ঢাকা, সোমবার 23 July 2018, ৮ শ্রাবণ ১৪২৫, ৯ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কোর্টের ওসি মাহমুদুর রহমানকে সরকার দলীয় সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দেয়

গতকাল রোববার নয়াপল্টন বিএনপি কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার: দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র আওয়ামী লীগের ক্রীড়ানকে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল রোববার কুষ্টিয়ায় আদালত প্রাঙ্গনে আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ওপর ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলা ঘটনার পর এক জরুরী সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব এই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, এই রাষ্ট্রযন্ত্র সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র এখন রাষ্ট্র নেই, এটা অকায্র্কর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এখানে রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ করছে না। আজকে (রোববার) পুলিশ চলছে আওয়ামী লীগের নির্দেশে এবং দুঃখজনকভাবে বিচারাঙ্গনকেও তারা প্রায় দখল করে ফেলেছে। আমরা আপনাদের মাধ্যমে দেশের জনগণের কাছে এই কথাটা পৌঁছাতে চাই যে, এদেশে গণতন্ত্রের সমস্ত প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রযন্ত্র আওয়ামী লীগের ক্রীড়ানকে পরিণত হয়েছে। কুষ্টিয়ায় কোর্টের ওসি জোর করে মাহমুদুর রহমানকে আদালত থেকে বের করে সরকার দলীয় সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দেয়।
কুষ্টিয়ায় মাহমুদুর রহমানের ওপর হামলার ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে  মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, মাহমুদুর রহমান সাহেব যখন আদালতের কাছে প্রোটেকশন চান, কোর্ট থানায় ফোন করে এবং ওসিকে ব্যবস্থা নিতে বলেন। ওসি সেখানে এসে উপস্থিত হননি। এরপর একেবারে উচ্চ মহলেও পর্যন্ত যোগাযোগ করা হয়েছে কিন্তু দুভার্গ্যজনকভাবে এই সরকারের পুলিশ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। উপরন্তু তাদের সহায়তায় সরকারি দলের ক্যাডার বাহিনী তার উপর বর্বর হামলা চালিয়েছে। আদালতে যে ওসি থাকেন তিনি মাহমুদুর রহমান সাহেবসহ অন্যান্যদেরকে বলেছেন যে, আপনারা বাইরে আসেন, বের হন। যাকে বলা যায় যে, জোর করে বের করে ওই সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। যার ফলে সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে আক্রমন করা হয়েছে বিশেষ করে মাহমুদুর রহমান সাহেবকে মাথায় আঘাত করেছে এবং বুকে রক্তাক্ত করা দিয়েছে। সেখানে অন্যান্য যারা ছিলেন তারা আহত হয়েছেন।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, তারা সেখানে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পাননি। কোনো গাড়ি পর্যন্ত তাদেরকে দেয়া হয়নি। সরকারের দায়িত্ব উচিৎ ছিলো সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ হেফাজতে তাকে হাসপাতালে পাঠানো ও তারপর তাকে ঢাকায় আসার ব্যবস্থা করা। দুঃখজনকভাবে শুধু নয় আমরা ক্ষোভের সাথে লক্ষ্য করেছি যে, তারা ( সরকার) এই ব্যবস্থা তো করেনইনি উপরন্তু যেন মাহমুদুর রহমান সাহেবের ওপর এই আক্রমনটা  করে তার ব্যবস্থা তারা করেছেন। আমরা  নিন্দা ও ধিক্কার জানাচ্ছি। আমরা অবিলম্বে যারা কুষ্টিয়ায় এ ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করে তাদের বিরুদ্ধে বিচারবিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি।
এই সরকারের পতন না ঘটানো গেলে এসব ‘অন্যায়ের’ বিচার হবে না বলে মন্তব্য করেন মির্জা ফখরুল। না হলে শুধু মাহমুদুর রহমান নয় কোনে নাগরিক আদালত বা কোথাও নিরাপদে থাকবে না।
এর আগে নয়া পল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক ও সম্পাদকদের সভা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বিএনপি মহাসচিব। বৈঠকে দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি বিশেষ করে দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও তার চিকিৎসা নিয়ে করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে তিন সিটি নির্বাচন পরবর্তী এবং আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে আন্দোলন জোরদার করার বিষয়ৈও আলোচনা হয়েছে। আজকালের মধ্যে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে জানা গেছে।
সাংবাদিক সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, আবদুল মঈন খান গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব মাহবুবউদ্দিন খোকন, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবীর খোকন,সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, আসাদুল হাবিব দুলু, নজরুল ইসলাম মঞ্জু, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, মাহবুবে রহমান শামীম শামা ওবায়েদ, প্রচার সম্পাদক শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
ক্ষোভ প্রকাশ: জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি (রাজশাহী বিভাগ) ও বগুড়া জেলা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মোঃ জাহাঙ্গীর আলম মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা মামলায় বগুড়া জজকোর্টে হাজিরা দিতে গেলে তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল এক বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি (রাজশাহী বিভাগ) ও বগুড়া জেলা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মোঃ জাহাঙ্গীর আলম এর জামিন বাতিল করে কারাগারে প্রেরণের ঘটনা-সরকার কর্তৃক দেশব্যাপী বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বানোয়াট মামলা দায়ের, গ্রেফতার, কারান্তরীণ ও নির্যাতনেরই ধারাবাহিকতা। মিথ্যা মামলায় মোঃ জাহাঙ্গীর আলমের জামিন বাতিল করে কারাগারে প্রেরণ বর্তমান সরকারের হিংসাশ্রয়ী রাজনীতির আরেকটি জঘন্য বহি:প্রকাশ। বর্তমান সরকারের অন্যায়-অবিচার ও ভয়াবহ দু:শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কন্ঠস্বর তরুণ সমাজকে নিশ্চিহ্ন করতেই তরুণদেরকে টার্গেট করে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে কারান্তরীণ করা হচ্ছে। হত্যা-বিচারবহির্ভূত হত্যা-গুম-অপহরণ-মিথ্যা মামলা দায়ের-গ্রেফতার-কারান্তরীণ এবং দমন-পীড়ণ চালিয়ে দেশের বিরোধী দল বিশেষ করে বিএনপি-কে নিশ্চিহ্ন করে বাংলাদেশে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার আকাঙ্খা এদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণ কখনোই বাস্তবায়িত হতে দেবেনা। বিএনপি মহাসচিব অবিলম্বে দায়েরকৃত সকল বানোয়াট মামলা প্রত্যাহার ও নি:শর্ত মুক্তির জোর দাবি জানান।
শোকবার্তা: ঢাকা জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি শরীফ মোঃ মহিউদ্দিনের (৫৯) মৃত্যুতে গভীর শোক ও দু:খ প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এক শোকবার্তায় বিএনপি মহাসচিব বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নীতি ও আদর্শ এবং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী দর্শণে বিশ্বাসী মরহুম শরীফ মোঃ মহিউদ্দিন ঢাকা জেলা বিএনপি ও কেরানীগঞ্জ মডেল থানা বিএনপি-কে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করতে যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন তা এলাকার নেতাকর্মীদের মনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিএনপি মহাসচিব শোকবার্তায় মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যবর্গ, আত্মীয়স্বজন, গুণগ্রাহী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
ছাত্রশিবিরের তীব্র নিন্দা
রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার সাংবাদিক, আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ওপর ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের বর্বর হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।
গতকাল রোববার দেয়া যৌথ প্রতিবাদ বার্তায় ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি ইয়াছিন আরাফাত ও সেক্রেটারি জেনারেল মোবারক হোসাইন বলেন, অসভ্য ও বর্বরতার সর্ব নিন্ম স্তরে পৌছে গেছে সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগ। গত ১০ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি ইয়াসিন আরাফাত তুষারের দায়ের করা বঙ্গবন্ধুকে কটুক্তির মিথ্যা মানহানির মামলায় জামিন নিতে গতকাল রোববার কুষ্টিয়া সদর জুডিশিয়াল ম্যাজেস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করেন মাহমুদুর রহমান। দুপুর ১টার দিকে তিনি আইনজীবী ও সাংবাদিক নেতাদের সাথে আদালত থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে আদালত ভবনের প্রতিটি প্রবেশদ্বার আটকিয়ে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা। যার নেতৃত্ব ছিল কুষ্টিয়া জেলা সভাপতি ইয়াসিন আরাফাত তুষার। এসময় মাহমুদুর রহমান পুনরায় আদালতের এজলাসে আশ্রয় নিয়ে লিখিতভাবে পুলিশ প্রোটেকশনের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু রহস্যজনক ভাবে পুলিশ নিরব ভূমিকা পালন করে। এমনকি ম্যাজিষ্ট্রেট কর্তৃক ওসিকে আসার জন্য বললেও তিনি আসেননি। পরে তিনি আদালত এলাকা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে তার ওপর বর্বর হামলা চালায় ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা। এতে তিনি মারাত্বকভাবে আহত হয়েছেন।
তারা বলেন, পবিত্র আদালতে পুলিশের সামনে দেশের একজন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বকে রক্তাক্ত করেছে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা। ছাত্রলীগের সর্বাত্মক সন্ত্রাসী কার্যক্রমের পরও পুলিশের নিরব ভূমিকা পালনে প্রমাণ হয় এ হামলা পূর্ব পরিকল্পিত এবং অবৈধ সরকারের নির্দেশেই হয়েছে। কোন সভ্য সমাজ বা দেশে এ বর্বরতা কল্পনাও করা যায় না। সরকার ও পুলিশের সরাসরি মদদের ফলে অসভ্যতা এবং বর্বরতার নজিরবিহীন তান্ডব চালাচ্ছে ছাত্রলীগ নামের অভিশপ্ত সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। আদালতেও যদি একজন নাগরিক ছাত্রলীগের সন্ত্রাস থেকে মুক্তি না পায় তাহলে মানুষের জন্য আর নিরাপত্তা বলতে কিছু থাকে বলে মনে হয়না। আমরা ছাত্রলীগের এই জঘন্য ও ন্যক্কারজনক অপকর্মের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
নেতৃদ্বয় বলেন, এর আগেও ছাত্রলীগ সম্মানিত শিক্ষকদের লাঞ্চিত করেছে। মায়ের পেটে থাকা শিশুকে গুলী করে ঝাঝরা করে দিয়েছে। বহু নিরপরাধ ছাত্রকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে, গুলী করে নৃশংসভাবে খুন করেছে। ক্যাম্পাসগুলোকে অস্ত্রের মিনি ক্যান্টনম্যান্ট আর মাদকের আখড়ায় পরিণত করেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাতুরী দিয়ে পিটিয়েছে। বিরোধী মতের সংগঠনের নেতার ওপর প্রকাশ্য হামলা চালিয়ে তার পা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ছাত্রীদের প্রকাশ্যে শ্লীলতাহানী করেছে ও ধর্ষণের হুমকি দিয়েছে। সারাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কার্মকাণ্ডের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। কিন্তু ছাত্রলীগের কোনো নির্মমতারই বিচার করা হয়নি। রাষ্ট্রীয় মদদের কারণেই আজ আদালতকে রক্তে রঞ্জিত করেছে জঙ্গিবাদী সংগঠন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। এ হামলা শুধু মাহমুদুর রহমানের উপর হয়নি বরং আদালতের উপরও হয়েছে। স্বয়ং পুলিশই যদি সন্ত্রাসীদের সহযোগির ভূমিকা পালন করে তাহলে জনগণ যাবে কোথায়? দলবাজী আর সন্ত্রাসীদের তোষণ করতে গিয়ে পুলিশও এখন ছাত্রলীগের মত ঘৃণার প্রতিকে পরিণত হয়েছে। আমরা অবিলম্বে হামলাকারী ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও উপযুক্ত বিচারের দাবি জানাচ্ছি। একই সাথে নাগরিকদের নিরপত্তা দিতে গাফিলতি করায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানাচ্ছি।
নেতৃদ্বয় অবিলম্বে হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনতে এবং সর্বক্ষেত্রে নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ