ঢাকা, মঙ্গলবার 24 July 2018, ৯ শ্রাবণ ১৪২৫, ১০ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ইউনিসেফের অনন্য স্বীকৃতি ও মাহমুদুর রহমানের ওপর হামলা

গত ৪ জুলাই ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ইউনেস্কো ইসলামকে দুনিয়ার সবচেয়ে শান্তিকামী ধর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করে একটি বিবৃতি দিয়েছে। ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতি ও বিবৃতির ফলে যারা এতদিন পর্যন্ত ইসলামকে সন্ত্রাসী ধর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করে অপপ্রচার চালাতেন তাদের মুখ বন্ধ হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের এই সংস্থাটি প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, তারা প্রায় ছয় মাস আগে বিশ্বের সবগুলো ধর্ম অধ্যয়ন করে তার মধ্য থেকে সব চেয়ে শান্তিকামী ধর্মটিকে চিহ্নিত করার লক্ষ্যে ইন্টারন্যাশনাল পিস ফাউন্ডেশনের সাথে এক চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন। এতে আরো বলা হয়, ‘ছয় মাস ধরে কঠোর অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণের পর আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, বিশ্বে ইসলামই হচ্ছে সবচেয়ে বেশি শান্তিকামী ধর্ম।’ আন্তর্জাতিক পিস ফাউন্ডেশনের তুলনামূলক অধ্যয়ন শাখার প্রধান রবার্ট মাকগী সাংবাদিক সম্মেলনে এই ঘোষণা দেন, সাংবাদিক সম্মেলনে যখন সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা ও বাগদাদসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ইসলামের নামে পরিচালিত সন্ত্রাসী হামলাসমূহের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয় তখন ইউনেস্কো কর্মকর্তারা এ ঘটনাগুলোর সাথে ইসলামের যে কোনো সম্পর্ক অস্বীকার করেন।
তাদের ভাষায় : ‘Terror had no religion, Islam means peace.’ জানা গেছে যে, এই স্বীকৃতিকে প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষণের লক্ষ্যে ইউনেস্কো এব্যাপারে আগ্রহী মুসলিম সংস্থাগুলোকে একটি সার্টিফিকেট ইস্যু করবে যা তারা মসজিদ, মাদরাসা, ইসলামী অধ্যয়ন কেন্দ্র, হালাল স্টোর, মুসলিম কসাইখানা প্রভৃতিসহ বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শন করতে পারবে।
বিশ্ব সংস্থা কর্তৃক তুলনামূলক ধর্ম অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণের উদ্যোগ গ্রহণের এই বিষয়টি ছিল সমসাময়িক দুনিয়ার অনন্য একটি ঘটনা। বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী যখন ইসলামের দুশমনরা তাদের হত্যা-সন্ত্রাস, গুম খুনসহ সব অপকর্মের দায় ইসলামের ওপর চাপিয়ে দিয়ে তাকে সন্ত্রাসী ধর্ম হিসেবে চালিয়ে দেয়ার অপতৎপরতায় লিপ্ত তখন এ ধরনের একটি উদ্যোগের প্রশংসা না করে পারা যায় না। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই যে ইউনেস্কো কর্তৃক ইসলামকে সর্বশ্রেষ্ঠ শান্তির ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পর প্রায় তিন সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই ঘোষণাটি দেয়া হয়েছে। সম্মেলনস্থল থেকে এএফপি হেড কোয়ার্টারের দূরত্ব খুব বেশি নয়। সেখানে রয়টারসহ পাশ্চাত্য দুনিয়ার নামকরা বহু সংবাদ সংস্থার দফতর রয়েছে, যারা দুনিয়ায় যখন যেখানেই কোনো সন্ত্রাসী বা অমানবিক ঘটনাই ঘটুক না কেন তার দায় ইসলাম ও ইসলামপন্থীদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে তৎক্ষণাৎ সংবাদ পরিবেশন করে। কিন্তু ইউনিসেফের এই ঘোষণাটি তারা কেউই আজ পর্যন্ত পরিবেশন করেনি। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রমাণ হয় যে, সত্যের ব্যাপারে তারা অন্ধ, সত্যকে তারা ভয় পায় এবং এদের সকলেই ইসলাম বিরোধী ও ইসলাম বিদ্বেষীদের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করে। আবার আমাদের দেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলোর সরকারগুলোর নীরবতা ও ধিক্কার পাবার যোগ্য। কেননা ইউনিসেফ বা বিশ্ব সংস্থার সামান্য আনুকূল্য পেয়ে দেখা গেছে যে, তারা শুধু ধন্যই হয় না, জাতীয়ভাবে উৎসব করে দেশকে মাতিয়ে তোলারও চেষ্টা করে। জাতিসংঘ একটি বিশ্ব সংস্থা; দুনিয়ার সব দেশ ও জাতিগুলোকে নিয়ে এই সংস্থা গঠিত। এই সংস্থার প্রভাবশালী ধনী দেশগুলোর বেশির ভাগ ইসলাম বিরোধী এবং তাদের শাসকগোষ্ঠী ও রাজনীতিবিদদের উল্লেখযোগ্য অংশ ইসলাম ও মুসলমানদের দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়। এ জন্য একটা অজুহাতের দরকার। এই অজুহাত হচ্চে সন্ত্রাস ও মানবতা বিরোধী অপরাধ। তারা ইসলাম ও তার অনুসারীদের ওপর এই মিথ্যা অভিযোগটি চাপিয়ে দিয়ে প্রচার মাধ্যমগুলোকে কাজে লাগিয়ে দুনিয়াব্যাপি ইসলাম বিরোধী প্রপাগা-ায় লিপ্ত রয়েছে। তাদেরই প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ইউনিসেফ তার অধ্যয়নমুখী সমীক্ষা ও বিশ্লেষণে এই সত্য উদ্ঘাটিত করেছে যে, ইসলামের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগ মিথ্যা; সন্ত্রাসের সাথে ইসলামের দূরতম সম্পর্কও নেই। এটিই একমাত্র শান্তির ধর্ম। বস্তুত ইসলামের জন্য ইউনিসিফের এই সার্টিফিকেটের দরকার হয় না। কেননা, স্বয়ং আল্লাহতায়ালাই পবিত্র কুরআনে সাড়ে চৌদ্দশ’ বছর আগে ইসলামকে এই সার্টিফিকেট দিয়ে মানবজাতির জন্য তাকে একমাত্র ধর্ম বা দ্বীন হিসেবে মনোনীত করেছেন। এটি নিছক ধর্ম নয়, একটি জীবনব্যবস্থা। আলেম ওলামা থেকে শুরু করে সারা দুনিয়ার ঈমানদার মুসলমানরা পাশ্চাত্যের ইসলাম বিদ্বেষের সর্বদা নিন্দা করেছে এবং তাদের দেশীয় এজেন্টদের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ করেছে। এই এজেন্টরা ইসলামী শক্তিসমুহের নাম দিয়েছে জঙ্গিবাদী শক্তি। অথচ কোনও ঈমানদার মুসলমান সন্ত্রাসী হতে পারে না, অন্যায়ভাবে কারোর ওপর হামলা করতে পারে না। ইউনিসেফের অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণ একথাটিই প্রমাণ করেছে এবং বিশ্ব সংস্থা হিসেবে তার সমীক্ষা ও গবেষণার ফলাফল অবশ্যই গুরুত্ব বহন করে। পাশ্চোত্যের প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক ও সোশ্যাল মিডিয়াগুলোর ন্যায় আমাদের দেশের মিডিয়াগুলো এ ব্যাপারে অন্ধের ভূমিকা পালন করেছে। তারা এই নিউজটি সম্পূর্ণভাবে কিল করে দিয়েছে। এরা নিজেরা যেমন স্টাডি করতে জানে না, তেমনি অন্যের বস্তুনিষ্ঠ অধ্যয়ন বা অনুসন্ধান থেকে শিক্ষা নিতে পারে না। এরা চোখ থাকতে অন্ধ, কান থাকতে বধির এবং জবান থাকতে বোবা। আল্লাহ এদের এই গুরুত্বপূর্ণ ইন্দ্রয়গুলোতে সীল মেরে দিয়েছেন বলে মনে হয়। সরকারের অবস্থাও একই রকম বলে মনে হয়।
আমার ইচ্ছা ছিল আজ নির্বাচন নিয়ে লিখব। সিটি নির্বাচন ও পার্লামেন্ট নির্বাচন। আওয়ামী লীগের সিনিয়ার নেতা ও সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন বাংলাদেশের নির্বাচনী মাঠে আগামী দিনগুলোতে খেলা হবে। এই খেলার মাঠে এককভাবে থাকবেন শেখ হাসিনা এবং সেখানে রেফারী হবেন নির্বাচন কমিশন। চমৎকার। সরকারি প্রস্তুতি ঐ লক্ষ্যেই অগ্রসর হচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্ভাবনাময় সকল নেতানেত্রীদের গ্রেফতার করে জেলে ভরা হচ্ছে। যারা সত্যের পক্ষে কথা বলেন লেখা লেখি করেন, তাদের গুম করে মেরে এবং প্রকাশ্যে হামলা করে রক্তাক্ত করে তাদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা চলছে। লেখক সাংবাদিক ফরহাদ মজহারসহ বেশ কয়েকজন এখন ভয়ে সন্ত্রস্ত, অনেক রাজনীতিবিদ প্রাণের ভয়, সম্পত্তি ও সম্মানের ভয়ে প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে পারেন না। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষ এই দু’টি ধ্বংসাত্মক শব্দ এমনভাবে এখন ব্যবহার করা হচ্ছে যে কে কখন দেশদ্রোহীতে পরিণত হয়ে যান বলা মুশকিল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কথা বললেই স্বাধীনতা বিরোধী, তার বেঁচে থাকার অধিকার নাই, মৌলিক অধিকারের তো প্রশ্নই উঠে না, গ্রামাঞ্চলের অবস্থা আরো খারাপ। পুলিশ ও সিভিল প্রশাসন এখন উঠানামা করে জেলা উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতা ও ছাত্রলীগ যুবলীগের ইশারা ইঙ্গিতে। চিরায়ত সামাজিক মূল্যবোধ ও কাঠামো প্রায় ভেঙ্গে পড়েছে। সেদিন কে একজনকে বলতে শুনেছি, আর যদি পাঁচ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকে তাহলে নিশ্চিত ভাবে এদেশের মানুষ জাহান্নামে যাবে। কেন না এর মধ্যে তারা তাদের সুকৃতিগুলো সম্পূর্ণভাবে ভুলে যাবে। কাজেই নির্বাচন নিয়ে লিখে কোনও লাভ হবে বলে মনে হয় না। নির্বাচন আদৌ হয় কিনা আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
তবে দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে একটি কথা না লিখে পারছিনা। গত রোববার আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিষ্ট মাহমুদুর রহমান একটি মামলায় হাজিরা দেয়ার জন্য কুষ্টিয়ার চীফ মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে গিয়েছিলেন। তিনি আইনের কাছে নজেকে সোপর্দ করেছেন এবং আদালত তাকে জামিন দিয়েছেন। মামলাটি করেছেন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি। জামিন তার এবং তার সংগঠনের পছন্দ হয়নি। তারা কোর্ট আঙ্গিনায় জনাব মাহমুদুর রহমান এবং তার দল বলকে জিম্মি করে রাখে, বিষয়টি আদালতের গোচরীভূত করা হয়। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী আদালত ওসিকে তলব করেন কিন্তু পুলিশের ওসি এতে সাড়া দেননি। জনাব মাহমুদ একজন আইনজীবীর কক্ষে আশ্রয় নেন। সেখানে তাঁর ওপর হামলা করা হয়। পরে তিনি যখন গাড়িতে উঠেন তখন তার গাড়িতেও হামলা করা হয় এবং লাঠি দিয়ে পিটিয়ে এবং ইট-পাটকেল ছুড়ে তাঁকে রক্তাক্ত করে দেয়া হয়। পত্র-পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত তার রক্তাক্ত ছবি অনেকেই দেখেছেন। ঘটনাটি মর্মান্তিক ও অভূতপূর্ব। আদালত প্রাঙ্গণে আদালতকে অবমাননা করে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা, একজন আইনানুগ নাগরিক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবির জীবন এবং সম্মানের নিরাপত্তা হানির যে ঘটনা ঘটিয়েছে তা সভ্যকোনও দেশে কল্পনা করা যায় না। সরকারি প্রশাসন অদ্যাবধি এর বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
প্রসঙ্গত : ২০১০ সালেও রাঙ্গামাটিতে এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছিল। সেখানে এর অনুঘটক ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগ। ঐ দিন জামায়াত নেতৃবৃন্দ শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ জেলা আদালতে হাজিরা দেয়ার কথা ছিল। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার মিথ্যা অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। সরকার তাদের এই সংগঠনটিকে দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত করে যেমন প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের নেতা সমর্থক এবং সাংবাদিক বুদ্ধিজীবিদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছেন তেমনি সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের তারা অমানুষিকভাবে অত্যাচার নির্যাতন করছেন, হাতুড়ি পেটা করছেন। এ অবস্থা চলতে পারে না। এ দেশে এখন কারুরই নিরাপত্তা নেই। মানুষ তাদের বিবেকও হারিয়ে ফেলছে। আমরা এর নিন্দা জানাই এবং দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যত বংশধরদের স্বার্থে দলমত নির্বিশেষে সকল শ্রেণি পেশার মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই। সাথে সাথে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কামনা করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ