ঢাকা, সোমবার 23 July 2018, ৮ শ্রাবণ ১৪২৫, ৯ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অপরাধ প্রবণতা ও আইনের শাসন

জনজীবনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও মানুষের সকল কাজের শ্রেণিবিন্যাস এবং সংবিধিবদ্ধ করার জন্যই রাষ্ট্র নামক সংঘের ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল। যখন রাষ্ট্রীয় চিন্তার উম্মেষ ঘটেনি তখন সভ্যতাও ছিল পুরোপুরি অনুপস্থিতই। কারণ, রাষ্ট্রাচারের মাধ্যমেই মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশ তরান্বিত ও সহজসাধ্য হয়েছে। প্রাগৈতিহাসিককালে মানুষের মধ্যে কোন অপরাধবোধও সক্রিয় ছিল না। পেশীশক্তিই ছিল সকল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। নৈতিক মূল্যবোধের বিষয়টিও ছিল খুবই ভঙ্গুর। শক্তি-সামর্থের যথেচ্ছ ব্যবহার ও স্বেচ্ছাচারিতাকে অপরাধ বা অন্যায় মনে করা হতো না। ফলে দুর্বল ও পশ্চাৎপদরা ছিল নিগৃহীত ও অধিকার বঞ্চিত।
মূলত সভ্যতা উত্তর সময়ে অপরাধই ছিল না। কারণ, অপরাধ কী তা তখনও সংজ্ঞায়িতই হয়নি। কিন্তু মানবচিন্তা চেতনার ক্রমবিবর্তনের ফলেই মানুষের কিছু কাজকে অপরাধ বা গর্হিত বলে মনে করা শুরু হলো। সূচনালগ্লে তা সীমিত পরিসরে থাকলেও পরবর্তীতে তা আরও পরিশীতিল হয় এবং অপরাধের পরিধিও অনেককাংশে বেড়ে যায়। ফলে অপরাধ প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায়। আর তা প্রতিবিধানের জন্যও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়াও শুরু হয়। এ জন্য বিভিন্ন প্রক্রিয়াও শুরু হয়। আর এসব প্রক্রিয়ার ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে তা এখন আধুনিকতা উত্তর পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছেছে এবং আমরা তার সুবিধাভোগী। তবে তা এখনও কাঙ্খিত পর্যায়ে পৌঁছেনি।
খুব সঙ্গত কারণেই আইনের পরিভাষায় অপরাধকে সভ্যতার অবদান বলা হয়ে থাকে। কারণ, সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথেই অপরাধকে সংবিধিবদ্ধ করা হয়েছে। আর অপরাধ যখন সংজ্ঞায়িত হলো তখন অপরাধ প্রবণতাকে সীমিত পর্যায়ে রাখা বা প্রতিবিধানের আবশ্যকতাও দেখা দিল। এই আবশ্যকতা থেকেই রাষ্ট্রচিন্তার উম্মেষ তথা সূচনা হয়। কালের বিবর্তনে ও সময়ের প্রয়োজনেই রাষ্ট্রচিন্তার ক্রমবিকাশ, পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন হয়ে এখন আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সূচনা হয়। বর্তমান সময়ে তা অনেকটা পরিপূর্ণতাও পেয়েছে।
অপরাধ প্রবণতাকে সীমিত পর্যায়ে রেখে বা তার প্রতিবিধান করে জনজীবনে শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব এখন রাষ্ট্রের ওপর পড়েছে। আর এ দায়িত্ব রাষ্ট্র স্বতোপ্রণোদিত হয়েই কাধে তুলে নিয়েছে বলা যায়। কারণ, রাষ্ট্রের এসব সেবাদানের প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের বিপরীতেই নাগরিকরা রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য পোষণ ও রাষ্ট্রীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য কর প্রদান করে থাকেন। বস্তুত আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব যেহেতু সরকারের হাতে তাই এই দায়িত্ব সরকারের বলাটাই অধিক যুক্তিযুক্ত। তাই রাষ্ট্র ও জননিরাপত্তা একে অপরের পরিপুরক। একটি থেকে অপরদিকে আলাদা করার কোন সুযোগ নেই।
বিশে^র সকল ভূখন্ডই রাষ্ট্র ব্যবস্থার অধীন হলেও কোন দেশই অপরাধ প্রবণতা মুক্ত নয়। কারণ, মানুষ কখনই ষড়রিপুর প্রভাবমুক্ত নয়। তাই সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যেই অপরাধ প্রবণতার অস্তিত্ব থাকতেই পারে। আর মানুষের কাজকে নেতিবাচক প্রভাব থেকে বের করে এনে ইতিবাচক পথে পরিচালিত করার দায়িত্ব ও ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতেই অর্পিত। তাই এই দায় রাষ্ট্র কোন ভাবেই এড়াতে পারে না। একথা অনস্বীকার্য যে, উন্নত, উন্নয়নশীল, স্বল্পোন্নত ও অনুন্নত সকল দেশেই অপরাধ সংঘঠিত হয়। কিন্তু তা প্রতিবিধানে রাষ্ট্রকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। এজন্য বিশে^র সকল রাষ্ট্রেই রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমকে গতিশীল ও ক্রিয়াশীল রাখতে শাসনতন্ত্র বা সংবিধানের আবশ্যকতা দেখা দেয়। আর গৃহীত শাসনতন্ত্রের আলোকেই রাষ্ট্রের সবকিছুই পরিচালিত হয়। অপরাধ প্রবণতা দমন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য দন্ডবিধি, আইন-আদালত, প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারক এবং অবকাঠামো শুধু রাষ্ট্রের অঙ্গই নয় বরং সম্পূরকও বটে। কারণ, এসব অনুসঙ্গ ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্র পুরোপুরি অচল হতে বাধ্য। কিন্তু রাষ্ট্র যে সকল ক্ষেত্রেই পুরোপুরি সফল হয় এমনও নয়। খুব প্রাসঙ্গিক কারণেই বিশে^র কোন রাষ্ট্র থেকেই অপরাধ প্রবণতার মূলোৎপাটন করা সম্ভব হয়ন। আর তা হবারও কোন সম্ভবনা নেই। তবে তা সীমিত ও সহনীয় পর্যায়ে রাখা অবশ্যই সম্ভব যদি রাষ্ট্র যথাযথভাবে ক্রিয়াশীল থাকে। যেসব দেশে জনজীবনে শান্তি, শৃঙ্খলা রক্ষা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রে সহযোগি অঙ্গগুলো ক্রিয়াশীল থাকে সেসব দেশে অপরাধ প্রবণতা সীমিত ও সহনীয় পর্যায়ে রাখা খুবই সম্ভব। কিন্তু আমাদের দেশের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ও রূঢ় বাস্তবতায় দেশের অপরাধ প্রবণতা একেবারে লাগামহীন। এতে সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, আমাদের দেশে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও রাষ্ট্রযন্ত্র যথাযথভাবে ক্রিয়াশীল ও কার্যকর নয়। আর রাষ্ট্রের এই নির্লিপ্ত ও উদাসীনতার সুযোগের দেশের অপরাধ প্রবণতা ফুলে-ফলে একেবারে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে বলা যায়। মূলত বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও অপরাধীর শান্তি না হওয়ায় আমাদের দেশের অপরাধ প্রবণতা ক্রমবর্ধমানই বলতে হবে। আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীদের শাস্তি হয় না বরং ক্ষেত্রে বিশেষে চিহ্নিত অপরাধীরা বিভিন্নভাবে আনুকুল্যও পেয়ে থাকে। সঙ্গত অপরাধ করে গর্ব করার একটা অপসংস্কৃতিও গড়ে উঠেছে আমাদের দেশে। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে।
মূলত আমাদের দেশে সুস্থধারার রাজনৈতিক চর্চা ও সংস্কৃতি চালু না থাকায় এর জন্য প্রধানত দায়ি। আর ক্ষমতাকেন্দ্রীক নেতিবাচক রাজনীতি আমাদের জাতীয় জীবনের মহাসর্বনাশটা করেছে। কারণ, একটি দেশের রাজনীতিকে কেন্দ্র করেই জনগণের ভাগ্য আবর্তিত হয়। আমাদের দেশের রাজনীতি এখনও জনবান্ধব হয়ে উঠেনি বরং তা শ্রেণি বিশেষ ও গোষ্ঠী বিশেষের উচ্চাভিলাষ চরিতার্থের ঘুর্ণাবর্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে। ফলে রাজনীতি থেকে নাগরিকরা যেভাবে উপকৃত হওয়ার কথা সেভাবে উপকৃত না হয়ে রাজনৈতিক কারণেই অনেক ক্ষেত্রেই নিগ্রহের শিকার হচেছ। শুধু তাই নয়, প্রচলিত রাজনীতি শ্রেণি বিশেষের জন্য মনোরঞ্জিকা হলেও সাধারণ মানুষের স্বার্থ বরাবরই উপেক্ষিত হচ্ছে। উপকৃত হচ্ছে একশ্রেণির টাউট-বাটপার ও রাজনৈতিক ফরিয়ারা।
খুব সঙ্গত কারণেই রাজনৈতিক শক্তিগুলো সাধারণ মানুষের অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। ক্ষমতাসীনরাও জনগণের স্বার্থে কাজ করার পরিবর্তে নিজেদের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার জন্য তাদের সকল মেধা, মনন, মনোযোগ ও শক্তি কাজে লাগাচ্ছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহারের বিষয়টিও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। যারা ক্ষমতার প্রভাব বলয়ের বাইরে রয়েছেন তাদেরও ধ্যান-জ্ঞান ক্ষমতাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। ফলে একদিকে সরকার জনগণের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছে অন্যদিকে অপরাপর রাজনৈতিক শক্তিগুলোও জনগণের কল্যাণে তেমন কিছুই করতে পারছে না বা করার চেষ্টাও করছে না। ফলে গণদুর্ভোগ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এ অবস্থা থেকে দেশ ও জাতিকে উদ্ধার করা যাদের দায়িত্ব তারা সঠিক কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। ফলে অপরাধ প্রবণতা হয়ে উঠেছে ক্রমবর্ধমান। এখন তা প্রায় অপ্রতিরোধ হয়েই উঠেছে। বর্তমান সময়ে তা একেবারে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ বিষয়ে কোন পক্ষকে ত্রাতার ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে না বরং একটা অনাকাঙ্ঘিত উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতায় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে গণসচেতনতার অভাবের বিষয়টিও উপেক্ষার করার মত নয়।
দেশের অপরাধ প্রবণতা যে কতটা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে তা গত ৬ মাসের পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্টভাবে উপলদ্ধি করা যায়। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠিত সরকার এসব মোকাবেলায় কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বা আদৌ কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কি না তা নিয়ে রীতিমত প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি প্রাপ্ত এক তথ্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম ছয়মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪২৭ নারী । এদের মধ্যে ধর্ষণের পর ৩৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এখানে রাষ্ট্র দেশের নারী সমাজের একদিকে সম্ভ্রম রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে তাদের জানেরও নিরাপত্তা দিতে পারেনি।
জানা গেছে, একই সময় পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২০৪ জন নারী। নির্যাতনের মাধ্যমে ১৪৪ জন নারীকে হত্যা করা হয়েছে। গত ৩০ জুন সংবাদমাধ্যমে পাঠানো আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক সংবাদ-বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। অপরাধীরা প্রকাশ্যে ঘুরলেও আসামিকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ এমনটিই দাবি করা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর পক্ষ থেকে ! যা দেশের অপরাধ প্রবণতাকে উৎসিত করছে বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। আটটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ এবং আসকের নিজস্ব সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে সংখ্যাগত প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। যা কোন ভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালের প্রথম ছয় মাসে ৮৫৬ শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১৪৮ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। ৫৮ শিশু আত্মহত্যা করেছে। নিখোঁজের পর আট শিশু এবং বিভিন্ন সময়ে ৫৩ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ধর্ষণের ফলে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে গর্ভপাতের সময় মৃত্যু হয়েছে একজনের। এ ছাড়া রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয়েছে ১৫ শিশুর। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ছয় মাসে ধর্ষণ এবং ধর্ষণ চেষ্টার পর আত্মহত্যা করেছেন চার নারী। ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে ৫৭ নারীর ওপর। যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ৫৮ নারী। এর মধ্যে যৌন হয়রানির কারণে তিনজন আত্মহত্যা করেছেন। যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে চারজন পুরুষ নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া হয়রানি ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ৬৯ নারী-পুুরুষ। পারিবারিক নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করেছেন ৩০ নারী। শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩০ নারী। যৌতুককে কেন্দ্র করে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১১২ নারী। যৌতুকের জন্য শারীরিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে ৪৪ জনকে। যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন চারজন নারী। ছয় মাসে ২৫ গৃহকর্মী বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন ১৪ নারী। সালিশ ও ফতোয়ার মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তিন নারী।
উপরের পরিসংখ্যান থেকে দেশে অপরাধ প্রবণতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্রই ফুটে উঠেছে। যা একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক সমাজে কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্র নয়। কারণ, মাত্র ৬ মাসের ব্যবধানে দেশে যত অপরাধ সংঘঠিত হয়েছে এর নজীর বিশ্বের আর কোন দেশে আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিবিধানে রাষ্ট বা সরকারের কার্যকর কোন ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়নি বরং প্রায় ক্ষেত্রেই উদাসীনতার ভাবই বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কোথাও কোথাও ছোটখাট তৎপরতা লক্ষ্য করা গেলেও সেসব ক্ষেত্রে সাফল্য একেবারে শুণ্যের কোটায়। মূলত রাষ্ট্র বা সরকার এ বিষয়ে সক্রিয় থাকলে অপরাধ প্রবণতার এই লাগামহীন জয়জয়কার কোন ভাবেই সম্ভব ছিল না। আসলে জাতি হিসেবে আমরা কোন পাপের প্রায়াশ্চিত্য করছি কিনা তা কোন ভাবেই বোধগম্য হচেছ না। কারণ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সেন্ট অগাস্টিন মনে করে রাষ্ট্র হলো মানুষের আদি পাপের ফলশ্রুতি। রাষ্ট্রীয় জীবনের মাধ্যমে প্রায়াশ্চিত্য সম্পন্ন হলে মানুষ আবার স্বর্গরাজ্যের যোগ্য হয়ে ওঠে। তাই আমাদের এই প্রায়শ্চিত্যটা কবে নাগাদ শেষ হবে তা বলার খুব একটা সুযোগ থাকছে না। তাই আমাদের পক্ষে স্বর্গরাজ্যের আশা করাটা সঙ্গত হবে না বরং আমাদের অনাদিকাল পর্যন্ত নরকরাজ্যের যন্ত্রণায় ভোট করতে হবে-সার্বিক পরিস্থিতি সেদিকেই অঙ্গলী নির্দেশ করছে।
অবশ্য সেন্ট টমাস এক্যুনাস অগাষ্টিনের এ মতবাদ পরিহার করে এরিষ্টটলের সাথে সুর মিলিয়ে বলেন, রাষ্ট্র একটি প্রাকৃতিক সংস্থা। তার মতে রাষ্ট্র কল্যাণ সাধানের একক বিশিষ্ট সংস্থা। প্রয়োজনীয় অথচ ক্ষতিকর প্রতিষ্ঠান নয়। কল্যাণকর সংস্থা হিসেবে রাষ্ট্রের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত এবং এর শিক্ষামূলক কার্যক্রম রয়েছে। এরিষ্টটলকে অনুসরণ করে তিনি বলেন, সুন্দর ও সৎ জীবনের জন্য সুষ্ঠু এক অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রয়োজন এবং এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের এক উজ্জল ভূমিকা রয়েছে। রাষ্ট্র বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করবে। ন্যায়ানুগ মজুরীর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। দ্রব্যমূল্য সঠিক পর্যায়ে রাখবে এবং মুনাফা সীমিত করবে। রাষ্ট্র দরিদ্র ও দুস্থদের সহায়তা করবে।
তার মতে, সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক কল্যাণের জন্য রাষ্ট্র আইন প্রণয়ন করবে। তাছাড়া আত্মার মুক্তির জন্য ধর্মশালা যাতে তার যথার্থভাবে কাজ করে যেতে পারে তার উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলবে এবং নাগিরিকদের জীবনে এক শৃঙ্খলাবোধ জাগ্রত করবে। রাজনৈতিক কর্তৃত্বের স্বরূপ ও প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে টমাস রাষ্ট্রকে ব্যাপক স্বর্গীয় ব্যবস্থার অংশ বিশেষ হিসেবে দেখেছেন। এরিষ্টটল ও সেন্ট টমাস অক্যুনাসের মতবাদের মধ্যে যে স্বাতন্ত্র্য তার মূল এখানে। কিন্তু আমাদের দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা সেন্ট টমাসের রাষ্ট্রচিন্তা থেকে যোজন যোজন দুরে অবস্থান করছি। সুন্দর ও সুকুমার বৃত্তির চর্চার পরিবর্তে আমরা একটা অশুভবৃত্তির মধ্যেই আটকা পড়েছি।
আমরা আমাদের ধর্মশালাগুলোকে সক্রিয় করার পরিবর্তে ক্রমেই নিষ্ক্রিয় করে ফেলছি। তাই আমাদের এই অধঃপতনটাও অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
সেন্ট টমাস এক্যুনাসের ভাষায়, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে নৈতিক মানের ঔজ্জল্যে। তাই রাজনৈতিক কর্তৃত্ব হবে সীমিত এবং তা আইনের সীমারেখায় হবে আবর্তিত। যে সরকার আইন অনুযায়ি পরিচলিত হয় না তা অবৈধ ও পীড়নমূলক। অবশ্য সরকারের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আর তেমন কিছুই তিনি বলেন নি। তিনি রোমান আইনের সাথে পরিচিত ছিলেন কিন্তু আইনের উপরও সার্বভৌমের ক্ষমতা বিস্তৃত হতে পারে সে সম্পর্কে কিছুই বলেন নি। পোপ ও রাজকীয় শক্তির দ্বন্দ্ব সম্পর্কে তৎকালীন সাহিত্যে যা লেখা হয়েছিল, সে সম্পর্কেও তিনি অবহিত ছিলেন। তথাপি তিনি রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সঠিক ভিত্তি সম্পর্কে বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হননি।
মূলত শাসকগোষ্ঠী ও দেশের রাজনৈতিক শক্তি দেশের মানুষকে বন্ধু মনে করতে পারছে না বরং তাদেরকে বরাবরই প্রতিপক্ষই ভাবা হচ্ছে। তাই আমাদের দেশের রাজনীতি এখনও গণমুখী হয়ে উঠেনি। উপর্যুপরি রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই জনগণ ক্রমেই রাজনীতিবিমূখ হয়ে উঠতে শুরু করেছে। আর দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে রাজনীতিবিমূখ রেখে কোন ভাবেই জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতি সম্ভব নয়। সম্ভবত আমাদের দেশের রাজনীতিকরা বহুল আলোচিত-সমালোচিত রাষ্ট্রচিন্তক মেকিয়াভেলির রাষ্ট্রচিন্তার প্রভাবেই প্রভাবিত হচ্ছেন। মেকিয়াভেলির ভাষায়, ‘If men were entirely good this precept would not hold, but because they are bad and will not keep faith you, you too are not bound to observe it with them’. অর্থাৎ ‘জনগণ যদি সত্যিই উত্তম হতো তাহলে এই উপদেশের প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু তারা অসৎ এবং আপনার উপর তারা আস্থাহীন। সুতরাং তাদের ওপর আপনারও বিশ্বাস রাখার দরকার নেই’।
মূলত জনগণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের এমন ভ্রষ্ট ও অযৌক্তিক মূল্যায়ন আমাদের জাতিস্বত্ত্বাকে হীনবল করে ফেলেছে। তাই জনজীবনে সার্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে জনগণকে আস্থায় এনে গণমুখী রাজনীতির সূচনা করতে হবে। লাগাম টেনে ধরতে হবে অপরাধ ও অপরাধ সংশ্লিষ্টদের। অন্যথায় আমাদের সকল অর্জনই ব্যর্থ হতে বাধ্য।
-এস.এম মোস্তফা
smmjoy@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ