ঢাকা, মঙ্গলবার 24 July 2018, ৯ শ্রাবণ ১৪২৫, ১০ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশ ব্যাংকে স্বর্ণ কেলেঙ্কারী

অলিউর রহমান ফিরোজ : সাত রাজার ধন যেভাবে গুপ্ত সিন্দুকে রাখা হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ রাখার ভল্ট তার চেয়েও আরো বেশি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যেভাবে স্বর্ণ রাখা হয় তা ছয় স্তর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেদ করে ঢুকতে হয়। ভল্টের প্রধান দরজা থেকে রয়েছে আরো তিনটি দরজা। সেখানে রয়েছে আলাদা আলাদা নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এ ছাড়াও রয়েছে ডিজিটাল পাঞ্চকার্ড। সেখানে ঢুকার পর রয়েছে আলাদা আলাদা আলমারী। সেই আলমারীর জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা সিন্দুক। সেই সিন্দুকের রয়েছে আলাদা আলাদা চাবি। সেই চাবি রাখা হয় একটি সিন্দুকে। সেই সিন্দুকের চাবি থাকে একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তার জিম্মায়, একটি থাকে শুল্ক গোয়েন্দাদের জিম্মায় এবং অপরটি থাকে স্বর্ণকারের কাছে। তা আবার রাখা হয় আলাদা একটি সিন্দুকের ভেতর। সেখানে ইচ্ছা করলেই এককভাবে কেউ ঢুকতে পারে না। প্রয়োজন তিনটি চাবির। তার জন্য প্রয়োজন তিন সংস্থার লোক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা, শুল্ক গোয়েন্দা এবং স্বর্ণকারের। একজন বাকী থাকলে সেখানে ঢুকার কোনো সুযোগ নেই। এতো মহাযজ্ঞ থাকার পরও কীভাবে সংরক্ষিত এলাকার ভল্টে ঢুকে এরকম একটি ঘটনার অবতারণা করলো তা এখন দেশের মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে রাখা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম স্বর্ণের চাকতি এবং ২২ ক্যারেট স্বর্ণ এখন হয়ে গেছে শুংকর ধাতু। এতে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতর যে বড় ধরনের গলদ রয়েছে সে বিষয়টি আবারও পরিস্কার হলো। তবে এ ঘটনাটি যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে একক কোনো ব্যক্তির পক্ষে যে সম্ভব নয় তা পরিষ্কার। হয়তো জোটবদ্ধভাবেই স্বর্ণ চোরাচালান মাফিয়াদের হাতে হাত মিলিয়ে এ স্বর্ণের রকম হেরফের করা হয়ে থাকার সম্ভাবনাই বেশি বলে পরিলক্ষিত হচ্ছে। যেভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিরুদ্ধে এর আগে গুরুতর অভিযোগ ছিল যখন নতুন টাকা বিশেষ বিশেষ উৎসবে ছাড়া হয় তার ভেতর জাল টাকা পাওয়ার ঘটনা। তাতে বিষয়টি স্পস্ট হয় যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টটি যে আদৌ কোনো নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে নেই। আর থাকলেও যারা নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্বে রক্ষকের ভূমিকায় থাকছে তারাই এখন ভক্ষকের  ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে। স্বর্ণ অনিয়মের ঘটনাটি ধরার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ আনবিক শক্তি কমিশনের মাধ্যমে আধুনিক পদ্ধতিতে স্বর্ণের মান পরীক্ষা করার প্রস্তাব দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সে প্রস্তাব শুল্ক বিভাগ প্রত্যাখান করেছেন। শুল্ক অধিদপ্তর চাচ্ছে তারা যে প্রতিবেদন দিয়েছে তা নিরপেক্ষ এবং তৃতীয় কোনো পক্ষ পরীক্ষা করুক। কিন্তু এখানে একটি বিষয় স্বচ্ছতা পাওয়া গেছে তা হলো চরম গাফেলতি। কোনো কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই গাফেলতির দায়ভার এড়াতে পাড়ে না। তার কারণ হলো- যখন স্বর্ণ রাখা হয় তখন তার যে প্রতিবেদন শুল্ক অধিদপ্তরে দেয়া হয়েছিল তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরই তৈরি। তারা এখন ইচ্ছা করলেই তার দায়ভার অন্য কারো কাঁধে চাপিয়ে দিতে পাড়ে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যখন সাইবার হামলা চালিয়ে দেশের টাকা চুরি করে নিয়ে গেল তখন অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন এটা কোনো টাকাই না। টাকা চুরির সাথে তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো কোনো কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন বলেও তদন্তে বিষয়টি ওঠে আসে। কিন্তু তারপরও কোন ধরনের শুদ্ধি অভিযান নেয়া হয়নি। যার ফলশ্রুতিতে অপরাধী চক্র আবার বড় ধরনের ঘটনা ঘটাতে পেরেছেন। এ চক্রটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতর ঘাপটি মেরে বসে আছে। কিন্তু অনেক ঘটনার পটিয়সী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের খলনায়কদের বিরুদ্ধে শক্ত কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় তারা একের পর এক অরাজকতা করেই চলেছে। এখন তাদের চিহ্নিতকরণের সময় এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে নিতে হবে কঠোর এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা। অনিয়ম, সেচ্ছাচারিতা, গাফেলতি, দুর্নীতি সবকিছুই এখন বিরাজ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। গুরুত্বপূর্ণ এ সংস্থাটি কতটা অরক্ষিত তা কয়েকটি ঘটনা সামনে না এলে বুঝাাই যেতো না। কেদ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে কি এবার তাহলে ভূঁতে আছর করছে। গল্প কাহিনীর মতো সোনার কাঠি রূপার কাঠিতে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা কতটা অরক্ষিত, অনিয়ম এবং গাফেলতি বিরাজ করছে তা স্বর্ণ কেলেঙ্কারীর ঘটনাটা সামনে না এলে তা বুঝা যেতো না। বাংলাদেশ হলো স্বর্ণ চোরাচালানীদের জন্য নিরাপদ রোড। দেশের বাজারের চাহিদা মিটিয়ে বাকী স্বর্ণ চলে যায় পাশের দেশ ভারতে। সেখানে স্বর্ণের রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। যত স্বর্ণ বাংলাদেশ দিয়ে পাচার হচ্ছে তার হয়তো সামান্যই ধরা পড়ছে। কিন্তু সেই সামান্যও কম নয়। স্বর্ণ ধারা পড়ার পর তা নিয়ম অনুসারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে রাখা হয়। রাখার সময় বিধি মোতাবেক সে স্বর্ণ অভিজ্ঞ লোক দিয়ে স্বর্ণের মান যাচাই বাছাই করে পরিমাপ এবং তাতে কি ধরনের স্বর্ণমান রয়েছে এ মর্মে একটি লিখিত প্রতিবেদন শুল্ক অধিদপ্তরকে দেয়া হয়। তাদের তালিকায় ৯৬৩ কেজি স্বর্ণ রয়েছে বলে জানা যায়। কিন্তু দেশের শুল্ক গোয়েন্দারা যে স্বর্ণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে রেখেছিল তা পরিদর্শন শেষে তাদের রাখা স্বর্ণের মান তারা ঠিক পায়নি। ২২ ক্যারেট স্বর্ণ হয়ে গেছে ১৮ ক্যারেট। তারা বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৃষ্টিগোছরে এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি লেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। আর তখনই ঘটনাটি ফাঁস হয়ে যায়। আর তার ফলে দেশজুড়ে ভয়াবহ আলোড়নের সৃষ্টি হয়। দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা যে কৌশলে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে স্বর্ণের পরিবর্তন ঘটিয়েছে তা ভাবলে শরীর শিউরে ওঠে। জালিয়াতকারীরা এটা  ভালো করেই জানে যে স্বর্ণ লুটপাট করে খেলে তা ধরা পড়বে অনিবার্য। তাই তারা ভিন্ন কৌশলের আশ্রায় নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আসল স্বর্ণ সরিয়ে নকল এবং মানহীন স্বর্ণ রেখে যে আলোড়ন সৃষ্টি করছে তা ক্ষমার অযোগ্য। এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভোল্টে জালিয়াতকারীরা আসল টাকা সরিয়ে জাল টাকা রেখে তা বিতরণ পর্যন্ত করেছিল। এতে বুঝা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে দুর্নীতির আখড়া কতটা ঘাপটি মেরে বসে আছে।
সবচেয়ে আলোড়ন তুলেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকা চুরির ঘটনাটি। সেখানেও নির্বিঘ্নে তারা চুরির কাজটি করতে পেরেছিল। সে ঘটনাটিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক গোপন করতে চেয়েছিল। যে কারণে ঘটনাটি সংগঠিত হওয়ার অনেক পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা প্রকাশ্যে আনেন। আমরা এবারও কি স্বর্ণের ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে দেখবো। যেখানে শুল্ক গোয়েন্দা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক যৌথভাবে ঘটনাটি স্বীকার করে অভিমত পোষণ করেছেন সেখানে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর মুখে এখন অন্য সুর শোনা যাচ্ছে। তারা হয়তো ঘটনাটির নেপথ্যে থেকে আড়াল করতে চেষ্টা করছেন। তাতে করে কি সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে? জনগণকে কি তারা বোকা বানাতে পারবে? অনেকগুলো ঘটনার জন্ম দেয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক একের পর এক ঘটনা তৈরি করবে আর সরকার তা প্রতিহত না করে আড়াল করার চেষ্টা করবে? যেখানে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বলছেন তাদের প্রতিবেদনটি নির্ভুল এবং সঠিক। সেখানে দেশের রাজনৈতিক নেতাদের কোনো ধরনের জরিপ না করেই রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়াটা দেশের মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যে ঘটনাটি ঘটেছে তার জন্য দায়ী হলো কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলাজনিত। সেখানে এখন যেভাবে সরকার এবং আমলা-মন্ত্রীরা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছে তা অযাচিত। তারা কীভাবে গোপন প্রতিবেদনটি প্রকাশ পেল তা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করছেন। কি অভিনব দেশ, কি অভিনব তাদের চিন্তা-চেতনার প্রয়াস। যেখানে একটি বড় ধরনের ঘটনার অবতারণার জন্ম দিয়েছে, সেখানে সরকারের কঠোর পদক্ষেপই ছিল প্রধান এবং প্রথম পদক্ষেপ। কিন্তু তা না করে যারা এই মারাত্মক অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেছে তারাই যেন সরকারের রোষের অনলে পোড়তে যাচ্ছে।
oliurrahmanferoz@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ