ঢাকা, মঙ্গলবার 24 July 2018, ৯ শ্রাবণ ১৪২৫, ১০ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপে প্রতিদিন গড়ে আক্রান্ত ১৫

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : ডেঙ্গু জ্বরের মোক্ষম সময় চলছে। এই বর্ষা মৌসুমেই মশার উপদ্রবে রাজধানীজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপে দেখা দিয়েছে। ছোটবড় হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের সংখ্যা বাড়ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো থেকেই ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের সংখ্যা বাড়ার পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। তাতে দেখা যায়, রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে ১৪ থেকে ১৫ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের কর্মকর্তা আব্দুর রহিম বলেন, গত ১ জানুয়ারি থেকে চলতি জুলাই মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে  ভর্তি হন ৭০৯ জন রোগী।
এর আগে ১৮ জুলাই এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) জানায়, ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে ওই দিন পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৮০ জন রোগী। ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে জনসাধারণকে সচেতন থাকার কথা উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এবারের মৌসুমে ভারি বর্ষণে এডিস মশাবাহিত রোগ ব্যাপক হারে হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সবাইকে সচেতন থাকতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
সরকারের ওই দুই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দু‘দিনের ব্যবধানে রাজধানীর ডেঙ্গু পরিস্থিতির যে চিত্র পাওয়া যায়, তাতে দেখা গেছে, ১৮ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ৬০৮ জন, আর দুদিন পর সে সংখ্যা ২০ জুলাইতে গিয়ে দাঁড়ায় ৭০৯ জনে। সে হিসেবে দুদিনে রাজধানীতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ২৯ জন। যা গড়ে প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৫ জনের বেশি কম।
এদিকে, রাজধানীর ১৯টি এলাকাকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া বিস্তারে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। অধিদফতরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা পরিচালিত একটি জরিপের ফলাফল গত মে মাসে প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, চিহ্নিত ১৯টি  এলাকায় চিকুনগুনিয়া বাহক মশার ঘনত্ব বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, এ মাসে (জুলাইতে) এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত বৃহস্পতিবার (১৯ জুলাই) পর্যন্ত ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি এলাকার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন অন্তত ৩৬৪ জন ডেঙ্গু রোগী। গত দু’মাসে এই রোগে অন্তত চার জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
ভারী বর্ষণের ফলে এডিস মশাবাহিত রোগ আরও  ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে জনগণকে সতর্ক করেছে সরকারের রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ঢাকায় প্রতি বছরের জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশার উপদ্রব বাড়ে। এ সময়কে চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু জ্বরের মৌসুম ধরা হয়। এ বছরের জানুয়ারিতে আগাম বৃষ্টি হওয়ায় মশার উপদ্রব আগে থেকেই বেড়ে গেছে।
অন্যদিকে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়িতে এডিস মশার লার্ভা খুঁজে পেয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কর্মকর্তারা। সম্প্রতি এক অভিযানে ১৮টি বাড়ির মধ্যে ১১টি বাড়িতেই এডিস মশার লার্ভা পেয়েছেন তারা। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে মিলছে লার্ভা। তাদের হিসাব মতে, প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়িতে লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু জ্বর ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদফতর ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার জন্য ঢাকার দুই সিটির যেসব এলাকাগুলো ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে, সেগুলোর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) আছে বনানী, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, গাবতলী, মগবাজার, মালিবাগের একাংশ, মিরপুর-১, মহাখালী ডিওএইচএস, নাখালপাড়া, পূর্ব শেওড়াপাড়া, টোলারবাগ ও উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টর। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে, ধানমন্ডি ১, এলিফ্যান্ট রোড, গুলবাগ, কলাবাগান, মেরাদিয়া, মিন্টো রোড, বেইলি রোড ও শান্তিনগর।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের কর্মকর্তা আব্দুর রহিম বলেন, ‘জুলাই মাসে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর কোনও তথ্য আমরা পাইনি। গত জানুয়ারিতে একজন চিকুনগুনিয়া রোগীর তথ্য পেয়েছিলাম। এ বছর ডেঙ্গুর রোগী ঢাকায় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে (২০ জুলাই) পর্যন্ত ৩৬৪ জন ভর্তি হয়েছে। জুনে তিন জন ও জুলাইয়ে তিন জন, অর্থাৎ এই দুমাসে ডেঙ্গু রোগে ছয় জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।’ তিনি বলেন, ‘জুন মাস থেকে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। গত ১ জানুয়ারি থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হন ৭০৯ জন রোগী।’
 সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে  ডেঙ্গু রোগীর হিসাবটা সংখ্যায় পাঁচ/ছয় জনের বেশি না।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদালয়ের (বিএসএমএমইউ)পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আব্দুল্লাহ আল হারুন বলেন, ‘এই সিজনে ২১ জন রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছি।’
এদিকে, ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে জনসাধারণকে সচেতন থাকার কথা বলছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এবারের মৌসুমে ভারি বর্ষণে এডিস মশাবাগিত রোগ ব্যাপক হারে দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সবাইকে সচেতন থাকতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
গত বুধবার (১৮ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে ৬৮০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা নেয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এডিস মশাবাহিত রোগের প্রতিরোধ ও বৃদ্ধি রোধকল্পে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।’
এর আগে ২০১৭ সালে ঢাকা মহানগরীতে চিকুনগুনিয়া রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছিল। ঢাকায় অবস্থিত বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে আইইডিসিআর’র পাওয়া তথ্য অনুযায়ী চিকিৎসা নেয়া সম্ভাব্য চিকুনগুনিয়া ও চিকুনগুনিয়া পরবর্তী আর্থ্রালজিয়া রোগীর সংখ্যা ছিল (১২ মে থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) ১৩ হাজার ৮১৪ জন এবং আইইডিসিআর-তে রক্ত পরীক্ষায় নিশ্চিত চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা হিসাব করা হয় ১ হাজার ৩ জন। এছাড়া ২০১৭ সালে আনুমানিক ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৭৬৯ জন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ