি মুসলিমরা স্বভাবতই তা প্রত্যাখ্যান করে। কেননা ৩২ শতাংশ ইহুদি জনগণকে (যাদের অধিকাংশই অভিবাসী) যেখানে ফিলিস্তিনি ভূমির ৫৬ শতাংশ প্রদান করা হয়, সেখানে ৬৮ শতাংশ মূল আদিবাসী মুসলিম আরবদেরকে প্রদান করা হয় মাত্র ৪৪ শতাংশ ভূমি। অবশ্য প্রস্তাবিত ম্যাপ অনুযায়ী ইসরায়েলের রাষ্ট্র সীমানার ভেতর বসবাসকারী প্রায় দশ লক্ষ অধিবাসীর ভেতর ইহুদি ও মুসলিমদরে সংখ্যা ছিল প্রায় সমান সমান। পক্ষান্তরে, ফিলিস্তিনের রাষ্ট্র সীমানার ভেতর বসবাসকারী প্রায় আট লক্ষ অধিবাসীর ভেতর ইহুদিদের সংখ্যা ছিল মাত্র দশ হাজার। আর জাতিসংঘ নিয়ন্ত্রিত জেরুজালেমে ইহুদি ও মুসলিমদের প্রস্তাবিত সংখ্যা ছিল সমান সমান চার লক্ষ করে। জাতিসংঘ কমিটির দাবি অনুযায়ী ইসরায়েলকে অধিক পরিমাণে ভূমি দেওয়ার পেছনে যুক্তি ছিল উক্ত এলাকায় ভবিষ্যত ইহুদি অভিবাসীদের সস্কুলানের ব্যবস্থা রাখা। এছাড়া মানুষ বসবাসের জন্য প্রতিকূল, দক্ষিণের নেগেভ মরুভূমি ইসরায়েলকে দেওয়া হয় এই উদ্দেশ্য যেন ভবিষ্যতে আগত ইহুদি অভিবাসীরা সেখানে নিজেদের প্রয়োজনে বসতি গড়ে নিতে পারে। জাতিসংঘের দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ফিলিস্তিন বিভাজনের প্রস্তাব অনুমোদন ইহুদি শিবিরে যতখানি আনন্দ বয়ে আনে, ঠিক ততখানিই অসন্তুষ্ঠি ও ক্ষোভ বয়ে আনে আরব শিবিরে। যার পরিপ্রেক্ষিতে আবারও দফায় সংঘর্ষ বাঁধে ফিলিস্তিনের ইহুদি ও মুসলিমদের ভেতর এবং প্রচুর হতাহতের ঘটনা ঘটে। ১৯৪৮ সালের মে মাসে ব্রিটিশ সরকারের ফিলিস্তিন ম্যান্ডেট-এর মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আগের দিন ইসরায়েল স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ইসরায়েলের স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই আমেনিকা ও রেজা শাহ পাহলভির ইরান ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দান করে। যা অনুসরণ করে পরবর্তী দিনগুলোতে অন্যান্য অনেক অমুসলিম দেশ ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দান করে। তবে ইসরায়েল স্বাধীনতা ঘোষণা করার পরদিনই ঈজিপ্ট লেবানন সিরিয়া জর্ডান ও ইরাক ইসরায়েলে সামরিক হামলা চালায়। ইউরোপীয় উপনিবেশ থেকে সম্প্রতি মুক্ত হওয়া এসব আরবদেশ সামরিকভাবে সে সময় তেমন একটা শক্তিশালী না হওয়ায় ইসরায়েলকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়। ১৯৪৯ সালের জুলাইতে সিরিয়ার সাথে আর্মিস্টিস? (যুদ্ধবিরতি) চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে ইসরায়েল-আরব যুদ্ধের অবসান ঘটে। তবে ইসরায়েল তার সার্বভৌমত্বকে ধরে রাখতে সমর্থ হয় এবং ইতিমধ্যে ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করে নিজেদের রাষ্ট্র সীমানা ১৯৪৭-এর জাতিসংঘের অনুমোদিত বিভাজন ম্যাপের চেয়ে ন্যূনতম আরও ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করতে সমর্থ হয়। আরব-ইসরায়েল যুদ্ধকালীন ইসরায়েল নিজস্ব ভূভাগ (জাতিসংঘের ম্যাপ অনুযায়ী) ও দখলকৃত এলাকা থেকে মুসলিম অধিবাসীদের ঢালাওভাবে বিতাড়ন করে এবং নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে মুসলমানদের মাঝে ত্রাসের সৃষ্টি করে। নিজেদের আবাসভূমি থেকে উৎখাত হওয়া ও প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা ফিলিস্তিনি আরবরা ইসরায়েলি সীমানার বাইরে ও আশপাশের আরবদেশগুলোতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করে। অবশ্য এর বিপরীত চিত্রটাও এখানে উল্লেখ করা দরকার। আরবদেশগুলো থেকে অন্তত আড়াই থেকে তিন লক্ষ ইহুদি ইসরায়েলে মাইগ্রেট করে ১৯৪৮ সালের ইসরায়েল আরব যুদ্ধের পর। এছাড়া ১৯৬৭ মারের অন্যতম বৃহৎ ইসরায়েল-আরব যুদ্ধের পর আশপাশের প্রায় ১০ টা আরবদেশ থেকে অন্তত সাড়ে আট লক্ষ ইহুদি ইসরায়েলে মাইগ্রেট করে। এর ভেতর ধর্মীয় ও আদর্শগত কারণে স্বেচ্ছায় যত সংখ্যক ইহুদি ইসরায়েলে মাইগ্রেট করেছে, নিজেদের বাসস্থান থেকে বিতাড়িত কিংবা অত্যাচারিতি হয়ে বাধ্য হয়ে ইসরায়েলে মাইগ্রেট করেছে এমন ইহুদির সংখ্যা সম্ভবত তার চেয়ে অনেক বেশি।
১৯৬৭ সালে ইসরায়েল-আরব যুদ্ধের সূত্রপাত হয় মূলত ইসরায়েলের সাথে পার্শ্ববর্তী আরবদেশগুলোর রাষ্ট্র সীমানায় সংঘটিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ও বিচ্ছিন্ন অনেকগুলো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটার মাধ্যমে যা ইসরায়েলের সাথে প্রতিবেশী আরবদেশগুলোর এতদপূর্বে সৃষ্ট উত্তেজনাকে আরও বৃদ্ধি করে। ১৯৬৭ সালের মে মাসে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে থেকে সিরিয়ান বর্ডারের অনতিদূরে ইসরায়েলি সীমানায় ইসরায়েলের সৈন্য সমাবেশের মিথ্যে সংবাদ পেয়ে ঈজিপ্ট ইসরায়েলি সীমানার কাছাকাছি সিনাই ভূখ-ে সৈন্য সমাবেশ করে এবং জর্ডানের সাথে এক সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। জর্ডান ইসরায়েলি সীমানার কাছাকাছি নিজস্ব সৈন্য মোতায়েন করে এবং জর্ডানের আহ্বানে আগত একদল ইরাকি সৈন্য জর্ডানি সৈন্যদের সাথে যোগ দেয়। ইতিমধ্যে ঈজিপ্ট ১৯৫৭ সালের জাতিসংঘের নৌচুক্তি ভঙ্গ করে ইসরায়েল কর্তৃক ব্রবহৃত সুয়েজ খালের নৌ চলাচলের পথ বন্ধ করে দিলে ইসরায়েল ঈজিপ্টের নৌচুক্তি ভঙ্গকে যুদ্ধের বৈধতা দানের আজুহাতে ১৯৬৭ সালের ৫ জুন আকস্মিকভাবে পার্শ্ববর্তী আরবদেশেগুলোতে সামরিক স্থাপনা ও সন্নিবেশিত সৈন্যদের ওপর বিমান হামলা চালায়। ব্রিটিশ এবং বিশেষ করে মার্কিন আর্থিক ও সামরিক সাহায্যপুষ্ট, শক্তিশালী ইসরায়েল মাত্র ছয়দিনব্যাপী এই যুদ্ধে সহজেই বিজয় লাভ করে। ইসরায়েল এই যুদ্ধে ঈজিপ্ট নিয়ন্ত্রিত সিনাই ভূখ, জর্ডান নিয়ন্ত্রিত ওয়েস্ট ব্যাংক ও ইস্ট জেরুজালেম এবং সিরিয়া নিয়ন্ত্রিত গোলান হাই?স? দখল করে নেয়। অবশ্য ১৯৭৯ সালে এক শান্তি চুক্তির মাধ্যমে ঈজিপ্টকে সিনাই ভূখণ্ড ফিরিয়ে দেয় ইসরায়েল। ইহুদিরাষ্ট্রপন্থি ও ইসরায়েলিদের অনেকে এই যুদ্ধকে প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ বলে দাবি করলেও বিশ্বের অধিকাংশ ইতিহাসবিদ, দার্শনিক ও রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবীদের অভিমতে প্রতিবেশী আরবদেশগুলোর ওপর ইসরায়েলের  এই সামরিক হামলা ছিল সুস্পষ্ট আগ্রাসন।
ইসরায়েলিদের দখকৃত অংশে তথা স্বভূমিতে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের মানবেতর জীবনযাপন, আন্তর্জাতিক নির্দেশ উপেক্ষা করে ফিলিস্তিনি ভূমিতে ইসরায়েলিদের প্রক্রিয়াগতভাবে ও পর্যায়ক্রমে ইহুদি বাসন্থান স্থাপন এবং স্বল্পসংখ্যক ফিলিস্তিনি যোদ্ধার বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী হামলার প্ররিপ্রেক্ষিতে ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরগুলোতে ইসরায়েলিদের পরিকল্পিত সামরিক অভিযান চালিয়ে অসংখ্য নিরীহ ফিলিস্তিনি নারী পুরুষ ও শিশুদের হত্যার ঘটনায় ধীরে ধীরে ইসরায়েল বিরোধী মনোভাবের জন্ম হয়েছে বিশ্বব্যাপী। এবং তারই ধারাবাহিকতায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে রাজনৈতিক সচেতন ও মানবতাবাদী অসংখ্য মানুষ ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব ভূখ- ফিরে পাওয়ার ন্যায়সঙ্গত দাবির সমর্থনে এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশের জন্য দেশে দেশে ইসরায়েলি সামগ্রী বর্জন করেছেন। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যার স্থায়ী সমাধান বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে ক্রমে সর্বাধিক কাক্সক্ষত রাজনৈতিক সমাধান হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।
মজার ব্যাপার হলো ১৯৬৭ সালে প্রতিবেশী আররদেশগুলোর ওপর অতর্কিত সামরিক হামলা চালিয়ে ইসরালেয়ের আরব ভূখ- দখল করে নেওয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যেখানে সুস্পষ্ট আগ্রাসন হিসেবে বিবেচিত এবং যে কারণে ইউরোপসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ ১৯৬৭ সালের ইসরায়েল-আরব যুদ্ধপূর্ব মানচিত্র অনুযায়ী ইসরালেয়ের সীমানা প্রত্যাহারের পক্ষে, সেখানে জাতিসংঘের অসংখ্য সম্মেলনে আরব লীগ কর্তৃক উত্থাপিত এবং এশিয়া ও ইউরোপের অধিকাংশ দেশ কর্তৃক সমর্থিত ইসরালেয়ের সীমানা প্রত্যাহারের প্রস্তাবিত বিল প্রতিবার পরাজিত হয়েছে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য ও ভোট প্রদানের ক্ষমতাধারী আমেরিকার একমাত্র ভেটো প্রদানের কারণে। বিভিন্ন সূত্রমতে এ যাবৎকাল দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূমিতে ইসরায়েল কর্তৃক অসংখ্য বেসামরিক ফিলিস্তিনিকে হত্যার প্রতিবাদে নিন্দা জানিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত চল্লিশটারও বেশি বিল আমেরিকার ভেটোর কারণে পরাজিত হয়েছে। সেই ১৯৬২ সাল থেকে অদ্যাবধি আমেরিকা ১০০ বিলিয়ন ডলারের অধিক অর্থ সাহয্য প্রেরণ করেছে ইসরায়েলে অনুদান হিসেবে। আজ আমেরিকার জাতীয় আর্থিক ঘাটতি যেখানে প্রায় ১৪ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, অধিকাংশ স্থানীয় ও প্রাদেশিক সরকার যেখানে নিজস্ব বাজেট ঘাটতি পূরণে অপারগ, জাতীয় বেকারত্ব যেখানে প্রায় ১০ শতাংশ সেখানে আগামী ২০১৩ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলের সামরিক খাতে প্রতি বছর ৩.১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ সাহার্য্য পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আমেরিকা। তো আমেরিকার এহেন নগ্ন, চরম পক্ষপাতপুষ্ট ও অন্ধভাবে ইসরায়েলকে সমর্থন করার এবং ইসরায়েলের সামরিক খাতে প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অর্থ সাহায্য পাঠানোর ও সর্বোতভাবে ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষার কারণটা কী? (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ