ঢাকা, সোমবার 23 July 2018, ৮ শ্রাবণ ১৪২৫, ৯ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ভল্টের সোনা নয় ছয়ের ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা

স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রাখা সোনা নয় ছয়ের ঘটনায় গোজাঁ মিলের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় ব্যাংকটির মুখপাত্র পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। মুখপাত্র  দেবাশিস চক্রবর্তীকে সরিয়ে সিরাজুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁরা দুজনই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক। ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলা মুখপাত্রের দায়িত্ব। এমন শাস্তির ঘটনার ব্যাংকটি তার দায় স্বীকার করে নিলো বলে জানিয়েছে খাত সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভোল্টে রক্ষিত সোনার বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি নির্বাহী পরিচালক দেবাশিস চক্রবর্তী। তাঁর সঙ্গে কয়েক দফা যোগাযোগ, লিখিত প্রশ্ন জমা দেওয়ার পরও তিনি গণমাধ্যমকে যথাযথ কোনো মন্তব্য দেননি। এর ফলে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন নিয়ে বিপাকে পড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, সোনার ক্যারেটের তারতম্য ঘটানোর কারণে সরকারের ১ কোটি ৯০ লাখ ৮৫ হাজার ৩৪৬ টাকা ৬৭ পয়সা ক্ষতির সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। আর সরকার বলছে এটি অক্ষরিক ভুল। এতে কোন নয় ছয়ের ঘটনা ঘটেনি। যদি ঘটে থাকে তাহলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নতুন মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া সিরাজুল ইসলাম বলেন, তাঁকে গতকাল রোববার বিকেলেই এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
 গত বছর শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে ভল্টে রাখা সোনার মান নিয়ে এ ভয়ংকর অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। দৈবচয়ন ভিত্তিতে নির্বাচন করা বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রক্ষিত ৯৬৩ কেজি সোনা পরীক্ষা করে বেশির ভাগের ক্ষেত্রে এ অনিয়ম ধরা পড়ে। প্রতিবেদনটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড হয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে।
২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর। গত জানুয়ারিতে কমিটি শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর প্রতিবেদন জমা দেয়। গত ২৫ জানুয়ারি প্রতিবেদনটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো হয়। পরিদর্শন দল ভল্টে রাখা সোনার যাচাই-বাছাই শেষে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। তার মধ্যে প্রথম পর্যবেক্ষণ ছিল একটি সোনার চাকতি ও আংটি নিয়ে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট কাস্টম হাউসের গুদাম কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ গোলাকার কালো প্রলেপযুক্ত একটি সোনার চাকতি এবং একটি কালো প্রলেপযুক্ত সোনার রিং বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেন। বাংলাদেশ ব্যাংক ওই চাকতি এবং আংটি যথাযথ ব্যক্তি দিয়ে পরীক্ষা করে ৮০ শতাংশ (১৯ দশমিক ২ ক্যারেট) বিশুদ্ধ সোনা হিসেবে গ্রহণ করে প্রত্যয়নপত্র দেয়। কিন্তু দুই বছর পর পরিদর্শন দল ওই চাকতি ও আংটি পরীক্ষা করে তাতে ৪৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ (১১ দশমিক ২ ক্যারেট) সোনা পায়। আংটিতে পায় ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ সোনা (৩ দশমিক ৬৩ ক্যারেট)। ধারণা করা হচ্ছে ভল্টে রাখার পর এগুলো পাল্টে ফেলা হয়েছে।
প্রতিবেদন বলছে, ভল্টে থাকা সোনার চাকতি এবং আংটি পরীক্ষার পর দেখা গেল এগুলো সোনার নয়, অন্য ধাতুর মিশ্রনে তৈরি। এতে সরকারের ১ কোটি ১১ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬ টাকা ৫০ পয়সা ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিদর্শন দল প্রতিটি রসিদের অনুকূলে জমা হওয়া সোনা যাচাই করেছে। তাতে দেখা গেছে, সোনার অলংকার এবং সোনার বারে ক্যারেটের তারতম্য করা হয়েছে। ২৪ থেকে ২০ ক্যারেটের ৯৬০ কেজি সোনার বেশির ভাগের ক্ষেত্রে ভল্টে ১৮ ক্যারেট হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। কম ক্যারেটে নথিভুক্ত থাকায় নিলাম বা অন্য উপায়ে বিক্রির সময় অতিরিক্ত ক্যারেটের বিপরীতে প্রাপ্য টাকা থেকে সরকার বঞ্চিত হবে। সোনার ক্যারেটের তারতম্য ঘটানোর কারণে সরকারের ১ কোটি ৯০ লাখ ৮৫ হাজার ৩৪৬ টাকা ৬৭ পয়সা ক্ষতির সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
ক্যারেটের তারতম্য হলে সোনার দামের কী পার্থক্য হয় সে বিষয়ে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) নির্বাহী কমিটির সদস্য দেওয়ান আমিনুল ইসলাম জানান, ক্যারেটের মাধ্যমে সোনার মান নির্ধারিত হয়। আর মান অনুসারে সোনার দাম কমবেশি হয়। ২২ ক্যারেট বা ২১ ক্যারেটের সোনা এবং ১৮ ক্যারেটের সোনার দামে বড় অঙ্কের পার্থক্য আছে।
শুল্ক গোয়েন্দা, কাস্টমসহ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে আটক সোনা নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা করা হয়। কাস্টম হাউসের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে যখন সোনা জমা রাখা হয়, তখন ব্যাংকের পক্ষ থেকে স্বর্ণকার দিয়ে পরীক্ষা করে সোনার মান নির্ধারণ করা হয়। ব্যাংক, এনবিআর এবং সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ওই সব সোনা মান নির্ধারণপূর্বক ব্যাংক গ্রহণ করে রসিদ দেয় সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে এ-সম্পর্কিত প্রতিবেদন পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গর্বনর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বিষয়টি জেনে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এটি অকল্পনীয়। যারা কাস্টডিয়ান, তাদের হাতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে বিস্মিতই হতে হয়। ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ব্যাংকে কাজ করার সূত্রে আমি জানি, এসব ক্ষেত্রে দায়িত্বে থাকেন হাতে গোনা কয়েকজন। পরিদর্শন প্রতিবেদনে যে তথ্য এসেছে, সে তথ্য থেকে ঘটনার সময় যাঁরা দায়িত্বে ছিলেন তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে সব বের হয়ে আসবে। ঘটনাটিকে ছোট ভাবার কারণ নেই। ভল্টের মতো উচ্চ গুরুত্বের জায়গায় এমন অনিয়মকে গুরুত্ব না দিলে আরও বড় ঘটনা ঘটতে পারে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন এই ঘটনার জন্য যারা ভল্টের দায়িত্বে ছিলেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে কেন ব্যাংকটির মুখপাত্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলে তা বুঝা কঠিন। তবে এটি বুঝতে কোনভাবেই কঠিন হচ্ছে যে সরকার বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে। সাবেক এক জন ডেপুটি গর্বনর বলছে, এটির দায়িত্বে আছে মাত্র কয়েক জন তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। অন্য কারো ওপর ব্যবস্থা নিয়ে সরকার মূল হোতাদের বাচানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
এ ঘটনায় যদি মূল হোতারা রিজার্ভ চুরির নায়কদের মত পার পেয়ে যান তাহলে এর ফল ভালো হবে না। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে রয়েছে প্রায় ২০ টনের(রিজার্ভ) ওপর সোনা। এর বাহিরেও ভল্টে রয়েছে কয়েক টন সোনা। এ সব সোনার দায়িত্বে যারা রয়েছে তারা যদি এরকম দুনীতি করে পার পেয়ে যান তাহলে দেশের গোটা রিজার্ভই হুমকিতে পড়ে যাবে। এ ঘটনাকে ছোট করে দেখান কিছু নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ