ঢাকা, মঙ্গলবার 24 July 2018, ৯ শ্রাবণ ১৪২৫, ১০ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হলি আর্টিজান হামলার ঘটনায় ৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট

স্টাফ রিপোর্টার : সাত’শ বায়ান্ন দিন (দুই বছর ২২ দিন) আগে রাজধানীর কূটনীতিক এলাকা গুলশানের কড়া নিরাপত্তার ফাঁক গলে হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় জড়িত ২১ জনকে চিহ্নিত করে জীবিত আটজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দিয়েছে পুলিশ। ‘চিহ্নিত’ বাকি ১৩ জন নজিরবিহীন ওই হামলার পর বিভিন্ন অভিযানে নিহত হওয়ায় মামলা থেকে তাদের নাম বাদ দেয়ার কথা বলা হয়েছে অভিযোগপত্রে।
বিশ্বজুড়ে আলোচিত ওই হামলার ঘটনায় পুলিশ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে যে মামলা করেছিল, দুই বছরেরও বেশি সময়  পর তার তদন্ত শেষ করল পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট।
হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা হয়েছিল পাঁচ মাস আগে। এখানে হামলা চালানো জঙ্গিদের উদ্দেশ্য ছিল বিদেশী অর্থাৎ আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করা। বিশ্বের বড় বড় জঙ্গি সংগঠনের অনেক অস্ত্রশস্ত্র আছে। তাই তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এসব অস্ত্রশস্ত্র এবং প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা পাওয়া যাবে, এমন ধারণা ছিল জঙ্গিদের।
হলি আর্টিজান মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম গতকাল সোমবার এ কথা বলেন। সকালে রাজধানীর মিন্টো রোডে অনির্ধারিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে মনিরুল এ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে পাঠিয়ে দেওয়ার বিষয়টি জানান। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় এ হামলার নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন তিনি।
মনিরুল ইসলাম বলেন, জঙ্গিদের উদ্দেশ্য ছিল যত বেশি সংখ্যায় বিদেশীকে তারা হত্যা করতে পারবে, ততই দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাবে। এ কারণেই তারা হোলি আর্টিজানকে বেছে নেয়।
মামলার অভিযোগপত্র নিয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘অভিযোগপত্র দাখিল করেছি ৮ আসামীর বিরুদ্ধে। তদন্তকালে মোট ২১ জনের সম্পৃক্ততা এ ঘটনায় এসেছে। এ ঘটনায় যারা সরাসরি অংশ নিয়েছিল, তারা ঘটনাস্থলেই অভিযানে মারা যায়। এরপর আমাদের সঙ্গে বিভিন্ন অভিযানে আটজন নিহত হয়েছে। আর আটজন জীবিত রয়েছে, যাদের মধ্যে ছয়জনকে জীবিত গ্রেফতার করেছি৷ আর দু’জন আছে, যাদের আমরা গ্রেফতার করতে পারিনি। তাদের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট অব অ্যারেস্টের আবেদন আমরা আদালতে পাঠিয়েছি।’
মনিরুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে তারা ওই অভিযোগপত্র আদালতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তিনি জানান, জীবিত আট আসামীর মধ্যে ছয়জন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন, বাকি দুজন পলাতক। কারাগারে থাকা ছয় আসামি হলেন- জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী, রাকিবুল হাসান রিগান, রাশেদুল ইসলাম ওরফে র‌্যাশ, সোহেল মাহফুজ, মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান এবং হাদিসুর রহমান সাগর। পলাতক দুই আসামি শহীদুল ইসলাম খালেদ ও মামুনুর রশিদ রিপনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রে গ্রেফতারি পরোয়ানা চাওয়া হয়েছে বলে জানান মনিরুল। তিনি বলেন, “তদন্তে দেখা গেছে, আসামিরা পাঁচ মাস আগে থেকেই হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল দেশকে অস্থিতিশীল করা, বাংলাদেশকে একটি জঙ্গি রাষ্ট্র বানানো, সরকারকে চাপের মুখে ফেলা।”
হামলার পরদিন সকালে হলি আর্টিজান বেকারি থেকে গ্রেফতার নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিমের নাম এই অভিযোগপত্রে আসেনি। অভিযানে নিহত হলি আর্টিজানের পাচক সাইফুল ইসলামকে শুরুতে সন্দেহের তালিকায় রাখা হলেও তার সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ তদন্তকারীরা পাননি।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালিয়ে ১৭ বিদেশিসহ ২০ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। তাদের ঠেকাতে গিয়ে দুই পুলিশ কর্মকর্তাও নিহত হন। রাতভর উৎকণ্ঠার পর ২ জুলাই সকালে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে সঙ্কটের অবসান ঘটে। হামলায় অংশ নেওয়া নব্য জেএমবির পাঁচ জঙ্গি নিবরাজ ইসলাম, মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল নিহত হন ওই অভিযানে।
আর পরে জঙ্গিবিরোধী বিভিন্ন অভিযানে হামলার ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ তামিম চৌধুরী, জাহিদুল ইসলাম, তানভীর কাদেরী, নুরুল ইসলাম মারজান, আবু রায়হান তারেক, সারোয়ার জাহান, বাশারুজ্জামান চকলেট ও ছোট মিজান নিহত হন।
কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্ত প্রতিবেদনে চিহ্নিত ২১ জনের মধ্যে পাঁচজন গুলশান হামলায় সরাসরি অংশ নেন। বাকিরা হামলার পরিকল্পনা, সমন্বয়, প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র-বোমা সংগ্রহসহ বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত ছিলেন।
গত বছর মনিরুল বলেছিলেন, হামলার মূল পরিকল্পনাকারী (মাস্টারমাইন্ড) তামিম চৌধুরী, মূল প্রশিক্ষক (মাস্টার ট্রেইনার) মেজর জাহিদ কিংবা তানভির কাদেরি, নুরুল ইসলাম মারজান ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসামী।
পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গুলশান হামলার জন্য বগুড়ার দুই জঙ্গিকে নিয়োগ করেন রাজীব আর বসুন্ধরায় বাসা ভাড়া ও জঙ্গিদের উদ্ধুদ্ধও করেন তিনি।
সাগর সীমান্তের ওপার থকে আসা অস্ত্র ঢাকায় মারজানের কাছে পৌঁছান। বাশারুজ্জামান মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ থেকে দুই দফা হুন্ডির মাধ্যমে আসা ২০ লাখ টাকা গ্রহণ করেন এবং সেই টাকা গুলশান হামলায় ব্যবহৃত হয়।
হাসনাত করিমের সম্পৃক্ততা মেলেনি
গুলশান হামলার মামলায় দুই বছর ধরে বন্দী থাকলেও হাসনাত রেজাউল করিমকে বাদ রেখেই দেয়া হয়েছে অভিযোগপত্র। অভিযোগপত্র দাখিলের পর পুলিশ জানিয়েছে, হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলায় নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক এই শিক্ষকের জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ তারা পাননি। হামলার দিন সপরিবারে গুলশানের ওই ক্যাফেতে ছিলেন ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী হাসনাত করিম। তাদের উদ্ধারের পর সন্দেহ সৃষ্টি হলে হাসনাত করিমকে পরের মাসেই গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর থেকে তিনি কারাগারে।
হাসনাত করিমের নাম অভিযোগপত্রে না থাকার বিষয়ে মনিরুল বলেন, “এই ঘটনায় জীবিত উদ্ধারদের মধ্যে কেউই হাসনাত করিমের নাম বলেনি। তদন্তে হামলার কোনো পার্টেই হাসনাত করিমের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। তাই চার্জশিট থেকে তার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।”
তদন্তে ২১১ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এর মধ্যে ১৪৯ জন প্রত্যক্ষদর্শী।
২০১৬ সালের ৪ অগাস্ট গ্রেফতার হওয়ার পর হাসনাত করিম অনেকবার জামিনের আবেদন করলেও প্রতিবারই তিনি প্রত্যাখ্যাত হন। জামিনের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলে আসছিলেন, অভিযোগপত্রে হাসনাত করিমের নাম আসতে পারে।
ঢাকার বনানীর ব্যবসায়ী প্রকৌশলী রেজাউল করিমের ছেলে হাসনাত করিম মেয়ের জন্মদিন উদযাপনের জন্য ওই বছরের ১ জুলাই সপরিবারে হলি আর্টিজানে গিয়েছিলেন। সন্ধ্যার পর সেখানে পাঁচ জঙ্গি হানা দিয়ে ১৭ বিদেশীসহ ২০ জনকে হত্যা করে। তখন জিম্মি হন হাসনাত করিম, তার স্ত্রী, দুই মেয়েসহ কয়েকজন। কমান্ডো অভিযান চালিয়ে জঙ্গিদের হত্যা করার পর তারা মুক্ত হন। কিন্তু ওই ক্যাফেতে জিম্মি দশার একটি ভিডিওচিত্র প্রকাশের পর হাসনাতকে নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। হামলার পরদিন ভোরে ধারণ করা ওই ভিডিওতে হাসনাত করিমকে জঙ্গিদের সঙ্গে আলাপ করতে দেখা গিয়েছিল। হলি আর্টিজানে কমান্ডো অভিযান শুরুর আগের এক ছবিতে ক্যাফের ছাদে দুই ব্যক্তির সঙ্গে হাসনাত রেজাউল করিমকে দেখা যায়। হলি আর্টিজানে কমান্ডো অভিযানে যে পাঁচ হামলাকারী নিহত হন, তাদের মধ্যে নিবরাজ ইসলাম নর্থসাউথের শিক্ষার্থী ছিলেন, যেখানে হাসনাত এক সময় পড়াতেন।
হাসনাতকে গ্রেফতারের পর ঢাকা মহানগর পুলিশের (গোয়েন্দা) তৎকালীন যুগ্ম-কমিশনার আবদুল বাতেন বলেছিলেন, “গুলশানের হামলার ঘটনায় হাসনাত করিমের জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাই ওই ঘটনায় করা মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।”
তবে হাসনাতের স্ত্রী জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, জিম্মি অবস্থায় তাদের বিভিন্ন নির্দেশ মেনে কাজ করতে হয়েছিল।
হাসনাতের সঙ্গে উদ্ধার তাহমিদ হাসিব খানকে নিয়েও দেখা দিয়েছিল সন্দেহ; কারণ ভিডিওতে তাকে অস্ত্র হাতে দেখা গিয়েছিল। তবে পরে পুলিশ অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয় কানাডায় পড়াশোনারত তাহমিদকে। পরে তিনি মুক্তি পেলেও হাসনাত করিম আটকে আছেন।
উদ্দেশ্য ছিল দেশকে অস্থিতিশীল করা
মনিরুল ইসলাম জানান, হলি আর্টিজানে নিহত পাঁচ জঙ্গির মধ্যে নেতৃত্ব দিয়েছিল রেহান ইমতিয়াজ এবং খায়রুল ইসলাম পায়েল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল দেশকে অস্থিতিশীল করা। বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র বানানো। সরকারকে কোণঠাসা করে দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করা। সরকার যাতে চাপে পড়ে। বিনিয়োগকারীরা যাতে দেশ ছেড়ে চলে যায়।
মনিরুল ইসলাম বলেন, জঙ্গিরা মনে করেছিল, আসল জঙ্গিদের না ধরতে পেরে নিরীহ মানুষকে নির্যাতন নিপীড়ন করা হবে। এতে মানুষ যাতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়বে সরকারের ওপর। সাধারণ মানুষ যেন সরকারের ওপর বিক্ষোভ করে,জঙ্গিরা একেই কাজে কাজে লাগাতে চেয়েছিল।
মনিরুল ইসলাম বলেন, হলি আর্টিজানের ঘটনার আগে জঙ্গিরা আরও কয়েকটি স্থানে রেকি করেছিল। কিন্তু তাদের বিচারে বেরিয়ে এসেছে, তারা হলি আর্টিজানেই চালাবে। প্রথমত, এখানে নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা তেমন ছিল না। দ্বিতীয়ত, এ জায়গাটা পালানোর জন্য সুবিধাজনক হবে। পাশাপাশি এ এলাকায় ঘটনা চালালে সর্বোচ্চসংখ্যক বিদেশি একসঙ্গে পাওয়া যাবে। এ কারণেই তারা ঘটনার দু-তিন আগে হলি আর্টিজানকে টার্গেট করে। এ ছাড়া ২৭ রমজান ছিল এ ঘটনার দিন। তারা মনে করেছে, এ জঘন্য কাজে তারা বেশি সোয়াব পাবে।
মনিরুল ইসলামের ভাষ্য, প্রথমে জঙ্গিরা হলি আর্টিজান টার্গেট করেনি। তারা টার্গেট করেছিল ঢাকার যেখানে বেশিসংখ্যক বিদেশী পাওয়া যাবে, এমন কোনো জায়গা। সে অনুযায়ী তাদের নেতারা কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তারা টার্গেট করেছিল, শহুরে ব্যাকগ্রাউন্ডের কিছু ছেলে লাগবে, সেই কারণে তারা চারজনকে বাছাই করে। একজনকে শোলাকিয়াতে কাজে লাগায়, বাকি তিনজন রোহান ইমতিয়াজ, মোবাশ্বির ও নিবরাস ইসলামকে হলি আর্টিজানে কাজে লাগায়। তাদের যেহেতু পূর্ব অভিজ্ঞতা কম, তাই গাইবান্ধায় একটি ক্যাম্পে কথিত প্রশিক্ষণ ক্যাম্প করে প্রশিক্ষণ দেয় এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার জন্য দেশের বিভিন্ন জায়গায় একাধিক অপারেশনে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে পাঠায়। পাশাপাশি গ্রামীণ ব্যাকগ্রাউন্ডের যে দুজন রয়েছে, উজ্জ্বল ও পায়েল। তারা অপেক্ষাকৃত অভিজ্ঞ। তাদেরকে এই তিনজনের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে।
এ মামলার তদন্ত করতে দুই বছর লাগল কেন? এ প্রশ্নের জবাবে মনিরুল বলেন, এ ঘটনায় সরাসরি যারা অংশগ্রহণ করেছিল, তারা ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। জীবিত কাউকে ধরা যায়নি। ফলে আলামত পরীক্ষা ও প্রাপ্ত ফলাফল পর্যালোচনা করতে সময় লেগে যায়। অভিযানকালেও বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছে, যাদের জীবিত ধরতে পারলে আরও বেশ কিছু তথ্য পেতে পারতাম, আরও দ্রুত তদন্ত শেষ হতো। এ ছাড়া তদন্ত যাতে নির্ভুল হয়, এ কারণে আমাদের কিছু সময় লেগেছে।
মনিরুল বলেন, ‘বিদেশী ১৭ জন, ৩ জন বাংলাদেশী নাগরিক এবং ২ জন পুলিশ কর্মকর্তা এ হামলায় নিহত হয়েছেন। তাঁদের আমরা রক্ষা করতে পারিনি, এটি আমাদের ব্যর্থতা। তবে আমরা চেয়েছি নিহত ব্যক্তিদের হত্যাকারী অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করতে, যাতে তাঁদের স্বজনেরা শান্তি পান।’
মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এ ঘটনায় ১৭ জন সার্ভাইভার যাঁরা ভেতরে ছিলেন, তাঁদের জবানবন্দী রেকর্ড করিয়েছি, ৭৫টি আলামত বিজ্ঞ আদালতে পাঠিয়েছি। নিহত ব্যক্তিদের সঙ্গে থাকা বিভিন্ন বিলংইংস (জিনিসপত্র) স্বজনদের কাছে ফেরত দিয়েছি।’
গতকালকের সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন মনিরুল ইসলাম।
প্রশ্ন: এজাহারে নাম থাকলেও চার্জশিটে হাসনাত করিম ও শাওনের নাম নেই কেন? কোন গ্রাউন্ডে তাদের বাদ দেওয়া হলো?
উত্তর: মামলার এজাহারের কলামে কোনো আসামীর নাম ছিল না। বডিতে নাম ছিল। যাদের জীবিত উদ্ধার করেছি, এমন ১৭ জনের জবানবন্দী আদালতে দেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি যে আসামী জীবিত উদ্ধার হয়েছে, তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী এবং আলামত যাচাই-বাছাই করে যাদের সম্পৃক্ততার নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেছে, তাদের নাম চার্জশিটে দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন: হামলার নিয়ে হাসনাত করিমের ব্যাখ্যা কী?
উত্তর: যারা জীবিত উদ্ধার হয়েছে, তাদের দেওয়া তথ্যের পাশাপাশি আমরা আরও জানতে পেরেছি, নব্য জেএমবির একটি সাংগঠনিক পরিকল্পনা নিয়ে এ হামলা করা হয়েছে। তাদের এই পরিকল্পনার কোথাও আমরা হাসনাত করিমের সম্পৃক্ততা পাইনি। এ ছাড়া যারা জীবিত গ্রেফতার হয়েছে, তাদের কথায়ও হাসনাত করিমের নাম আসেনি। সুতরাং হাসনাত করিমের দেওয়া ব্যাখ্যার চেয়েও অন্য যারা প্রত্যক্ষদর্শী ছিল, তাদের জবানবন্দীর ওপর আমরা ডিপেন্ড করেছি এবং চার্জশিটে আদালতকে ব্যাখ্যা করেছি।
প্রশ্ন: তদন্তে সাক্ষী কতজন ছিল?
উত্তর: এ মামলার সব মিলে মোট সাক্ষীর সংখ্যা ২১১ জন। এদের মধ্যে ১৪৯ জন ঘটনা সম্পর্কে জানে কিংবা ঘটনা দেখেছে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জানে। ৭৫টি আলামত আদালতে পাঠানো হয়েছে।
প্রশ্ন: হামলার পর প্রকাশিত ছবি নিয়ে হাসনাত করিমের ব্যাখ্যা কী?
উত্তর: সেই ছবিগুলো আমরা বিশ্লেষণ করেছি। সেই বিশ্লেষণের ফলাফল আদালতে ব্যাখ্যা করেছি।
প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা পেয়েছেন কিনা?
উত্তর: এ ঘটনায় তামিম, সারওয়ার, মারজানের মতো নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতাদের কাউকেই জীবিত গ্রেফতার করতে পারিনি, তারা অভিযানে নিহত হয়েছে। এদের জীবিত গ্রেফতার করতে পারলে নিশ্চিত হতে পারতাম। কিন্তু অন্য যাদের জীবিত গ্রেফতার করেছি, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং আমাদের টেকনোলজিক্যাল এভিডেন্সে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কোনো তথ্য-প্রমাণ পাইনি। তবে আমরা মনে করি, তদন্তে আমাদের যে একটা ল্যাকিংস সেটি ছিল, যেসব কেন্দ্রীয় নেতারা বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয়েছে। এদের জীবিত গ্রেফতার করতে গেলে আরও তথ্য পেতে পারতাম।
এ ঘটনায় সাইফুল্লা ওযাকির কিংবা বিদেশে অবস্থানরত অন্য কারও নাম কিংবা আন্তর্জাতিক সংগঠনের নাম পাইনি। নব্য জেএমবির নেতাদের সঙ্গে থাকলেও থাকতে পারত। তবে তামিম যেহেতু নেতা, আন্তর্জাতিক কারও সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারই করার কথা ছিল। এ ছাড়া তার ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলো অভিযানের আগেই ধ্বংস করে পুড়িয়ে দিয়েছে। তাই বিদেশী কোনো সংগঠন, আইএস কিংবা আল-কায়েদা, হিযবুত তাহ্রীর কিংবা অন্য কোনো সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য আমরা পাইনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ