ঢাকা, সোমবার 23 July 2018, ৮ শ্রাবণ ১৪২৫, ৯ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রাষ্ট্রীয় কর্পোরেশনের ঋণ

সরকার ও সরকারি দলের নেতারা যখন বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তীর্ণ হওয়ার সক্ষমতার কথা জোর গলায় বলে বেড়াচ্ছেন, তখন দেশের প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, অব্যবস্থা, অদক্ষতা, অবক্ষয়, অস্বচ্ছতা ও নজিরবিহীন ব্যর্থতার চিত্রই দেখা যাচ্ছে। যদিও অর্থনৈতিক সূচক ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান অভীষ্ঠ নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে জনগণের আস্থায় আনা, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনকল্যাণে নিয়োজিত করার পাশাপাশি আইনের শাসন তথা সুশাসন নিশ্চিত করাই আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল লক্ষ্য। সে অর্থে বর্তমান আওয়ামী সরকারের আমলে আমাদের দেশ ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ছে। রাষ্ট্রের প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান যেন জনগণের আস্থাহীনতার সংকটে পড়েছে। জননিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করার জন্য যেমন রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো ব্যর্থ হচ্ছে, এর পাশপাশি ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব খাত, বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন খাতসহ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যেসব রাষ্ট্রীয় কর্পোরেশন রাজস্ব আয়ের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হিসেবে দাঁড়াতে পারতো, সেসব প্রতিষ্ঠানগুলোই এখন হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণগ্রস্ত ও ঋণখেলাপী হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায় যে, রাষ্ট্রীয় ৩০টি কর্পোরেশনের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ ৩১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। শুধুমাত্র বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছেই বাণিজ্যিক ব্যাংকের পাওনা প্রায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা। এরপর চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনের ব্যাংক ঋণ ৫ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। এছাড়া ঋণগ্রস্ত অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন, পেট্রোবাংলা এবং বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন। রাষ্ট্রীয় এসব প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ধরে লোকসান দিয়ে চলছে এবং লোকসানের পরিমাণ দিন দিন কেবল বেড়েই চলেছে।
দেশের অর্থনীতির আকার বাড়ার সাথে সাথে বার্ষিক অর্থবাজেটের আকারও বেড়ে চলেছে। বিশাল আকারের ঘাটতি বাজেট নিয়ে লাখো কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন করতে প্রায় প্রতি বছরই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে হিমশিম খেতে হয়। সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের বোঝা মূলত জনগণকেই বহন করতে হয়। সরকারি ঋণ পরিশোধ করতে জাতীয় বাজেটে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। পাশাপাশি যেসব রাষ্ট্রীয় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান জনগণের পক্ষে সরকারের সাথে নানা বিষয় দেনদরবার, বোঝাপড়া করার কথা সেসব প্রতিষ্ঠানকেও নানাভাবে অকার্যকর করে ফেলছে সরকার। জনগণের অর্থায়ন ও বিনিয়োগে গড়ে তোলা রাষ্ট্রীয় কর্পোরেশনগুলোকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করা মোটেও অসম্ভব নয়, নীতিনির্ধারণ ও নিয়োগে সরকারের সংশ্লিষ্টরা দুর্নীতিমুক্ত থাকলে এবং প্রয়োজনীয় তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলেই তা সম্ভব। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই সর্ষের ভেতর ভূতের উপস্থিতি রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ও বিশৃঙ্খল করে তুলেছে। জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, ব্যাংকিং সেক্টর, পুঁজিবাজার, গণপরিবহন, বন্দর ব্যবস্থাপনা, খাদ্য নিরাপত্তা, রাজস্ব খাত পর্যন্ত বিদ্যমান অব্যবস্থাপনার জন্য মূলত সরকারের সংশ্লিষ্টদের অদক্ষতা ও বেপরোয়া দুর্নীতিই দায়ী। আইন প্রণেতারা যদি আইন না মানেন, রাষ্ট্রের পরিচালক-প্রতিনিধিরা যদি রাষ্ট্রের বিধি বিধানের তোয়াক্কা না করেন তাহলে সাধারণ মানুষ আইন মানার উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে এটাই স্বাভাবিক।
আওয়ামী সরকারের পৌনে ১০ বছর ধরেই দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ গতিহীন হয়ে আছে। বিনিয়োগে গতি আনতে ব্যাংকিং সেক্টরসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতো। কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, লুটপাট ও অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কর্পোরেশনগুলোর খেলাপী ঋণ এবং বাজেট বাস্তবায়নে ব্যাংকিং সেক্টরের ওপর অতি মাত্রায় নির্ভরশীলতা বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এ সেক্টরের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। দেশ থেকে লাখো কোটি টাকা বিদেশে পাচার এবং ব্যাংকিং সেক্টরে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির সাথেও বর্তমানে প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশের অভিযোগ আছে। যে প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয় বাজেটে রাজস্ব সংস্থানের অন্যতম যোগানদাতা হতে পারতো দলবাজ অদক্ষ ও দুর্নীতিবাজ লোকদের নিয়োগ দিয়ে সেসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে লোকসানি ও ঋণখেলাপী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। একই প্রক্রিয়ায় দেশের সম্ভাবনাময় ব্যাংকিং সেক্টরকেও এখন অথর্ব ও দায়গ্রস্ত করে ফেলা হয়েছে। একদল প্রভাবশালী নেতা নামধারী লোকদের লুটপাটের কারণে অনেক ব্যাংক এতটাই দেউলিয়া হয়ে পড়েছে যে গত ৬ মাস ধরে গ্রাহকদের আমানতও ফেরত দিতে পারছে না। অন্তত ৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে এখন মূলধন ভেঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে বলে প্রকাশিত খবরে জানা যায়। জনগণের টাকায় গড়ে তোলা রাষ্ট্রীয় কর্পোরেশনগুলোই যখন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করে না, তখন ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর হওয়ার নীতি একটি আইনগত বৈষম্যের উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে। সরকারি কর্পোরেশনগুলোই যদি বাণিজ্যিক ব্যাংকের আমানত ও মূলধন লুটপাট করে খেয়ে ফেলে তাহলে বেসরকারি বিনিয়োগ আদৌ কী আশা করা যায়?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ