ঢাকা, মঙ্গলবার 24 July 2018, ৯ শ্রাবণ ১৪২৫, ১০ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কোটা সংস্কার না মানলে সরকারের পতনের আন্দোলন

গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে নাগরিক ঐক্য আয়োজিত কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিপীড়িত শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ এবং আমাদের করণীয় শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার: কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিপীড়িত শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ এবং আমাদের করণীয় র্শীষক এক আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, কোটা সংস্কার না মানলে এই ফ্যাসিট সরকারের পতনের আন্দোলন শুরু হবে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের কর্মসূচিতে হামলার ঘটনায় নিন্দা ও ক্ষোভ, আহতদের সুচিকিৎসা এবং মামলা থেকে নি:শর্ত মুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন অভিভাবক ও উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। পাশাপাশি হামলায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের মুক্তি চেয়েছেন তারা। কোটা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত সাধারণ শিক্ষার্থীর ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশবাহিনী এবং ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবিও জানিয়েছে বক্তারা। পাশাপাশি গ্রেফতার হওয়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের মুক্তি, সরকারি উদ্যোগে নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা সেবা প্রদান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের পদত্যাগের দাবি করেন তারা।
গতকাল সোমবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের নাগরিক ঐক্য আয়োজিত এক সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নার সভাপত্বিতে আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন, কোটা আন্দোলনের কর্মী জামাল আহমেদ, রিয়াদুল ইসলাম রিহন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, ডা. জাফরুল্লাহ খান, সাবেক এমপি আহসান হাবিব ংিকন, আব্দুল মালেক রতন, বিডি রহমাতুল্লাহ প্রমুখ।
আলোচনায় নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ব্যাংক লুটেরাদেরকে সরকার নতুন করে টাকা দিচ্ছে। দেশটা আজ মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে। আপনারা (সরকার) গণতন্ত্র চান না, ন্যায্যতা চান না। এ দেশের ছাত্র সমাজ কখনো নিজেদের স্বার্থের জন্য কাজ করেন না। গোটা দেশ ও সমাজের জন্য তারা আন্দোলন করেন। আপনারা যে যেখানে যেভাবে রয়েছেন, পারলে ছ্ত্রাদের পাশে দাঁড়ান। এখন সরকার সোনা রুটের পর কয়লা খাওয়া শুরু করেছে। অচিরেই এই ফ্যাসিট সরকারের পতন হবে কোটা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে।
মান্না আরো বলেন, ফোর টুয়েন্টি করার সুযোগ আছে, কিন্তু ঢাবি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সেটা করা যাবে না। তাদের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করার জন্য, বিকারগ্রস্ত করার জন্য যেসব কথাবার্তা বলছেন, তাতে কোন লাভ হবে না। আপনারা চাইলেই এই আন্দোলন বন্ধ করতে পারবেন না। ছাত্র আন্দোলনটারে আগাইয়া নেয়া জরুরী।
অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, মাহমুদুর রহমানের উপরে হামলার নিন্দা জানায়। ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন ছাত্রসমাজের ন্যায্য আন্দোলন। এই আন্দোলনে কারা হামলা করেছে তাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সরকারের এত এত গোয়েন্দা সংস্থা, এ ঘটনার ছবি, ভিডিও ফুটেজ আছে। সরকারের উচিৎ এদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া। কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রী এগুলো চোখে দেখছেন না। তিনি এই আন্দোলনের পেছনে ১২৫ কোটি ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পেয়েছেন।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘সরকারের পেটোয়া বাহিনী ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। আজ কোদাল দিয়ে কোপানো হচ্ছে, লাঠি দিয়ে মারা হচ্ছে, হাতুড়ি পেটা করা হচ্ছে। যারাই প্রতিবাদ করতে যাচ্ছেন, যুক্তিসঙ্গত আন্দোলন করছেন তারাই পেটোয়া বাহিনীর রোষানলে পড়ছেন। সরকারি বাহিনী ছাত্রলীগ যেভাবে সাধারণ ছাত্রদের পা ভেঙ্গে দিয়েছে তেমনি ভাবে আজ রাষ্ট্রেরও পা ভেঙ্গে গেছে।
ডা. জাফরুল্লাহ খান বলেন, ‘সরকারের ভাষায় সরকার উন্নয়ন করছে। জনগণের জন্য যদি উন্নয়ন হয় তাহলে সরকারের এত ভয় কেন? কেন তাদের পেটোয়া বাহিনীর দরকার হচ্ছে? কেন আন্দোলনকারীদের ওপর এমন হামলা চালানো হলো? ‘আমরা অবিশ্বাস্য বাজে পরিবেশে বাস করছি। সরকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, পুলিশ বাহিনী এবং ছাত্রলীগের কর্মীরা একই কায়দায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। পুলিশ মরিয়মকে হুমকি দিয়ছিল যে তার ব্যাগে ইয়াবা ভরে দিয়ে তাকে ইয়াবা ব্যবসায়ী বানাবে। পুলিশ আর ছাত্রলীগ এখন ব্যাপক ক্ষমতাশালী। কিন্তু তাদেরকে এতো ক্ষমতা দিতে হবে কেন। সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির অসঙ্গতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যারা প্রকৃতভাবে সুবিধাবঞ্চিত সেই অসহায় নারী, সুবিধাবঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধারা এর সুফল পায় না। সরকারি আমলা, কর্মকর্তা ও তাদের লোকজন এই কোটার সুযোগ নিচ্ছে। কোটা যত থাকবে, নিয়োগ বাণিজ্যে তত লাভ। এই কারণে তারা এই কোটার সংস্কার চায় না। ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে কোটা বাতিলের ঘোষণা দিলেন। কিন্তু সেটির বাস্তবায়ন হলো না। এটি সংসদে প্রধানমন্ত্রীর কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না, এটি ছিল তার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এ কারণে পরবর্তীতে আরও জটিলতা তৈরি হয়েছে।’
আহসান হাবিব লিংকন এমপি বলেন, আমরা চাই, অবিলম্বে আমাদের সন্তান, ছোটা ভাইদের ওপর সরকারের প্রশ্রয়ে যে হামলা ও নির্যাতন হচ্ছে তা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা হোক। পুলিশ প্রকাশ্যে কোটা আন্দোলনকারী ছাত্রীদের যৌন হয়রানী ও ধর্ষণ করার হুমকি দিচ্ছে। এটা একটি সুস্থ রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ অবনতি। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এসব হামলায় জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তি দেয়া হোক। প্রধানমন্ত্রী কোটা বাতিলের ঘোষণা দেয়ার পর প্রায় তিন মাসেও এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়ায় গত শনিবার থেকে ফের আন্দোলনে নামে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। কিন্তু আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের মারধরের শিকার হচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জামাল আহমেদ বলেন, আজকে আমরা কোন পরিস্থিতির কারণে প্রেস ক্লাবের সামনে এই প্রতিবাদ সভায় অংশ নিয়েছি- তা সবাই জানেন। সরকার কোটা আন্দলনের সঙ্গে জড়িত সাধারণ শিক্ষার্থীরা- যারা আক্রান্ত হয়েছে, তাদের গ্রেফতার করছে অথচ আক্রমণকারীদের কিছুই বলছে না। সাধারণ শিক্ষার্থীরা হামলার শিকার হয়ে হাসপাতালে গেলেও চিকিৎসা পাচ্ছে না। আক্রান্তকারীদের হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নুরুকে এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তরিকুলকে বের করে দেওয়া হয়েছে- চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। এ কেমন বাংলাদেশ, এ কেমন মানসিকতা। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরভাবে হামলা চালানো হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ মিছিলে ছাত্রলীগের নামধারীরা শত শত মোটরবাইক নিয়ে হামলা চালাচ্ছে। এটা কিসের লক্ষণ? এই সমাজ আমরা চাই না। যে সমাজ নাগরিকদের স্বাধীনভাবে চলার এবং মুক্তভাবে কথা বলার অধিকার দিতে পারে না, এমন সমাজ আমরা চাই না। সরকার যদি স্বাধীন সমাজের পরিস্থিতি গড়তে না পারে তবে চলে যাক। বিক্ষুব্ধ মানুষ ঘুরে দাঁড়ালে কিছুই করার থাকবে না। যারা আক্রমণ করেছে তাদের গ্রেফতার করতে হবে এবং আক্রান্তদের বিরুদ্ধে মামলা বিনা শর্তে তুলে নিতে হবে। যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের মুক্তি দিতে হবে।
সভায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়ে তিনি আরো বলেন, প্রক্টর বলছে তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে কিছুই জানেন না। এর থেকে লজ্জার আর কী হতে পারে! তিনি যদি না-ই জানেন, তবে ওই পদে বসে আছেন কেন- প্রক্টর সাহেব ইস্তফা দিয়ে এখনই চলে যান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ