ঢাকা, সোমবার 23 July 2018, ৮ শ্রাবণ ১৪২৫, ৯ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নানা সংকটে পান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে মিরসরাইয়ের চাষীরা

মিরসরাই (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা : ‘যদি সুন্দর একখান মুখ পাইতাম মহেশখালীর পানের খিলি তারে বানাই খাবাইতাম’ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের সম্রাজ্ঞী সুমিষ্ট কণ্ঠের শিল্পী শেফালী ঘোষ নেই। কিন্ত তার গাওয়া এই গানটি বেঁচে আছে সবার মাঝে। শুধু দক্ষিণ চট্টগ্রাম নয় উত্তর চট্টগ্রামের মিরসরাই থেকে শুরু করে সারা দেশেই এই গান যেন গেঁথে আছে মানুষের মনে। কিন্তু ক্রমান্বয়ে সেই পান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন চাষীরা।
চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার হিঙ্গুলী, দুর্গাপুর, ওয়াহেদপুর ও পাশ্ববর্তি বারৈয়াঢালা পানচাষের জন্য বিখ্যাত ছিলো। বারইয়ারহাট বাজারটি‘পানেরবারৈ’ (পান বিক্রেতাদের) হাট থেকেই নামকরণ। বর্ষার এই মৌসুমে মিরসরাই এলাকার পানের বরজগুলো এখন সেজেছে মনোরম সাজে। সারি সারি পানের সুমিষ্টসমিরণে কৃষকদের মনে ও এখন বেশ আনন্দ। কোন প্রকার প্রাকৃতিক বৈরীতা নাহলে এবার ভালো ফলনই আশা করছে কৃষকরা। কিন্তু বর্তমানে উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারমূল্য কম থাকা, উপকরনের মূল্য বৃদ্ধি ও সংকট, প্রয়োজনীয় ঋণ ও প্রশিক্ষণের অভাবে উপজেলার  এসব এলাকার পানচাষিরা পান চাষে সফলতা পাচ্ছেনা। ফলে পানচাষে তাদের আগ্রহ কমে গেছে।
জানা গেছে, উপজেলার বারইয়ারহাট ও মিঠাছড়া বাজারে সপ্তাহে তিন দিন পানের বাজার বসে। বারইয়ারহাট বাজারে বসে শনি, সোম ও বৃহস্পতিবার। আর মিঠাছড়া বাজারে বসে রবি ও বৃহস্পতিবার। এক সময় দুই বাজারে প্রতি হাট বারে প্রায় কোটি টাকা লেনদেন হতো বলে জানান আড়তদাররা। এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। এছাড়াও রয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও যাতায়াত সমস্যা। মিঠাছড়া পানের আড়ত মালিক সম্ভু নাথ জানান, তার আড়তে দুই দিনে প্রায় ১০ লক্ষ টাকা বিক্রি হতো। এখন ৬-৭ লাখ টাকা বিক্রি হয়। চট্টগ্রাম শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন খুচরা পান ব্যবসায়ীরা মিঠাছড়া থেকে পান ক্রয় করেন। এখানে রয়েছে ২০ জন কর্মচারী।
জানা যায়, পানের বরজ তৈরির জন্য বাঁশ, খুঁটি, ছন, নলের ঝাঁটি, খৈল ইত্যাদি কেনার জন্য মহাজন বা ব্যাংক থেকে মোটা সুদে টাকা এনে যথাসময়ে সুদের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে অনেক সময় চাষিদের কমমূল্যে পান বিক্রি করতে হয়। ফলে পূর্বের ঘাটতি পূরণ করতে চাষিদের আবার সেই মহাজন বা ব্যাংকের কাছে যেতে হয়। এভাবে চক্রাকারে তাদের আর্থিক সংকটে পড়তে হচ্ছে।
এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, জ্যৈষ্ঠ থেকে কার্তিক এ পাঁচ মাস পর্যন্ত পানচাষে অধিক ফলন হয়ে থাকে। এখানে সাধারণত ঝাল পান হয়ে থাকে। এখানকার পানের সাইজ অন্য অঞ্চলের তুলনায় বড়। বরজ তৈরির জন্য উঁচু জায়গার প্রয়োজন। পানের বরজ করতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পড়ে বাঁশ, ছন ও খৈলের। অথচ এগুলোর বর্তমানে সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া ভাদ্র থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত খৈলের প্রয়োজন পড়ে। এগুলো না দিলে পান গাছের মূলে পচন ধরে। পানচাষে ব্যবহৃত বাঁশের খুঁটি ও ছন পাহাড় থেকে সংগ্রহ করা হতো। বর্তমানে সরকারের বনবিভাগ সেখানে বাগান করার কারণে বাঁশ-ছনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
হিঙ্গুলী এলাকার পানচাষিরা জানান, ‘কবুতর পাড়ি’ ও ‘ছাগপাড়ি’নামে দু’ধরনের রোগে আক্রান্ত হয় পানের বরজে। শীতের অতিরিক্ত কুয়াশা, অধিক খরা ও রোগ বালাই কারণে গাছ থেকে পান ঝওে যায়। এছাড়া প্রাকৃতিক দূর্যোগ এবং শিলাবৃষ্টির কারণে পানের বরজে প্রচুর ক্ষতি হয়। তবে কোনো রোগ বালাই না থাকলে অনেক দিন পর্যন্ত থাকে। পানচাষি পরিমল দে জানান, ফেনী, বারইয়ারহাট ও মিঠাছড় াবাজারে প্রতি সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবার পানের হাট বসে। কিন্তু ভারত থেকে অবৈধ পথে (ছাগলনা-ইয়া) ব্যবসায়ীরা পান বিক্রির জন্য এখানকার হাটে আসায় কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পায়না। অবৈধ পথে পান বিক্রি বন্ধ করলে এখানকার কৃষকরা লাভবান হবে মনে করছেন তারা।পানচাষি সুজিত নন্দী ৭০ শতক জমির পান চাষ করতে গত তিন বছরে প্রায় আড়াই লাখ টাকা খরচ পড়ে। উপকরন ও শ্রমিকের মূল্যে বৃদ্ধি এবং পানের বরজে রোগ বালাই সহ ইত্যাদি কারণে তিন বছরের শেষে এসে হিসাবে দেখা যায় তার ৫০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। তার এই লোকসানের হিসাব দেখে পানচাষের প্রতি আগ্রহ কমে যাবার কথা। কিন্তু আদি পেশা হিসেবে তিনি এখনো বুকে ধারণ কওে আছেন। লোকসানের কথা ভুলে গিয়ে তিনি আবারো ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তার জমিতে পানচাষে মনোযোগী হলেন। সকল পানচাষিদের মুখে একই কথা‘বাপ দাদার’ পেশা আঁকড়ে ধরে রাখার জন্য এই পানচাষ করা।
জানা যায়, পানচাষিরা বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে পান বিক্রি করেন। জেলার চাহিদা পুরণের পর তা ঢাকাসহ সারা দেশে এবং দেশের বাইরে ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান ও নেপালে রপ্তানি করা হয়। পানচাষি কেশব চন্দ্র নাথের অভিযোগ, গত পাঁচ বছর ধরে কৃষি বিভাগের পরিদর্শ করা কৃষকদের দুয়ারে কোনোদিন আসেনি। মাটি পরীক্ষা করা হয়না বলে পান গাছের মূলে (গোড়া) পচন ধরে।
পানচাষী সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, এলাকার সবাই দরিদ্র কৃষক। পানের প্রধান উপকরণ হচ্ছে বাঁশ। পাহাড়ি এলাকায় বাঁশ না থাকায় অধিক মূল্যে দিয়ে অন্য জায়গা থেকে বাঁশ ক্রয় করতে হয়। প্রায় সময় পান ক্ষেতে রোগ বালাই থাকে। কৃষি বিভাগ থেকে ন্যায্যমূল্যে সার, কীটনাশক, খৈলসহ বিভিন্ন উপকরণ প্রদান করলে কৃষক ফসল উৎপাদনে উৎসাহিত হতো। পানচাষি সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক রতন বিহারী সেন জানান, কৃষি বিভাগের সঠিক পরামর্শ না পাওয়ায় এখানকার পানচাষিরা প্রধান উপকরণ খৈলের পরিবর্তে ইউরিয়া সার ব্যবহার করে থাকেন। খৈলের পরিবর্তে ইউরিয়ার ব্যবহারেও বরজের প্রচুর ক্ষতি হয়।
এছাড়া এখানকার কৃষকদের প্রয়াজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে পানচাষে লাভবান হবে। মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বুলবুল আহমেদ জানান পানচাষীদের বিষয়ে আমি ও স্থানীয় সুপারভাইজার এর মাধ্যমে আমার এলাকায় কিছু প্রশিক্ষনসহ প্রণোদনার উদ্যোগ গ্রহন করবো। আশা করছি ভবিষ্যতে এই পানের ঐতিহ্য রক্ষা সম্ভব হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ